চাতক-- দেবশ্রী মজুমদার
চাতক: দেবশ্রী মজুমদার
চাতক শুধু
ধুসর ধু ধু --
বৃষ্টি চোখে চোখে
ফটিক জল, ফটিক জল
বৃষ্টি দুচোখ ভরে
তখন, বাইরে কোথায় ঝরে!
বৃষ্টি হীনে দৃষ্টি হীন
চাতক তারস্বরে।
সাহারায় হায়!
ঊষর 'পরে
দহন ঝরে ঝড়ে।
ভালো থাকিস, ভালো রেখে
ঊষর বালু বুকে---
কেউ বলে না, কেউ ভাবে না
বিদায় বীতশোকে।
মা যবে গৃহ বন্দি::দেবশ্রী মজুমদার
মা যবে গৃহ বন্দি::দেবশ্রী মজুমদার
মা যবে গৃহ বন্দি
অশোক কাননে
বন্দি সীতা
রাবন করেছে বন্দি।
দুধের ধারা
বাঁধন হারা
আগল দেয়ার ফন্দি
মা যবে গৃহ বন্দি।
স্নেহ তবে করে সন্ধি
মা যবে গৃহ বন্দি।
অশোক কাননে
বন্দি সীতা
রাবন করেছে বন্দি।
প্রচারের আলোককেন্দ্রে রথীন্দ্রনাথ: উদ্যোগ বিশ্বভারতীর: দেবশ্রী মজুমদার
প্রচারের আলোককেন্দ্রে রথীন্দ্রনাথ: উদ্যোগ বিশ্বভারতীর: দেবশ্রী মজুমদার
প্রায়শ্চিত্ত, না সংশোধনী- বলবে সময়। তবে, সোজা সাপটা ভাবে বলা যায়, বিশ্ব ভারতী উদ্যোগ নিল তার অশ্রুত নায়ককে নতুন করে আবিষ্কার করতে। তিনি হলেন, বিশ্ব ভারতীর প্রথম উপাচার্য তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্তান রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
...I know for certain that the Bengali race must needs accept my songs, they must all sing my songs in every Bengali home...
উপরে উল্লেখিত কথা পড়ে বোঝা যায় কবিতা ও সঙ্গীত নিয়ে নিশ্চয়তা গভীর বিশ্বাস ছিল কবির মনে। বহুল শ্রুত একটি ঘটনা থেকে জানা যায়, আশ্রম বালিকা কনিকা বন্দোপাধ্যায়কে তিনি একবার বলেছিলেন, এ শুধু মাত্র সঙ্গীত নয়, মন্ত্র। তবু ও কোথাও যেন আশঙ্কা ছিল, যদিও সব প্রভাতে, সব খেলাতে তিনি আছেন। তাঁর কোন অনাগত আশঙ্কা থেকেই, তাঁর সমস্ত সৃষ্টির অছি করে গেছিলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও পুত্র বধু প্রতিমা দেবীকেই।
বিশ্ব ভারতীর ক্ষেত্রে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান কম ছিল না। শুধু মাত্র ব্রহ্ম চার্যশ্রমের পাঁচ বালকের একজন ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক প্রকার হৃদস্পন্দন। রবীন্দ্র ভাবনা কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার এক মূল্য বান প্রকাশ। মাধ্যমিক স্তরের পাঠের পর কৃষি বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার জন্য ইলেনয় যান তিনি। পাঠ সমাপ্ত করে চার দশক শান্তি নিকেতনে কাটান তিনি। তিনি পড়ুয়াদের জনু বিদ্যা পড়াতেন। তাঁর প্রচেষ্টা ছাড়া বিশ্বভারতী এই শিখরে উঠতে পারতো না। তাঁর প্রচেষ্টায় টেগোর মেমোরিয়াল গড়ে ওঠে। কিন্তু রথীন্দ্রনাথকে প্রচারের আলোতে কোন দিন আনা হয় নি। অশ্রুত থেকে গেছেন চিরদিন। ১৯৩৮ সালের ২৮ জানুয়ারি, এক স্বাক্ষরিত চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমস্ত কিছু দিয়ে গেছেন রথীন্দ্রনাথ ও তাঁর স্ত্রী প্রতিমা দেবীকে। তিনি লেখেন, আমি আমার সৃষ্টি যথা সঙ্গীত, নাটক সবকিছুর একচ্ছত্র অধিকার পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও পুত্র বধু প্রতিমা দেবীকে দিয়ে গেলাম। তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী আশ্রম ও তার বাইরে এগুলো কোন বিকৃতি ছাড়াই অনুষ্ঠিত হবে। এই আশঙ্কা থেকে এই দায়িত্ব তাদের উপর দিয়ে গেলাম , ভবিষ্যতে কেউ দায়িত্ব নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করবে না, তা বলা যায় না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে রাজনীতি রথীন্দ্রনাথকে আশ্রম ত্যাগ করতে বাধ্য করে। তিনি দেরাদুনে চলে যান। সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এমনকি রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ১৯৬১ সালে তাঁকে শান্তি নিকেতনে ডাকা হয় নি। এটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল বলে আজ অনেক আশ্রমিক মনে করেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিশ্বভারতী তাঁর লেখা, চিঠি, ডাইরি, ছবি চার সমগ্রের আকারে প্রকাশ করছে। বিশ্ব বিদ্যালয়ের রবীন্দ্রভবনের বিশেষ আধিকারিক নীলাঞ্জন বন্দোপাধ্যায় সেগুলো সম্পাদনার কাজ করছেন। প্রথম ভলিউম এই বছরের ২৭ নভেম্বর প্রকাশ পাবে, বলে জানা গেছে। কারণ ওই দিন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম দিন। প্রথম ভলিউমের নাম রথীন্দ্র রচনা সংগ্রহ। তার মধ্যে রয়েছে তাঁর কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও অপ্রকাশিত রচনা। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম ভলিউমের পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভলিউম ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ পাবে। চতুর্থ ভলিউম বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করার কথা। চারটি ভলিউম আগামী এক বছরের মধ্যে প্রকাশ পাবে, বলে সূত্রের খবর। উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী জানান, বিশ্বভারতীর উন্নয়নে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই ভলিউম পাঠ করলে রথীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত অনেক ধারণা পরিবর্তিত হবে। এই প্রচেষ্টায় আমি খুশি।
অনুগল্প : অনুভব : দেবশ্রী মজুমদার
অনুগল্প : অনুভব : দেবশ্রী মজুমদার
আপনি কী জানেন? --বেশি নিম ভাজা খেলে কী হয়? কিডনি ভালো রাখতে নিম পাতা ভাজা বেশি খাবেন না। জল পরিমিত খান, কমও না বেশিও না। বরং ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ম মাফিক করুন । ধ্যেৎ! নিয়মের কোন ঠিক নেই। আজ যা ঠিক, কাল তা ভুল। কর্তার না পসন্দ ওই নিম! হাতে মোবাইল নিয়ে 'ফেবু ' স্ট্যাটাস থেকে মুখস্থ করার মত জোরে পড়তে লাগলেন অনুপম বাবু! উদ্দেশ্য, কথা গুলো গিন্নির কানে পৌঁছানো! যেমন ভাবনা, তেমনি কাজ। শাস্ত্রের কথা মিছে হবার নয়। ঝাঁঝালো সুরে গিন্নি সরযু বলল, ওই রকমভাবে পড়া মুখস্থ করলে, আজকে অফিসে বড়বাবু হতে! ওরকম কলম পিষতে হত না। -- এক্কেবারে আঁতে ঘা! তবুও বউয়ের সাত অপমান গায়ে মাখতে নেই। স্রেফ মাফ! কাব্যি করে অনুপম বললে, কিসে আর কিসে! নিম পাতার সাথে, বড়বাবু আসে?
গোপাল ভাঁড় নাকি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে বলেছিলেন, প্রথমে তেঁতো মুখ করা যাক! পোড়া মুখে সব ভালো লাগবে!
কিন্তু তা হলো কৈ! সরযু দেবী মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, আর তখনই ফাটলো গার্হস্থ্য বোমা! একই বাড়িতে থাকে দুই তরফ। ছোট তরফ পুষেছে কুকুর। নাম লালু। হঠাৎ সেই লালু ঝাঁপিয়ে পড়লো তার উপর। আর যাই কোথা! বেচারা অনুপম পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে লালুকে চেনে বেঁধে দিল। আর তাতে পরিস্থিতি আরও বিগড়ে গেল।
সামাল সামাল বলে নাওয়ের মাঝি চিৎকার করলো ঠিকই, কিন্তু নাও ডুবলো। এখন দুই তরফের মুখ দর্শন বন্ধ!!
যাকে নিয়ে এত কাণ্ড। সেই লালুর খাতির বেড়েছে আগের থেকে দ্বিগুণ। কারণ এই লালুই ময়দানে নেমে ছোট তরফের হয়ে একাই প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করেছে। ছোট তরফের সারমেয় প্রীতির আতিশয্যে সরযুর দন্তপাটি যুগল ক্রমশ গ্রাইণ্ডিং মেশিন হয়ে উঠেছে! আর তাতে মাঝে মধ্যে নিষ্পেষিত অসহায় দুইজন। সে অনুপম ও তার মা!
কিন্তু, হঠাৎ করে লালু এই সংসারে আসে নি। লক্ষ্য ছিল রাস্তার কুকুরদের আশ্রয় দেওয়া। সেই ইচ্ছেতে হ্যাঁ মিলিয়ে তাঁর এই স্থান। যাহোক, তাদের অনেকেই গাড়ি চাপা পড়ে যাওয়ায়, ছোট তরফ লালুকে এক প্রকার দত্তক নেয়। প্রথম দিকে সারমেয় প্রীতি ছিল লক্ষ্য। এখন সংসারে প্রতিপক্ষকে জব্দ করার মোক্ষম হাতিয়ার। কারণ, লালুর বদ অভ্যাস অর্থাৎ পা চাটা, গা চাটা, গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়া, লোম ঝাড়া, খাবার কাপ ডিস ও থালা চাটা , সর্বোপরি যেখানে সেখানে পটি করা সরযু,একদম পছন্দ করতো না। এই নিয়ে দুই তরফে কথা কথান্তর কম হয় নি। সরযু ভাবে আবেগ অনুভূতি বড়ই যুক্তি হীন। আর এই জন্য হৃদয় থেকে মস্তিষ্ক বড়। সে হৃদয় বেত্তাকে যুক্তির নিত্তিতে মেপে নেয়। তাই আমূল পরিবর্তিত হয় অনুভূতি। একটু বলে নেওয়া ভালো। লালুর আগে ধলু গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায়। তখন আফশোস হয়েছিল অনুপমের। আজ আর দুঃখ হয় না।
সংসারে বড় অসুখ। রোগহারক অনুপান সেবন করতে করতে কোনটা তিক্ত কোনটা মিষ্ট এই ফারাক করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে সে। সে বুঝতে পারছে, অভিজ্ঞতা দিয়ে, জীবন দিয়ে--অনুভূতির হাজার প্রকাশ! কেউ বলে হাজারো ফিকির! চোখ ধাঁধানো আলো যেমন গোটা চোখ জুড়ে আঁধার আনে, তেমনি নিস্পন্দ অন্ধকার আলোর পদধ্বনি শোনে। মন নিঃশীম ছায়া স্নাত হয়েও ভেসে যায় আলোর বন্যায়!
ধুলুর কথা হচ্ছিল, আপনাদের সঙ্গে। আঘাত সবাই পেয়েছিল। ছোট বড় সব তরফ। ভারাক্রান্ত মন বলেছিল--এক প্রকার ভালোই তো হল। আপদ তো গেছে! আদরে কখনো ধলু কখনো বা ভোলা। ভালবাসা প্রকাশের ভাষার সে অনেক ভঙ্গি। তার ঝক্কি পোহায় গুটি কয়েক জন। অকুতস্থল তারাপীঠ গামী এক গ্রামের মসৃন রাস্তা। কোন ভিড় নেই। অবরোধ নেই। মিছিল নেই। কুকুর কুকুরের মত মরেছে। সাঁ সাঁ করে ধাবমান গাড়ির ধাক্কা। মসৃণ রাস্তায় রক্তের প্রলেপ। প্রখর রৌদ্রে যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিলিয়ে যাবে। কুকুরের রক্ত মানুষের মত চাপ চাপ রক্ত, জমাট রক্ত নয়। যে রক্তে বোধ হয় পশুদের মানবের মত উদাসিনতা জমতে চাই না। জমাট বেঁধে স্বার্থপরতা তঞ্চিত হতে পারে না। তাই রক্তে এত পার্থক্য! মানুষকে কুকুর বললে , রাগ হয়। কিন্তু লজ্জা পাওয়া উচিত অন্য কারনে। এসব বিবেক দংশিত আজগুবি প্রশ্নের বুদবুদি কাটছিল কার মনের অতলান্তে? তবে অবাক জ্বরে আক্রান্ত মন জানে সব কিছু ক্ষণস্থায়ী। আজ যা মনে হয় সঠিক। সময়ের নির্দেশ তন্ত্রে তার মিথ্যে হতে সময় লাগে না। সেখানে আমাদের গভীর গভীরতর অসুখ।যেন বেওয়ারিশ লাশের মত শুয়ে আছে লাশ কাটা ঘরে। অনুপম কি জানি, নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করেছিল কোন কারণে। কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে সে তো দায়ী ছিল না! তবুও ভাবনা আসছে-- যদি, ভুলুকে এতটা দূর ছাই না করতাম! এই তো গত কাল বাড়ি ফিরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গ্রীলটা টেনে দিলাম। ভুলু পিছন পিছন এসেছিল। যা যা বলে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আজ আর নেই। কত ভালোবাসা! ছোট তরফই যত্ন করত। কিন্তু ভুলু জানত, অনুপম প্রভুর বাড়ির সদস্য। এই দায় বদ্ধতা কজন মানুষের আছে? এসব সাত সতেরো ভাবতে ভাবতে যখন বড় তরফ,জানতে পারল, ভুলু আর নেই। ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ভুলু রাস্তার কুকুর। যাকে গলা জড়িয়ে , বাড়ির ছোট্টরা কথা বলত আপন মনে, সাজাতো। শাসন করে গোটা দুপুরটা কাটত তাদের। খবরদারি কম ছিল না কারো ভুলুর উপর। বাড়ির ক্ষুদ্র সদস্য অনুপমকে জানাল, জানো, ভুলুকে আর দেখতে পাবো না। সে আকাশের তারা হয়ে গেছে! কথাটা তার শব্দ ভান্ডারে স্থান পেয়েছে নিজের ঠাকুরদা মারা যাওয়ার পর। কিন্তু, আজ লালু বিড়ম্বনা। মরলে দুঃখ আসবে। হৃদয়ের কাজ হৃদয় করবে। যাকে বলে হৃদয়বেত্তা। মস্তিষ্ক তার মহৎগুণে জন্ম দেবে অন্যকোন নতুন অনুভবের!
অনুপম ঘটনার চকিতে কেমন যেন হয়ে ফের সম্বিৎ ফিরে পেয়েছিল সেদিন। যার সঙ্গে আজ আর তাকে মেলানো যাবে না কোনভাবেই। চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে- সদ্য তাকে মাটি চাপা দেওয়া হল বাড়ির উঠোনে। তীব্র অভিমানে একটি কথায় তার মুখ দিয়ে বেরোল :: ভালো ই হল। কম ঝামেলা পোহাতে হয় নি। আর না। দুঃখ বড় তরফের হয় নি, তা নয়। কিন্তু, সে একটু লেখা টেকা করে। একটা গল্প লিখে নিজের মন হালকা করে নেবে। নৈতিক অবনমনের গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ উপায়। লোকে বলে, ফিরিঙ্গিদের কনফেসান আর কি! এসব কি নেহাতই মেকি। মনে পড়ে গেল তার ইলিয়টের বিখ্যাত লাইন-- Put on a face to meet the faces that you meet--সে সব যাগগে। অনেকক্ষণ থেকেই ছোট, বড় বলছি। আবার নাম ও বলছি। নামে কি আসে যায়? নাম তো প্রতীক। ধরুন, ছোট তরফ বলতে বেশ কিছু নামের ভিড়। আর বড় তরফ বলতে সেই একই। গল্পের চরিত্র এরা হয়ত কেউ নয়। কিন্তু আজ এদের কষ্ট বেশি। অনেকের চোখে জল। ভবিষ্যতে হয়তো তা অলীক বাষ্প।
হাড় কাঁপানো শীতে রাস্তার এক নেড়ি কুকুর বেশ কয়েকটি বাচ্চা জন্ম দিয়েছে। এটাই ছিল আদ্যোপান্ত গল্প। গল্পের খোল নলচে এক থাকল। কিন্তু দিনের ছায়া- আলো খেলার মত, মানুষের আবেগ অনুভূতি গুলোই পাল্টে পাল্টে যেতে লাগলো। অনুভূতি গেল যেন-- দিনের আলো ফোটার সাথে সাথে গাছের ঘন সবুজ অবয়ব। নিষ্পাপ শিশুর মায়া মাখানো মুখের মত! আবার প্রখর আলোয়, তা উদ্দাম গীতি। আর দিনের শেষে আলো নেভার প্রাক মুহূর্তে মনের আত্যান্তরে হারিয়ে যাওয়া সুখ!! অনুভব ! তুমি অনন্য অনুভূতি! শুধু তোমার জন্য যা একসময়ের আবেগ, তা অন্যসময়ে বিড়ম্বনা মাত্র। একমাত্র তুমিই মানুষকে বানিয়েছ বিচিত্র জীব!!
ভণিতা : নাগরিক পন্জিকরণ: দেবশ্রী মজুমদার
ভণিতা : নাগরিক পন্জিকরণ: দেবশ্রী মজুমদার
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল নিয়ে বাঙালির বিতর্ক কম ছিল না। কিন্তু দুজন দুজনকে কিনা ভালবাসতেন। নজরুলের আব্দার সহ্য করে অসুস্থ শরীরে ও রবীন্দ্র নাথ গান গেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের নিন্দা সহ্য করতে না পেরে নজরুল হাত চালাতে কুন্ঠা করেন নি। আজ মনে হয়, রোজ কত কী ঘটে যাহা তাহা - এমন কেন সত্যি হয় না আহা। আচ্ছা, ওঁদের কথা ছেড়ে দিন। আজ পরিস্থিতি পাল্টেছে। বাঙালি বিভাজিত বলব না। দ্বিধা গ্রস্থ। অনেকটাই কৃতকার্য রাজনীতি। যে রাজনীতি একদিন ভারত তথা বাংলা ভেঙেছিল। হিন্দু ভাবছে ডেমোগ্রাফি চেন্জ হচ্ছে। একদিন মুসলিম রাষ্ট্র হবে। বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের ঘটনায় সিঁদুরে মেঘ দেখছে হিন্দুরা। কিন্তু এটা ভুললে চলবে না, ওখানকার মুসলিমরা তাদের অনেকেকেই বুকে আগলে রেখেছে। ওখানকার মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে গিয়ে বেশির ভাগ মুসলিম ব্লগার খুন হচ্ছেন। তাই দোষী মৌলবাদী। আজ ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমাদের গ্রামের এক বিধবা মহিলা এক মুসলিম রিক্সাচালককে বিশ্বাস করেন। তিনিই তাঁকে পেনশন থেকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান। পয়সা অবশ্যই নেন। এখন ভালো হিন্দু, ভালো মুসলিম অসহায় আল্লাহ আর ভগবানের লড়াইয়ে। সেজন্যই কী চরম খেদে পৃথিবীর সমস্ত অবিশ্বাসীদের এক হওয়ার ডাক দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়? ধর্ম কি আফিমের মত উপাদেয় হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে! টুকরো টাকরা উদাহরণ অনেক কিছু বলতে পারে।
১) তখন আমি যুবক। রাজ্যে বাম। কেন্দ্রে হয় জনতা না হয় কংগ্রেস। সমস্তিপুরে রেলের পরীক্ষা। সিট রিজার্ভ করে যা ঘটল, বাদ থাক। স্টেশনে নেমে বাসে বাংলা বলায় বেশি ভাড়া দিলাম। কোলকাতা থেকে অনেকে গেছিল। কাউকে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয় নি, বাঙালি তাই। পরীক্ষা হয়ে গেছে। রাত্রে ট্রেনে একটি মাত্র জেনারেল কামরা। গাদাগাদি ভিড়। তিল ধারণের জায়গা নেই। এর মাঝে দুই হিন্দি ভাষীদের ঝগড়া। মাঝে আমি। হিন্দি বলতে পারি না। তাই স্পিকটি নট। কিন্তু পায়ে চাপ পড়তে -- ওরে বাপরে ! গেলাম রে! ব্যস ঝড়ের অভিমুখ আমার দিকে। বর্ধমান ঢোকার আগে পর্যন্ত কি অত্যাচার বলে বোঝাতে পারবো না। ওই ভদ্রলোকের কপালে পুজা আর্চার টিপ। আর মুখের দিকে ঘুষি নিয়ে আসছে। আমার অপরাধ বুঝতে পারছি না। শুধু হাতজোড় করে কাকুতি মিনতি করে রেহাই পাই। তারপর বর্ধমানে নামি।
২) আমার ছেলের মাথা ফেটেছে স্কুলে । হাসপাতালে ইমার্জেন্সী থেকে নার্সের কাছে ইঞ্জেকশন নিতে গেছি। আমার ছেলে পাঁঠা কাটার মত ছটপট করছে। সুঁচ দেখেছে। অবস্থা দেখে লাইনে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক বয়স্ক মুসলিম মহিলা বললেন, বাপ ধন ! তুমি আগে বাচ্চাটা কে নিয়ে যাও। ইঞ্জেকশন দেওয়া দেখতে পেলে ওকে আর দেওয়াতে পারবে না। কিন্তু একজন হিন্দিভাষী মহিলা কিছুতেই শুনবেন না। কি ব্রত করে আছেন। দেরী হয়ে যাবে। তাই চিৎকার শুরু করলেন। যদিও ইমারজেন্সি থেকে আসায় নার্স আমার ছেলেকে ডেকে নিলেন। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। হয়ত সবার ক্ষেত্রে ঘটে না। যুক্তি তর্ক পরিসংখ্যান দিয়ে যখন অনেকের সাথে আলোচনায় যোগ দিই এগুলো আমার মাথায় থাকে না। অভিযোগের পর অভিযোগে গলা মেলায়। তখন সেই বুড়িটা যে বাপধন বলে ডেকে ছিল কি দরকার তাকে মনে রেখে, সে তো আর হিন্দু নয়!!!!!
