আইনের ফাঁস এড়াতে দল পরিবর্তন, "মূর্খের স্বর্গ বাস", সুকান্তর বরাভৈ দেবশ্রী মজুমদার

সম্প্রতি আর জি কাণ্ডে অন্যতম অভিযুক্ত অধুনা লটারি কাণ্ডে জেল যাত্রার আশঙ্কা থেকে ঋতব্রত তৃণমূল বৈঠকে হাজির হন নির্মল ঘোষ, যার হৃদয়ে নাকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ড. সুকান্ত মজুমদার বলেন, যারা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়িয়ে ভাবছেন বেঁচে যাবেন, তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। তাদের শাস্তি পেতেই হবে। হয়তো সাময়িক স্বস্তি পাচ্ছেন। আমরা সবাই জানি, সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস, অসৎ সঙ্গে নরক বাস। বর্তমান সরকারের আমলে মূর্খের স্বর্গ বাসের প্রকৃত রূপ কী হবে জানা নেই। সৎ ও অসৎ বিষয়টি বেশ গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। তবে নির্মলদের মতো এই মূর্খ -চতুরদের ক্ষেত্রে পৃথক ফল স্বাভাবিক কিনা, আজ হোক,বা কাল হোক, ক্রমশ প্রকাশ্য। যদিও সুকান্ত মজুমদারের বরাভৈকে বিশ্বাস করতেই হবে। কারণ এই সরকার মাত্র কয়েক মাস এসেছে। পানিহাটির প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল ঘোষের বিরুদ্ধে অভয়ার মা প্রথম থেকেই সরব ছিলেন। পূর্বতন মমতা সরকার অভয়া কাণ্ডে আসল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থায় নেয় নি। এমনকি তার ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে দলীয় প্রার্থী করে দেয়। তাই অভয়ার বিচার চাইতে মা রত্না দেবনাথ মানুষের আশীর্বাদ চান এবং তা পেয়ে আজকে পানিহাটির বিধায়িকা। বিধান সভার প্রথম দিনে অভয়ার কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কেঁদে ফেলেন রত্না দেবী। আর জি কর ফাইলস খোলে সরকার। বিষয়টি সিবিআইয়ের অধীন। অবশ্য কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। সাত দিনের মধ্যেই কিছু একটা হবে আশা ছিলো তাঁর হয়তো বা। ১১ জুলাই নির্মল ঘোষ ফের খবরের শিরোনামে। লটারি মামলা থেকে বাঁচতে ঋতব্রত তৃণমূলের বৈঠকে যোগদান করেন তিনি? কেউ কেউ বলছেন, তিনিও কি তবে ভালো তৃণমূল হওয়ার পথে? আমরা রাজ্যবাসী সবার ভালো চাই। এমনকি "সবাই ভালো হোক" চাই। তবে নির্মল ঘোষের মতো লোক যেন ভালো না হন, এটাই চাই। "ভালো" বলতে 'ভালো তৃণমূল'। এই 'ভালো তৃণমূল' ট্যাগ একবার হয়ে গেলে, গরিব গাড়ি চালকটি ডিয়ার লটারির ১ কোটি টাকা ফেরৎ পাবেন না এবং সর্বোপরি রত্না দেবীর জীবনের লক্ষ্যটাই হারিয়ে যাবে। তবে সুকান্ত বাবু, সকলকে আশ্বস্ত করেছেন দোষীদের বিজেপিতে পুনর্বাসন হবে না। ঋতব্রত তৃণমূলে যে কেউ যেতেই পারেন। তবে, নির্মল ঘোষের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, এমনটাই সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠিত সত্য যে নির্মল ঘোষ লোকটি সহজ খেলোয়াড় নন। কারণ তিনি ঋতব্রত -তৃণমূলের তপসিয়া বৈঠকে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। নির্মল ঘোষ বলছেন, তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন। ঋতব্রতর সাথে কথা হয়েছে। আবার কথা হবে। চাপান উতোরে ঋতব্রত উল্টো গেয়ে বলেন, নির্মল ঘোষকে তারা কেউ আমন্ত্রণ জানান নি। তাঁকে দেখে তিনি অবাক হয়েছেন। ছাব্বিশের প্রাক নির্বাচন সময় কালে রত্না দেবনাথের মুখে ভয়ঙ্কর কথা ছিলো, "প্রশাসনিক ক্ষমতায় না থাকলে, মেয়ের বিচার পাবো না।" গণতন্ত্রের বিপক্ষে এমন বিপদজনক শব্দ আর হয় না। তাহলে অসাধারণ না হলে, ধর্ষিতা বিচার পাবে না। এর থেকে ভয়ঙ্কর আর কী হতে পারে? এক্ষেত্রে রত্নাদেবী সঠিক বিচার না পেলে তিনি, তাঁর পরিবার, রাতের রাস্তা যারা দখল করেছিলো এবং সমগ্র রাজ্যবাসী এক নুতন দৃষ্টান্তের সাক্ষ্মী হবেন। যা হবে খুবই হতাশাজনক। সবাই জানে, আর জি কর মেডিক্যালে চিকিৎসককে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় নাম জড়ায় পানিহাটির তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষের। আর জি কর মেডিক্যালের নিহত চিকিৎসক যেখানে থাকতেন, তিনি সেখানকারই বিধায়ক। নির্যাতিতার পরিবারের দাবি, নির্মল ঘোষের তত্ত্বাবধানেই হাসপাতাল থেকে দেহ বের করে বাইরে নিয়ে আসা হয়। ধর্ষণ-খুনের পর তাড়াহুড়ো করে দাহ করে ফেলা হয় চিকিৎসকের দেহ। অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন পানিহাটির বিধায়ক নির্মল ঘোষ। তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক অভিযোগ অস্বীকার করলেও চিকিৎসককে ধর্ষণ-খুনের তদন্তে তাঁকে তলব করে সিবিআই। তাই তো রত্না দেবী বলেন, পুলিশ নির্মল ঘোষকে খুঁজে পাচ্ছে না। আসলে ধরছে না। আমি পুলিশকে ফোন করেছি। কেউ ছাড়া পাবে না। আমি ছাড়বো না। আমার অভিশাপে একটা বড়ো দল ছিন্নভিন্ন হলো। অনেকে মনে করছেন, 'কালীঘাট-তৃণমূল' ছেড়ে এখন সেই নির্মল ঘোষ 'ঋতব্রত তৃণমূল'-র তপসিয়ার বৈঠকে আসছে, নিজ স্বার্থে। আর তাতেই, অনেক বিতর্ক জন্ম দিয়েছে। তবে সেই জল্পনায় জল ঢালার চেষ্টা করেন পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক। নির্মল ঘোষ এও বলেন যে, তিনি জাভেদ খানের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। দীর্ঘদিন ধরে বেপাত্তা থাকার পর হঠাৎ উদয়। এতদিন কোথায় ছিলেন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তা কেউ জানেন না। লটারি প্রতারণা মামলায় ধরপাকড় শুরু হতেই কি তবে তাঁর এই শিবির বদল? 'ঋতব্রত-তৃণমূল'-এর বৈঠক চলাকালীনই হাজির ছিলেন নির্মল ঘোষ। যদিও নির্মল ঘোষের বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি, জানিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই সুকান্তবাবুরাও ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের বক্তব্য দেবেন। শীর্ষ নেতৃত্ব যা বলবেন, তাই করতে বাধ্য হবেন। তারপর একটা ব্যাখ্যা দেবেন। তবে আপাতত পরকীয়া প্রেম নিয়ে ছোঁক ছোঁক না দেখিয়ে এমন ভাব যেন,অতি পীরিত যেখানে, নিত্য যাবে না সেখানে”।

পুশ ইন - পুশ ব্যাক কোন মুভি থ্রিলার থেকে কম নয়, সুনালি, দানেশ ও সুইটি বিবিদের। পিছন ফিরে তাকালেই, গুলি... দেবশ্রী মজুমদার, বীরভূম :