প্রনাম নেবেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ঃদেবশ্রী মজুমদার
প্রনাম নেবেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ঃ
দেবশ্রী মজুমদার
প্রনাম নেবেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। আপনি তফাতেই ছিলেন আর সকলের থেকে। অবশ্য তা শির দাঁড়াতে। আদর্শ থেকে না সরে ইউ নাইটেড প্রগ্রেসিভ এলায়েন্স থেকে বামদল সরে এলেও আপনি স্পিকার পদে থেকে পদত্যাগ করেন নি। কারন আপনি বিশ্বাস করতেন সংসদীয় গণতন্ত্রে।আর তাছাড়া এতে হয়ত বিজেপি সুবিধা পেত। এটা একটা বিশ্বাস। ভুল কি ঠিক সেটা ইতিহাস বিচার করবে। এস এস ডি এ র চেয়ারম্যান হিসেবে শান্তিনিকেতন, শ্রীনিকেতনে উন্নয়নের জন্য আপনি কম করেন নি। খোয়াই নিয়ে ধারাবাহিক লিখছিলাম। শেষ মুহূর্তে অফিস বলল, পাতা ছাড়ব। সোমনাথ বাবু বোলপুরে আছেন, বক্তব্য দাও। মাস্ট। গৌতমবাবু সহ্য করতে পারতেন না দুটো কথা, ১) অসমর্থিত সূত্র ২) ফোনে রিং হলেও অমুক বাবু ফোন ধরেননি। তাই মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল। কি দুঃসাহস আমার! আপনি জানতে চাইলেন কাগজের নাম। তারপর খুব অনুরোধ করায় রাজী হলেন। নাম জানতে চাইলেন। নামটা বার বার দেবর্ষি বলছিলেন। বানান করে নাম বলায় , আপনি যারপরনাই ক্রুদ্ধ হয়ে বলে উঠলেন, তোমার সাহস তো কম নয়? আমায় বানান শেখাচ্ছ। প্রথমে থতমত করে বলি স্যর ভুল বুঝবেন না, আমার নাম টা বাংলা ফিল্মের এক একট্রেসের নামের সাথে মিল হওয়ায় বিপত্তি এড়াতে আমাকে বানান করে বলতে হয়। বুঝলেন। তারপর রাশভারী মানুষটি বললেন, Come tomorrow morning 9 sharp. I mean 9. আমার ধন্য হওয়ার কথা। কিন্তু গৌতম বাবুর মাস্ট, মাস্ট। তাই বললাম, স্যর কিছু যদি মনে না করেন, একটা কথা বলবো? আবার কি হল?- বাজখাঁই গলা। বললাম, আজ আপনার বক্তব্য না পেলে বড় বিপদে পড়ে যাব। নরম হলেন। বক্তব্য পেলাম। বললেন, এস এস ডিএর চেয়ারম্যান হিসেবে এই এলাকা পুনর্গঠনের জন্য যখন চেষ্টা করি। শুধু বিরোধীতার জন্য বিরোধীতা করা হয়। খোয়াই নিয়ে অহেতুক বিরোধীতা করা হয়। এক সময় যারা বিরোধীতা করেন, আজ তাঁরা বুঝতে পারছেন। বাস্তব কে উপেক্ষা করা যায় না। এটা ভালো লাগছে। শিবপুরে শিল্প তালুক গড়ে তোলার চেষ্টা করি। বাধা দেওয়া হয়। বিনিয়োগ আনতে পারিনি। সেটা তো হাতে নেই। এস এস ডি এর চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করার সময় অহেতুক বিরোধীতা করা হয়েছিল। সেদিন অনেক ক্ষণ কথা বলেন। পুরোটায় নোট নিয়েছিলাম। ল্যান্ড ফোনে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। পরে নিজের প্রয়োজনে, বন্ধু দের প্রয়োজনে তাঁকে অনেকবার ফোন করেছিলাম। কারন অনেকেই আমার মত তাঁকে ফোন করতে ভয় পেত। তবে আর কোন দিন অসুবিধা হয় নি। অতবড় মাপের মানুষ, আমার মত অখ্যাত একজনের অন্যায় আব্দার রেখেছেন। তাই উনাকে আবার প্রনাম। পরে এই সুযোগকে কাজে লাগায় অন্য মালিকানার স্বভূমি। ফোনের কথাবার্তাকে অবলম্বন করে উনার একটি লেখা বের করেছিল। তখন অবশ্য গৌতম বাবু স্বভূমিতে ছিলেন না।
ক্ষুদিরাম বসু: তোমায় প্রনাম-- দেবশ্রী মজুমদার
ক্ষুদিরাম বসু: তোমায় প্রনাম-- দেবশ্রী মজুমদার
কি রাজনীতি, কি খেলা, কি ক্লাব, কি শিক্ষার অঙ্গন! একটু কান পাতুন। শুনতে পাবেন, একজন আরেকজনকে বলছে -- “আমাকে ক্ষুদিরাম বানাবেন না। বা আমি ক্ষুদিরাম হতে চাই না”। অর্থাৎ ক্ষুদিরামকে যেন ‘বলি’ বানানো হয়েছিল। যাকে চলতি ভাষায় আমরা ‘মুরগী’ বানানো বলি। এর থেকে অদ্ভুত পরিভাষা বোধকরি আর হয় না। এখনকার বিচারে তিনি বোকাই ছিলেন। আর সেই জন্য আজ আমরা চব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয় উপভোগ করছি। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ নির্মল সেনের কথায়, এই ‘বোকা’ ক্ষুদিরামই স্বাধীনতা সংগ্রামে তরুণদের নতুন পথ দেখান। ইতিহাসের লালচে পাতার ভাঁজে কারো কারো ব্রিটিশরাজের কাছে আপোষ করে ক্ষমা ভিক্ষা বা মিথ্যে সাক্ষী দেওয়া নিয়ে সময় সময় সারা দেশব্যাপী বিতর্ক দেখা গিয়েছে। কিন্তু ক্ষুদিরামের জাতই আলাদা! থাক সে কথা!
ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্ব কনিষ্ঠ বিপ্লবী ছিলেন ক্ষুদিরাম। ফাঁসির সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস ৮ দিন। ১৯০৮ সালের আজকের দিন। অর্থাৎ ১১ অগাস্ট ভোর ৪টা। সত্যেন বসুর নেতৃত্বে গুপ্ত সংগঠনে যোগ দেন ক্ষুদিরাম। তার আগে কাজ ছিল ভুত ধরা, ভুত তাড়ানো আর দলবেঁধে দূরন্তপনা করা। ১৯০৩ সালে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে অস্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে পড়াশোনা বন্ধ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনে সত্যেন বসুর সাথে পরিচয়। কাজ ছিল ইংল্যান্ড থেকে আমদানীকৃত লবনের নৌকা বা বিদেশী পণ্যের নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া। ১৯০৬ সালে দেশপ্রেমের ছোট ছোট বই বিক্রির দায়িত্ব পড়ে ক্ষুদিরামের উপর। মেদিনীপুর মারাঠা কেল্লায় প্রবেশ দ্বারে দাঁড়িয়ে ক্ষুদিরাম বই হাতে বলছেন, “আসুন, পড়ুন। দেশের দুর্দশার খবর জানুন। অত্যাচারী রাজশক্তির নির্মমতার নজির—এই বই আপনাদের জন্য”। এমন সময় এক হাবিলদার ক্ষুদিরামের হাত চেপে ধরে। ক্ষুদিরাম সোজা হাবিলদারের নাকে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিলেন। সত্যেন বসু হাজির হয়ে সামাল দিতেই, ক্ষুদিরাম হাওয়া। অবশ্য পরে আলিগঞ্জের তাঁতি তলায় পুলিশের কাছে ধরা দিলেন। ১৩ এপ্রিল মুক্তি পেলেন ক্ষুদিরাম। দেশ চিনল সাহসী ছেলেকে!
১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর অভিবিভক্ত বাংলায় মেদিনীপুর জেলার বহুভাইনি গ্রামে জন্ম ক্ষুদিরামের। বাবা ত্রৈলক্যানাথ বসু এবং মা লক্ষ্মী দেবী। ক্ষুদিরামের জন্মের আগে দুই ভাই মারা যান। তাই সংস্কারবশতঃ তিন মুঠো চালের বদলে বিক্রি করেন ক্ষুদিরামকে। ক্ষুদিরামের তিন বোন ছিল—অপরূপা, সরোজিনী, ননীবালা। তাই আদরের ছিলেন ক্ষুদিরাম। কিন্তু তাঁর সাত বছর বয়সে বাবা মারা যান। তার ৬ মাস পরে মা মারা যান। তারপর তাঁর আশ্রয় হয় দূর সম্পর্কের দাদা বৌদির কাছে। তারপরে বোনের বাড়িতে আশ্রয়। চিঠিতে সত্যেন বসুর নির্দেশ মত ১৯০৮ সালের ২৫ এপ্রিল ক্ষুদিরাম কোলকাতায় পৌঁছুলেন। গোপী মোহন দত্তের ১৫ নম্বর বাড়িতে হাজির হেমচন্দ্র ও উল্লাসকর। তৈরী হল শক্তিশালী ‘বুক বম্ব’। বইয়ের ভাঁজে বোমা। বেশ কৌশলে অত্যাচারী কিংসফোর্ডের কাছে পাঠানো হল। কিন্তু না খোলায় তিনি বেঁচে গেলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে মজঃ ফরপুরে বদলি হলেন কিংসফোর্ড। এবার নেওয়া হল দ্বিতীয় পদক্ষেপ। প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম। কলকাতা রেলস্টেশনে বিপ্লবী বারীন ঘোষ ক্ষুদিরামকে বোমা পৌঁছে দিলেন। বোমার সাথে রিভলভার কেনার টাকা ও মজঃ ফরপুরে যাওয়ার মানচিত্র। কিন্তু এবারেও বরাত জোরে বেঁচে গেলেন কিংসফোর্ড। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল। রাত ৮টা। ক্লাব হাউজ থেকে ফেরার পথে ঝোঁপে ওঁত পেতে ছিলেন দুজন। ভুলবশতঃ মারা পড়লেন নিরীহ মিসেস কেনেডি, তাঁর কন্যা ও চাকর। রেল লাইনের পাশ ধরে ২৪ মাইল দৌড়ান। সারা রাত দৌড়ে পৌঁছান ওয়েইনি রেল স্টেশনের কাছে। রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যান ক্ষুদিরাম। নিজেকে গুলি করার সুযোগ পান নি। ১মে ট্রেনে উঠে কুখ্যাত দারোগা নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে ধরা পড়েন প্রফুল্ল চাকী। আত্মসমর্পনের আগেই শহিদ হন নিজের গুলিতে। শত অত্যাচারেও অন্য সহযোগীর নাম প্রকাশ করেন নি। ১৯০৮ সালের ৮ জুন শুরু হয় ক্ষুদিরামের বিচারপর্ব। সারা পশ্চিম বাংলায় সেদিন কোন উকিল ক্ষুদিরামের হয়ে মামলা লড়তে সাহস পান নি। পূর্ব বঙ্গের অধুনা বাংলাদেশের রংপুর বারের উকিল সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, কুল কমল সেন ও নগেন্দ্র লাহিডী তাঁর হয়ে মামলায় লড়েন। অবশ্য বিচারকের অনুরোধে কালিপদ বসু নামে স্থানীয় এক উকিল এগিয়ে আসেন আসামীর পক্ষে। ৬ দিন ধরে মামলা চলে। বিচারক কর্নডফের কাছে স্বীকারোক্তি দিলেন ক্ষুদিরাম। আদালতের নিয়মে বিচারপর্ব চলল। প্রফুল্ল চাকী শহিদ হয়ে যাওয়ায়, বেনিফিট অফ ডাউট পেতে পারতেন ক্ষুদিরাম। কিন্তু তিনি তা নিলেন না। ফাঁসির আদেশ দেওয়া হল।
উকিলের সাথে ক্ষুদিরামের কয়েকটি কথোপকথন শুনলে ভালো বোঝা যাবে যে ভারতীয়দের কথায় কথায় ‘ক্ষুদিরাম হওয়া’ সহজ নয়ঃ
উকিলঃ তোমার মনে কি কোন কষ্ট আছে?
ক্ষুদিরামঃ না, একেবারেই না।
উকিলঃ তোমার কি ভয় করছে?
ক্ষুদিরামঃ (স্মিত হেসে) ভয় করবে কেন?
উকিলঃ তুমি কি জানো আমরা রংপুর থেকে এসেছি তোমাকে সাহায্য করতে? কিন্তু তুমি ---
১৯০৮ সালের ১১ অগাস্ট। ভোর ৪টা। ফাঁসি হল। ক্ষুদিরামের আইনজীবী উপেন্দ্রনাথ সেন লিখে গেছেন, ফাঁসির মঞ্চে নির্ভিকভাবে উঠে যান ক্ষুদিরাম। তাঁর মধ্যে কন ভয় বা অনুশোচনা কাজ করছিল না।
হাসতে হাসতে বন্দেমাতরম ধ্বনিতে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েন ক্ষুদিরাম। তাঁর আত্মত্যাগের চেতনাকে স্মরণ করে বাঁকুড়ার লোক কবি পীতাম্বর দাস রচনা করেন কালজয়ী গান—
একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি
হাসি হাসি পড়ব ফাঁসি দেখবে জগতবাসী।
কলের বোমা তৈরী করে
দাঁড়িয়ে ছিলাম রাস্তার ধারে মাগো,
বড়লাটকে মারতে গিয়ে
মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী।
শনিবার বেলা দশটার পরে
জর্জকোটেতে লোক না ধরে মাগো
হল অভিরামের দ্বীপ চালান মা ক্ষুদিরামের ফাঁসি
দশ মাস দশ দিন পরে জন্ম নেব মাসির ঘর মাগো
তখন যদি চিনতে না পারিস দেখবি গলায় ফাঁসি।
তাই আবার বলি, কথায় কথায় ‘ক্ষুদিরাম হওয়া’ সহজ নয়। বরং নিজের অজ্ঞতাকে প্রকট করে!! অন্য কিছু বলুন।
বিনীত- দেবশ্রী মজুমদার।
তথ্য সংগ্রহ বিভিন্ন উৎস থেকে।
নেতাজী! :: দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা::
নেতাজী! :: দেবশ্রী মজুমদার
তোমায় যদি পড়ে থাকে কাজল ছোঁয়া চোখ
খুব কম জেনেছে
কেউ কেটা সে হোক।
তোমায় যদি পড়েছে বা
রঙিন বাহারি ফ্রেম
তবে করে কম্মে খা
থাক না সে দেশ প্রেম।।
তোমায় যদি পড়ে থাকে ভ্রমর কালো চোখ
বুকের মাঝে তার তো চাপা শোক।
যাচায় করে, কার আড়ালে কার পতাকা বহ
ভ্রম হবে না কখ্খনো, তার জেনো
সে ছাড়ে না তার হক কোনো।
তোমায় যদি পড়ে থাকে নির্জলা সে
চোখ
তবে অন্যদিনেও জন্ম তোমার পালন করা
হোক!!
প্রসঙ্গ : নারী নির্যাতন ভারতে : দেবশ্রী মজুমদার
প্রসঙ্গ : নারী নির্যাতন ভারতে : দেবশ্রী মজুমদার
না, ডোমিনিক লা পিয়্যরের ‘ সিটি অফ জয়ে’র কথা বলছি না। ভারতের দুটি রাজ্যের আর্থ সামাজিক বিষয় নিয়ে গোটা ভারতের ছবি। খবরের লিড বা শিরোনাম ছিল ‘ভুখা ভারতের সাজানো ছবি’। খবরের মাথায় ছিল—জলার ধারে লাল কাপড়ে ঢাকা টেবিল। তাতে রাখা আছে অনেক খাবার। সামনে দাঁড়িয়ে দুটি শিশু। একজন মলিন পোশাকে, অন্যজনের খালি গা। সামনে খাবার, অথচ চোখ মুখ ঢেকে রয়েছে তারা। ইটালির বিখ্যাত এক চিত্রকরের এই ছবি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্ক।উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ থেকে ছবি গুলি তোলা। এই ছবি ২০১৮ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জিতে নিয়েছে জুরিদের কাছ থেকে। একটি প্রথম শ্রেণীর বাংলা দৈনিকে ২৪ তারিখ এই খবর পড়ে মনে পড়ল গ্রীক পুরাণের ট্যান্টালুসের কথা। মনে পড়ল তাকে নিয়ে একটি বিখ্যাত উক্তি--- The covetous man pines in plenty, like Tantalus up to the chin in water, and yet thirsty.