Green Border (২০২৩) পোল্যান্ড–বেলারুশ সীমান্তে শরণার্থীদের বারবার পুশব্যাক ঘটনার উপর নির্মিত বাস্তবধর্মী ও আবেগঘন ছবি হাত তালি কুড়িয়েছে অনেকের। কিন্তু আমাদের দেশের নাগরিকদের পুশ - ইনের ছবি এখনো নির্মিত হয় নি। হতভাগ্য সুনালী সুইটি বিবিদের জীবনের এক বছর চোদ্দ দিন, কম মর্মস্পর্শী, হৃদয় বিদারী নয়। এই ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। নাগরিকের বেনাগরিক করে তোলার কাহিনী। অবশ্যই স্যালুট ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাকে! ২০-২১ বছর দিল্লির রোহিনী পল্লিতে থেকে কাজ করে দিন গুজরান করতো সুনালী খাতুন ও সুইটি বিবিদের পরিবার। কিন্তু গতবছর ২৪ শে জুন নেমে এলো সেই ভয়ঙ্কর দিন। রোহিনী পল্লী থেকে দানেশ সেখ ও সুইটি বিবিদের বাংলাদেশী সন্দেহে ধরে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি আগেই হাতিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি অন্তস্বত্বা সুনালীর ডাক্তারি কাগজ, মোবাইল ফোন। হুমকি দেয়, কথা না শুনলে, সুনালিকে আলাদা পাচার করে দেবে। দানেশ সেখ নিজের জবানিতে বলেন, পুলিশ তার কাছে তিন লক্ষ টাকা চেয়েছিলো। দানেশ জানিয়েছিল, তাদের কাছে রয়েছে ২৫-৩০ হাজার কারণ গ্রামের বাড়ি পাইকর থেকে কুরবানী সেরে সদ্য ফিরেছে। পুলিশ দানেশের কাজের জায়গার ম্যানেজার, এলাকার সাফাইকর্মী কারো কথায় শোনে নি। সবাই তাদের হয়ে অনুরোধ করেছিলো, ছেড়ে দিন। গরীব মানুষ। আম্বেদকর মেডিক্যাল হাসপাতালে মেডিক্যাল টেস্ট করে, কোর্টে তাদের তুলে মিথ্যা তথ্য জমা দিয়ে পুলিশ জানালো তারা বাংলাদেশী, কোনো কাগজ তারা জমা দিতে পারে নি। ২৬ শে জুন তাদের নিয়ে মোট ৭০ জনকে এয়ারপোর্ট থেকে আসামের ধুবড়ির কাছে বাংলাদেশ কুড়ি গ্রাম সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্যাম্পে বাংলাদেশীদের হাতে বাংলাদেশী মুদ্রা দেওয়া হয়। দানেশ সেখদের সঙ্গে দুজন বাংলাদেশী ছিল। একজন একটি পোস্টের কাছে নেমে যায়। আরেকজন দালাল গোছের লোক গাড়ি থেকে তাদের মাঝপথে নামিয়ে দেয়। সেখানে বি এস এফ তাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বলে। দানেশ জানায়, তখন রাত বারোটা না একটা ঠাউর করতে পারছিলাম না। বর্ষার সময়। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। হঠাৎ আমাদের ছয় জনকে বি এস এফের একজন বললেন, সামনে ফাঁকা জায়গা দিয়ে দৌড় দিয়ে সরসর করে চলে যাবি। পিছনে তাকালে গুলি করে দেবো। ছেলে বৌ সবাই তাদের হাতে পায়ে ধরে কাঁদতে থাকলাম, শুনলো না। বললে, এই সামনের জঙ্গলে বাঘমারারা আসে, ওরা জানতে পারলে বিপদে পড়বি, কাঁদিস না। অগত্যা এক পা জল ভুঁইয়ে দেড় থেকে দু'দিন হেঁটে চলেছি, বলে চলে দানেশ। সারা রাতা মহিলা ও শিশুদের নিয়ে জংলি পথে হাঁটা। দিনের আলো ফুটলে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে নদীর জল আর কলার বন থেকে কাঁচা কলা খেয়েই জীবন বাঁচাতে হয়েছে। তারপর কুড়ি গ্রামের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে সেখানে প্রাণ ভরে একদিন একটু খাওন দাওন হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আশ্রয় গেল। দানেশ বলেন, আসলে ওটা ছিলো দালালের বাড়ি। যারা বিজিবি ও বিএস এফের মিডলম্যান। সেই বিজিবিকে ফোন করে আমাদের ধরিয়ে দেয়। তারপর শুরু হলো আরেক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। দানেশ জানান, বিজিবি অফিসার তাদের কাদা জল মাখা পোশাক দেখে বাঘমারা চোরা শিকার পাচারকারি মনে করে। দানেশের কাছে নেই টাকা, নেই কোনো নথি। হিন্দিতে নিজের নাম লিখতে পারতো। সেটা দেখেই বিজিবি নিসন্দেহ হয়, তারা ইণ্ডিয়ান। এতক্ষণ পুশ ইন কবলে তারা ভুগলো। এবার পুশব্যাক। এবার সেই দালাল তাদের দায়িত্ব নিয়ে, বিজিবিকে জানিয়ে দিলো, সেই ম্যানেজ করে দিচ্ছে। কিন্তু কিছুটা হেঁটে কুড়ি গ্রামের একটা ফাঁকা পথ দেখিয়ে সেই দালাল বলে দিলো, সোজা হাঁটবে। আধ ঘন্টা গেলেই, আমার লোক থাকবে। সেই তোদের বর্ডার পার করে দেবে। যেহেতু আমরা টাকা দিতে পারি নি, তাই সে সাথে গেলো না। বহু অনুরোধ করেও কোনো লাভ হলো না। বিএস এফ হেড লাইটে তাদের যথারীতি দেখে ফেলে চিৎকার করে ওঠে, রুক্ রুক্। গুলি করে দেবো। ক্যাম্পে নিয়ে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয় আমাকে, বলে দানিশ। লাঠি, ঘুষি চালায়। বন্দুক দিয়ে মারতে গেলে আমি সরে যেতেই, সেই বন্দুকের আঘাত লাগে আমার ওই টুকু ছেলে সাবের সেখের মাথায়। সুনালীকে থাপ্পড় মারা হয়। সন্তান সম্ভবা বলে মাফ করা হয় নি। সুইটিকেও চড় থাপ্পড় মারা হয়। পরে আমার জামা খুলে পিঠে মারের দাগ দেখে ওষুধ দেয়। খাবার ও দেয়। তারপর রাত বারোটা নাগাদ গাড়িতে চাপিয়ে ফের একটা জায়গাতে নামিয়ে দেওয়া হয়। দানেশ বলেন, বিএস এফ বর্ডারে হ্যালোজেন নিভিয়ে বলে সামনের রাস্তা ধরে চলে যা। বুঝলাম, আবার পুশ ইন। আল্লাহ কে ডাকতে ডাকতে অন্ধকারে সবাই চলতে লাগলাম। পিছনে দেশের সৈন্য। তারা বন্ধুক তাক করে আমাদের দিকে। সামনে বিদেশী সৈন্য। আমরা কোথাকার! কোন দেশের! ঠিকানা ছাড়া, ঠিকানার খোঁজে। ছেলেরা ভয়ে কাঁদতে ভুলে গেছে। সুনালীর হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। উপায় নেই। ১০ কিমি হেঁটে একটা নদী পেলাম আমরা। পড়ে শুনেছি ওটার নাম নাকি দুধকুমার। ভারতে শঙ্কোস বলে। জিঞ্জির নৌকা টেনে পেড়িয়ে একটা বড়ো নদী দেখলাম। সেখানে বাঁশের সেতু। ধরলা নদী পেরিয়ে সোনাহাটি বন্দর যাওয়া যায়। এরপর দেখলাম আরেকটা বড়ো নদী। এক ফোঁটা পানি নাই। হেঁটে পেরোলাম। বোধহয় ওটা তিস্তা নদী। দানেশ বলে, সোজা ঢাকা মেট্রো শহরে হাজির হলাম আমরা। একটা বাড়িতে বললাম, আমাদের কাছে একটা ফোন নাম্বার আছে, একটু ফোন করতে দিন। বাড়িওয়ালা বললো, কাজ করো তারপর ফোন করতে দেবো। তার বাড়িতে তিন দিন রাজমিস্ত্রির কাজ করার পর, একটু খেতে আর ফোন করতে দেয়। দানেশ জানায়, সুইটিবিবির মামাতো ভাই আমির খানের কাছ থেকে ঢাকার ফারুক সেখের নাম্বার পায় সে। সেই নাম্বারে ফোন করে অনেক সমস্যা মিটে যায়। ততদিনে সুনালী, সুইটি ও ছেলেরা হোটেলে বাসন ধোয়ার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ফারুক সেখ একজন চিকিৎসকের ছেলে ও ব্যবসায়ী। তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে তিন চার দিন রাখার পর, বাসা বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। জামা কাপড়, খাবার দাবারের ব্যবস্থা করে দেন। ইতিমধ্যে জানাজানি হয়ে যায় আমাদের কথা। পুলিশ আমাদের জেলে পাঠিয়ে দেয়। তারপর ভারত থেকে মোফাজিল সেখ বাংলাদেশে এসে মামলার তদবির করে। তিন মাস দশ দিন পর সুনালি ও ছেলে সাবেরের জামিন হয়। ক্যাপশন: ছেলে আপনকে কোলে নিয়ে দানেশ সেখ

বিধবা মাছ ছোবে না ছ'মাস, ক্রান্তিকাল কি তার আগেই উত্তীর্ণ? দেবশ্রী মজুমদার

সহজে অনুমেয়। সেই মহা সন্ধিক্ষণ সমুপস্থিত। বৃহস্পতিবার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সারির তিন নেতৃত্বের হাতে পদ্ম পতাকা ধরিয়ে দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বললেন, ‘এই মুহূর্তে সুখেন্দু শেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইকের একমাত্র পরিচয়, তাঁরা বিজেপি কর্মী।’ তিনি আরও বলেন, ‘চার ঘণ্টার তৃণমূলের জন্য দরজা বন্ধ। যাঁরা মানুষকে লুঠ করেছে তাঁদের জন্য দরজা বন্ধ।’ রঙ্গিলা রসিকতা করবে। অনেক নিন্দুক বলতে শুরু করেছে, জানতুম, বিধবা ছ'মাস মাছ ছোঁবে না। এতো দেখছি, এদের এতো দেরিও সয় না! আই এ্যাম তো অবাক! অবাক হওয়ার কিছু নেই। জার্সি বদল করে দল বদল খেলারই অঙ্গ। দর্শকের কাজ দেখা, শুধু দেখা সে কেমন খেলছে। কেউ কেউ তো তলে তলে একাদশী বিধবার মতো নিরম্বু উপবাস রেখে পুকুরে ডুব দিতে যাওয়ার নাম করে ডুবে ডুবে জল খায়। মহাভারতে মহামতি ভীষ্ম একবার যুধিষ্টিরকে বলেন- "শত্রুর্ মিত্রং ভবত্যেব, মিত্রং চাপি প্রদুষ্যতি। কার্যাকার্যবশাদ্ রাজন্, নিত্যং লোকস্য বর্তনম্॥" যার বাংলা অর্থ হলো- হে রাজন, শত্রুও মিত্র হয়ে যায়, আবার মিত্রও শত্রু হয়ে যায়। মানুষের সম্পর্ক কার্য, প্রয়োজন ও পরিস্থিতির কারণেই পরিবর্তিত হয়। তাই অবাক হওয়ার কিছুই নেই। ইহাও সম্ভব, উহাও সম্ভব, সম্ভব তো যুগে যুগে। রাজনীতি যারা করেন, তারা জানেন, রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী থাকে স্বার্থ, লক্ষ্য ও পরিস্থিতি। রাজনীতির মতো যতো কিছু জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সব ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে। পুরাণে দেখা যায়, রাম–সুগ্রীব: প্রয়োজনে মৈত্রী। দ্রোণ–দ্রুপদ: বন্ধু থেকে শত্রু। বিভীষণ–রাম: ধর্মের জন্য পক্ষ পরিবর্তন। দেবতা–অসুর: স্বার্থে সাময়িক জোট। স্বার্থ একটা থাকেই। একটু বৃহৎ পরিমণ্ডলে দেখলে আরও ভালো পরিষ্কার হবে। ইতিহাসের পাতায়, এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে দেখা যায়—স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী মিত্র বলে কিছু নেই; পরিস্থিতি ও ব্যবহারের ভিত্তিতেই সম্পর্ক বদলে যায়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়াই যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে যুক্ত রাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়ন আদর্শগতভাবে একে অপরের বিরোধী ছিল। কিন্তু হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার পর তারা একই জোটে যোগ দেয়। যুদ্ধ শেষে আবার ঠাণ্ডা লড়াইয়ে তারা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। পুরন্দরের সন্ধি চুক্তি হয় শিবাজী ও জয় সিংহের মধ্যে। পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে আবার সংঘাত শুরু হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বহুল উদ্ধৃত নীতি রয়েছে: "Nations have no permanent friends or permanent enemies, only permanent interests." বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তো এব্যাপারে রাজনৈতিক নজির স্থাপন করেছে। এব্যাপারে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো: ভারতীয় জনতা পার্টি ও জনতা দল (ইউনাইটেড) বহু বছর জোটসঙ্গী। তাবলে কি মাঝে মাঝে তাদের মধুচন্দ্রিমা ভঙ্গ হয় নি? ২০১৩ সালে তাদের জোট ভাঙে। ২০১৭ সালে আবার জোট। ২০২২ সালে আবার বিচ্ছেদ। ২০২৪ সালে পুনরায় জোটে ফেরা। ফের ২০২৬ শে জোট সঙ্গী। শিবসেনা ও ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র। ২০১৯ মহারাষ্ট্র সরকার গঠন-এর পর জোট ভেঙে যায়। পরে শিবসেনার একাংশ একনাথ শিন্ডে-র নেতৃত্বে আবার বিজেপির সঙ্গে সরকার গঠন করে। পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও ভারতীয় জনতা পার্টি মতাদর্শে ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও জম্মু ও কাশ্মীর-এ সরকার গঠন করে। তাই নীতি ও আদর্শ এই কথাটা কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো শোনায়। অনর্গল সুন্দর কথার ফাঁকে শমীকবাবু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য অর্গল খোলা হবে। এদিন তার সূচনা হলো। এটা অনেকের কাছে শুধু আবেগ নয়, বেগের। কারণ উন্নয়ন থেমে আছে। পঞ্চায়েত ত্রিস্তরে, পৌরসভায় এই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য অনেক খেলোয়াড় প্রায় বসে আছে। দাঁতে বসা রস আর রসিকতা, এক নয় বস। রসায়নের পরিভাষায়, এই ধারণাকে বলে, কালেক্টিভ ইফেক্ট। অনেক মৌল, আয়ন, বা অনু একসঙ্গে যুক্ত হলে এমন আচরণ দেখা দিতে পারে যা একক কণার পক্ষে সম্ভব নয়। সমবায়ী বন্ধন, আয়নীয় আকর্ষণ, বা জালিকা গঠনের মাধ্যমে তা সমষ্টিগত বৈশিষ্ট্যে রূপ নেয়। পদার্থ বিদ্যায়, যেমনটা তড়িৎ পরিবাহিতা, চৌম্বকত্ব। সমাজ বিজ্ঞানে এমার্জেন্ট সোশ্যাল ফোর্স। এরা ডিম ছুঁড়তে পারে। এরা কি না পারে। একুশের বিধান সভার নির্বাচনোত্তর সহিংসতা দেখলে, এখন তাদেরই আচরণ দেখলে সহিষ্ণুতা বলে ভ্রম হতে পারে। এই বিচিত্রতা আছে। অনেকেই কোন রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যত নিয়ে ইতি টানছেন। অনেক সময় অনেক শাসক দল রিবাউণ্ড ইফেক্ট বুঝতে পারেনা। জার্মানিতে নাৎসি দল আর ফেরে নি। তবে নব্য নাৎসি ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক পার্টি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তাই কোন দলকে না ভেঙে, শর্ত দিয়ে দমাতে চায় অনেকে। কিন্তু তাতেও খুব ফল হয় নি। প্রতিবেশী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিল; পরে স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে পুনর্জীবিত হয়, আর বহুদলীয় রাজনীতি ফিরে এলে আবার সক্রিয়ভাবে সংগঠিত হয়। জামায়াতে ইসলামী: স্বাধীনতার পর দলটি নিষিদ্ধ ছিল; ১৯৭৯ সালে আবার সক্রিয় হয়, যদিও পরে আবার নানা আইনি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে নাস্তানাবুদ হয়। প্রতিক্ষেত্রে পট পরিবর্তনে রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা থাকে, আবার অবিশ্বস্ততা থাকে। এব্যাপারে বিদুরনীতিই শ্রেষ্ঠ : "ন বিশ্বসেদ্ অবিশ্বতে, বিশ্বস্তে নাতি বিশ্বসেদ্। বিশ্বাসাত্ ভয়মুৎপন্নং, মূলান্যপি নিকৃন্ততি। অবিশ্বস্ত কে বিশ্বাস করবে না। আবার বিশ্বস্তকেও অতিরিক্ত বিশ্বাস করবে না। অতি বিশ্বাস যে কোন শিকড় পর্যন্ত কেটে ফেলতে পারে।