ট্যান্টালুস না পেয়েছিল গাছের ডাল থেকে ঝুলন্ত প্রায় নাগালের মধ্যে রসালো ফল, না গাছের নিচে ঠোঁটের নাগালে জল। ভাবতে গেলে, সংবাদে বর্ণিত ওই শিশুদুটির অবস্থা তো আরও করুন। কারন টেবিলের খাবারগুলো সত্যি ছিল না। ওদের বলা হয়েছিল, ভাবতে প্লেটে কী কী খাবার থাকলে তাদের ভালো লাগতো। খবরে ‘ইমপ্যাক্ট’ আনতে গবেষণাধর্মী বিষয়কে কোন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়! ভাবতেও অবাক লাগে! তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া যায় যে ওই দুটি রাজ্যের আর্থসামাজিক অবস্থা সত্যি তাই, তাহলে সেটা গোটা দেশ হবে কেন? কিন্তু দুঃখের ব্যাপার গোটা ভারতকে সেভাবেই তুলে ধরা হয়েছিল।
ভারতে গরীবী আছে, দূর্নীতি আছে,নারী নির্যাতন আছে। সব কিছু ছাড়িয়ে যে কোন ইস্যুর রাজনীতিকরণ। অর্থাৎ ওই দুটি রাজ্যে কোন রাজনৈতিক দলের শাসন আছে বা ছিল। পরিসনংখান, স্ট্যাটিক্সটিস দিয়ে ড্যামড লাইজকে বেশী করে দেখানোর প্রবণতা দেশে ও বাইরে। এধরণের গবেষণায় স্যাম্পেল এরিয়া লাগে। স্যাম্পেল এরিয়া যত বড় হয়, তত বিশ্লেষন যথার্থ হয়। কিন্তু এরা বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনে বিশ্বাসী। এরকম একটি ঘটনা ঘটে গেছে বেশ কিছুদিন আগে। থমসন রয়টর্স ফাউণ্ডেশন মহিলাদের পক্ষে ভারতকে পৃথিবীর মধ্যে সব থেকে ভয়ংকর দেশ বলে অভিহিত করেছে। অর্থাৎ মহিলাদের জন্য সুরক্ষিত নয়। সিরিয়া, সোমালিয়া, সৌদিআরব, পাকিস্তান এবং আফগানিস্থানকে পিছনে ফেলে দিয়েছে ভারত। এই খবর রীতিমত চিন্তার সন্দেহ নেই। ৫৪৮ জন বিশেষজ্ঞ ৬টি বিষয়ে নজর রেখে এই বিবেচনা করেছেন। অর্থাৎ স্বাস্থ্য, আর্থিক পরিস্থিতি, বৈষম্য, প্রথাগত রীতি, সেক্সুস্যাল হিংসা এবং নারী পাচার। এগুলি নিয়ে মধ্যে ৫৪৮ জনের মধ্যে মাত্র ৪৩ জন বিশেষজ্ঞ ভারতের মত বিশাল দেশে এই বিশাল কাজটি নিয়ে তদন্ত করেছেন। যদিও এই সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। ঠিক তার পরেই জাতীয় মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন রেখা শর্মা খুব স্পষ্টভাবেই রয়টার্সের এই ঘোষণার তীব্র বিরোধীতা করে বলেন, এই ধরনের সার্ভের ক্ষেত্রে ‘স্যাম্পেল’ সাইজ আরও বড় হওয়া উচিত ছিল। ভারতের মত বিশাল দেশে ৪৩ জন বিশেষজ্ঞ যে সার্ভে এরিয়া ঘুরেছেন তা নেহাতই ছোট। কখনই গোটা দেশের ছবি আনতে পারে না। যে দেশ গুলি ভারতের থেকে র্যাংকে এগিয়ে রাখা হয়েছে , সেই দেশের মহিলাদের প্রকাশ্যে বলার অর্থাৎ বাকস্বাধীনতাটুকু নেই। আর এই কথা কতটা সত্য, অল্প বিস্তর আমরা সবাই জানি। মাদাদগর হেল্প লাইন ১০৯৮ নামে আন্ত র্জাতিক প্রতিষ্ঠানের এর প্রতিষ্ঠাতা জিয়া আহমেদ আওয়ান রীতিমত পরিসংখ্যান দিয়ে আন্তর্জাতিক মহিলা দিবসে প্রেস কনফারেন্স করে বলেন, ৮,৮৯৭ পাকিস্তানি মহিলা ও শিশু যারা ২০১৬ সালে সাহস করে তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তাঁরা বলেন, পাকিস্তানে ইমার্জেন্সি জারি করা উচিত। পাকিস্তানের পত্রকার মুদাসের কাজী লেখেন, পাকিস্তানের ৭০ শতাংশ মহিলা ও বালিকা শারীরিক ও যৌন অত্যাচারের শিকার এবং ৯৩ শতাংশ মহিলা পাবলিক প্লেসে যৌন লাঞ্ছনার শিকার। আমার বক্তব্য পাকিস্তানে কি হল তা নয়। পাকিস্তান আমার দেশ নয়। কিন্তু বিষয়টা হল দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সার্ভে রিপোর্টের ফারাক। এই রিপোর্ট ২০১৭ সালে বেরোয়। এক বছরের মধ্যে তার বিশাল কিছু তারতম্য ঘটে না, যার জন্য ম্যাজিকের মত আমূল পরিবর্তন ঘটে যাবে। আর পরিসংখ্যান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আগের বছরের রিপোর্ট ফেলে দেওয়া যায় না। তাহলে কি আমদের দেশ এই মহিলা অত্যাচারের দোষে দুষ্ট নয়? প্রতিদিন দেশের প্রান্তে যা ঘটছে এবং আমরা যা খবরের কাগজে পড়ছি তা মিথ্যা? তা নয়। সেটা আমার বক্তব্য নয়। আমার বক্তব্য প্রত্যেকটা ইস্যুর দুটো স্টোরি থাকে। সেটা দেখা উচিত। আমরা যদি মহিলাদের বিরুদ্ধে ক্রাইম রিপোর্ট দেখি তাহলে ২০১০ থেকে ২০১৪পর্যন্ত দেখব এর বৃদ্ধি ঘটেছে। সেই চার্ট আমি দিয়েছি। আর সেটা দেখতে কোন কোন সময় দেশে কোন কোন দল ছিল বা কোন কোন রাজ্যে কোন কোন দল ছিল তাই মহিলাদের প্রতি অত্যাচার বেড়েছে এটা দেখা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ হতে পারে। এর বেশী কিছু নয়। ওই সময়ে যা হয়েছে, আমাদের ক্ষতি হয়েছে। তাই মহিলাদের প্রতি হিংসা বাড়াতে যেমন ঘর, তেমনি বাইরের দৃষ্টি কোনের পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। চ্যারিটি বিগিন্স এ্যট হোম। বাড়িতে ছেলের পাতে মাছের মুড়োটা। কিম্বা কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ায় মহিলার প্রতি অত্যাচার, মহিলাকে চাইল্ড বিয়ারিং মেশিন ভেবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ না করা—এগুলো দূর করতে হবে। বাইরে ফতোয়া দূর করতে হবে। ভ্যালেন্টাইন্স ডে চলবে না, অনার কিলিং জারি থাকবে। এসব চললে অবস্থা পরিবর্তনের আশা দূরাশা। সম্মান রক্ষার দায়িত্ব নারীদের। অর্থাৎ ঠিকঠাক পোশাক পড়ে না, তাই মহিলাদের উপর অত্যাচার হয়। মান্ধাত্তা আমলের এই বস্তাপঁচা ধারণা দূর করতে হবে। তাহলে বিদেশে তো প্রতিদিন মহিলাদের উপর অত্যাচার হওয়ার কথা। পোশাক নিয়ে বিদেশে পুরুষ বা মহিলাদের কোন সমস্যা হয় না। পুরুষদের নিজেদের দৃষ্টি পাল্টাতে হবে। কেউ বলবেন, তা কি করে হয়, ভারত সংস্কৃতির দেশ--। থামলেন কেন বলুন! ধর্মের দেশ। স্কুলে ছুটি নিতে গেলে দেখেছি, স্যর পেটে ব্যথা ছুটি চাই- বললে শিক্ষক মহাশয়রা সমস্যায় পড়ে যেতেন। জ্বর বা অন্য কিছু বললে ডাক্তার তার সত্য মিথ্যা বিচার করতে পারেন। কিন্তু পেটে ব্যথা! দাও ছুটি। ধর্ম আর সংস্কৃতি বড় বিষম বস্তু। পক্ষপাত দুষ্ট। ব্যালেন্সের এদিক ওদিক হলেই তুমি গোঁড়া বা সাম্প্রাদায়িক! আর সংস্কৃতি ওটা তো রক্ষার দায়িত্ব মেয়েদের। পুরুষ মদ খেলে দোষ নেই। কি ব্র্যান্ড খায় দেখুন! মহিলা খেলে, দেশটা গোল্লায় গেল। পুরুষ খিস্তি খেউড় করলে মর্দানি। আর মেয়েদের খিল্লি নৈব নৈব চ। মেয়েদের দু’একজন টমবয় হয়। কিন্তু তাদের পাঠ পড়ানো হয়। তাই আর কথা নয়। নইলে লোকে বলবে উনপঞ্চাশেই বাহাত্তুরে! বাজে বকে! শেষ করি বিখ্যাত এক কবির একটি কবিতা দিয়ে। পড়ুন ভালো লাগবে। ---
*সর্বহারা অবিশ্বাসী*
আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর স্ত্রী
বেশ সেজেগুজে এসেছে,
কিন্তু আমাদের সঙ্গে খেতে বসবে না,
আজ তার নীলষষ্ঠী ।
যৌবন বয়েসে এই নিয়ে
কত না চটুল রঙ্গ করতাম,
এখন শুধু একটা পাতলা হাসি
অন্যের বিশ্বাসে নাকি
আঘাত দিতে নেই ।
আর এক বন্ধু
যে প্রথম আমায়
ছাত্র রাজনীতিতে টেনেছিল,
তার আঙুলে দেখি
একটা নতুন পাথর বসানো আংটি,
আমার কুঞ্চিত ভুরু দেখে
সে দুর্বল গলায় বলল -
শরীরটা ভালো যাচ্ছে না
তাই শাশুড়ি এটা পরতে বললেন,
মুনস্টোন, না বলা যায় না ।
আমার মনে হল
এ যেন আমারই নিজস্ব পরাজয় !
শ্রদ্ধেয় অধ্যাপকের বাড়ি, মাঝে মাঝে তাঁর
আলাপচারিতা শুনতে...
এখনও কত কিছু শেখার আছে
আজই প্রথম দেখলাম,
তাঁর দরজার পেছন দিকে
গণেশের মূর্তি আটকানো ।
প্রশ্ন করিনি, তিনি নিজেই জানালেন
দক্ষিণ ভারত থেকে ছেলে এনেছে,
কী দারুণ কাজ না ?
সুন্দর মূর্তির স্থান
শো-কেসের বদলে
দরজার ওপরে কেন,
বলিনি সে কথা -
সেই ফক্কুড়ির বয়েস আর নেই ।
বয়েস হয়েছে তাই হেরে যাচ্ছি
অনবরত হেরে যাচ্ছি,
অন্যের বিশ্বাসে আঘাত দিতে নেই...
অন্যের বিশ্বাসে আঘাত দিতে নেই...
চতুর্দিকে এত বিশ্বাস
দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে,
কত রকম বিশ্বাস...
যে গেরুয়াবাদী ঠিক করেছে,
পরধর্মের শিশুর রক্ত গড়াবে মাটিতে,
চাটবে কুকুরে
সেটাও তার দৃঢ় বিশ্বাস ।
ধর্মের যে ধ্বজাধারী মনে করে,
মেয়েরা গান গাইলে
গলার নলি কেটে দেওয়া হবে,
টেনিস খেলতে চাইলেও
পরতে হবে বোরখা,
সেটাও তার দৃঢ় বিশ্বাস ।
যে পেটে বোমা বেঁধে
যাচ্ছে ধ্বংসের দিকে,
যে পেশি ফুলিয়ে, দেঁতো হাসি হেসে
পদানত করতে চাইছে গোটা বিশ্বকে,
এরা সবাইতো বিশ্বাসীর দল ।
সবাই বিশ্বাসী, বিশ্বাসী, বিশ্বাসী
এক-একবার ভাঙা গলায়
বলতে ইচ্ছে করে
অবিশ্বাসীর দল জাগো,
দুনিয়ার সর্বহারা অবিশ্বাসীরা
এক হও !
অটলজীঃ এক সঙ্গে অনেক প্রকাশ ঃ দেবশ্রী মজুমদার
অটলজীঃ এক সঙ্গে অনেক প্রকাশ ঃ দেবশ্রী মজুমদার
সাচ্চায় ইয়ে হ্যয় কি / কেবল উঁচাই কি কাফি নেহি হোতি
সবসে আলগ থালগ/ পরিবেশ সে পৃথক
আপনো সে কদা বৈঁঠা/ শুন্য মে একেলা খাড়া হোনা
পহাড় কি মহনতা নেহি/ মজবুরি হ্যায়
উঁচায় ওর গহরায় মে / আকাশ পাতাল কি দূরি হ্যয়
জো জিতনা উঁচা/ উতনা একাকী হোতা হ্যায়
চড়হায় পর/ মুস্কানে চিপকা
মন হি মন রোতা হ্যায়।
এ কোন কবির লেখা বলার দরকার নেই। এই পঙক্তির মধ্যেই একাধারে নিজের জীবন অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন স্পষ্ট। হ্যা ঠিকই বুঝেছেন। বাজপেয়ীজীর কথা বলছি। বাজপেয়ীজী ছিলেন, যেন এক সঙ্গে অনেক প্রকাশ! একইভাবে অত্যন্ত নিঃসঙ্গ ছিলেন উঁচু পাহাড়ের মত। মন হি মন রোতা থা। হয়ত!!!
২৪টি দল নিয়ে জোটবন্ধন সরকার চালিয়েছেন। ইরাক আক্রমণের সময় বাম নেতা হরকিষেন সিং সুরজিতের সাথে আলোচনা করেছেন। তাঁদের মতামত নিয়ে আমেরিকার আবেদনে সাড়া না দিয়ে ইরাক আক্রমণে ভারতীয় সৈন্য পাঠান নি। শুধু বলেছিলেন সংসদের বাইরে আপনারা বিক্ষোভ করুন। একইভাবে, গুজরাত দাঙ্গা নিয়ে তদানীন্তন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীকে রাজধর্ম পালন করতে বলেছিলেন। সেটাও কম নয়। তাঁর মত ব্যক্তির এরকম একটা কথা ‘দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে’ কাঠগোড়ায় দাঁড় করাতে পারে। তবুও তিনি তা পরোয়া করেন নি। গুজরাত যান নি। ‘ চাহাতা থা লেকিন’ এর মধ্যে আঁটকে গিয়েছিলেন। সাংবাদিক ও পায়োনিয়ারের সম্পাদক বিনোদ মেহেতা তাঁকে দোষে গুনে ভরা রক্ত মাংসের মানুষ বলেছেন। তাঁর কাছে অটলজীর একিলিসিস হিলস গুলো ছিল পি এম ও অফিসের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন তাঁরাই। যার জেরে তিনি বাধ্য হয়ে অটলজীকে চিঠি লিখে মনে করিয়ে দেনঃ ইমার্জেন্সির সময় তাঁর প্রতি অন্যায়ের কথা। উত্তর পান নি। আউটলুক অফিসের এডিটর উপর অন্যায় ব্যবহার হয়। অফিস রেড হয়। শুধু মাত্র তহেলকা টেপে বংগালুরু লক্ষণের একটি মাত্র কথার সূত্রে খবরের জেরে!
অন্যদিকে দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনের অবসানের পর যখন সাউথ ব্লকের অফিসে ঢুকে তিনি দেখলেন তোষামোদিরা নেহেরুর প্রোট্রেট সরিয়ে দিয়েছেন। তখন তিনি বললেনঃ আই ওয়ান্ট ইট ব্যাক। এমন মানুষ ছিলেন তিনি। সাংবাদিক কিংশুক নাগ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেনঃ অটলজীর মধ্যে নেহেরু ও মোদীর কিছু গুণ দেখতে পাওয়া গেছে। যদিও তিনি আলাদাই। হয়ত নেহেরুর মত বাগ্মীতা তিনি দেখেছেন। যার জন্য নেহেরু তরুণ অটলজী সম্পর্কে একদিন ভবিষ্যতবানী করে বলেছিলেন, ওয়ান ডে দিস ইয়ং ম্যান উড বিকাম দ্য প্রাইম মিনিস্টার অফ ইন্ডিয়া। আর হয়ত সিদ্ধান্তের দৃঢতা দেখে মোদীর সাথে কোথাও মিল খুঁজে পেয়েছেন ওই সাংবাদিক। রিচার্ড নিক্সনের চাইনা ডিপ্লোম্যাসির মত পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফের দিকে হাত বাড়িয়েছেন তিনি। পারভেজ মুশারফের পিছনে ছুঁরি তাঁকে কোনদিন শান্তি প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত করতে পারে নি। ১৯৯৮ সালে পোখরানে পরমানু বোমা পরীক্ষণ ঘটেছে। আন্ত র্জাতিক স্তরে তাঁর প্রভাব সামলেছেন। যদি তাঁর রাজনৈতিক জীবন দেখা যায়, তিনি একজন আর এস এসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘে তাঁর যোগদান। পাঞ্চজন্য সাপ্তাহিক, মাসিক রাষ্ট্রধর্ম, বীর অর্জুন এবং স্বদেশের সম্পাদনা করেন। ১৯৫২ সালে রাজস্থানে শ্যামাপ্রসাদের সাথে যাওয়ার পর সেখানে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৫৩ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাথে কাশ্মীরে আমরণ অনশন করেন বহিরাগতদের জন্য পারমিট প্রথার বিরুদ্ধে। শ্যামাপ্রসাদ ওখানেই মারা যান। ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের বলরামপুর থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ১৩ দিনের প্রধান মন্ত্রী। তারপর ১৯৯৮-৯৯- ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী। এন ডি এ তে টিডিপির চন্দ্রবাবু নাইডুর মত ২৪টি ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলকে এক জায়গায় এনে ভারতীয় গনতন্ত্রের কত মজবুত ভিত্তি, তা দেখিয়েছেন। কিন্তু কিসের বলে, কেউ বলেছিল? বিজেপি অচ্ছুৎ নয়? তাঁকে দেখেই। কেউ মন্ত্রীত্ব নিলেন? ঘর করলেন? তিনি তো আর আর এস এসের সৈনিক। অটলজীর অন্তিম যাত্রায় চাঁদ সূর্য এক হওয়ার মত অলৌকিক ঘটনা ঘটল। সব ধর্ম মিলে মিশে গেল। মোদীজী হাঁটছিলেন। তিনি কী ভাবছিলেন ? তাঁর মনে কি রসায়ন চলছিল, কারো বোঝার উপায় নেই। তিনি কি ভাবছিলেন অটলজী কি করে জীবিত ও মৃত অবস্থায় বিপরীত মেরুকে একজায়গায় আনতে সক্ষম হলেন? মানুষ কি চাই? এটাই কি অটলজী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন না?
অটলজী দেশের প্রতি তাঁর অবদানের জন্য ২০১৫ তে ভারত রত্ন এবং তার আগে ১৯৯২ সালে পদ্ম বিভূষণ পেয়েছেন। আর এস এসের লোক হয়েও হিন্দুত্ব নয়, ভারতীয়ত্বকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তাই তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তার জমানায় ওল্ড অ্যাঙ্কাল সাম কেম দেয়ার ট্যু চেঞ্জ- শুনতে হয় নি কাউকে। কাজ করে দেখিয়েছেন। গঙ্গাকে পুজোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, নদীর সাথে নদীর যোগ, সড়ক যোগাযোগের কথা ভেবেছিলেন। অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ – এ গুড ম্যান ইন ব্যাড সাইড। আরও মারাত্মক অভিযোগ, ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনের সময় তিনি ও তাঁর দাদা প্রেম বাজপেয়ী ২৩ দিন জেল খাটার পর, কোন দিন ব্রিটিশ বিরোধী কাজ না করার মুচলেকা দিয়ে মুক্তি নেন। তখন বাজপেয়ীর বয়স ১৮। যে বামপহ্নী নেতা দেশদ্রীহিতার এই অভিযোগ করেন, তাঁর পুত্র কুমারলিংগম বিজেপিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রিত্ব নেন। তাঁর বোনও বিজেপিতে যোগ দেন। পাশাপাশি , এটাও অভিযোগ ওঠে, সেই মুচলেকা উর্দুতে লেখা এবং অটলজী উর্দু জানতেন না। কোনটা সত্যি ভবিষ্যত বলবে। আরেকটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। সত্যেন্দ্র দুবে কানপুর আই আই টির স্নাতক। ২০০২ সালে গ্র্যান্ড ট্রান্ক রোড প্রজেক্ট ডিরেক্টর ও দায়িত্বশীল ম্যানেজার। ঔরংগাবাদ -বারাছাট্টি সেকশন এন এইচ-২। কাজে ঢুকেই তিনি পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি ধরে ফেললেন। কন্ট্রাক্টরকে বাধ্য করালেন তিন ইন্জিনিয়ারকে সাসপেন্ড করাতে। ৬ কিমি রাস্তা নতুন করে নির্মাণ করতে বাধ্য করালেন। ফল মিলল হাতে নাতে। গয়া ট্রান্সফার করে দেওয়া হল তাঁকে। সেখানে ও রোড মাফিয়া। একই দুর্নীতি। সহ্য হল না। সরিসৃপ হতে পারলেন না। মানুষ তো ! আমরা না-মানুষের দল শুনবো কেন? স্বাক্ষরহীন চিঠির সাথে নিজের বায়োডাটা জুড়ে দেন। যাতে করে উড়ো চিঠি মনে না হয়। পাশাপাশি অনুরোধ করলেন, নাম গোপন রাখার জন্য। চিঠি বায়োডাটা সমেত বিভাগীয় দপ্তরে পাঠানো হল। কিছু গোপন থাকল না। মাফিয়ারা হুমকি দিতে থাকলেন। ভিজিলেন্স আধিকারিকরা তাঁকে ধমকাতে থাকলেন। বাধ্য হয়ে এন এইচ এম আই অধিকর্তার
জ্ঞাতার্থে চিঠি লিখে সব জানালেন। কাকস্য পরিবেদনা। অবশেষে ২৭ নভেম্বর ২০০৩ সাল বারানসির এক বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরছেন। ড্রাইভারকে বলা সত্ত্বেও গয়া স্টেশনে রাত্রি ৩টা নাগাদ এলেন না। রিক্সা করে ফিরছিলেন। গুলিবিদ্ধ দেহ পাওয়া গেল পরের দিন। গনতন্ত্রের দেশ সবার বিচার প্রাপ্য। ৩১ বছরের যুবক দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদীকে ইংরেজিতে হুইসেল ব্লোয়ার বলে। তিনি বিচার পেলেন সিবিআই আদালতে। গয়ার কাটারি গ্রামের মন্টু কুমার,উদয় কুমার, পিংক রবিদাস ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে তাঁকে নাকি খুন করেছিল। দুবের ভাই সিবিআই আদালতের রায় শুনে একটু ই বলেছিলেন, যাদের ধরা হয়েছে বা যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে তারা নির্দোষ। তাহলে দোষী কে? তাঁর সততার দাম দিতে অপারগতা কি চারিত্রিক হ্যামারসিয়া নয়? যা কাউকে ইতিহাসে ট্র্যাজিক হিরো বানাই! মনে পড়ে যায় এক উক্তি: Things without all remedy should be without regard: what's done is done. জানা নেই কোন অদৃশ্য পরামর্শের হাত ছিল এমন ঘটনা ঘটার পিছনে।
সমালোচনা তাঁর মৃত্যুতে থামবে না। কারন তিনি মহারথী ছিলেন। কবি ছিলেন। আরেক কবি ইকবালের সায়রিতেই এর জবাব দেওয়া যায়ঃ “ কোন অধিকারে ফেরেশতারা ইকবালের অতীতের ভুলগুলোর হিসেব লিখবে? ভুলগুলোর মাঝে আমি তো আজন্ম বন্দী হয়েই আছি”।
বিশিষ্ট সাংবাদিক কিংশুক নাগ বাজপেয়ীজী কে নিয়ে লেখা “অটল বিহারী বাজপেয়ীঃ আ ম্যান অফ অল সিজনজ”- বইয়ের পরতে পরতে তুলে ধরেছেন তাঁর চরিত্রের আরেকটি দিক। নাজুক মন। টাইম মেশিনে ধরা পড়েছে-- ‘ সেই সময় পাখীরাও ভালোবাসার কথা বলত না। ভঙ্গিতে প্রকাশ করত। চোখে প্রকাশ করত সেই ভাষা। কোন মুঠোফোন ছিল না। বিশিষ্ট সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারের কথায়—সে সময় মেয়েদের সঙ্গে ছেলেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করবে ভালো চোখে দেখা হত না। এক সুন্দর প্রেমের কাহিনী যা মর্যাদার সাথে চির গোপন ছিল। কিন্তু মৃত্যুর পাড় ভাঙা স্রোত বোধ হয় একুল দুকুল এক করে দিল। রাজকুমারী কউল যদি ক’বছর আগেই ক্যান্সারে মারা না যেতেন। হয়ত এই অমর প্রেম অতি পাষাণ হৃদয়ের চোখও ছাপিয়ে যেত! ১৯৪০ সালের কথা। ভিক্টোরিয়া কলেজ। বর্তমানে লক্ষ্মীবাই কলেজ। বন্ধুত্ব কখন প্রেমে পরিণত হয় বুঝতে পারেন নি দুজনেই। কিন্তু সাহস করে প্রেমপত্র লিখেছিলেন বাজপেয়ীজী। রাজকুমারী রাজী থাকলেও তাঁর পরিবারের আপত্তিতে প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় নি। দুঃখ পেয়েছিলেন অটল। আর বিয়ে করেন নি। তবে পরবর্তীতে কেউ প্রশ্ন করলে, স্মিত হাসিতে একটাই জবাব ছিল তাঁর সময় করে উঠতে পারে নি। সেজন্যই কি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ ছিল তাঁর প্রিয় উপন্যাস? প্রিন্সেসের বিয়ে হয় রামজাস কলেজের ফিলসফি বিভাগের প্রধান এবং হোস্টেল ওয়ার্ডেন ব্রিজ নারায়ন কউলের সাথে। সাংবাদিক গিরীশ নিকাম একবার এক সাক্ষাতকারে জানান, তখন অটলজী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। বাড়িতে ফোন করলে রেকর্ড থাকত। সেই রেকর্ডে একবার শোনা গেল, “ আমি মিসেস কউল , রাজ কুমারী কউল বলছিঃ আমরা চল্লিশ বৎসরের বেশী সময় ধরে একে অপরের বন্ধু!’ বি এন কাউলের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন অটলজী। দিল্লীতে লচেন বাংলোতে তাঁরা থাকতেন অটলজীর সাথে। প্রিন্সেসের মেয়ে নমিতাকে দত্তক নেন অটলজী। তারপর মেয়ে নমিতা ভট্টাচার্য এবং জামাতা রঞ্জন ভট্টাচার্য তাঁর সাথেই থাকতেন। শেষদিন পর্যন্ত তাঁরাই দেখাশোনা করতেন। যে সম্পর্কের নাম ছিল না কোন দিন। তবু কেন জানি না মনে পড়ে সপ্তপদীর মিস ব্রাউনকে। যাকে একদিন এমনিই ভালোবেসেছিলেন কৃষ্ণেন্দু। ঘটনার প্রেক্ষাপ্ট আলাদা। তবুও পরিচয় দিয়েছিলেন এক খ্রিস্টান চিকিৎসক বোমের আঘাতে আহত নার্সকে ‘স্ত্রী
বলেই। -- কেন এমন বললে? প্রশ্ন ছিল ব্রাউনের। এমন নাটকীয় মোড় রিয়েল আর রিলকে অনেক সময় এক বন্ধনীতে রাখে না। সেকারনেই, ‘মন হি মন রোতা হ্যায়’। তাই এই সম্পর্ক এত মিষ্টি! প্রশ্নাতীত!
দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার
রম্যরচনা:
দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার
এখন আর সেই দুটি গ্রাম না থাকলেও, আই ডোন্ট নোউ, কেউ বলে না। তবে পাড়ায় পাড়ায় লড়াই আছে। আছে থিমের লড়াই। দুগগা পুজোয় তার বাড় বাড়ন্ত! পুজোর কর্ম কর্তারা সদা ব্যস্ত যেন থিম কোন ভাবেই বাইরে বেরিয়ে না যায়। ন’পাড়ার দুগগা পুজোর থিম- দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি! একজন পরামর্শ দিতে গিয়ে বলল, লুচির আগে ‘ফুলকো’ যোগ করলে হয় না? পুজো কমিটির সেক্রেটারি কেলোদা বলে উঠল, না, তা হবে না! ৪০৭ মিনি ট্রাকের পেছনে “লুচির” আগে “ফুলকো” লেখা ছিল না!! তার মানে? মানেটা জানা গেল অন্তর্তদন্তের পর! রোড কালেকশনের সময় কমিটির বিশ্বস্ত সৈনিকদের নির্দেশ ছিল, চাঁদা তোলার সময় খেয়াল রাখতে হবে ৪০৭ গাড়ির পিছনে, কি লেখা আছে তা দেখার। চট পট তা লিখে ফেলতে হবে গোপনে, বিল বইয়ের পিছনে। কারন শত্রুর অভাব নেই। অনেক লেখাই নোট করেছিল তারা। তার মধ্যে বেছে নেওয়া হয়েছে – এই থিম-দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি! কিন্তু বেনে পাড়ার পুজো কমিটির মাথায় এই বুদ্ধি এলো কি করে? কেমনে ওরা পেরেছে সেটা জানতে? –দেশলাই কাঠির মত ফস করে জ্বলে বলে উঠল নেতাই, আমাদের মধ্যে কেউ ওদিকেও সিংকিং সিংকিং মানে ঢুকু ঢুকু করে। সবাই একবাক্যে সমর্থন করল। ওদিকে বেনেপাড়ার বুধুর হাতে যখন লিস্টি এল, সে বলল, একটাও ভালো না। এদের মগজে ঘিলু নেই। ব্যাটা আস্ত নিরেট। সাহস করে ন্যাদা বলল, কত থিম দিয়েছি— ‘৮০ বন্ধু আবার দেখা হবে’, ‘দেখলে হবে খরচা আছে’, ‘হিংসা করো না,তুমিও চেষ্টা করো’। বুধো রেগে বলল, এই এগুলো পুজোর থিম হয়? ৮০ বন্ধু? পুজোর আগেই আসি? লোকের মটকা গরম করার জন্য বলবো, ‘দেখলে হবে , খরচা আছে’? আর হিংসা করো না,তুমিও চেষ্টা করো’ – ওটা তো অনেকটা ‘ ওদের থিম—‘দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি’র মত। ভালো করে ওই মিনিট্রাকের পিছনে লেখাগুলো দেখ। এখনও সময় আছে। বস, গুনে গুনে একশ’টা মিনি ট্রাক দেখেছি, আবার?—হ্যাঁ- তাই, যাও, দূর হও এখান থেকে—বলে দাঁত মুখ খিচিঁয়ে উঠলো বুধো। আসলে পাড়ার প্রেস্টিজ, কে হ্যাম্পার করতে চাই! দেখবি আর জ্বলবি তো, লুচির মত ফুলবি—তো তাদের ইঙ্গিত করে বানানো থিম!! সেটা জানতে কারো বাকি নেই।।
পিচবোর্ডের সাহায্যে লুচির মত করে মণ্ডপের উপরটা সাজানো হয়েছে শ্রীশ্রী ন’পাড়া পুজো কমিটির মণ্ডপ। আর মণ্ডপের নিচের অংশটি অনেকটা উনুনের মত। লাইট ও সাউন্ডে মনে হচ্ছে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে।। কিন্তু আগুন তো জ্বলছে অন্যখানে। বেনে পাড়ার বুধো এন্ড কোংদের মনে!!! তাই খুশির অন্ত নেই ন’পাড়ার মনে। অবশ্য বেনে পাড়াও দিয়েছে মোক্ষম চাল। তাদের থিম—‘অতি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে ঝরে যাবে’। অর্থ যাই দাঁড়াক, ভুল যা হবে হোক, ‘ভেঙে ’ বাদ দিয়ে ‘ঝরে’ যোগ করে নতুনত্ব এনেছে থিমে। গাছপালা, আর ঝড়ের থিম বেড়ে হয়েছে ‘লাইট এন্ড সাউন্ড ইফেক্টে’।। দুই কমিটি পুজোর অনুষ্ঠান আপলোড করছে ফেস বুক পেজে। একদিকে কেলো আর অন্যদিকে বুধো ফরমান জারি করেছে—নো লাইক!! আত্মীয় স্বজনদের বলে দেওয়া হয়েছে একই কথা!! নবমীর সকালে বুধোর মটকা গরম, মণ্ডপের সামনে একজনকে ওয়ার্নিং দিয়ে বলছে, মানে বোঝ না? ‘দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি’র ? সেই নির্জীবজন মিন মিনে গলায় বলছে, আমি তো লাইক দিই নি। আমার ফুলদি লাইক দিয়ে কমেন্ট করে লিখেছে, পুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দারুণ হয়েছে। আমি কি করব? বুধো দ্বিগুন গলার আওয়াজ বাড়িয়ে বলে উঠল, এখুনি বল-লাইক তুলে নিতে। আর মেসেঞ্জারে আত্মীয়দের বল, কেউ যেন ন’পাড়ার কোন অনুষ্ঠানে ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’ না দেয়। শ্রীমান ফের আরেকটা ভুল করে ফেলল। বলল, আমি যেখানে নেই, সেখানে আমার কোন আত্মীয় অনুষ্ঠান ভালো লাগলেও ‘ লাইক’ দেবে না। কেবল, ফুল দি’ই যা ভুল করল।।---এ্যাঁ, অনুষ্ঠান ভালো হয়েছে? এত বড় আস্পর্ধা! ওরে ওকে এখান থেকে সরা। আমার মাথায় রক্ত উঠে গেছে!! কেউ একজন ফিস ফাস করে বলল, জব্বর থিম দিয়েছে—ন’পাড়া—দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি—হিঁ হিঁ, যাই বাড়িতে লুচি আর মটরের ঘুগনি খাইগে। আজ বোধ হয়, ফুলকো লুচি মুখে দেবে না বুধোদা! এই চুপ! চুপ! তারপর যে যেখানে যাওয়ার চলে গেল!! আগুন যা লাগার লেগেই গ্যাছে। যা ফোলার ফুলেই গ্যাছে।। এখন মারামারিতে কারো কপাল ফলা বাকি!!
দেউল সঙ্কট(অনুগল্পঃ) ঃ দেবশ্রী মজুমদার
সূত্রঃ “মোদের প্রাণের পূজার দেউলে তাহার প্রতিমা গড়ি/ চুয়া- চন্দন- গন্ধ বিলায়ে আমরা ঝরিয়া পড়ি ” – (নব নবীনের লাগি) জীবনানন্দ দাশ
অনুগল্পঃ
দেউল সঙ্কট ঃ দেবশ্রী মজুমদার
কি ছাইপাঁশ লেখ? বন্ধ কর এসব। এই বলে দরাম করে দরজা খুলে যেন এক দমকা হাওয়া হুড় মুড় করে আমার লেখার ঘরে ঢুকে পড়ল। আমি খুশি করার জন্য বললাম , আহা নীলাম্বরী শাড়িতে—থাক! নীলাম্বরীতে – মুখ বেঁকিয়ে গজ দন্ত বের করে নীলা বলল ঢের হয়েছে ! এবার তোমার নীলার কথা শোন! আর ওসব ছাইপাঁশ লিখো না! ওতে বেতো সমাজের বাতের ব্যথা ভালো হয় না। ওকে খুঁড়িয়ে চলতে দাও। তাহলে কি করব? – নীলা মানে আমার দমকা হাওয়া বলল , এখন লেখার নয়, দেখার যুগ, শুধু দেখে যাও। যদি তৈল মর্দন না পারো। অন্ততঃ চুপ থাক। এসব পটোল চেরা চোখ আর ন্যাকাপনা করে লিখো না তো। প্রতিবাদ করে লেখা তোমার মত পাতলা ধাতের লোকের কাছে প্রায়ই অসম্ভব। তবে ইনিয়ে বিনিয়ে লেখা, জাস্ট অসহ্য। তোমার মত লোকেদের ফ্রীতে একটা এডভাইজ দেব, নেবে? বললাম -জো হুকুম— নীলা গ্রীবা উঁচু করে একটু অবজ্ঞার হাসি হেসে বললে, তাহলে শোন , এসব করার চেয়ে, কিছু না করতে চাওয়াও অনেকটা চাওয়া! নীলা হাসলে গালে টোল পড়ে আর গজ দন্ত বেরিয়ে পড়ে। শুনেছি হাতির বাইরে দাঁতটা আসল নয়, ভিতরের টাই আসল। তাই সমঝে চলায় ভালো, বুঝে হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলালাম।
কিন্তু একটা গল্পের প্লট মাথায় ভুর ভুর করছে অনুভবের। টেবিলে খাতা পেন! ভারজিনিয়া উলফ তাঁর বাধা দূর করতে একবার ‘এঞ্জেল অভ দ্য হাউজ’কে খুন করেছিলেন। তাঁর কাছে এঞ্জেল ছিল লেখায় চিন্তনের বাধা। কিন্তু আমার চিন্তন যে চলমান এঞ্জেল । হা করলে, বুঝে নেয় ‘হাওড়া’ বলতে চাইছি। ঠিক সেই সময় নীলা এসে এক কাপ চা। আর এক বাটি খোসা ছাড়া ছোলা ভাজা এনে দিল। তারপর ভণিতা ছাড়াই শুরু করলঃ তুমি মন্দ লেখ না। কিন্তু কি জানো ওগুলো মনোরঞ্জনের পর্যায়ে পড়ে। তোমার ঘরের ছেলেকে যদি কেউ ডুবিয়ে মারে, তখন কি তোমার মনোরঞ্জন মনে ভিজবে? আমি বললাম, কখনই না! তারপর বলে চলল, দেখ হরিতারণ উচ্চবিদ্যালয়ের দু’দুটো তরতাজা বাচ্চা পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারাল। দুজন মায়ের কোল শূন্য হল। পুলিশ বলছে তারা গুলি করে নি। তাহলে, কে করল? এতো দেখি ভূতে বিশ্বাস হারানো শুধু পাপ নয়, মহাপাপ! জানি, তার শ্লেষটা অনেকেই 'ডাক' করবেন। তাই এসব এড়িয়ে -- আমি বললাম, হ্যাঁ টিভিতে শুনেছি। এক বহিরাগত ছাত্র কিছু সাম্প্রদায়িক শক্তির উসকানিতে একজন অন্য ভাষার শিক্ষককে যোগদান করতে দিতে না চাওয়ায়, ঘটনাস্থলে বিশাল পুলিশবাহিনী যায়। ছাত্রদের অবরোধ তুলতে খন্ডযুদ্ধ বাঁধে। পুলিশের গুলিতে দুজন ছাত্রের প্রাণ যায়। যদিও পুলিশ তা অস্বীকার করেছে। আমি বুঝেছিলাম নীলা নয়, এক মাতৃহৃদয় কথা গুলো বলেছে। আশ্বস্ত করতে চেয়ে বললাম, দেখ, এসব নিয়ে আমি লিখব না। কারণ একটা আছে। তুমি হয়ত ভাবছ, আমি ভীতু। সেটা ঠিক! টারগেট হয়ে যাব। সব কিছু বন্ধ হয়ে যাবে। লিখে যে কটা টাকা পাই তাও পাব না। তোমরা অসুবিধেয় পড়বে। এনিয়ে আমি যতটা ভাবিত, তার থেকেও বেশী ভাবিত মানুষের বুদ্ধি মিশ্রিত নির্বুদ্ধিতাকে নিয়ে। ইংরেজরা যাদের ওয়াইজেকার বলে। শুধু বুদ্ধিমান বা শুধু নির্বোধ হলে চলত। কিন্তু মিশেল আছে। --হাত ফাঁকা আছে? জিজ্ঞেস করলাম। নীলা বলল –হ্যাঁ। তাহলে একটা গল্প বলি তোমায়, বলে শুরু করল অনুভব। ঠিক গল্প নয়, ঘটনা। এখান থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো কিমি দূরে বনগাঁ সীমান্ত বলতে পারো। নদীয়া আর উত্তর চব্বিশ পরগণা দুটো জেলায় যেন আঁচল দিয়ে আগলে রেখেছে সিলিন্দা গ্রামকে। কারন কাছেই গোপাল নগর। উত্তর চব্বিশ পরগনার মধ্যে পড়ে। আর সিলিন্দা নদীয়ায়। বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শুনেছ নিশ্চয়। তাঁর গ্রাম। তাঁর লেখাতে ঠগীদের কাহিনী আছে। একটা সময় ওই সব এলাকা জঙ্গলে ভর্তি। পিছনে ইচ্ছেমতী নদী। আজ হয়ত মজে গেছে। তখন তার রূপ ছিল আলাদা। ওপার বাংলার কাঁটা তার পেরিয়ে বনগাঁ সীমান্ত হয়ে ওই জঙ্গল পেরোতে হত উদ্বাস্তুদের। দিনের বেলায় গা ছম ছম করত। ওই জঙ্গলে ঠগীদের কালী ছিল। যার পুজো সেরে তারা লোকেদের আক্রমণ করত। সব কিছু কেড়ে নিয়ে লাশ পানাপুকুরে পুঁতে দিত। এসব হামেশায় ঘটত। সেখানে ঘাঁটকল ঠগী ছিল। ওই জঙ্গলে ঘাঁটকল গাছের পাতা পাওয়া যেত। বেঁটে ভাতের সাথে উপাদেয় লাগত। একটু কুটকুটে তবে বেশ লাগত। ওই ঘাঁটকল ঠগীর ধারণা ছিল। সে কোন অন্যায় করে না। কারন তাঁর সাথে তাঁর মা কালী আছে। এদিকে যখন কাতারে কাতারে মানুষের ঢল ওপার থেকে এপারে আসছে। তখন কেউ হাতে পায়ে ধরে কারো পরিত্যক্ত ল্যাট্রিনে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানেই চলছে খাওয়া, ঘুমোনো সব। আবার কেউ খুঁজছে এদেশে তাদের আত্মীয়। কেউ কিছু সোনাদানা নিয়ে আসতে পেরেছে। সে এক ইতিহাস। অন্যদিন বলব। তবে যেটা ঘটল, সেটা হল ঘাঁটকল ঠগীর জীবনে এক অন্য মোড়। তাঁর ভাবনা, কেন যে মা আমার নাম ঘাঁট কল দিয়েছিলেন? এর থেকে গ্যাঁড়াকল দিলে বেশ হত। জঙ্গল আর থাকল না। জঙ্গল কেটে বসতি বসল। জঙ্গলের স্বঘোষিত রাজা ঘাঁটকল দোকান খুলে বসল। তার অসুবিধে হল না। কিন্তু পুরানো অভ্যেস। আর আরাধ্য দেবীর জন্য চিন্তা বাড়ল। এখন দেবীর অস্তিত্ব নিয়ে তাঁর ভাবনা! ঠগী কালী নামে খ্যাত এই কালী ও তাঁদের বাড়ি। এই কালী নিয়ে সে কি করবে? যাহোক একদিন রাত্রে স্বপ্নে ভক্তের সমাধান করেদিলেন দেবী। তিনি বললেন, আমাকে নিয়ে ভাবিস না। তুই বুড়ি গঙ্গায় আমায় ভাসিয়ে দে! আমার অস্তিত্ব আলাদা করে ছিল না। তোর চিন্তায় ভাবনায় নিজের মত করে তুই আমায় গড়েছিস। তুই যা ভেবেছিস। তাই করেছিস। যেহেতু তোর আত্মজা আমি, তাই আমিও কিছু বলি নি। যার এরকম অস্তিত্বই নেই, তার আবার সঙ্কট কি? তোর দোষ নেই, জন্মদাতারা তাঁদের সন্তান সন্ততিদের নিয়ে অনেক অহৈতুকি দেখায়। ভাবিস আমার অস্তিত্ব না টিকিয়ে রাখলে, তোদের কল্পনা বা ভাবনা বা বিশ্বাস সব মিথ্যে হয়ে যাবে। তা নয়। আর তাই আমার রূপ নিয়ে, উপাসনা নিয়ে কত ব্যাখ্যা তোরা করিস! তাই চেয়ে দেখ, দেশ দ্বিখন্ডিত হল। আবার ভাষা নিয়ে আন্দোলন করবে মানুষ, নতুন দেশ হবে। তাতেও থামবে না। ভাষা থেকে ধর্মের অস্তিত্ব নিয়ে প্রতিদিন ওই কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে মানুষ আসবে। হানাহানি হবে। তুই নির্বোধ! তুই বুঝবি, আমাকে বুড়ি গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আয় শীঘ্র। বিলম্ব করিস না! তোর নির্বুদ্ধিতায় বুদ্ধি মিশলে তুই আমাকে ফেলতে পারবি না। ঘাঁটকল কিছু বুঝুক আর না বুঝুক এটুকু বুঝতে পেরেছে যে দেবীকে ভাসিয়ে দিতে হবে। পরের দিন স্বপ্নকে সত্য ভেবেই রাত ভোরে ঘাঁটকলঠগী কালীকে বিসর্জন দিয়েছিল। তারপর তো একাত্তরের যুদ্ধে বাংলাদেশ তৈরী হল। সেসব তো তোমার জানা।দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীলা বললে, তোমাকেও নির্বোধ ভাবতাম। দেখছি তোমার মধ্যেও বুদ্ধি মিশেল আছে! এ্যাঁ—উচ্চারণটাও পুরো করতে দিল না, দরজাটা হাট করে খুলে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল নীলা।
লাইভ দুগগা- দেবশ্রী মজুমদার
রম্যরচনা:
লাইভ দুগগা- দেবশ্রী মজুমদার
লাইভ দুগগা- দেবশ্রী মজুমদার
আজ দশমী। এবার আমাদের পুজোর থিম লাইভ ঠাকুর। মোড়ের মিস্টির দোকানের ময়রা হয়েছিল গণেশ, বলিউডের স্বপ্নে বিভোর ঋত্মিক হয়েছিল কার্তিক, পাড়ার হার্টথ্রব চিনির বোন মিনি হয়েছিল সরস্বতী। লক্ষ্মী হয়েছিল দুলে পাড়ার টেপির মা সোহাগী। লক্ষ্মী নিয়ে হয়েছিল হৈ চৈ। সবাই চেয়েছিল দুলে পাড়ার সোনামণিকে। লক্ষ্মীর মত তার ছোট ছোট হাত পায়ের গড়ন। পাড়ার কাউন্সিলারের প্রধান চামচার বৌ মায় দুর্গা পর্যন্ত সোনামণির হয়ে বলতে গিয়ে ঘোল খেতে হয়। জানতে পেরে টেপির মা বাড়ি বয়ে দুর্গাকে এক হাত নিয়ে আসে। -- বলি কার ঘাড়ে ক’টা মাথা আছে যে আমার বদলে সোনামণিকে লক্ষ্মী করে? আইবুড়ো ধিঙ্গি মেয়ে লক্ষ্মী হবে? এবার শাস্ত্রীয় যুক্তি দিয়ে তাল ঠুকে বলল, সবাই জানে লক্ষ্মী নারায়ণের ঘরণী ছিল। আমি হাটে নয় একেবারে হার্টে হাড়ি ভেঙে দেব! মিনি কি করে বেড়াই আমি জানি না? আমি সবার---। রোসো, দেখি কি করা যায়— কুটনৈতিক ভাবে বললেন ভাবী দুগগা। রাগে গা রি রি করলেও, চুপ মেরে রইলেন। শুধু একটা খটকার কাঁটা – যাওয়ার সময় কী তাঁর সঙ্গে কাউন্সিলার পদাদার ইন্টু ফিন্টুকে ইঙ্গিত দিয়ে গেল? মরুক গে!!!