আসল বেইমান বনাম নকল বেইমান : খানদানি জি আই ট্যাগ কার? দেবশ্রী মজুমদার

আসল বনাম নকল লড়াই আছেই। তার জন্যে কেউ ঠকে, কেউ জেতে। কিন্তু বেইমানিতে কে আসল, এমন চ্যালেঞ্জ কদাচিৎ ঘটে। পাড়ার “মীরা বৌদি”-রা সাধারণত এরকমটি করে থাকেন। লীলা মজুমদারের চোর গল্পে চোরের নাম নেই। এখানে বেইমানেরও নাম নেই। সম্প্রতি বিধান সভার প্রেস কর্ণারে সাংবাদিক বৈঠক করে এই খানদানি বেইমানির জিআই ট্যাগ নিয়ে লড়াইয়ের ইঙ্গিত প্রদর্শনী হলো। বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠক করে ঋতব্রত বলেন, ‘ এক কোম্পানির সদ্য অভিষিক্ত ম্যিনেজিং ডিরেক্টর তথা প্রাক্তন সাংসদ নাকি দশ হাজার টাকা চাঁদা দিতেন। কিন্তু হাজার হাজার কোটির দুর্নীতি নিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, সব খরচের পরে আরও ৩০ কোটি ছিল। এক জনের কাছে রাখা হয়েছিল কোথাও বিনিয়োগ করার জন্য। এই চিঠি দল তুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর তখন থেকেই সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল। দলের সাংসদ সেই সময়ে কি বেইমানি করেছিলেন?’ প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেওয়া হলো কোন এক কর্ণারে। সেটি খপাৎ করে ধরে নিলেন সেই কোন এক প্রাক্তন সাংসদ। যিনি অবলীলায় বলে ফেললেন, আমার ধারণা দিদির ওই চিঠি পড়ে মুখস্থ হয়ে গেছে। তিনি স্বীকার করেন, তিনি প্রথম হুইসেল ব্লোয়ার। মুখে না বললেও, অভিব্যক্তি হলো, তিনি বেইমান নন। দলের দুর্দিনে পাশে আছেন এবং সমানে দলকে ডিফেণ্ড করে যাচ্ছেন। দলকে মাসিক চাঁদা দিয়ে গেছেন। ঋতব্রত কোন ভাবেই সেই আসল বেইমানের নাম মুখে আনলেন না।তবে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন অনেকটাই। তাঁকে নাকি সেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটি একবার কুইজ মাস্টার বলেছিলেন। যাইহোক, অনেকটা কুইজ মাস্টারের মতোই, বেশ কিছু হিন্টস দিলেন, সকলের সুবিধার্থে। এর পরেও, যদি কোন নিন্দুক বলেন, আমি মুখ্খু সুখ্খু মানুষ, নামটা খোলসা করে বলুন না? তাহলে দাদা, আপনি এই লাইনের-ই লোক না। বলা হলো, তৃণমূলের প্রাক্তন এক সাংসদ প্রায় এক দশক আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সিবিআই ডিরেক্টরকে ৯১ পাতার চিঠি লিখে জোড়াফুল দলকে তুলে দেওয়ার সলতে পাকানোর কাজ শুরু করেছিলেন। দু'দিন ধরে সেই চিঠি পড়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। যেন প্রশংসা করে বললেন, সামান্য দুই একটা জায়গায় কাটাকুটি। তার পড়তে কোনো অসুবিধা হয় নি। বিরোধী দলনেতা তিনি। তাই খুব দায়িত্বের সাথে বলেন, ওই চিঠিতে লেখা রয়েছে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী চিটফান্ডের টাকায় চলেন। চিট ফাণ্ডের সব থেকে বেনিফেশিয়ারি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু তাই নয়, মোবাইলের স্টোরেজ থেকে সেই ঐতিহাসিক চিঠির সাবহেড মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা অংশ বিশেষ কোট আনকোট পাঠ করলেন। যেটি বন্দি কালে লেখা হয়েছিলো এবং যার প্রতিলিপি কোনো সখা, কোন সাংবাদিকের কাছে শেষ বয়ান হিসেবে পাঠানো হয়েছিলো। সেই চিঠিতে, অমুক ব্যক্তি, তমুক ব্যক্তিকে চিটফান্ড উদবৃত্ত ৩০কোটি টাকা অন্যকোনো জায়গায় লগ্নি করতে বলেছিলো। অমুক ব্যক্তির নামটা ঋতব্রত উহ্য রাখেন। তবে মি. সেন নামটাও একবার বলেন। এরপর হেসে হেসে বলেন, এই চিঠি যদি ওই প্রাক্তন সাংসদ দিদিকে না দেখান বা পাশে বসে কোনো কোনো কাটাকুটির জায়গায় পড়তে সাহায্য না করেন, তাহলে ১৫ দিন পর, সেই চিঠি ক্যুরিয়ার করে থ্রি বি হরিশ চ্যাটার্জী স্ট্রিটে পাঠিয়ে দেবেন। তারপর সমস্ত সংবাদ মাধ্যমকে সরবরাহ করে দেবেন। অর্থাৎ পাবলিক করে দেবেন। এসব শুনে মনে হয়েছিলো, বাছাধন। ঘুঘু দেখেছো, ফাঁদ দেখো নি। এই জন্যই বলে, শতং বদ, মা লিখ। যদিও প্রাক্তন সাংসদ বা ম্যানেজিং ডিরেক্টর পাত্তা দিলেন না। অর্থাৎ তির নিক্ষেপ হলো। কিন্তু অর্জুন সিংয়ের " শকুনির" গায়ে লাগলো না। অর্থাৎ হিট হলো না। এ তো আর ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি ফাঁস নয়। অন ক্যামেরায় এসব কথা মানুষ আগেই শুনেছে। তাই যে কেলেঙ্কারির জন্য ১৯৭৪ সালের ৯ আগস্ট Richard Nixon রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, তা হবে না। তেনার ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পদ খায় কে? তবে ঋতব্রতদের এই ফ্রন্টাল এ্যাটাকে নামহীন নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিশ্চয়ই ব্লোব্যাকে যাবেন না। তবে, রাগ তো হবেই। সায়নীকে বেইমান শুনতে হয়েছে। শতাব্দী রায়, নিজের এলাকায় এসে দিদির সাথে আছেন, বলেছেন। আবার এন সিপি আইয়ের কথা মুখে একবার বলেছেন। তবে, সেই দল মাথায় দেয় না কোথায় দেয়, কেউ জানে না। সবার ভয় 'ডিম' ও 'বেইমান' শব্দকে। তাই তো ঋতব্রত নাম না করে বলছেন ম্যানেজিং ডিরেক্টর-ই, আসল বেইমান। আর তাঁর ম্যানেজিং ডিরেক্টর? তিনিও বলছেন, কোন প্রতীকে জিতেছেন? কার দেওয়া প্রতীকে জিতেছেন? নিজের এলাকায় মানুষের কাছে যান না? শুধু মুখে বলেন নি, ভাতারের ভাত খায়, নাঙ্গের গুণ গায়।।

আর কত ধবধবে কালো, হবে কুচকুচে সাদা দেবশ্রী মজুমদার

"কুচ কুচে সাদা, ধবধবে কালো। তৃণমূলে নেই কোনো ভালো।" এই বাক্যটি বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যর। এখন তিনি কী বলবেন? লোকমুখে বিজেপির বি টিম বলে খ্যাত ঋতব্রত তৃণমূলে এবার স্থান পেলেন দিদির দীর্ঘদিনের সাথী অনুব্রত মণ্ডল। শুধু স্থান নয়, পেলেন জেলার দায়িত্বও। তবে ঋতব্রত তৃণমূলে। নির্বাচনে পরাজয়ের পর পুরাতন কমিটি তো মমতা তৃণমূল আগেই ভেঙে দিয়েছে। বলাই বাহুল্য, শেষের দিকে, বিশেষ করে ছাব্বিশে কোন দায়িত্ব না থাকায় নিষ্ক্রিয় ছিলেন দিদির কেষ্ট । অন্যদিকে, জেলার রাজনীতিতে অভিষেকের পছন্দের ছিলেন কাজল সেখ। অনুব্রতকে সরিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আদি তৃণমূলে এক কথায় জেলার মধ্যমণি। তিনি আগেই ঋতব্রত তৃণমূলে যোগদান করেছেন। এবার সেই অনুব্রত ঋতব্রত তৃণমূলে জেলার দায়িত্ব পেলেন। ভাগ্যের উত্থান পতন কাকে বলে তা অনুব্রত মণ্ডলকে না দেখলে দুষ্কর। এই অনুব্রত মণ্ডল যার নির্দেশে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায় সেই বেতাজ বাদশাকে সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবাস ভোগ করতে হয়। তবে অনুব্রত মণ্ডল রাতারাতি এইভাবে বেতাজ বাদশা হয়ে উঠেছেন এমন নয়। একসময় তিনি ছিলেন সামান্য এক মুদিখানার দোকানের মালিক। শমীক বাবু বলতেই পারেন, এটা তৃণমূলের পারিবারিক বিবাদ। তৃণমূল ভেঙে আসল তৃণমূল এখন ঋতব্রত নেতৃত্বে প্রধান বিরোধী দল। তারা কমিশনের কাছে ঘাসফুল সিম্বলের দাবিদার। আইনি লড়াইয়ে জটিলতা থাকলে হাতের পাঁচ এন সি পি আই তো আছেই। এখন মমতার হাত ছাড়লেন কেষ্ট। মমতা দিদির আদরের ভাই কেষ্ট! বহুদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী। গুঞ্জন আগেই শুরু হয়েছিলো। কেউ কেউ বলেছিলো, পড়ল কথা হাটের মাঝে, যার ব্যথা তার বুকে বাজে। সেই ব্যাথা মমতা থুড়ি রাসমণির বুকে কতটা বাজে দেখার! " রাসমণির আর কোনো সন্ধান রহিল না। " গল্পের এমন পরিসমাপ্তি কবে হবে জানা নেই। (রবীন্দ্রনাথের দান প্রতিদানের রাসমণির মতো মর্যাদা সম্পন্ন মোটেই এখনকার কোন নেত্রী নন, হওয়া সম্ভবও নয়।) তবুও অনুগামীদের একাংশের মত। অত:পর আর কোন দুর্নীতিযুক্ত দল, পাপড়ি ও মূল রহিল না। শুধু "ভালো"-ই রহিয়া গেল। সখেদ কিনা জানি না। তবে, ধবধবে কালো, এখন হাত যশে কুচকুচে সাদা। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচাৰ্য। খুবই বিশুদ্ধ, শিষ্ট মিষ্ট ভাষী। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, "কুচ কুচে সাদা, ধবধবে কালো। তৃণমূলে নেই কোনো ভালো।" তারপর থেকেই স্থানান্তরিত বিশেষণটি ফিগারস অফ স্পিচ হয়ে লোকমুখে ঘুরছে। কয়দিনের ঘটনাক্রমে স্পষ্ট যে ধবধবে কালো এবার কুচকুচে সাদা হবেই। সেই তালিকায় সদ্য তিন তৃণমূল সাংসদ, বিজেপি সাংসদ প্রার্থী হিসেবে সংসদের উচ্চ কক্ষে যাচ্ছেন। এটা নিশ্চিত। অতীতে এমনটা হয় নি তা নয়। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্র শেখরের ছেলে নীরজ শেখর ২০১৯ সালের জুলাই মাসে সমাজবাদী পার্টি (SP) ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (BJP) যোগ দেন। আর তাতেই শুরু হয়েছে, হতাশা বিজেপির অনুগামীদের একাংশের মধ্যে। তারাই সমাজ মাধ্যমে শিক্ষাবিদ তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ড.সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্য তুলে ধরে এবং তৃণমূল নেতানেত্রীদের বিজেপিতে যোগদানের ছবি পাঞ্চ করে সুন্দর ককটেল বানাচ্ছেন। আর তাতে নেশাটাও জমে উঠেছে। যাকে একদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, গরু পাচারকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে ভাইপোর কাছে অর্থ পাঠানোর কথা বলছেন, তিনিই এখন বিজেপিতে যোগদানের পর কুচকুচে সাদা। এই নতুন তালিকায় আরও নিত্য নতুন নাম সংযোজন অনুব্রত মণ্ডল। আদি তৃণমূলের পুরো মেশিনারী নব্য তৃণমূলের চায়। এটা অস্তিত্বের লড়াই। এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে সাংগঠনিক দক্ষতা ছাড়া, একটা মেকানিজম ছাড়া রাজধানী থেকে রাজ্যপাট চালানো যায় না, দলও চালানো যায় না। এই পুরো মেকানিজমটা মাঠের বাইরে বেশিদিন শাসকদল রাখতে দেবে না, তাদেরও কুচকুচে সাদা করে দলে ঢোকাবে। অমৃতে অরুচি তো সুরাসুর কারো নেই। ভালো হলে তো ক্ষেতি কিছু নেই। শুধু ধবধবে কালো না হলেই হলো। তবে শমীকবাবুর আরেকটা বক্তব্য নিয়েও খটকা লাগছে। তিনি বলছেন, জনগণকে এই ভূখণ্ড রক্ষা করতে হবে। নাহলে, যতমত তত পথ থাকবে না, কমিউনিস্ট থাকবে না, তৃণমূল যদিও এখন নির্মূল, কেউ থাকবে না। শক্তিশালী ভূখণ্ড না হলে, বহুত্ববাদ থাকবে না। একটা অংশ যা বলবে, তাই শুনতে হবে। তাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং তাঁর ভাষায় প্রতিশোধ নিতে হবে। এই তিনটে 'প্রতি' যুক্ত শব্দ তিনি আপামর জনসাধারণের উদ্যেশে বললে, বিজেপির নিচুতলার কর্মীদের যে সহ্য করতে হবে! তাদের আবেগকে মান্যতা দিতে হবে! এও কি সম্ভব? এই জন্যই যদি কেউ তাকে পিতামহ ভীষ্ম বা লুইস স্টিভেনসনের ড. জেকিল এবং মি. হাইডের মত এক বিখ্যাত দ্বৈত সত্তা বানিয়ে ফেলেন, খুব খারাপ লাগবে। সর্বপরি, তিনি একজন ভদ্র লোক।