তখন পুজোর দু’মাস বাকি! মুৎসুদ্দি পাড়ার সাড়ে সতের পল্লীর সাজো সাজো রব! কাউন্সিলার পদাদার মত বেশ উদ্যোগ ছিল টপকাদার। টপকাদা এলাকার সেরা সন্তান মানে মস্তান আর কি! এখন মস্তানরা সবাই ধব ধবে পাঞ্জাবী পড়ে নেতা হতে চান। আর মাঝে মাঝে কালচারাল মুখ নিয়ে উঁচু করে জোড় হাত করেন! রবীন্দ্র জয়ন্তী, আর দুর্গা পুজোর মত উৎসব তো আছেই। প্রথমেই মোটা ডোনেশন। তারপর ফিতে কাটা। নাহলে একটা প্রেসিডেন্ট সেক্রেটারির পদ। টপকাদা কতজনকে টপকাতে টপকাতে টপকায় নি তার ইয়ত্তা নেই। সে নেহাতই তাঁর দয়ার শরীর তাই। এবার লাইভ পুজোতে টপকাদা হবে অসুর। পুজোর মিটিংয়ে বলেছিল, মাটির দুগগা হবে মাইরি! কোন ঝক্কি থাকবে না। কিন্তু পদাদা চাইল লাইভ দুগগা পুজো করে সেরা ট্রফিটা নিতে। টপকাদার খুব প্রেস্টিজে লাগছিল অসুর সেজে ‘মেয়েছেলের’ পায়ের নিচে বসতে। টপকাদা মহিলাদের মেয়েছেলে বলে। সবার সামনে বলে ফেলল সে-শালা কপাল মাইরি গনশার। মুখোশ পড়ে সিংহাসনে বসে থাকবে। সবাই হাসতেই, গণশা পঁচা ময়রা বলে উঠল—ইস এত সোজা! মু-মুখোস পড়লে নাক সুর সুর করবে না? দ-দম বন্ধ লা-লাগবে না? টপকাদা রেগেমেগে বলে উঠল- চোপ! একদম টপকে দেব শালা! গণেশ বাবাজীর তোতলামি সেরে আওয়াজ বেরুল – ঠিক আছে।
প্যান্ডেল বাথ বল ডান্স রুমের আদলে। ইতিমধ্যে ডেকোরেটার্সের মালিককে টপকাদা জানিয়ে গেছে—দুদিনের মধ্যে প্যান্ডেল ফিটিং চাই!কোন রিস্ক নেব না বস! দু’দুবার রিহার্সাল হয় পদাদার বাড়িতে। স্ট্রান্ড রোডের সেরা মাইম গাইড ট্রেনিং দিয়েছে সবাইকে। পার্ক সার্কাসের বিউটিশিয়ান মিস নিমকি সবাইকে সাজাবেন। হারবাল ম্যাসাজ ও নেচার কিওর হেয়ার স্পা মিলে সাতশ টাকার প্যাকেজ প্রত্যেকের জন্য। সরস্বতী আর দুর্গাকে এ’কদিন পাস্তার মত কনটিনেন্টাল খাবার খেতে মানা করা হয়েছিল। ওই কদিন সরস্বতী ডেটিংয়ে গেলেও, পাস্তা খায় নি। স্কিন থেরাপির ঝামেলা ভালোয় ভালোয় কাটলেও, সমস্যা হয়েছিল ড্রেস নিয়ে। বেঁকে বসেছিল সরস্বতী। কিছুতেই শাড়ি পড়বে না। শেষ মেশ পদাদা বললেন, দেখা যাক লোকে খায় কিনা?
প্যান্ডেলের সাথে খাপ খাইয়ে সরস্বতী পড়েছিল সাদা জিন্সের হট প্যান্ট ও ব্ল্যাক টপ। পায়ে রুপালি রঙের কাঁচের হিল তোলা স্টেনেটো জুতো। আঙুলে পিঙ্ক কালারের উপর সাদা ডিজাইন করা নেল পালিশ। পিঙ্ক লেন্স লাগানো চোখে আইকনিক সাদা কাজল। মাথার চুলের রঙ গার্ণিয়ারের ডার্ক ব্লু । কানে সাদা মেটাল টাপ। এক হাতে অফ হোয়াইট মেটাল পার্স। অন্যহাতে স্ক্রীন টাচ স্মার্ট ফোনের আদলে এক গীটার এবং পায়ের নিচে রোবট হাঁস। গায়ে ইয়ার্ডলি পারফিউম। তাল মিলিয়ে লক্ষ্মী পড়েছিল ভজগোবিন্দ ডালিয়া স্লিভলেস গাউন। ঠোঁটে স্কিন কালারের লিপস্টিক। গালে ল্যাক্মি ব্র্যান্ডের ব্লাশারের টাচে বেশ লাগছিল লক্ষ্মী ওরফে টেপির মাকে। তাই দেখে পাড়ার সোহাগীর তিন ছেলের বাপ মণ্ডপ থেকে সরে না। একমাত্র মা দুর্গা পড়েছিলেন শাড়ি। রানি কালারের নেটের শাড়ি সাথে ম্যাচিং করা ব্লাউজ। বীর দর্পে রোবটের সিংহের উপর বসে যেন উনার তিনাকে শাসাচ্ছেন আর কি! ঠিক পায়ের কাছে অসুর টপকাদা। বেড়ে হয়েছিল টপকাদার অসুর সাজা। মাথায় সেট ওয়েল জেল লাগিয়ে চুল হয়েছিল হানিসিং মার্কা। পড়নে সবুজ রঙের দুদিকে দড়ি বাঁধা ডিজাইনের বেলুন প্যান্ট, গায়ে হলুদ রঙের টি শার্ট, কানে ম্যাগনেট রিং, হাতে বাহুবলী -২ ব্রেসলেট। আর গায়ে গোল্ডি পারফিউম। পাড়ার ঋত্মিক সেজেছে কার্তিক। সাদা সেরোয়ানি ও নাগড়া জুতো। গালে গ্লোফেস আর জ্যাটাক বডি স্প্রে মিলে সব কিছুতে মানিয়েছে বেশ! কার্তিক হেব্বি মাঞ্জা দিয়েছে – বললে ঋত্মিকদের বাড়ির কাজের মেয়েটি চিন্টি। ঋত্মিকের অবসর প্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক বাবা, গিন্নীকে বললেন, তাহলে আর কি! তোমার ছেলে এবার ময়ুরের পিঠে চেপে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ উড়ুক। মুখ ঝামটা দিয়ে এল প্যাটার্নের অবয়ব করে উত্তর দিল গিন্নি—তোমার তো মুরোদ কিছু নেই। পদার পোঁ ধরে যদি উৎসব মুতসব করে নেতাদের নজরে পড়ে একটা চাকরী জোটাতে পারে! আরে তোমার ছেলের যা পকেটের ছিরি! যদি যুবশ্রী টুবোশ্রী একটা জুটোতে পারে তাতে ও তো কিছু হয়। এখন ওসব রামনবমী, হনুমান জয়ন্তী, আরো সব উৎসব কি যেন মাটি, গোবর, মেলা, খেলায় থাকতে হবে। কিছু না হলে সিনেমায় চান্স নেবে। পদা আছে তো। ‘---দেখ! কালো সাদা যুগের বাংলা সিনেমার ধন্যি মেয়ের গোবর্ধন মামার ইয়েস ম্যান বা স্ত্রী চরিত্রে নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের মত মুখব্যাদান করে বললেন, আমার তো ভরসা হয় না। দেখ স্পট বয় টয় হতে পারে! – উত্তর এল কর্তার।
গণেশের গোমড়া মুখ দেখার উপায় ছিল না ঠিকই, তবে পৈতে সার আদুল গায়ে আর সরু পাড়ের সেনগুপ্ত ধুতি পড়ে ওঁর মন ভালো ছিল না। যার যা বরাত! তাঁর শরীরের উইক পয়েন্ট সব থেকে নাকি বড় স্ট্রং পয়েন্ট। তাঁর ভুড়ির নাকি জুড়ি মেলা ভার। আর এটাই তাঁকে মর্মে বেঁধে। কারন বাকি গুণগুলোকে ছাপিয়ে গেল ওই বেআক্কেলে ভুড়িটাই!
ষষ্ঠির দিন পুজোর উদ্বোধন করলেন এলাকার বিধায়ক ঠনঠনিয়া আগরওয়াল। ঢাউস প্রজেক্টরে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত ভিড় দেখে পদাদার গোঁফের নিচে এক সুতো হাসি। সাতটা থেকে দশটা মোট চারটি শো। প্রতিটি শোর মাঝে আধ ঘণ্টা গ্যাপ। সেই সময় দুর্গার আর্থারাইটিসের ওষূধ, লক্ষ্মীর আদা দিয়ে চা খাওয়ার সময়। ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত দেখিয়ে একগাল হেসে টেঁপির বাবা যথারীতি আদা থ্যাতলানো চা দিয়ে গেছে। টেঁপির মা খোঁজ নিয়েছে টেঁপি, হুঁকো ও হোঁৎকাদের। শুধু একবার বলেছে – হ্যাঁগো শেষ পর্যন্ত পুরসভায় যে একজন করে কর্মী নেবে সেই শিকে টা এই অধম বিড়ালীনির ভাগ্যে ছিঁড়বে তো? কর্তা বললেন, -- পদাতো কথা দিয়েই দিয়েছে! চিন্তা করোনো! ফাটিয়ে লক্ষ্মীর পোজ দিয়ে যাও। আর হাত তুলে মানুষকে আশীর্ব্বাদ করে যাও। তোমাকে আঁটকায় কে? কিন্তু বাকি দেবদেবীদের দিকে ইশারা করে লক্ষ্মী আশঙ্কার ভ্রু তুলে বললেন, —ওঁরা কি ছাড়বে---। পারলে মোমেন্টাম গতিতে প্যান্ডেলের স্পর্শক বরাবর পালাতো লক্ষ্মীর নারায়ণ। কিন্তু চোক টিপে কেটে পড়ল! তিনি তো আবার জগতের পালনকর্তা। হাতে একদম সময় নেই!
দশমীর দিন বেজায় ঝামেলা। সূত্রপাত অবশ্য সপ্তমী থেকে। সরস্বতীর মোবাইল পার্স থেকেই ঘন ঘন মেসেজটোন দিচ্ছিল। অসুর এনিয়ে উচ্চবাচ্চ কিছু করে নি। ভাবটা এমন শোয়ের টি আর পি বাড়ছে! কিন্তু দশমীর দিন নখড়া পাড়ার চিন্টু মস্তান সরস্বতী মিনিকে সিটি মেরে ডাকতেই, দেবসেনাপতি কার্তিকের মটকা গরম। তাল ঠুকে অসুর বলল, সবকে বের করে দে। চিন্টুকে টপকাতে হবে। আমাদের সরস্বতীকে সিটি! প্রেস্টিজ ফাইটের ব্যাপার। আগে আসল ফাইটটা হোক, বলল দুগগা। কার্তিক বলল, শালা, কৃষের মত উড়ে গিয়ে চিন্টার জিল্পি ছিঁড়ে নেব! লক্ষ্মী ঝপাং করে সিংহাসন থেকে নেমে বলল, তোদের কিছু করতে হবে না! ফিল্মি ডায়ালগে মিঠুন শত্রুঘ্নকে এক হাঁড়িতে ঘেঁটে বলল, হাঁড়ি মাজা হাতের পাঁচ শিক্কার চড় মারব এখানে। লাশ পড়বে শ্মশানে। হুড়োহুড়ির মধ্যে এক পৌঢ ফস করে বলে উঠলেন—ছ্যা ছ্যা রামশ্চন্দ্র! এখানে কি কেউ আসে! অসুর চিৎকার করে উঠল, কে বল্লি রে কথাটা? একদম জিনটাক দিয়ে দেব দাদু! দাদু ভয়ে ভিড়ে এগিয়ে গেল। দুপুরের পাঁঠার মাংসটা হজম হয় নি তাঁর। চোঁয়া ঢেকুর উঠল দু’একবার। নিজের মনে বললেন, ভোজের আগে নয়, ঝামেলার আগেই পলায়ন করতে হবে। না হলে অসুরটা জিনটাক দিয়ে ডাক্তারি করবে! তখন মাইক হাতে পদাদা সবাইকে শান্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন। অন্যদিকে চিন্টু সটকেছে। মাইকে অসুর ও কার্তিককে বার বার নিজের জায়গায় ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। প্যান্ডেলে মিনি, সুড়ুক সুড়ুক করে কাঁদছে! তোতলা গণেশ বলে উঠল, কেসটা মাথায় ঢুকল না। রেগে মা দুর্গা বলে উঠল, এ্যাঁ! বড় সিদ্ধিদাতা গণেশের আমার! এজন্যই তোকে লোকে গোবর গণেশ বলে! পঁচা ময়রা মুখোশ তুলে আছাড় মেরে বলল, নে! হাতির মাথায়টা আর আস্ত রাখলাম না! আর তো গণেশ বলতে পারবি না! সরস্বতী এবার বলে উঠল, তোকে তবুও লোকে গোবর গণেশ বলেই ডাকবে!
স্বাধীনতা দেশবাসীর অলংকার: দেবশ্রী মজুমদার
রম্যরচনা:
স্বাধীনতা দেশবাসীর অলংকার: দেবশ্রী মজুমদার
মঙ্গলবার রাত। সকাল সকাল শুয়ে পড়েছি। রাত পেরোলেই আরেকটি স্বাধীনতা দিবস। মনে করছি ছোট বেলায় যখন বুড়ু, আকাল, সুখেন, পিন্টু, সন্দীপ, রাজীব, উৎপল, খোকন, পথু কাক ভোরে উঠে প্রশানদার সাথে গোটা গ্রাম পরিক্রমা করতাম। গলা মেলাতাম প্রসানদার সাথে-- নেতাজি তোমাই ভুলছি না ভুলব না। রক্তে লেখা দুটি নাম মাতঙ্গীনি, ক্ষুদিরাম। গ্রামের দত্তদের বরিষ্ঠ মহিলা যিনি আর বেঁচে নেই, তার কাছে শুনেছিলাম , ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাষ্ট কিভাবে গোটা গ্রাম ফেস্টুন আর পতাকায় সেজে ছিল। এই সব ভাবনা নিয়ে প্রাক স্বাধীনতার দিন টান টান উত্তেজনা নিয়ে শুয়ে ছিলাম। আবৃত্তির সুরে শুয়ে শুয়ে আওড়াচ্ছিলাম--- গোটা বিশ্ব যখন ঘুমিয়ে থাকবে, তখন মধ্য রাত্রের ঘন্টায় ভারত বর্ষ জেগে উঠবে প্রানে ও মুক্তির আস্বাদে অর্থাৎ স্বাধীনতায়। স্বাধীনতা! স্বাধীনতা নিয়ে লেখাটা তোমার চোখেও পড়েছে? বলে ভাত খাওয়ার পর এক টাকার আজোয়ান প্যাকেটের দুই তৃতীয়াংশ মুখে পুরে কাছে এসে বসল গিন্নি। ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের আশংকা জাগলো মনে। কাগজে পড়েছি আন্তর্জাতিক বর্ডারে এ রকম হয়ে থাকে। আমি বললুম, চোখে পড়বে মানে? এত মুখস্থ। মধ্য রাত্রে পার্লামেন্টে... সে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। নেহেরুজী আবেগ মথিত গলায় বলছেন। ভাবলে এখন ও গায়ে কাঁটা দেয়। কাঁটাটা দুহাত দিয়ে সরিয়ে খবরের কাগজে লেখা কি একটা দেখিয়ে বলল, আরে না-- সে সব কিছু না। ও: বলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম। কানে এলো, আমি বলছিলাম - স্বাধীনতা দেশবাসীর অলংকার! গিন্নির মুখে ঘটা করে দেশ প্রেম! ঠিক বিশ্বাস হল না। তাই জেগে আছি কিনা বুঝতে বিছানায় উঠে বসলাম। বললাম হঠাৎ কি হলো তোমার বলো তো? কাগজ টা হাতে ধরিয়ে একটা কলাম দেখাল-- লেখা আছে স্বাধীনতা দেশবাসীর অলংকার। আপনার জীবন শিল্প নৈপুণ্যে সাজিয়ে তুলতে আজই আসুন-- ৭২ তম স্বাধীনতা উপলক্ষে আমাদের গহনার দোকান শ্রীনিকেতন রোডে--বিশেষ ছাড়!! ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘড়িতে এখন কিছু বাজল না। যা বাজল আমার বুকে। বুকের মাঝে পেন্ডুলাম টা এদিক ওদিক করতে করতে কখন চোখ লেগে গেছিল জানি না।
দেখছি আমার মাতামহ ঈশ্বর অভয়া পদ ভট্টাচার্যের সাথে আমি মহাজাতি সদনের সামনে। প্রস্তর ফলকে সাল দেখলাম ১৯৩৯ সালের ১৯ অগাষ্ট। অনেককেই চিনি না। একজন বলছেন: বাঙালির বাহু ভারতের বাহুকে বল দিক। বাঙালির বাণী ভারতের বাণীকে সত্য করুক। ভারতের মুক্তি সাধনায় বাঙালি স্বৈর বুদ্ধিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোন কারণেই নিজেকে অকৃতকার্য না করে। দাদুকে জিগ্যেস করলাম উনি কে? দাদু কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে একে একে রবীন্দ্র নাথ, সুভাষ বসু সকলকে দূর থেকে চিনিয়ে দিলেন। পথে যেতে যেতে দাদুকে বললাম, আজ বাঙালির এত অপমান কেন? কোথাও জায়গা নেই কেন? যে সময়ে আমি নেই, সেই সময়ের কথা আমি বলতে পারি না। ওটা তোমাদের সময় বিচারের ভার তোমাদের।-- আজীবন কংগ্রেসের সৈনিক দাদু হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। মহাত্মা গান্ধী রোডে একা ঘুরছি তো ঘুরছি। যাহোক দাদুই আবার হাত ধরে টেনে নিয়ে বললেন, জানিস, সুভাষ বোস আর কংগ্রেসের সভাপতি নেই। বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ। ভালো লোক। কিন্তু দক্ষিণ লবির জন্য মাত্র ৪জন বামপন্থী নেতাকে জায়গা দেওয়া হলো না। তুই কিছুক্ষণ আগে বলছিলিস না। বাঙালির কথা? আমার মাঝে মধ্যে একজন লোকের উপর খুব রাগ হয়। কে দাদু? মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। উনি কংগ্রেস সভাপতির পদত্যাগ না করলে পরিস্থিতি আলাদা হত। হয়ত মুসলিম লীগের অস্তিত্ব থাকত না। ১৯৩৭ সালের প্রথম নির্বাচনে উত্তর প্রদেশ ও বোম্বাই ছাড়া সর্বত্র মুসলিম লীগ পর্যদুস্ত হয়। ওদের ইউ পি নেতা চৌধুরী খালিকজ্জামান ও নবাব ইসমাইল খান কংগ্রেসকে আবেদন করে ক্যাবিনেট মিশন প্লানে সহযোগিতা করতে ও অংশগ্রহণের আবেদন জানান। কিন্তু মিনিস্ট্রি তে ওই দুজনের মধ্যে একজনকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে বলে জওহর লাল নেহেরু তাঁদের চিঠি লিখে জানান। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে জিন্না ভারতে দ্বিজাতিতত্ত্ব খাড়া করে। আজাদ সভাপতি থাকলে এটা হত না। আরেকজন নেতাজি। ভারত বর্ষ অসাম্প্রদায়িক । নেতাজির গুরু যিনি স্বরাজ্য দলের প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন দাশ তিনি কোলকাতা কর্পোরেশনের এক আলোচনায় পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য তখন অধিক মাত্রায় সংরক্ষণের দাবি জানান। ওরা থাকলে লজিস্টিক্যালি হিন্দু মুসলিম বলে কিছু থাকত না। যেমন গুরু তেমন শিষ্য। ১৫ অগাষ্ট হওয়ায় আজ দেরী করে উঠেছি। গিন্নির স্থিতপ্রজ্ঞ অবস্থা। হাসি মুখে চিনি ছাড়া র চা দিয়ে জিগ্যেস করলেন ঠিক আছে তো? এর কি কোন উত্তর হয়? বললাম টেস্টি টেস্টি। তারপর গিন্নির ব্যবহারে বুঝলাম -- স্বাধীনতা কতটা দেশবাসীর অলংকার বুঝতে বুধবারের বিকেলে শ্রীনিকেতনের গহনার দোকানে আমাকে যেতেই হবে!!!