ধর্ম ও রাজনীতি: সোনায় সোহাগা --দেব ঋষি

ব্রজবাসী শ্রীজীব গোস্বামীর দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন সম্রাট আকবর। কে এই দৈন্য বেশ ধারী অতি সাধারণ জীবন যাপনকারী সাধু! তাঁর চোখে বিস্ময়ের শেষ নেই। শ্রদ্ধায় তাঁর হৃদয় বিগলিত হলো। বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সমাজ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তাঁদের প্রার্থনা বৈষ্ণবদের মন্দির নির্মাণে বাধা দূর করুন সম্রাট। শ্রীজীব গোস্বামীর প্রজ্ঞা, তিতিক্ষা ও ধর্ম নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে ভূমি দান করলেন দিল্লীশ্বর। আদেশ দিলেন, বৃন্দাবনের যেকোন স্থানে মন্দির নির্মাণ করা যাবে। শুধু তাই নয়, বৃন্দাবনে মৃগয়া নিষিদ্ধ হলো। ঘোষণা করলেন, বৃন্দাবনে পশু হত্যা নিষিদ্ধ।। ( বৈষ্ণবাচার্য শ্রীজীব গোস্বামী: ভারতের সাধক-সাধিকা (দ্বিতীয় খণ্ড), সুবোধ চক্রবর্তী। অন্যদিকে, ঔরঙ্গজেবের ধর্ম ও রাজনীতি যে ধর্ম নীতি তৈরি করেছিলো, তা ইতিহাসে ভৎর্সিত। কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর শাসনকাল (১৬৫৮–১৭০৭ খ্রি.) ছিল অত্যাচারের। অথচ তিনি ছিলেন ধার্মিক। সুন্নি ইসলামি আদর্শকে ভিত্তি করে রাজনীতি পরিচালনা করেন তিনি। তিনি নিজেকে ইসলামের রক্ষক মনে করতেন এবং শরিয়তসম্মত শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তাঁর শাসনকালে জিজিয়া কর পুনরায় চালু করা হয়, বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস বা রূপান্তর করা হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তাঁর ধর্মনীতি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। রাজপুত, জাট, শিখ ও মারাঠাদের বিদ্রোহ বৃদ্ধি পায়, যা মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, ঔরঙ্গজেবের সময়ে ভারতের বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস হয়। এই পরিস্থিতিতে বৃন্দাবনের শ্রীশ্রী রাধা-দামোদর মন্দিরের সেবায়েতরা বিগ্রহের সুরক্ষার জন্য তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনেক চিন্তাভাবনার পর বিগ্রহটি নিরাপদে জয়পুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে যথাযথ পবিত্রতা বজায় রেখে নিয়মিত পূজা-অর্চনা শুরু হয়। রাজা কোনো বিশেষ ধর্মের অনুসারী হলে, রাজধর্ম ভুলে প্রজাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা তিনি হরণ করতে পারেন। এমন প্রমাণ ইতিহাসে ভুরি ভুরি আছে। গণতান্ত্রিক দেশে ভোট রাজনীতিতে প্রশ্রয় ও প্ররোচনা দুটোই হয়ে থাকে। নিরপেক্ষতা রাখতে ভারতের ডান ও বাম কেউ পারে নি। বামেরা জাতপাতের রাজনীতি করতে গিয়ে হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ করেছে। চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ। তারা গীতার এই বাণী বিশ্বাস করতে চায় নি। আজও ২৫ ডিসেম্বর 'মনুস্মৃতি দহন দিবস' পালন হয়। হিন্দু ধর্ম সহনশীলতার ধর্ম, তাই এই আচরণ সহ্য করা হয়। অভিযোগ, বিষ্ণুর পদ যুগল থেকে শুদ্র-র জন্ম হয়, বলা হয়েছে। কেন, এই ধর্ম বৈষম্য? ব্রাহ্মণদের আক্ষেপ হয়, কী অপরাধে শ্রীবিষ্ণুর চরণ যুগল থেকে তাঁদের জন্ম হলো না! শুদ্র কোনো জাতি বাচক শব্দ না। কে বোঝাবে! ক্ষত্রিয় রাজা জনশ্রুতি-পৌত্রায়ণকে ‘শূদ্র’ বলিয়া অভিহিত করা হয়েছে।কারণ বেদান্ত-দর্শনের ব্রহ্মসূত্রে (১।৩।৩৪–৩৫) এবং তার টীকায় শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য বলেছেন— এখানে ‘শূদ্র’ জাতিবাচক নহে। ‘শুচা দ্রবতি ইতি শূদ্র’ অর্থাৎ ব্রহ্ম জ্ঞানী শকট রৈক্বের জ্ঞানের মহিমা ও নিজের পুত্রের দীনতা দর্শনে শোকে দ্রবীভূত হন রাজা জনশ্রুতি-পৌত্রায়ণ। দানবীর হিসেবে শ্রেষ্ঠ হলেও বিদ্যা বা জ্ঞানে শকট রৈক্বের থেকে ছিলেন তুচ্ছ। দেবতাদের কাছে এই সত্য জেনে রাজার মন শোকে দ্রবীভূত হয়। তাহার নিকট দ্রুত গমন করেন জ্ঞান লাভের জন্য। সে কারণে ক্ষত্রিয় রাজাকে ‘শূদ্র’ বলা হয়। বহুজন সমাজ পার্টির কাঁসিরামের মতো নেতারা মি.গান্ধীকে রেয়াত করেন নি। তাঁর অপরাধ সমাজের পিছিয়ে থাকা বর্গের মানুষদের "হরিজন" বলতেন। হরিজন অর্থাৎ "ঈশ্বরের সন্তান" বলে নাকি তাদের অপমান করা হয়েছে। ভারসাম্যহীনতার এই রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতার হাতবদল করতে পারে। অবস্থার পরিবর্তন করতে অনেক ক্ষেত্রে অপারগ হয়। বিষয় যখন ধর্ম ও রাজনীতি, অপ্রিয় এই কাজটি করতেই হবে, কেউ পড়ুক না পড়ুক, আজ দিন হোক প্রবন্ধ -র। ধর্ম ও রাজনীতি, সোনায় সোহাগা সম্পর্কিত। তবে তা ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধ সোনা কিনা বলা বেশ শক্ত। এই দুইয়ের মিশেলে বিশুদ্ধতা না থাকতে পারে, কিন্তু টেকসই কতটা মানুষ কখনও হৃদয়ে আবার কখনও অস্থিতে অস্থিতে বোঝে। সুফী সাধকরা কিন্তু কাঁচা সোনার কথা বলেছেন। পাকা সোনা তো ভঙ্গুর! --দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা। তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলে ধরা দেয় না...সে যে মানুষ চেনা, সোনার মানুষ চেনা। যা হোক, এসব ভাবের কথায় ভাবনা বেশি। তবে, প্রথমে জানা দরকার ধর্ম কী? তার পরিভাষা কী? শাস্ত্রকাররা কী বলেন। আর আমরা কী জানি? -- মানুষ জন্মে ছিলো ধর্ম হীন হয়ে। তারপর পরিশীলিত জীবনের তাগিদে কার আবির্ভাব বলার অপেক্ষা রাখে না। এ কথা কেন বললুম? মহাভারত এ প্রসঙ্গে বলে, 'ধারণাদ্ ধর্মমিত্যাহুর্, ধর্মো ধারয়তে প্রজাঃ॥" অর্থাৎ যা ধারণ করে, রক্ষা করে এবং সমাজকে স্থিতিশীল রাখে, তাকেই ধর্ম বলা হয়; কারণ ধর্মই প্রজাদের ধারণ ও রক্ষা করে। আবার আরেকটি বহুল প্রচলিত শ্লোক হলো-- ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ॥ বাংলায় যার অর্থ- যে ধর্মকে রক্ষা করে, ধর্মও তাকে রক্ষা করে। এই ভাবনা থেকে অনেকে উজ্জীবিত হয়ে অত্যুৎসাহী হয়ে ওঠেন। তারা পূর্ণ শ্লোকটি খেয়াল করেন না। "ধর্ম এব হতো হন্তি, ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ। তস্মাদ্ ধর্মো ন হন্তব্যো, মা নো ধর্মো হতোহবধীত্॥" বাংলা অর্থ ধর্মকে নষ্ট করলে ধর্মই মানুষকে বিনষ্ট করে; আর যে ধর্মকে রক্ষা করে, ধর্মও তাকে রক্ষা করে। তাই কখনও ধর্মকে ধ্বংস করা উচিত নয়, পাছে ধ্বংসপ্রাপ্ত ধর্মই আমাদের ধ্বংস করে। এখন আমরা কিভাবে ধর্মকে রক্ষা বা ধ্বংস করতে পারি? মনুস্মৃতির ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৯২ তম শ্লোক বলে, - ধৃতিঃ ক্ষমা দমোহস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ। ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্॥ যার বাংলা অর্থ হলো- ধৈর্য, ক্ষমা, আত্মসংযম, চুরি না করা, শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, ধী (বিবেক), বিদ্যা, সত্য এবং ক্রোধহীনতা—এই দশটি হলো ধর্মের লক্ষণ। এই লক্ষণ যদি আমরা রাজনীতির মধ্যে দেখতে পাই, তাহলে রাজনীতি ও ধর্ম নিঃসন্দেহে সোনায় সোহাগা। কিন্তু বাস্তবে ধর্ম কী শুধুই মোহ? শুধু মরে আর মারে? শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৩২ তম শ্লোক বলে, - অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমসাবৃতা। সর্বার্থান্ বিপরীতাংশ্চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।। যার বাংলা তর্জমা হলো-- হে পার্থ! যে বুদ্ধি তমোগুণে আচ্ছন্ন হয়ে অধর্মকে ধর্ম বলে মনে করে এবং সকল বিষয়কেই বিপরীতভাবে উপলব্ধি করে, সেই বুদ্ধিই তামসী বুদ্ধি। এখন একটা গল্প বলি: একদা পুরাকালে অতি শিলাবৃষ্টির কারণে কুরুদেশ বিধ্বস্ত হয়ে গেলো। চক্র পুত্র ঋষি উষস্তি বালিকা বধূ আটিকীকে নিয়ে ইভ্য গ্রামে উপস্থিত হলেন। খাদ্যের সন্ধানে একটি বাড়িতে ভিক্ষা করতে গিয়ে দেখলেন, গৃহস্বামী আধপঁচা মাষকলাই খাচ্ছেন। তার গৃহে আর কোনো খাদ্য দ্রব্য অবশিষ্ট না থাকায় এবং খিদের জ্বালায়, গৃহস্বামীর উচ্ছিষ্ট মাষকলাই খেলেন এবং স্ত্রীর জন্য সামান্য কিছু সঙ্গে নিলেন। তারপর গৃহস্বামী বললেন, বাড়িতে আর পানীয় জল নেই। আপনি কি আমার এঁটো জল খাবেন? -- উত্তরে উষস্তি বললেন, পানীয় জল উচ্ছিষ্ট তিনি খাবেন না। তার উত্তরে গৃহস্বামী বিস্মিত হলেন। তার বিস্ময় দূর করতে, উষস্তি বললেন, খাদ্য গ্রহণ আমার কাছে খুবই প্রয়োজনীয় ছিলো। কিন্তু জল তেষ্টা আমার পাই নি। আর তা পেলে আমি যোগাড় করে নিতে পারবো। ছান্দোগ্য উপনিষদের গল্প আমাদের বলে দেয়, কোনটাকে আমরা উচ্ছিষ্ট মনে করবো। আর এই জন্যই রাজনীতিতে যা উচ্ছিষ্ট তা কখনও সত্য-ই উচ্ছিষ্ট। ঢাকঢোল পিটিয়ে তার প্রচার হয়। আবার কোনো উচ্ছিষ্ট দিব্যি উচ্ছিষ্ট হয়ে যায় না। "চোর ধরো জেল ভরো" প্রচার দেখে তাই গৃহস্বামীর মতো বিস্মিত না হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। মনে হতে পারে, ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্ম যুদ্ধে প্রশ্রয় দিচ্ছি। না, তা মোটেও না। ধর্মের প্রকৃত রূপ দেখুন। খুব ভালো লাগবে। আবার একটি বহুশ্রুত উপনিষদের গল্প বলি, মহাভারতে মহারাজা পাণ্ডু তাঁর পত্নী কুন্তীকে বলেছিলেন। ব্রাহ্মণ সেবার জন্য নিজ পত্নীকে অর্থাৎ তাঁর মাতাকে পুংশ্চলী বা পরপুরুষের অনুবর্তী হতে দেখে একবার খুবই ক্রুদ্ধ হন শ্বেতকেতু। তিনি পিতা উদ্দালকের কাছে প্রতিবাদ করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, এ কী নিয়ম? পুত্রের ক্রোধ দেখে উদ্দালক বলেন, মা তাত কোপং কার্ষীস্ত্বমেষ ধর্মঃ সনাতনঃ।। হে বৎস! তুমি রাগ কোরো না। এটিই চিরন্তন প্রথা এবং প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সামাজিক নিয়ম। আরও বললেন তিনি : অনাবৃতাঃ কিল পুরা স্ক্রিয় আসন্নবাননে। কামচারবিহারিণ্যঃ স্বতন্ত্রাশ্চারুহাসিনি॥ অর্থাৎ প্রাচীনকালে নারীরা কোনো নির্দিষ্ট পুরুষ বা সামাজিক নিয়মের অধীনে আবদ্ধ ছিলেন না। তাঁরা সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন এবং নিজের ইচ্ছামতো বিচরণ করতে পারতেন। তারপর শ্বেতকেতু কর্তৃক বিবাহ আইনের প্রবর্তন হলো। মহারাজা পাণ্ডু কুন্তীকে বললেন, হে মহাভাগে! এরপর শ্বেতকেতু ক্ষুব্ধ হয়ে মানবসমাজের কল্যাণের জন্য এই নতুন নিয়ম আইন প্রতিষ্ঠা করেন। এর বাইরে চলাকে তিনি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই সামাজিক সংস্কার যে ধর্মে নেই, সেই ধর্ম যথার্থ- ই অনাচার, অধর্ম। এই সমাজকে বাদ দিয়ে রাজনীতির অস্তিত্ব নেই। রাজনৈতিক নেতারা যে সব সিদ্ধান্ত নেন, তার প্রভাব পরে সমাজ জীবনে। রাজা ধর্মস্য কারণম্। যার বাংলা অর্থ হলো- রাজা (শাসক) ধর্ম বা ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রধান মাধ্যম। "রাজনীতি" শব্দটি আধুনিক বাংলা শব্দ। সংস্কৃত শাস্ত্রে এর সমার্থক শব্দগুলো হলো—রাজধর্ম, দণ্ডনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং নীতিশাস্ত্র। আমরা গণতন্ত্রে সবাই নিজেদের রাজা বলে থাকি। কারণ আমরাই রাজা নির্বাচন করে থাকি। আর রাজা কী করেন? সাম, দাম, ভেদশ্চ, দণ্ডশ্চেতি চতুরূপায়াঃ। সাম, দান (বা দাম), ভেদ এবং দণ্ড—এই চারটিই রাষ্ট্রনীতির চারটি উপায় বা কৌশল অবলম্বন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। যার ফল আমরা প্রত্যাশা করে থাকি। মহাভারতের রাজধর্মপর্ব পড়লে দেখা যায়, "সর্বে ত্যাগা রাজধর্মেষু দৃষ্টাঃ। সর্বাঃ দীক্ষাঃ রাজধর্মেষু চোক্তাঃ। সর্বা বিদ্যা রাজধর্মেষু যুক্তাঃ। সর্বে লোকাঃ রাজধর্মে প্রবিষ্টাঃ॥ বাংলায় যার অর্থ হলো-- সমস্ত ত্যাগ, সমস্ত দীক্ষা, সমস্ত বিদ্যা এবং সমগ্র সমাজব্যবস্থা রাজধর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আর এই কারণে, গুজরাট দাঙ্গার ঘটনায় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী খুবই স্বল্প শব্দ চয়নে, গুজরাটের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রীকে অনেক বড় কথা বলেছিলেন, "রাজধর্ম পালন করো।" আমি কী ধারণ করবো, আমাকে কে বা কী ধারণ করবে? তার সঙ্গে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশভাগের আগে এবং পরে কোনভাবেই ধর্মকে আলাদা করা যায় নি। যে কোনো রাষ্ট্র বিপ্লবে ধর্মকে বাদ দিয়ে বিশুদ্ধ আন্দোলন করতে চেয়েছেন রাষ্ট্রনেতারা। তারা পেরেছেন কী? খুব কম। হিন্দু স্বরাজ গ্রন্থে মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী বলেছেন, ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতির কোনো অর্থ নেই। ধর্ম ও রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি আবার সত্যকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে বলেছেন, "The truth will set men free." তাহলে, সত্যই মানুষকে মুক্ত করে; রাষ্ট্রের ভয় বা শক্তি নয়। আর এই সত্যের সন্ধান যদি ধর্ম দেয়, তার ফল ঔরঙ্গজেব দেবে। আর যদি আধ্যাত্মিকতা দেয়, তার ফল আকবর দেবে। এ বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করেছি। আধ্যাত্মিকতা শুধু ধার্মিক হলে আসে না। প্রথাগত ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা বিস্তর ফারাক। এই প্রসঙ্গে সুক্ষ পর্যবেক্ষণ আছে। জানিনা সেটা কতটা তাবড় রাজনীতিবিদদের প্রভাবিত করতে পেরেছে। নেতাজি সুভাষ বোস চিরদিন আমাদের অনন্য পথের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "Our task is to stand on the basis of perfect equality, irrespective of religion, caste or