নির্বোধ-- দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা::
নির্বোধ-- দেবশ্রী মজুমদার
পূজা আর পূজিত
বোধ হয় এক নয়।
পূজার উপাচার চাই ই চাই
অন্যের সে বালাই নেই।
দৃষ্টি নন্দন ম্যারাপে
হাততালি তুমি পেতেই পারো
সে তো পূজা-ই!
কিন্তু যে নির্ভয়া ---
ভোরের আঙিনায় একান্তে
করপুটে শিউলি ফুলের ঘ্রাণ নেয় প্রাণ ভরে--?
সে পূজা আর পূজিতা দুটোই।
তবু ও জানার প্রয়োজন নেই
কেন তার নাসিকা তিল ফুলের মত হতেই
হবে...উরু হবে কদলী বৃক্ষের মত পেলব মসৃন।
গালের রঙ দাড়িম্ব ফলের মত না হলেও চলবে,
তবে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল রং না হলে নৈব নৈব চ।
তার পর নটে গাছটি মুড়োবে!
সেই শার্দুল চোখ ধারালো নখ দন্তে ছিঁড়বে
ফুলের নাল! তবু পূজা হবে তোমার, অঞ্জলী
করপুটে!
আমার তর্জনী তুলি নি তোমার দিকে। তুমি
সংস্থিত কোথায় তা জানার অবকাশ নেই আজ!
বড় ব্যস্ত !বড় ব্যস্ত!
তবু বলব কেমন তর যেন - যখন শুধু পূজা হয়!
পূজিত হওয়াটা আর হয়ে ওঠে না।
মিলিয়ে যায় হাওয়ায় হাওয়ায়!!!
স্যান্টা হন্যে : দেবশ্রী মজুমদার
স্যান্টা হন্যে(অনুগল্প) : দেবশ্রী মজুমদার
স্পেশাল চা শুনেছেন। মন্টুদা পরলোকগত হওয়ার পর, মন্টু দার ছেলে চালু করেছে স্পেশাল চা। খদ্দের ভালো খেয়েছে কথাটা--ইস্পেশাল চা! হিরন্ময় গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে হিরুদা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন সান্টাকে, এই স্যান্টা ! ইস্পেশাল কি রে! সান্টার স্মার্ট রিপ্লাই- ও তুমি বুঝবে না! খাও তো বুঝবে!--দে তাহলে! দেখি একবার। সুর করে চুমুক দিতে শুরু করেছিল সবেমাত্র! মাঝখানে কেটে গেল সুরটা। হ্যারে স্যান্টা চা তো সেই একই, স্পেশালিটি কোথায়? এবার স্যান্টা কাছে এসে বলল, কিছু তো একটা আছে, তুমি ধরতে পারো নি! ইসস্পেশাল হওয়ার জন্য অতিরিক্ত এক টাকা নগদ নারায়ণ দিয়ে হিরুদা ক্ষুন্ন মনে অনেক দ্বিধা নিয়ে পরের ট্রিপের টিউশনে গেল।
হিরুদার একটু পরিচয় দেওয়া ভালো। নিপাট ভদ্রলোক। কপট না হওয়ায় কপাট অর্থাৎ কপোল কপাট কোনদিন খোলে নি তাঁর। স্থানীয় স্কুলে চাকরি হওয়ার মুখে আঁটকে যায়। অনেকেই দুঃখ ও সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেছিলেন, দুঃখ করো না। সবই ভবিতব্য বুঝলে! একটা স্পেশাল কেসের জন্য, এক্সপার্ট আরেকজনকে বেশি নাম্বার দিতে বাধ্য হল। তাঁরও যে খারাপ লাগে নি তা নয়। কিন্তু পার্টির বিরুদ্ধে যাবে কে? কার ঘাড়ে কটা মাথা! সেই একই রকম অঙ্কের উত্তর না মিললে যেমন মুখ হয়, তেমনি মুখ করে বাড়ি ফিরেছিলেন হিরন্ময় গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে হিরুদা।
হিরু দা ইংরেজিতে সাম্মানিক ও স্নাতকোত্তর। ইংরেজিটা শিখেছিলেন বাবার কাছেই। গানের গলাটাও চমৎকার। কিন্তু ওইটিকেই অপব্যবহার করতে শুরু করল সুযোগ সন্ধানীরা!! প্রচার শুরু হয়েছিল এমন ভাবে, লোকে বুঝল --- যে খায়, সে ঘুমায় না। যে ঘুমায়, সে খায় না। এই প্রচারে ক্ষতি তো যা হবার হলো! নিয়তিঃ কেন বাধ্যতে!
অনুষ্কাদের বাড়িতে পা দিয়েই হিরু দার অস্বাভাবিক একটু ঠেকল। অনুষ্কার অন্য এক স্যর নাকি তাকে এক্সট্রা ডেট দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কী বা বলার আছে? যাওয়ার আগে অনু খুব করুন মুখে -- আসছি স্যর বলে গেল। ওর মুখটা খুব ভার লাগলো। অনু ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রী । খুব যত্ন করে তৈরি করেছেন হিরু দা। খুব জেদী ছিল। পড়তে চাইতো না। ইংরেজি তো না। ওর ইংরেজির উপর বিদ্বেষ, স্বদেশীদের ইংরেজ বিদ্বেষকে ও ছাড়িয়ে যেত। সেই ইংরেজি এখন তার প্রধান বিষয়। তার জন্য অভিভাবকের কাছে প্রশংসিত হয়েছেন তিনি। মেয়েকে পৌঁছে দিয়ে কর্তা ফিরলেন। তার পর গিন্নিকে নিয়ে সোফার উল্টো দিকে বসে গৌর চন্দ্রিকায় কর্তা গিন্নি এক বাক্যে স্বীকার করে জানালেন--- তাঁর জন্যই মেয়ের রেজাল্ট ভাল তাই নয়, অষ্টম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ার এত আগ্রহ। তার পর আসল কথাটা পাড়লেন-- অনন্ত স্যর ইংরেজির স্পেশাল ক্লাস শুরু করেছেন। ব্যাচে ৫০ জন পড়ে। অনেকের অসুবিধা তাই একটা স্পেশাল ক্লাস শুরু করেছেন। তাই --- আর বাকিটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় হিরু দার। মনটা খারাপ হয়ে গেল। বার বার মনে পড়ছে ছাত্রীর কথা। কটা টাকা গেল ঠিকই!!! কিন্তু খুব স্নেহ করতেন। সেটা তো কোন দিন যাবার নয়। হিরু দার একটা সমস্যা। কিছু তেই বোঝে না, যার টিউশন ফিজ যত কম তার দাম তত কম। এনিয়ে স্ত্রীর সাথে তার বহুবার মতান্তর হয়েছে। তাঁকে রেট নিয়ে বললে , তাঁর একটাই উত্তর: আই ডোন্ট অন্ট ট্যু বি ওউভাররেটিড। বোঝ ঠ্যালা!
আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল হিরু দা। ফিরেই পুরানো হারমোনিয়ামটা নিয়ে বসলেন। গিন্নি বললো, ছেলেটাকে নিয়ে বসো একটু! হিরুদা বলল, দাঁড়াও! বাঁচার একটু রসদ নিয়ে নিই। তার পর ধরল--- সবাই তো সুখী হতে চায়, তবু কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না।
রাত্রে গিন্নি প্রেম পত্র দেওয়ার মতো করে একটা কাগজ তার হাতে গুঁজে দিল। কি এটা? পড়ে দেখো। ঠিক আছে- বলে পকেটে পুরে রাখল সে। পরের দিন সকালে বাড়ি থেকে এক পা বেড়িয়ে সাইকেলে চাপার আগে পকেট থেকে বের করে চশমাটা চোখে নেওয়ার আগে টুক করে টুক কাগজটা পকেট থেকে পড়ে গেল মাটিতে। চশমাটা পরে পড়তে শুরু করল সে...
শোন, জানি , কিছু একটা হয়েছে। মন খারাপ করো না। আমরা সুখেই আছি। আমার পায়ের গোড়ালিটা বড্ড ফেটেছে। একটা ছোট্ট ভেসলিন এনো। ছেলের জন্য একটাকা দামের পাঁচটি চকোলেট এনো। বাড়িতে ছেঁড়া মোজা আছে । সেখানে ভরে ছেলের মাথার কাছে রেখে দেব । কাল ২৪ ডিসেম্বর। পড়শু সকালে কিন্তু লাগবে! ভুলো না। আমারটা হাতেই দিও! তুমিই তো আমার স্বপ্নের সান্তা ক্লজ। যাকে এই দিন টিতে স্বপ্নে দেখতাম। আমার সান্তা--স্যান্টা !!!
হিরু দার চশমাটা খুলে একবার মুছে নিল। --না আর কিছু লেখা নেই। হাতে আর সময় নেই। গানের বাইরে নতুন করে জীবনের রসদের সন্ধান পেলে যেন! হন্যে হয়ে স্যান্টা বেরোল ক্রিসমাস ইভে।
হারিয়ে গেল ছোট্ট বিভাস!—দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা::
হারিয়ে গেল ছোট্ট বিভাস!—দেবশ্রী মজুমদার
চালাও শ্লোগান
বাজুক ঝাপান!
দয় (দোহাই) দয়, কার দয়
মানুষের দোহাই! মানুষের দোহাই।
কেউ দেখেনি, বিভাস কোথায়?
কেউ শোনে নি, কে ডাকে বিভাস!
বিভাস! ও বিভাস! গন্ধ নাকে
পোড়া বাতাস! ছিন্ন দেহে,
দেহ খোঁজে আপন গেহে
লুটাইয়ে তরাস!
গন্ধ বারুদ, তিক্ত বাতাস
বয় না সুবাস,
বয় না সুবাস।
বছর আটেক
বুকের খাঁচায়
অচিন লালন
হয় নি পালন।।
সকল বিভাস
জলের বোতল
স্কুলের ব্যাগে
গন্ধ জাগে, গন্ধ জাগে!!
বড্ড জ্বালা গুমোট চাপে
বুকের মাঝে? ছোট্ট বিভাস!
বিশ্ব এখন হাত জোড়া
পাই গো দেখা-
নাগের বাজার।
কাজি পাড়ায় বন্ধ বস্তা
জন্ম দিনের আসর জমায়
পোড়া বারুদ, মিস্টি হাতে
ছোট্ট বিভাস, ছুটতে গিয়ে
থমকে দাঁড়ায় , থমকে যায়!
কি চাই নি, কি চেয়েছি?
কি দিয়েছি ? ছোট্ট আকাশ!
আমার বাছা! ছোট্ট বিভাস!
হুরোল বানে, হাপুর গানে
হারিয়ে গেল, ছোট্ট বিভাস।
দান্তেওয়াড়া সবুজ যখন--দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা::
দান্তেওয়াড়া সবুজ যখন--দেবশ্রী মজুমদার
দান্তেওয়াড়া সবুজ যখন
লালের থেকেও অবুঝ
তখন সবুজে বেয়ারা
দান্তে ওয়াড়া-----
মহুয়া সবুজে সবুজ।
গুলি ছুটে কানকো পাশে
হলুদ বারুদ গন্ধ বাসে
কথা ফুরায় আসি ----
মা তোরে, বড্ড ভালোবাসি।।
হাজারো মাইল চড়াই উড়ে
দান্তে থেকে অনেকে দূরে
গোলাপে রঙিন
পাহাড়ী জমিন
রক্ত ক্ষরণে অবুঝ
দান্তেওয়াড়া কী সবুজ!
মাটির স্বর্গ গভীর খাদে
যত যে তরুণ আর্তনাদে
চোয়াল জোড়ে
শক্ত করে
দাফনের জানাযে।
চিনে নাও সে তোমার খোঁজে
তোমার মায়ের চক্ষু ভিজে
মৃত্যু ফলকে জীবন খোঁজে
সবার সাহু -----যে।।
তোমার ঘরে আগুন: দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা::
ধর্মান্ধতা প্ররোচিত দাঙ্গাদীর্ণ মানুষের উদ্দেশ্যে:
তোমার ঘরে আগুন: দেবশ্রী মজুমদার
আমার ঘরে শুয়োরানি
শীতলপাটি ঘুম
তোমার ঘরে দুয়োরানি
জেগে থাকার ধুম।।
আমার ঘরে আলোর বান
আকাশ জুড়ে ফাগুন
তোমার ঘরে রক্ত স্নান
বাহিরে ভিতর আগুন।
আমার ঘরে তো লাগে নি আগুন
আমি তবে কেন? আপনি শুধু জাগুন!
আমার তো বেশ ঘুম পেয়েছে
মাথার নিচে ঘাস
মাথার 'পরে নীল নভো মেঘ
হরিণ বারোমাস
কোজাগরী চাঁদ জেগেছে
রাতের 'পরে রাত
উঠোন জুড়ে ছড়িয়ে আছে
সিড়ি ধানের ভাত।
চাঁদের গায়ে চাঁদের চুমু
যখন ডুবু ডুবু
তোমার ঘরে তখন আগুন
ভাঙা হাঁড়ি কুড়ি।
চোখের জলে ভাসে বুঝি
চাঁদের গায়ে বুড়ি?
আমার উঠোন যোবন জুড়ে
তুমি তো থুথ্থুরি
তোমায় নিয়ে গাঙুর হাসে
হাসে ফটিকছড়ি।
আমার ঘরে তখন ফাগুন
তোমার ঘরে আগুন
আমার ঘরে দু'চোখ পাতা
আমার রজনীর
তোমার ঘর হয়তো যেথা
মুক্ত পঞ্চ--বেণীর।।
না, বলিনি: দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা::
না, বলিনি: দেবশ্রী মজুমদার
চোখের ডাকে চোখ
জিগাই যখন
বলুন, দাদা, বলুন?
দাদার পকেটে খোপ
বলছে চোপ চোপ
চল্লিশে কিলো
খেলো না খেলো
আহা! পটোল চেরা চোখ!
দাদা, পাঁচশ, দিই!
পাঁকাল মাছের গতর
চোখ নামিয়ে স্বতর
চুপ পিছটান নিই।
রূপালী প্রেমে ভাঁপা
থাক না বুকে চাপা।
কিছু তো বলো!!!
অর্ধস্ফুট ঠোঁটে
না বলা কথা ছোটে
তখন ও গোলাপ খুঁটে
বলি নি মুখ ফুটে--
আজ ও নিশ্চুপ বেবাক,
রোদে পুড়ে সব খাঁক
বয়সে বেড়েছে গ্লানি।
কিছু তো বলুন
জিগাও যখন---
তখন ও আমি মানি,
বুলেটে, বুটে, লুঠে
ছাত্ররা মরে ছুটে
লাশ তবে খাক লাশ
সবাই যখন চাস
গাছের গোড়াটা যাক
হুজুরের হুড়ো হাঁক
পিপু ফিশু ছিল, থাক।
পিপু ফিশু সুখে থাক!!
জয় শ্রী রাম--দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা::
জয় শ্রী রাম--দেবশ্রী মজুমদার
রাম, দুই, তিন
ফের বোল! রাম...
ক'বার? বল ধিন!
বলবো না, তুই থাম!
আবুলিস! রাম, দুই, সাড়ে তিন
অমাবস্যার ঘোড়ার ডিম!
ফের বোল ! আবুলিস!
বোলবোনা ফের! তুই বলিস!
সেরের মাপেও ছিল রাম
খেলার মোরেও সেই রাম!
ঝগড়া ছিল, রাকারাও ...
হয়ত তাও না, গা-ঝাড়াও...
ছিল ক্ষোভ, দুঃখ ; গা রি- রি
দেখি নাই কই, ঘেয়ো টিটকিরি!
ছিল ক্ষোভ, দুঃখ; ছিল তব নাম!
এখন সব অন্তর্লীন, শুধু-হা রাম!!
কনকাঞ্জলি:: দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা:কনকাঞ্জলি:: দেবশ্রী মজুমদার
ভেবেছিলাম হলুদ পাখিটি হয়ত পরিযায়ী।
নেহাতই বহিরাগত! এক মুখ নিকষ কালো
লোম। গা'টা হলদে। তা বেশ! কর্কশ গলা!
বসন্তের প্রতিশ্রুতি না পরাভৃত? কি নিদারুন
আক্রোশে ধ্বংস করছিল--বর্ণমালার সব
অক্ষরগুলো!!
মন বললে, আরে ! ওকে তো চিনি। ওদের তো
চিনি! ওরা সব শেষ করে দেবে! ওরা-ওরা বিচ্ছু!
ওরা বাংলার পঙ্গপাল!
দু'দিন ধরে চলল জহ্লাদ জল্পনা! তার ইতিহাস!
কিন্তু কই সেই হলুদ পাখি?
ওস্তাদ এল সরেজমিনে। কার গলা এত কর্কশ!
সব তদন্ত হবে এবার! সুর, তাল, লয়, ছন্দ সব
মাপা হবে নিত্তি ধরে। কিন্তু যাদের আপত্তি ছিল-
মূলত নির্মল মলয় বাতাস, ছোট ছোট ফুল,
পাতা, গন্ধ মিশে সে এক অনমনীয় স্থিত প্রজ্ঞ
প্রকৃতি। তাঁর সেই বিস্তৃত ললাট অসন্তোষের
সকরুন অভিব্যক্তি নিয়ে চেয়ে রইল। এই তো
সেই হলুদ পাখি! ওস্তাদ! ও ওস্তাদ! তোমার
পেছনে কে? মুখমণ্ডল তার কপোতাক্ষ নদীর মত
স্থির! উদ্বেগ হীন। ঘন কালো--- থাক! জমে
থাকা গুমোট অভিমান, বৃষ্টি হয়ে নামবে এখন!!
স্বভাব প্রকৃতি থাক না বাকরুদ্ধ!! বিদায় দিয়েছি
তোমায় অনেক আগেই। দিয়েছি কনকাঞ্জলি!!
সমীকরণ: দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা: সমীকরণ: দেবশ্রী মজুমদার
ধর, আমার নাম এক্স
তোমার নাম ওয়াই--
সন্তান সন্ততি ডব্লিউ জেড!
তুমি, বলবে, মাথাটা গেছে
আর কী বলবে, তাও জানি যে!
কুড়ি বছর ছাত্তর পড়ালে গাধা হয় সে!
বিশ্বাস করো আর না করো--
প্রশ্নগুলো ছা পাড়ে মগজে
যদি, তুমি হতে এক্স
আমি ওয়াই, আর ছেলে পুলে
ডব্লিউ, জেড-
তাহলে কী মন্দিরে ঘণ্টা বাজতো না? হত না পূজা পাঠ?
কিম্বা মসজিদে দোয়া? আনন্দ কী নিলম্বিত ?
উঁচু মাথা হেঁট?
কে যেন সাগর পাড়ে ফেরি করে-
নামে কী যায় আসে!
আরেকজন এপাড়ে চেতনায়
রাঙায় আমি!
সে চেষ্টা তবে কী ?
পাকা আমি...
সমীকরণের প্রথম শর্ত
তার পরে দ্বিতীয় শর্ত
কাটা কুটি গুণ করে
একটার মান পেলেই
দ্বিতীয়টি পায়ে পায়ে গুটি গুটি!
এভাবেই ভুল পথে তবে ছুটি!
ভেবে দেখো, বন্ধু! খুব কী হতো ক্ষতি?
যদি হাত হতো, প্রশস্ত উদার--
সন্নিপাতে হৃদয়ে হৃদয়, নাম হীন সাথী!!
সলিলে করিহ নিমগন-- দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা: সলিলে করিহ নিমগন-- দেবশ্রী মজুমদার
এ পুত ভূমি, পুণ্য গেহ
রক্ত রুধির রিক্ত কেহ!
রক্ত নেবে, রক্ত কেহ?
মাথায় লাঠি, রক্ত প্লব;
রক্ত চেনা মাথা জানে
মরুস্থলী কোথায় টানে-
রক্তে নিতে আজ্ঞাবহ!
বাঁশ উঁচিয়ে কোন উজানে!
সাচী কিম্বা পরিবহ-
যাই না কেনা কোন খানে!
রক্তে ভাসি রক্ত ত্রাসে
এরাই ছোটে, এরাই পাশে!
অত আঘাত পারো কী
ভাঙতে তাদের করোটি
নিত্যনিতি কবর খুঁড়ে
খোবলা করে মা ও মাটি!
মূর্তি ভাঙো, সে তো মৃন্ময়ী- দেবশ্রী মজুমদার
বাংলাদেশের বন্ধুদের জন্য: কবিতা:
মূর্তি ভাঙো, সে তো মৃন্ময়ী- দেবশ্রী মজুমদার
তুমি যেই হও বিশ্বাসী কিম্বা অবিশ্বাসী
ভাঙো মূর্তি, সে তো মৃন্ময়ী
যদি সহোদর না হও, যদি ভুলে যাও
তুমি কোন জনমের ভ্রাতা ভগিনী মোর...