creed." (ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে আমাদের দাঁড়াতে হবে।) কিন্তু তাঁর ধর্ম নিরপেক্ষতার উপর একটা সুমিষ্ট আবরণী ছিল। মাতৃভূমি চেতনা ছিলো সবার উপরে। তিনি বলেছেন,"The common bond that unites all Indians is the love of our mother land." এই জাতীয়তাবাদের একটা মাত্রা ছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই পরিমিত জাতীয়তাবাদের পক্ষে ছিলেন। উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে ছিলেন। জাতীয়তাবাদ তো হিটলারেরও ছিলো। কী ফল দিয়েছিলো? অন্যদিকে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অখণ্ড ভারত চেতনা বা জাতীয়তাবাদ চরম জাতীয়তাবাদ অভিমুখী বলে থাকেন অনেকেই। সমালোচনা করেন অনেক রাজনৈতিক দল। যদিও, তারা আদর্শগতভাবে নিজেরাও কোনোদিন ধর্ম নিরপেক্ষ থাকতে চেষ্টা করে নি বা পারে নি। তবুও তাদের বলবো, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে অস্বীকার করতে পারা অসম্ভব। তাঁর জাতীয়তাবাদ অখণ্ডতা, পূর্ণতা। সেটা যদি অন্যকোনো আদর্শ সাংঘর্ষিক হয়, মানুষ তা গ্রহণ করেছে। সেই পথেই তিনি হেঁটেছেন, বন্দি হয়েছেন ও মৃত্যু বরণ করেছেন। তিনি এক জাতির জন্য এক সংবিধান, এক পতাকা এবং এক রাষ্ট্রনেতৃত্বের দাবি জানিয়ে বলেন, "We demand one Constitution, one Flag and one Head for one Nation." ১৯৪১ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ছাড়া কৃষক প্রজাপার্টির প্রাদেশিক মন্ত্রী সভায় অর্থ মন্ত্রী ছিলেন তিনি। ১৯৪২ সালের ১৬ নভেম্বর মাসে পদত্যাগও করেন তিনি। তারপর থেকেই হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে পৃথক পশ্চিমবঙ্গ দাবির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠলেন তিনি। ইতিহাস সাক্ষ্মী, বঙ্গভঙ্গ ও উদ্বাস্তু সমস্যা শুধুমাত্র সংখ্যালঘু হিসাবে দেখলে অর্ধসত্য হবে। ভারতীয় উপমহাদেশের দুপাড়েই তা ছিল ধর্ম ও রাজনীতি। গান্ধী বাদ ছিলো ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতি। তলস্তয়ের আদর্শ এবং খ্রীষ্টীয় অহিংস নৈতিকতা মি. গান্ধীকে অনেকটাই প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত উক্তি হলো- "A man cannot at the same time obey God and obey the State when the State demands what is contrary to God's law." ধর্ম এখানেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে বলে অনেকে মনে করেন। সব ধর্ম না হলেও, কিছু ধর্ম, যেগুলো প্রিন্সপিলস্ নয়, রুলস। ড.আম্বেদকর সোশ্যাল ডেমোক্রেসির কথা সব সময় বলেছেন। দেশভাগের প্রাক্কালে তাঁর কিছু কথা শোনা যেতে পারে। যেগুলো কালোত্তীর্ণ নাও হতে পারে। তবুও উল্লেখ করা প্রয়োজন। -="Hindu society as such does not exist. It is only a collection of castes." এবং, "Caste is not merely a division of labour. It is also a division of labourers. ইসলাম ধর্ম সম্পর্কেও তিনি সমালোচনায় ভারসাম্য রেখে বলেছেন, "Islam is a close corporation and the distinction that it makes between Muslims and non-Muslims is very real." মাতৃভূমি ও সৌহার্দ্য সম্পর্কিত আরও কিছু বক্তব্য আমি বলা সমীচীন মনে করছিনা, কারণ সেগুলি ছিলো মূলত পাকিস্তান দাবির প্রেক্ষিতে করা মন্তব্য। এখন তার প্রাসঙ্গিকতা নাও থাকতে পারে। এবার আসি বীর সাভারকারের বক্তব্যে। সাভারকর তাঁর Hindutva: Who Is a Hindu? (১৯২৩) গ্রন্থে লিখেছেন, "A Hindu is one who regards this land of Bharatvarsha as both his Fatherland (পিতৃভূমি) and Holyland (পূন্যভূমি)." আর এখানেই মুসলিমের সাথে হিন্দুত্ববাদের বিরোধ। অন্যদিকে, মি. গান্ধীর সঙ্গে ড. আম্বেদকরের বিরোধ একটা ছিল। গান্ধী 'রিলিজিয়াস মরালিটি'র কথা বলতেন। আর আম্বেদকরের কাছে, ধর্ম কোন নিয়ম ছিলো না। শুধু মাত্র নীতি। তিনি 'কনস্টিটিউশনাল মরালিটি'তে বিশ্বাসী ছিলেন। জওহরলাল নেহরু অবশ্য ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নিয়ে একটা ধারণা পোষণ করতেন। তিনি বলেছেন, "We call our State a secular one. The word 'secular' perhaps is not a very happy one... It means freedom of religion and conscience, including freedom for those who may have no religion." জার্মান দার্শনিক কার্লমার্কস ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলেছেন, " ধর্ম হলো নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন বিশ্বের হৃদয়, আত্মাহীন অবস্থার আত্মা। ধর্ম হলো জনগণের আফিম। "জনগণের আফিম" এই অংশ বিশেষ নিয়ে ভারতে বামপন্থীরা চর্চা করতে ভালো বাসেন। তবে ভুললে চলবে না যে, উনিশ শতকে এই আফিম ছিলো ব্যাথা উপশমকারী ওষুধ। সমাজ জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী এবার কিছু অন্য ধর্মশাস্ত্রর দিকে দেখা যাক। সূরা আল-মায়িদা (৫:৮) বাংলা উচ্চারণ: ই'দিলু, হুয়া আকরাবু লিত্-তাকওয়া। বাংলা অর্থ: ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার (ভয় ভীতি, নির্দেশ ইত্যাদি) অধিক নিকটবর্তী। ত্রিপিটকের ধম্মপদ (১৮৩) বলে, সব্বপাপস্স অকরণং, কুসলস্স উপসম্পদা। সচিত্তপরিয়োদপনং, এতং বুদ্ধান সাসনং॥ যার বাংলা অর্থ: সব পাপ থেকে বিরত থাকা, সৎকর্ম সম্পাদন করা এবং নিজের মনকে পবিত্র করো। এটাই বুদ্ধদেবের উপদেশ। একইভাবে জরথ্রুষ্টীয় ধর্মের মূল নৈতিক বার্তা হলো- হুমতা, হুখতা, হ্বর্ষ্তা। যার বাংলা অর্থ হলো- সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম। পরিশেষে বলা যায়, সমস্ত ধর্ম -ই মানব ধর্ম হওয়া উচিৎ। সব ধর্ম মোটের উপর কম বেশি সমাজ মুখী। তবে গোঁড়ামী, ধর্মান্ধতা অন্য প্রসঙ্গ। ধর্মান্ধতা বিচ্ছিন্নতার কথা বলে। স্বামীজী বিশ্ব হিন্দু ধর্ম সম্মেলনে কী বলেছিলেন? - বলেছিলেন, "We believe not only in universal toleration, but we accept all religions as true." এই অমোঘ বাণী না মানতে পারলে, "ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।" আর ধর্ম ছাড়া রাজনীতি? এই দেশে অসম্ভব! ভারত জমীন কা টুকড়া নহী, জীতা-জাগতা রাষ্ট্রপুরুষ হ্যায়। হিমালয় ইসকা মস্তক হ্যায়, গৌরীশঙ্কর শিখা হ্যায়। কাশ্মীর কিরীট হ্যায়, পাঞ্জাব ঔর বঙ্গাল দো বিশাল কাঁধে হ্যায়। বিন্ধ্যাচল কটি হ্যায়, নর্মদা করধনী হ্যায়। পূর্বী ঔর পশ্চিমী ঘাট দো বিশাল জঙ্ঘায়েঁ হ্যায়। কন্যাকুমারী ইসকে চরণ হ্যায়। সাগর ইসকে পগ পখারতা হ্যায়। ইসকা কঙ্কর-কঙ্কর শঙ্কর হ্যায়, ইসকা বিন্দু-বিন্দু গঙ্গাজল হ্যায়। হম জিয়েঙ্গে তো ইসকে লিয়ে, মরেঙ্গে তো ইসকে লিয়ে। (অটল বিহারী বাজপেয়ী)