ভুলোনা অনেকের বুকে জেগে তোর
আলপনা হয়ে শিউলি ভোর
উমা শুধু দেবী নয়, ঘরের মেয়ে
শাপলা হাতে
শ্যামল বরণ
সোনার গা'তে
যে না হিন্দু, না অহিন্দু
তোরই দোরে
সাঁঝ পেরিয়ে আঁচল ভোর।
যতই গড়ো ক্রীড়নক
মুর্খ পুরুষ, চাও সম্ভোগ
ত্রস্ত হবে কীর্তিনাশায়--
যতই তুমি ব্যস্ত থাক
ধ্বংস নেশায়--
এপার কিম্বা ওপার
গঙ্গা কিম্বা মেঘনা
ধর্ম ধ্বজায় ঢাকো মুখ
ইতিহাস তো ছাড়েনা
লাগাবে চাবুক
পেতে রেখো বুক
ইতিহাস হবে
ইতিহাসেই লুকোবে মুখ।।
ভাষা বনাম ধর্ম- দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা:: ভাষা বনাম ধর্ম- দেবশ্রী মজুমদার
ভাষা? তুমি হিন্দু না মুসলিম?
লাশ? তুমি হিন্দু না মুসলিম?
ভাষা আর লাশের যুদ্ধে
শেষ রক্ত হাড় হিম।
ভাষা জানে সংস্কৃত আরবী
উর্দু ও একটা ভাষা
প্রশ্ন করে নিজেকে
ভাই তবে কোথা থাকবি?
সংস্কৃত আজ মৃত ভাষা
কে করেছে খুন?
না হিন্দু না মুসলিম, ভাবুন!
এখনও ভাবুন, ভাবুন।।
ভাষা যদি হয় আগে ধর্ম
ভাষা যদি হয় রাষ্ট্র বর্ম
তবে ইশারায় কথা বলো
ধর্ম যদি হয় গুমোট
শুধু সূক্ত সূরার বুনোট
তবে হবেই ফের ভাগ
টুকরো দেশ,আগে ধর্ম
একটাই বাণী- যাক যেখানে যাক
এখন তো সব ভাগ, শুধু ভাগ।
দুচোখ জোড়া অন্ধ:: দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা: দুচোখ জোড়া অন্ধ:: দেবশ্রী মজুমদার
যারা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছিলে
তারা ছিল অন্ধ।
তাই তাঁকে চেনা না চেনার প্রশ্নই ওঠে না!!
যারা সুকান্তের মূর্তি ভাঙো তারাও জন্মান্ধ!
তাই তাঁকেও চেনা বা না চেনা
গবাদি হাটে বিক্রেতা খোঁজার মত!
যে ক্রমাগত দড় কঞ্চি অগ্রে সুক্ষ লৌহ শলাকায়
রক্তাক্ত করে সব অবিরত!
সে যেই মূর্তি ভাঙো লেলিন কিম্বা কাস্ত্রো
হাতে লাঠি, মাথায় ফেট্টি, হাতে শানিত অস্ত্র।
সে যেই মূর্তি ভাঙো এপারে কিম্বা ওপারে
সে গ্রীক কিম্বা বৌদ্ধ
তোমরা তো আজ বীর নখ দন্ত লব্ধ।
এখানে মুখ ও মুখোশ এক!
তাই বীর সিংহের সিংহ শিশু দেখ,
গড়ায় ভূতলে লুন্ঠিত!
এবাংলায় মিছিল হয়, মিছিল হবে
বিদ্যাসাগরের মূর্তি সেতো
আজ কিম্বা কাল লাঞ্ছিত, প্রতিনিয়ত।
মিটিং কিম্বা মিছিলে, যে ভাষা কপচাই!
সে তো দেয়, নিজের পরিচয়-
কোথায়, কবে সেই বর্ণ পরিচয়?
স্কুল যেখানে বন্ধ
সেখানে কী নয় অবরূদ্ধ?
হে বিদ্যাসাগর করুনা করো
জেনো, মূর্তি তোমার দলিত
যখন প্রতিদিন তুমি লাঞ্ছিত!!!
প্রাগৈতিহাসিক: দেবশ্রী মজুমদার
মানববোমায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধায়:::
কবিতা:প্রাগৈতিহাসিক: দেবশ্রী মজুমদার
হে নারী! যদি তোমার হৃদয়
এ হিরণ্যগর্ভ অন্ধকারময়!
হে পুরুষ! যদি তোমার উষ্ণ শোণিত---
ভুলে যায় হিত অহিত!
সে স্রোত বইতে থাকে অন্য খাতে-
হে পুরুষপাঞ্জা! সে কোন অন্য রাতে!
হে ধর্ম! যদি সংখ্যায় বড়
তবে মানুষ!প্রাগৈতিহাসিকে ফেরো।
যখন ছিল দীর্ঘ নখর, ছিল দীর্ঘ শ্মশ্রু
তবুও ছিল না এত রক্ত, এত অশ্রু!
হে ধর্ম ! তুমি জনবিন্যাসে বিশ্বাসী
তুমিই বিশ্বে আগ্রাসী!
বুকে পিঠে মাথায়
যত বাণী ঘোরায়
তোমার সেই
কেল্লা ফতে চাই!
শুধু সংখ্যা বাড়াও, সংখ্যা বড়াই!
তাই ধর্ম আজ নয়ত বর্ম
ধর্ম বিজয় কেতন!
ধর্ম শুধু রাজনীতি তাই
ক্যাডার পোষ্য মর্ম।
তাই ধর্ম আজ নয়ত বর্ম।।
ধর্ম ছিল ধর্ম চেতন।
ধর্ম কেন বিজয় কেতন?
ধর্ম এখন বারুদ জমা
মানব দেহ মানব বোমা।
এ ধর্ম যদি জগৎ জুড়ে
ধর্ম তবে দাও গো ছুঁড়ে!
মানুষ থাকুক সারাৎসারে!!
মানুষ থাকুক সারাৎসারে!!
হুজুর রাগ করেনা ছি! – দেবশ্রী মজুমদার
কবিতা: হুজুর রাগ করেনা ছি! – দেবশ্রী মজুমদার
হুজুর, তোমার মত বুদ্ধি? কখখনো না
নাইকো আমার ঘটে!
হুজু্র, তোমায় রঙিন সেলাম
প্রেম দিবসে, গোলাপ খুঁটে খুঁটে!
তোমার মত বুদ্ধি যদি, থাকত আমার ঘটে!
কি আর করা! মাথা তো নয়, নিরেট !
আধলা ইঁটে জোরসে ঠুকে ঠুকে,
বুঝিনি তো সে ফাঁকাই ছিল এক্কেবারে নিরেট!
যা ঘটেছে, তার আগে পিছে হরেক কিসিম রিবেট!
কার বাপের সাধ্যি বোঝে! তবে বুঝলো শেষে
সেনা মরে নি, ভোট এসেছে, লাশগুলো সব মিছে!
গোমুত খেয়ে বুদ্ধি এমন! ধমক দিল কত্তা তখন-
আমতা কন, কত্তা হুজুর! বিদ্যে কোথা অত বোঝার!
দেশের পোলা মরলে পরে এমন ঠ্যালা সোজার!
আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার
আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার
বড়শাল। কোনভাবেই আজ আর তাকে প্রত্যন্ত গ্রাম বলা যায় না। এখন শহরের হাওয়া লেগেছে রামপুরহাট তারাপীঠ উন্নয়ন পর্ষদের দৌলতে। তাই এখানে সেই পুরানো ঘ্রাণ আর পাওয়া যাবে না। অনেক আগে উত্তমকুমার অভিনীত সূর্য্যসাক্ষী সিনেমার একটি জায়গায় অজ পাড়া গাঁর এক দৃশ্যে মোনারপুকুর পাড়ের চলমান ছবি দেখেছি। খুব আনন্দ হয়েছে। আগে ধুলো উড়িয়ে চিত্রা, শ্যামা বাসগুলো রামপুরহাট তারাপীঠ রুটে চলত। এই গ্রাম বড়শাল। এই গ্রামকে ভাগ্নেদের গ্রাম বলা হয়। আদি বাসিন্দা বলতে গ্রামের জমিদাররা। তারপর আস্তে আস্তে খুদ্র জনপদ, বৃহৎ জনপদে পরিণত হল। গ্রামের ইতিহাস লিখতে শুরু করেছিলেন গ্রামের বাসিন্দা সুধাকিংকর মুখোপাধ্যায়। তিনি কোন কালে গত হয়েছেন। বুৎপত্তিগত হিসেবে গ্রামের নামের উৎস পাওয়া আজ মুশকিল। তবে শোনা গেছে, এই গ্রামে নাকি বড় বড় আখের শাল বসত। চলতো আখের গুড় তৈরির কাজ। আবার কেউ বলেন, বড় বড় শাল গাছ ছিল। সেই থেকেই বড়শাল। নাম যাই হোক, এই গ্রামের একটা সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে। বিশেষত নাটক,যাত্রা,থিয়েটার নিয়ে। প্রাচীনকালে প্রায় প্রতিটি গ্রাম না হলেও, অনেক গ্রাম এই সম্পদ নিয়ে গর্ব করত। বড়শাল তার ব্যতিক্রম নয়! সেই জ্বল জ্যান্ত কাহিনীর একটা রূপরেখা ফুটিয়ে তোলা আজ হয়ত সম্ভব নয়। তবুও মনের তাগিদে গ্রামের শুভান্যুধ্যায়ীদের ইচ্ছায় বন্ধু সন্দীপ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে ‘ফিল্ড নোট নিতে শুরু করলাম। গবেষণা ধর্মী এই লেখার কথক ও লেখক একজন! খুব ভালো লাগছে এই ভেবে, যেদিন থাকব না, শুধু এই কাজের মাধ্যমে খুব কাছে আসতে পেরেছিলাম জননী জন্মভূমির! এটা সবাই মনে রাখবে! আমার এই প্রচেষ্টার মূলে ছিল এক ভাবনা, এক ব্যক্তি! গোটা লেখায় তিনি কোথাও নেই! তবুও প্রতিটি অক্ষরে তীব্র এক দুঃখ অনুভূতি নিয়ে তিনি আছেন আমার ভাবনায়! তিনি আমার পিতৃদেব স্বর্গীয় মানস কুমার মজুমদার। যিনি জীবনে প্রচূর সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছেন। কিন্তু একসময় এই গ্রামের প্রতি তাঁর অভিমান ছিল। কারণও ছিল! ঈশ্বরের অমোঘ বিধানে তাঁর অমৃতময় প্রতিশোধ নেওয়া হল তাঁরই সন্তানের কলমে এই অমর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে!
আজও গাঁ আর মা সমান। তাঁকে ঘিরেই গ্রামবাসীর আবেগ। গাঁ নিয়ে আজও লোকায়ত কথার বিরাম নেই। আমাদের গ্রাম ‘তেমাথা’। অর্থাৎ দু’জন মারা গেলে, আরও একজন মারা যাবেন। একথার চল বা মান্যতা আজও আছে। এই লোকায়তের অজস্র শিকড়ের সন্ধান মিলবে গ্রামে। শিকড়ের নস্টালজিয়া নিয়েই তো আজকের কিশলয়দের বেঁচে থাকা। আর সে সন্ধানের পথ স্মৃতিপথ। যে পথে আজও চোখে পড়ে গ্রামের মাথায় গ্রাম্যদেবতা ও গাঁয়ের মাথারা। আজ নেই গাঁয়ের মাথারা। তে মাথা বড়শাল গ্রামের মূল স্তম্ভঃ নাটক, যাত্রা ও থিয়েটার। নাটকের আদিকথা হলঃ বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম। অর্থাৎ বাক্য রসাত্মক হলেই কাব্য। কাব্যেষু নাটকং রম্যম। অর্থাৎ কাব্যের মধ্যে নাটক সুন্দর, নাটকই শ্রেষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, তটের সহিত তরঙ্গের মৃদু সংঘাতেই নদীর জলে ঐক্যতান সুর বাজিয়া ওঠে। সেইরূপ শ্রোতা ও লেখকের মধ্যে একাত্মবোধ হতেই উচ্চাঙ্গ নাটকের জন্ম। তাই নাটক সামাজিক সাহিত্য। নট-নটী, নাট্যকার ও প্রেক্ষক এই তিন লইয়ায় এই নাটক, যাত্রা, থিয়েটার। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ বেশীরভাগ নট নটী, প্রেক্ষক পরলোকগত। নাট্যকারকে আমরা সংলাপের মধ্যে পেতে পারি। কিন্তু সেই সময় সেটা সত্যিই সুদূর পরাহত। সকল নটনটী, সময়, পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কালের চক্রে অসম্ভব। চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? দেখায় যাক না, মহাকালের যে আবরণ ইহজগতের উপর বিস্তার করে আছে, তা সরিয়ে কিছু দেখার সৌভাগ্য হয় কিনা?
চুপ! সরে এস। নবাব আসছেন আলেয়া।
---নবাব? এই অন্ধকারে? বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার মহান অধিপতি।
কনসার্ট! তোমার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব। তুমি বলেছিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের কিছুতেই প্রশ্রয় দিও না। তুমি বলেছিলে সুযোগ পেলেই, তারা এ দেশ কেড়ে নেবে। আমি তাদের প্রশ্রয় দেব না। আমি বেঁচে থাকতে তোমার রাজ্যে তারা দুর্গ তৈরী করতে পারবে না। সৈন্য সমাবেশে সক্ষম হবে না।
পিন ড্রপ সাইলেন্স বলতে যা বোঝায়। বড়শালের ভূত বাড়ির ডাঙ্গায় থিয়েটার। ড্রপসিনে পড়ে থিয়েটার। গ্রামের অভয় মুখোপধ্যায়ের আঁকা সিন ও ড্রপ সিন। গ্রামেরই কড়ি ডাক্তারের বাড়িতে সংরক্ষিত থাকত এই ড্রপ সিন এবং ভেতরের সিন। এই সিন ছিল মূলতঃ দুই -জনপথ এবং বনপথ। সামাজিক এবং ঐতিহাসিক নাটকে দরজা, জানালা, শেকল আঁকা ড্রপ সিন। আর গিরি রঙের বন পথ, গাছপালা আঁকা সিন। সবই ঘটনার সাথে মানানসই। সিরাজদ্দৌলা থিয়েটারে মঞ্চে দৃশ্যমান জনপথ। রাজ পোশাক আর মাথায় উষ্ণীষ ঝলমল করছে নবাবের। অভিনয় করছেন থিয়েটারের অভিনেতা, প্রযোজক, নির্দেশক অজিত চট্টোপাধ্যায়। ডাক নাম দুলু।
মঞ্চের কিছুটা পিছনে আলো আধাঁরিতে হাসির আওয়াজ –কে কে? কে তুমি? কে তুমি? তোমার নাম? তোমার পরিচয়? প্রশ্ন কৌতূহলী নবাবের।
আর পরিচয় কলঙ্কের কালিতে ঢাকা পড়েছে জনাব। আলেয়ার উত্তর। আলেয়ার অভিনয় করেন একজন পুরুষ। নাম অলোক, সম্পর্কে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্যালক। (তখন পড়াশোনার জন্য থাকতেন ডাম্বল চট্টোপাধ্যায়দের বাড়িতে।) ---কি বলে তোমায় ডাকব? আলেয়া। নবাবের প্রশ্ন। আলেয়া বলেই ডাকবেন জাঁহাপনা। আবার হিল্লোলিত হাসি।
নবাব বলে উঠলেন--এমন মিষ্টি হাসি, তুমি কেমন করে হাস?
আলেয়ার বিস্মিত প্রশ্ন-- হারেমে কি এমন হাসি কি কখনও শোনেন নি জনাব।
নবাবের স্বীকারোক্তি- না।
কোন নর্তকীর? কোন বেগমের?- জানতে চাইল আলেয়া।
নবাবের সখেদ উত্তর- বেগমরা হাসতে জানে না। নর্তকীরাও না। সারা বাংলাদেশে কেউ হাসতে জানে না, বাঙালি জানে শুধু কাঁদতে।
আলেয়ার সপ্রতিভ প্রশ্নঃ দেশব্যাপী এই কান্নার কি কোন কারন নেই, জাঁহাপনা?
নবাব কৈফিয়তের ভঙ্গীতে জানতে চাইলেনঃ কি কারন? আমার অত্যাচার? আমার অবিচার?
আলেয়া বলে উঠল--আমি তা বলিনি ----
সরস্বতী পুজোর লাগোয়া সময়। মাঘ মাসের শেষ, ফাল্গুনের শুরু। ধান ঝাড়াইয়ের পর শুরু হত এই থিয়েটার, যাত্রা, নাটক। মাথায় থাকত চটের সামিয়ানা। মাঝে মাঝে বড় বাঁশ তাকে তুলে ধরে থাকত। বড়শালে থিয়েটার শুরু হয় আগে। সংস্কৃতির স্বর্ণযুগে ছিল বোদ্ধা দর্শকও। হালকা শীতে গায়ে কাপড় জড়িয়ে লীন হয়ে যেত দর্শকের আসনও। সবাই তখন এক একজন অভিনেতা। প্রথমে পুরুষেরাই ফিমেলের অভিনয় করত। দু’একজন গাঁয়ের মহিলা ‘সুবর্ণলতা’র মত সাহসীনি হয়ে বাড়ির চৌকাঠ পেরোতে সমর্থ হয়েছিল, তাদের মধ্যে একজন বেলা চট্টোপাধ্যায়। এটা একরকম দুঃসাহস ছিল। অজিত চট্টোপাধ্যায় এবং কুমারীশ চট্টোপাধ্যায়ের দৌত্যেই এই অসাধ্য সাধন হত। কারন সবার ধারণা ছিল, যাত্রা, থিয়েটার, নাটক করলে বাড়ির মেয়েদের বিয়ে হবে না। বেলা রানি ছিল সে অর্থে পথিকৃত। শুধু বড়শাল নয়, কোটাসুর ছাড়াও বেশ কয়েকটি জায়গায় অভিনয় করেছেন। আজকের দিনে বাড়ির মেয়েদের অভিনয়ের জন্য ভিতরে বাহিরে সে লড়াইটা করতে হয় না।
মঞ্চে আলেয়া আর সিরাজদ্দৌল্লার কথোপকথনের মাঝে লুতফার প্রবেশ। ঐতিহাসিক পালায় একজন পুরুষের বামা কণ্ঠের আদল বা ঢং এনে অভিনয় করাটা শুধুমাত্র ছাই দিয়ে দড়ি পাকানোর মত। লুতফার অভিনয়ে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। কি চমৎকার অভিনয়।
--জাঁহাপনা। নবাব-- লুতফা তুমি এই সময়ে? এখানে? হারেমে নর্তকীদের নিরস গান শুনে, কুৎসিত নাচ দেখে ঝিমিয়ে পড়েছিলুম। হঠাৎ যেন শুনতে পেলুম দাদুর কণ্ঠস্বর। ছুটে এলুম এইখানে। আমি যেন দেখতে পেলুম সিংহাসনে তিনি বসে রয়েছেন। চোখে মুখে দারুণ উৎকণ্ঠা। আমি তাকে বোঝাতে চাইলুম, আমি কর্তব্য বিমুখ হব না। কে যেন হেসে উঠল। চেয়ে দেখলাম দাদু নেই। সিংহাসন শুন্য। এই নাটকে তারা প্রসন্ন মুখোপাধ্যায় ওরফে কড়ি ডাক্তার করেন আলিবর্দীর অভিনয়।
পাক্কা তিন ঘন্টার নাটক। কিন্তু দর্শকের টুঁ শব্দটি নেই।
গোলাম হোসেনের অভিনয় করছেন রায়দের শান্তি। পুরোনাম শান্তি মুখোপাধ্যায়। পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধ। কনসার্টে বাজছে যুদ্ধের দামামা। মঞ্চের পিছনে ফাটছে দো’দমা ফটকা গোলার আওয়াজে। গোলাম হোসেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না আসন্ন পরাজয়। মীরমদনের অভিনয়ে রূপেণ চট্টোপাধ্যায় আর মোহনলালের ভুমিকায় দীপক। কালিদাস মুখোপাধ্যায়ের অসাধারণ অভিনয় সিম্ফ্রে ওয়াটসের। দীর্ঘকায় কালিদাসকে মানিয়েছেও দারুণ। জগত শেঠের অভিনয়ে সনৎ দত্ত। রায়দুর্ল্লভের ভূমিকায় বেনু চট্টোপাধ্যায়। নির্দেশক অজিত চট্টোপাধ্যায় নিজের হাত দিয়ে টেনে মঞ্চে অন্যান্য কুশীলবদের স্থান ঠিক করে দিতে দিতে সংলাপ বলে চলেছেন-- কাল যুদ্ধ। আলেয়া ! যদি আর ফিরে না আসি।।।
এদিকে নিজের ক্ষোভকে সংযত করে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলেছে নিজের গলায় গোলাম হোসেন--- - জাঁহাপনা! জয় নিশ্চিত জেনেও, যে সেনাপতি শত্রুকে আক্রমণ করে না, দূরে দাঁড়িয়ে শত্রুর তারিফ করে, হয় সে উন্মাদ, না হয় বিশ্বাসঘাতক।
কাছে গিয়ে গোলাম হোসেনকে মঞ্চের সামনে নিয়ে এসে নবাব বলে উঠলেন-- আমি সব জানি, সব বুঝি। তবুও বাধ্য হয়ে মীরজাফরকে খাতির করি। তোমরা বিরক্ত হও। আমি নিজের উপর নিজে বিরক্ত হই। কিন্তু কি করব গোলাম হোসেন। উপায় নেই। উপাই নেই।
মীরমদন যুদ্ধের খবর দিতে ছুটে আসা মাত্রই—তাকে জায়গা দিতে জায়গা পরিবর্তন করে তাঁর অর্ধ সমাপ্ত কথার রেশ ধরে বলে উঠলেন নবাব-- আমি জানি কি হয়েছে। যুদ্ধ বিরতির আদেশ পেয়ে আমাদের সৈন্যরা বিশ্রামের আয়োজন করছিল –ইংরেজদের হঠাৎ আক্রমণে, সৈন্যরা চারিদিকে ছুটে পালাচ্ছে, মোহনলাল তাদের ফেরাতে পারছে না। মীরজাফর ক্লাইভের শিবিরে। রায়দুর্লভ আর ইয়ারলতিফ-দূরে দাঁড়িয়ে ইংরেজদের রণ নৈপুণ্য দেখছে।
এখন গোলাম হোসেন? আদেশ করুন জাঁহাপানা, বললেন গোলাম হোসেন। ‘যে আদেশ করত, অনুমতি দিত। সে আর আমার মধ্যে নেই বন্ধু। পলাশীর প্রান্তরে লজ্জায় ঘৃণায় সে আত্মহত্যা করেছে। মুর্শিদাবাদে ফিরে এসে করজোড়ে সকলকে অনুরোধ করেছি, আমাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে। রাজকোষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি। কিন্তু দিনান্তে দেখলুম, যারা অর্থ নিল, তারা আর ফিরল না। যারা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিল, তারা আর কাছে এসে দাঁড়াল না। আবার মুর্শিদাবাদে ফিরে আসব। রাজ্য পাব, সিংহাসন পাব। পাত্র মিত্র ,পারিষদ সব পাব। নকীব আবার নাম হাঁকবে, বন্দী গান গাইবে। দেশ বিদেশ থেকে আসবে নানা উপঢৌকন, আবার যুদ্ধ হবে, রাজ্যের প্রসার হবে-অ্যাঁ কি? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি। কি সব বলছিলুম—অভিনেতা অজিত চট্টোপাধ্যায়ের নবাবের অভিনয়ে দর্শক তখন অভিভূত। বান্দা বলে, নফর বলে কত অপমান তোমাকে করেছি বন্ধু। আমাকে তুমি ক্ষমা করো।
----জাঁহাপনা যতদিন বেঁচে থাকবেন, গোলাম হোসেনকে বান্দা বলে জানবেন।
এরপরের দৃশ্যে নবাবকে নিয়ে কৌতুক ঠাট্টা তামাসা সাধারণ প্রজাদের।
নবাব সখেদে বলে উঠলেন-- ভাই সব তোমাদের এই পরিহাস নির্মম। কিন্তু নিরর্থক নয়। সত্য পরিহাস যোগ্য। আমি যদি নিশ্চিন্তে দিন কাটাতে চাইতুম, তাহলে কাহারো সাথে আমাকে দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হতে হত না। কিন্তু আমি তা চাইনি। চাইনি বলেই কি আমি তোমাদের বিচারে অপরাধী? বর্গী হামলার সময় নবাব আলিবর্দীর সমরে দিবসে নিশীথে আমিও কি ছুটে ছুটে যায় নি? আমার হাতের অস্ত্র কি মারাঠা দস্যুদের দ্বিখণ্ডিত করে নি --তারই পুরস্কার কি এই ছিন্ন পাদুকা? তারই পুরস্কার কি এই তস্কর লভ্য লাঞ্ছনা?