মমতার ট্রায়াল, পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া শুরু

মমতার ট্রায়াল, পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া শুরু দেবশ্রী মজুমদার ফ্রানৎস কাফকার বিখ্যাত উপন্যাস দ্য ট্রায়ালের কথা বলছিলাম। ব্যস, দুম্ করে পড়ে গেলেন তো? ধীরে, বন্ধু, ধীরে। ঠিকই শুনেছেন, মমতা অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। তার আগে একটু গৌর চন্দ্রিকা সেরে নিই। দ্য ট্রায়াল-এর যোসেফ কে. চরিত্রের সঙ্গে আমাদের রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কিয়দংশ মিল আছে। শুধু মিলের জায়গা টুকু বলবো। অমিলও আছে বিস্তর। জোসেফ কে. এমন এক ব্যবস্থার শিকার, যেখানে সবাই ভদ্র ব্যবহার করলেও কেউ তাকে সত্যিই সাহায্য করে না। চারপাশের সৌজন্য ও সহানুভূতি শেষ পর্যন্ত তাকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলে। তিনি ক্রমে মনে করতে থাকেন, সবকিছুর আড়ালে কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত রয়েছে। ট্রায়ালের নামে তার প্রহসন হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুন হতে হয়। আমরা অবশ্যই এমন করুন পরিণতি প্রাক্তনীর চাই না, হবেও না। তিনি বিচার পাবেন। তার কৃতকর্মের ফল পাবেন, এটুকুই আশা করতে পারি । তবে ওই যে বললুম, মমতার ট্রায়াল শুরু হয়েছে। হেঁয়ালি ছেড়ে বলি, আদালতে তাঁকে এখনো পুরোদস্তুর টেনে নিয়ে যাওয়া হয় নি ঠিকই। কিন্তু তার দলকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সম্প্রতি আদালতের রায়ের কপি হাতে নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তারা ছাড়া অন্যকোনো দল 'সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস' নাম কোনক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে না। করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন তারা। এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়গুলো ব্যবহার করতে পারবে না। ইতিমধ্যে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় একাউন্টের ৪২০কোটি টাকা ফ্রিজ করেছে ইডি। সেই টাকা একটি দলের কাছে যতই সামান্য হোক, সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ঋতব্রত তৃণমূল। এটা অবশ্য দুই পক্ষের অস্তিত্বের লড়াই, রাজনীতিতে আবার প্রাসঙ্গিক হওয়ার লড়াই। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু গণতন্ত্রে সংখ্যাধিক্যের জোরে এবং তীক্ষ্ণ কূট চালে অনেক ক্ষেত্রে বাজিমাত করছেন ঋতব্রত তৃণমূলীরা। সংসদীয় গণতন্ত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইনের আইনের হাত থেকে বাঁচতে প্রয়োজনের অধিক বিধায়ক তাদের হাতে। কেন্দ্রে সেই একই আইন থেকে বাঁচতে পুরানো ডরম্যান্ট ব্যাঙ্ক একাউন্টকে এ্যাকটিভ করেছেন সাংসদরা। তাঁরা এন সি পি আই দলের সাংসদ। এনডিএ-র সহযোগী দল। গুঞ্জন উঠছে এবার তারা সরাসরি বিজেপিতে যোগদান করবেন। কিন্তু রাজ্যে তাঁদের সতীর্থরা এন সি পি আই য়ে যোগ দিচ্ছেন না। পুরো দাবার বোর্ডে চাল যেটা পড়ছে, তাতে প্রথমে বোরে, ঘোড়া যেগুলো খাওয়া হচ্ছে সবটাই আমরা দেখছি। চালও কে দিচ্ছে জনতা জনার্দন সবটাই বুঝতে পারছে। এখন যোশেফ কে. কতটা বুঝছেন। বিজেপিকে সমর্থনের জন্য বিভিন্ন ইস্যুতে ওয়াক আউট করেছেন। অবশ্যই যা করেছেন নিজেকে বাঁচাতে করেছেন। এবার বাঁচবেন তো? এখন তো তাঁর টিকিটে জেতা সাংসদ বিজেপিকে সরাসরি সমর্থন করবে। কমিশনেও, আবেদন করেছে ঋতব্রত তৃণমূল। কপিল সিব্বল, মনু সিংভি কোথায়? কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষীয়াণ উকিল হিসাবে বলছেন, রেজিস্ট্রেশনের রিনিউয়ের তারিখ নিয়ে প্রশ্ন আসছে কেন? এই বিজয়ী প্রার্থীদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো সিম্বল দিয়েছিলেন ভোটে দাঁড়াতে? তাহলে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নিলেন কেন? যুক্তি যতই চালাচালি হোক, এই সবই মমতার ট্রায়ালের অঙ্ক ও অঙ্গ। কিন্তু সব থেকে নির্মম পরিহাস হলো, মমতার নিজের হাতের তৈরি দল ও প্রতীক কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা। প্রত্যেক পদ্মমুখী তৃণমূল মুখে বলছেন, মমতা তাদের সুপ্রিমো। জেলায় ফিরে অনুব্রত মণ্ডল বলছেন, সেই একই কথা। ঋতব্রত তৃণমূলে যোগদানের পরও প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা বলছেন, তিনি মমতার সঙ্গে আছেন। বীরভূম সাংসদ তার নিজস্ব নির্বাচনী গ্রুপ ডেসক্রিপশনে "তৃণমূল" কথাটি বাদ দিয়েও বলছেন, তিনি দিদিকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। দিদির সঙ্গে আছেন। আবার এনসিপিআইয়ে আছেন, সেটাও বলছেন। বর্তমানে দ্য ট্রায়াল-এর যোসেফ কে. -র মতোই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক ব্যবস্থার শিকার, যেখানে সবাই ভদ্র ব্যবহার করলেও কেউ তাকে সত্যিই সাহায্য করে না। চারপাশের সৌজন্য ও সহানুভূতি শেষ পর্যন্ত তাকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলে দিচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, সবকিছুর আড়ালে কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত রয়েছে। এই ট্রায়াল ট্র্যাপে তিনি আপাতত বন্দি। বাংলায় একটা কথা আছে, আঁধার কিল। সেটাই হচ্ছে। ক্রমশঃ পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া চলতে থাকবে, একদম গোঁড়া পর্যন্ত ।। পর্ব গুলো দেখুন, আর উপভোগ করুন।। দেবশ্রী মজুমদার একজন সাংবাদিক

Gadget

অপছন্দ: দেব ঋষি ২৮.০৯.২৬

                                  অপছন্দ  আমি রবাহুত হতে পারি যদি সেখানে কোনো ভান না থাকে।  জানি, তুমি আমাকে অপছন্দ করো। সে তোমার অধিকার। তব...

Popular