--হাজার হাজার সৈন্য পুতুলের মত দাঁড়িয়ে রইল। আর পরাজয়, আর কে পিছন থেকে এসে সবার কপালে লাঞ্ছনার কালিমা মাখিয়ে দিয়ে গেল? তার কৈফিয়ত কে দেবে? কোথায় তোমাদের সিপাহশালার ? কোথায় তোমাদের সেনাপতি ইয়ারলতিফ? কোথায় তোমাদের সেনাপতি রায়দুর্ল্লভ? ডাক তাদের। দাও তাদের দন্ড।
শেষ দৃশ্যে যবনিকা পতনের আগে তার জাত চিনিয়ে গেলেন অজিত চট্টোপাধ্যায়। নবাব অনেকের চোখে জল এনে দিয়ে আবেগ ঘন কণ্ঠে বলে উঠলেনঃ তাই যদি সত্য মনে কর, তোমাদের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ , তাহলে এস ভাইসব আর একবার চেষ্টা করে দেখি, পলাশীর প্রান্তরে যে রত্ন আমরা হেলায় হারিয়ে এসেছি। বঙ্গজননীর কনক কিরিটে তা আবার পরিয়ে দিতে পারি কিনা।
আঃ আঃ আঃ মহম্মদি বেগ, তুমি আঃ দিলে না শেষ চেষ্টা করতে, ওরা আমাকে দিলে না। বাঁচতেও দিলে না আমাকে। সুখে থাক ভাই সব। তোমাদের হতভাগ্য নবাবের বক্ষ রক্তে সব অশান্তি ধুয়ে যাক। --যবনিকা পতনের পর করতালিতে ফেটে পড়ল দর্শককুল যা মঞ্চের সামনে থেকে হাগর ভট্টাচার্য্যের বাড়ির বাহির দরজা পর্যন্ত বিস্তৃত। তেঁতুল তলা আর কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের পাউঠিতেও কম লোক বসত না। সেই তেঁতুল গাছ আজ আর নেই।
অজিত চট্টোপাধ্যায়, কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় সহ অন্যান্যদের রিহার্সাল বসত ক্লাবে। আর পার্বতী ভট্টাচার্য্যের গোয়াল বাড়িতে অর্থাৎ বর্তমানে সতীনাথ ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে। মোটামুটি গোটা গ্রামের লোক বসত। সামনে গরু থাকত। আর উপর নিচে থাকত গ্রামের দুই যুবক ফুচু ও নারু। তারা পড়াশোনা করত। যাত্রা হত শীতকালে। তার প্রস্তুতি নেওয়া হত আড়াই থেকে তিন মাস আগে। দুর্গোৎসবের মতই ছিল যাত্রা উৎসব। এই সময় যারা গ্রামের বাইরে থাকতেন তারাও আসতেন। যাত্রা ঘিরে ছিল চরম উন্মাদনা। দুপুর থেকে মঞ্চের আগে চলত চট দিয়ে জায়গা ঘেরার প্রতিযোগিতা। বাড়ির ছোটরা জায়গা ঘিরে রাখত। এনিয়ে ঝগড়াও কম ছিল না। স্কুল থেকে ফিরেই দেছুট ভূতবাড়ির ডাঙ্গায়। ঘুটিংয়ের উপর চট। চটের তলায় হাত ভরে ঘুটিং তুলে ফেলে জায়গা ঠিক করে থিতু হয়ে বসা। যাত্রার ঘন্টা বাজলে কেউ উঠত না।
বরাবর দুটো বই হত। কেউ একটিতে নাম ভূমিকায় থাকলে, অন্যটাতে পেত ছোট রোলে। রিহার্সাল কঠোর অনুশাসনের মধ্যে হত। প্রায় মাস তিনেক আগে থেকে চলত পার্ট কপচানো। গোটাটাই দুলু চাটুজ্যের তদারকিতে। সন্ধ্যে ৭ টা থেকে রাত্রি ১০টা পর্যন্ত চলত রিহার্সাল। ছোটদের অর্থাৎ মদন, খোকনদের ডিউটি ছিল শতরঞ্জি পেতে ধুপ জ্বেলে দেওয়া। রিহার্সালের জায়গা পবিত্র জায়গা হিসেবে দেখা হত। হুটহাট লায়েকের মত ঢুকে যাওয়া বা বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। কয়েকটা উদাহরণ শুনলে বোঝা যাবে ‘ডিসিপ্লিন’ কেমন ছিল তখন। অল্প বয়সী ছেলে ছোকরাদের একটা বিড়ি খেতে অনেক দূরে যেতে হত। কোন কারনে তুষার ওরফে বাচ্চু, খোকন, ছোট হীরু, বড় হীরু বাইরে গেছে। দেরী হয়েছে আধ ঘন্টা। কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় (বেচুর বাবা) বলে উঠল, পায়ে চটি দেখেছ। পা থেকে মাথা অবধি ছিলে দেব। কেউ কিছু বলতে পারল না। ভয়ে তাদের আত্মারাম খাঁচা। দুলু চাটুজ্যে সামাল দিতে বললেন, আরে ছেলে চ্যাংড়ার ব্যাপার একটু আধটু বাইরে যাবে না। তাই হয়। একটু শান্ত হও। একটা যাত্রায় একটি সিনে বেলা ও বেচুর জড়িয়ে ধরে একটা প্রেমের দৃশ্য ছিল। প্রতিদিন সেটা কুমারীশ চাটুজ্যে (বেচুর বাবা অর্থাৎ বেলার শ্বশুর মহাশয়) এটা করাতে চাইতেন, আর বেচু বলতেন ঠিক আছে ওটা একেবারে স্টেজে হবে। কিন্তু করতে হত। সিরাজদ্দৌলা নাটকে বেনু চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন রায়দুর্ল্লভের। রিহার্সাল চলছে। কুমারীশ চট্টোপাধ্যায়ের নজর সবার উপর। প্রম্পট করছে কাশী অর্থাৎ দেবীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। রায়দুর্ল্লভের কিছুতেই কৈফিয়ত উচ্চারণ হয় না। বার বার বলছেন কৈফত। আর যায় কোথা। কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় অগ্নি শর্মা। বলে উঠলেন- বামুনের ছেলে, কৈফিয়ত উচ্চারণ হয় না। বলে কিনা কৈফত? এই বলে কষে একখানা থাপ্পড় মারলেন বেনু চট্টোপাধ্যায়ের গালে। কাঁদতে কাঁদতে বাইরে বসে পড়ল বেনু। এখনকার দিনে হয়ত এই অনুশাসন ভাবাই যায় না। এভাবেই যাত্রার সমস্ত রির্হাসাল হত অত্যন্ত নিষ্ঠাভরে।
পুরানো দিনের যাত্রার কোন ছবি প্রমাণ হিসেবে নেই। তবে বর্তমানকালের নাটকের দৃশ্যের ছবি দেওয়া হল। গ্রামের মেয়েদের নিজের হাতে তৈরী করেন বেলা চট্টোপাধ্যায়ঃ
সিরাজউদ্দৌলা, গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম, বাঁশের কেল্লায় অভিনয় করেন অজিত চট্টোপাধ্যায়। ‘দ্বিতীয় পানিপথ’ ঐতিহাসিক পালায় আদিল শাহের ভূমিকায় অভিনয় করার কথা ছিল অজিত চাটুজ্যের। তাই বাঁশের কেল্লায়, তাঁর অভিনয় করার কথা ছিল না। মালদার লাল বাথানির রূপেন ওরফে বেচু (রূপেন) চট্টোপাধ্যায়ের র মাসির ছেলে কালি সাধনের, বিশু মণ্ডলের অভিনয় করার কথা ছিল। কিন্তু ছোট রোল হওয়ায় সে অভিনয় করতে চায় নি। মাত্র দুটি সিনের রোল। কে করবে! তাই অগত্যা অজিত চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেন। বিশু মণ্ডল অত্যাচারিত চাষি। ব্রিটিশ গুলি করে মেরে দিয়েছে তার নাতি বাদশাকে। শিশু শিল্পী মিহির ভট্টাচার্য করেছিলেন নাতি বাদশার অভিনয়। নাতির মৃতদেহ কোলে নিয়ে দর্শকের অনেকের চোখে জল এনে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন অজিত চট্টোপাধ্যায়। ওই নাটকে রুপেণ চট্টোপাধ্যায় (বেচু) অভিনয় করেন তিতুমিরের। এই বাঁশের কেল্লায় সেনাপতির ভূমিকায় ছিলেন দীপক। ইংরেজদের কামানের গোলায় মারা যাবে। হিসেব মত বোমার আওয়াজের সাথে সাথে সেনাপতি মাটিতে পড়ে যাবে। বোমে আগুন দেওয়া হল দু’দুবার। কিন্তু ফাটল না। মঞ্চে তিতুমীর ঈশারা করে সেনাপতিকে পড়ে যেতে বলল। ঈশারা মোতাবেক মাটিতে পড়ে যেতেই, তিতুমির বলে উঠল—আমরা হেরে যাচ্ছি ভেবে, তুমি কি বিষপান করে মারা গেলে সেনাপতি। যদিও মূল নাটকে বিষপানের কথা ছিল না। অনোন্যপায় হয়েই এই প্রত্যুৎপন্নমতি। দ্বিতীয় পানিপথে বৈরাম খাঁর চরিত্রে অভিনয় করেন সন্তোষ চট্টোপাধ্যায়, হিমুর ভূমিকায় রূপেণ ওরফে বেচু চট্টোপাধ্যায় এবং ছোট্ট আকবরের ভূমিকায় অভিমূন্য ওরফে মন বন্দ্যোপাধ্যায়।
পৌরাণিক পালা গঙ্গাপুত্র ভীষ্মের অভিনয় করেন অজিত চট্টোপাধ্যায় ওরফে দুলু। তার তখন বয়স ২৭-২৮ বছর। পরশুরামের অভিনয় করে কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় (বেচুর বাবা, কুমারীশ ওরফে শঙ্কর চাটুজ্যে)। অম্বা বেলা চাটুজ্যে। রামী চন্ডীদাস নাটকে অরুণ মুখোপাধ্যায়ের বন্ধু চিতু রামীর অভিনয় করেছিলেন অসাধারণ। শঙ্কর বলে পরিচিত কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় নামাবলী গায়ে গেয়েছিল ‘রাই কিশোরী তোমার কানু যায় মথুরায়”। কনসার্টের তাল মিলিয়ে সেই গান শুনে সেদিন বেশীরভাগ দর্শক মুগ্ধ হয়েছিল। আরেক পৌরাণিক পালা উপেক্ষিতায় দাস রাজের ভূমিকায় অভিনয় করেন বটকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। উপেক্ষিতাতে অম্বার ভূমিকায় বেলা, অম্বালিকায়- অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্যালক অলোক এবং ভীষ্মের ভূমিকায় দুলু চাটুজ্যে। ভীষ্মের সেই উদাত্ত কন্ঠ - ত্যাগ ধর্ম বড় ধর্ম। পৃথিবীর সর্বসুখ বিসর্জন ব্রহ্মচর্য করিনু সার। আজি হতে পৃথিবীর সকল রমণীরে মাতা বলি করিব অর্চনা।
‘ বাগদত্তা’ আর ‘উপেক্ষিতা’য় দুটোতেই অভিনয় করেন বেলা চট্টোপাধ্যায়। যাত্রাতে দুটো রাস্তা থাকত। এক দিকে প্রবেশ। আরেকদিকে নিষ্ক্রমণ। গ্রীন রুম থেকে ছুটে আসা সে দৃশ্য রোমকূপে শিহরণ জাগানো। এই নাটকে বাংলার নবাব তুঘরিল খাঁর অভিনয় করেন অমৃত শেখর মুখোপাধ্যায়। সামাজিক যাত্রা পালা ‘কয়েদী’তে উল্কার অভিনয় করেছিলেন বেলা চাটুজ্যে। তাঁর স্বামীর অভিনয়ে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। ছেলে হয়েছিল অবনী বন্দ্যোপাধ্যায়। এই নাটকে অভিনয়ের পর বাড়িতে ফিরে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন বেলারানি চাটুজ্যে। এই ‘কয়েদী’ নাটকে বাংলার রাজা আনন্দ রায়ের অভিনয় করেন অমৃতশেখর (লারু) মুখোপাধ্যায়। ‘ফেলারাম ডাকাত’ যাত্রায় গফুর ডাকাতেরও অভিনয় করেন তিনি। মহারাজ নন্দকুমার থিয়েটারে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহারাজার অভিনয় হয়েছিল দেখবার মত। মহারাজার রানীর ভূমিকায় ছিলেন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্যালক অলোক। অভাগীর কান্না ছাড়াও নন্দরাণীর সংসারে নন্দরানীর অভিনয় করেন বেলা চাটুজ্যে। নন্দরানীর স্বামীর অভিনয় করেন অজিত ওরফে দুলু চাটুজ্যে। বেলা চ্যাটার্জী ছাড়াও, বানী, নমিতা মুখোপাধ্যায়ও সুন্দর অভিনয় করতেন। সামাজিক পালা দেবদাসে অভিনয় করেছেন সন্তোষ চট্টোপাধ্যায়। আর তার প্রেমিকার অভিনয় করেন আরেক পুরুষ চরিত্র প্রদীপ চাটুজ্যের কাকা নীতু। দেবদাসের নায়িকা পারুর চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন তিনি। কালিদাস মুখোপাধ্যায়, খুরখুরির স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় ভালো অভিনেতা। এক নাটকে মিস্কিন ফকিরের অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন স্বপন।
পৌরাণিক যাত্রা পালা শ্রী রাম চন্দ্র। মঞ্চে ঠিক যেন শ্যাম দূর্বাদল ঘনশ্যাম রামচন্দ্র। পিঠে ধনুক। পিতৃসত্য পালনে বনবাস বেছে নিয়েছেন। সেদিন পঞ্চানন মুখোপাধ্যায়ের রাম চন্দ্রের অভিনয় আর তার সংলাপ শুনে মন্ত্র মুগ্ধ হয়েছিলেন অনেকেই। দীর্ঘাঙ্গী শ্যাম দূর্বাদল গাত্র উন্নত নাসিকা আর অভিনয় দেখে অনেক মহিলা দর্শকের মত শিপ্রা মুখোপাধ্যায় (তিপু) কপালে হাত ঠেকিয়েছিলেন। তখন মাত্র পনের বছর বয়স তাঁর। বারোর সামান্য কয়েকমাস বেশী বয়সে শিব কিঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের ঘরে বৌ হয়ে আসেন তিনি। আজও সেই কথা বলতে বিভোর হয়ে যান সত্তরোর্দ্ধ মহিলা।
আরেক পৌরাণিক যাত্রা পালায় তরণী সেন বধের দৃশ্য। গ্রামেরই বংশীধর মুখোপাধ্যায় অভিনয় করছেন তরণী সেন চরিত্রে। যখন অন্তিম দৃশ্যে তরণী সেন বধ হল, তখন বংশীধর মুখোপাধ্যায়ের মা অশ্বীনীধারী দেবী মঞ্চে উঠে গেলেন। আরে থামো থামো! কে কার কথা শোনে। চিৎকার করে বলতে থাকেন, ওরে আমার ছেলেকে মেরে দিলে? বংশীধর মুখোপাধ্যায় তাঁর একমাত্র ছেলে। যাত্রার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়ে এমন আচরণ সেদিন করেছিল এক মাতৃ হৃদয়। একাত্ম হওয়ার ঘটনার বহু সাক্ষী বড়শালের রঙ্গ মঞ্চ। যেমন কয়েদী যাত্রায় বেলা চট্টোপাধ্যায়ের উল্কার অভিনয়ে দেখে সাজ ঘরে ছুটে এসেছিলেন অভয়াপদ ভট্টাচার্য। বলেছিলেন, মেয়েটাকে একবার দেখব। আগে যে দেখেন নি। তা নয়। অন্যান্য দর্শকের মত মঞ্চস্থ নাটকের সাথে একাত্ম হয়ে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলে উঠেছেনঃ ভাসুর চিনলে না বাবা। এখন কাঁদলে আর কি হবে। এই নাটকে কালো সওয়ারের চরিত্রে অভিনয় করেন রূপেন চট্টোপাধ্যায়।
অভয়াপদ ভট্টাচার্য্য অভিনয় খুব ভালো করতেন। বিসর্জন নাটকে রঘুপতির অভিনয় করেন অভয়াপদ। অসাধারণ তাঁর অভিনয় ক্ষমতা। রিহার্সালেও ছিল না কোন খামতি। অজিত চাটুজ্যে যেমন ড্রেসিং টেবিলের সামনে বা গোয়ালে গরুর দেখাশোনা করতে করতে সংলাপ বলতেন। অভয়াপদ ভট্টাচার্যও তাই করতেন। প্রাতঃকৃত্য করার সময় রঘুপতির চরিত্রে তাঁর কণ্ঠ শোনা যেত—‘দে ফিরায়ে জয়সিংহে মোর। দে ফিরায়ে। দে ফিরায়ে রাক্ষসী পিশাচী’।
এই নাটকে রাজা গোবিন্দ মাণিক্যের ভূমিকায় অমৃত শেখর মুখোপাধ্যায় এবং রঘুপতির ভূমিকায় অভয়াপদ ভট্টাচার্য্যের সংলাপ বাঙ্গময় হয়ে উঠেছিল নিজ নিজ বাচন ভঙ্গিতে। গোবিন্দ মাণিক্যঃ নিষেধ করেছি বলি, সেই অপরাধে মাতা চলে গেল রোষভরে এই তোরা করিলি বিধান। দণ্ডে দণ্ডে ক্ষীণ শিশুকে স্তন্য দিয়া বাঁচায়ে গেলে মাতা। সেকি তার রক্তপান লোভে?
রঘুপতিঃ মূঢ তুমিই শুনেছ দেবীর ডাক! আমি শুনি নাই? লক্ষ লক্ষ বৎসর যে রক্ত করেছেন পান, আজই অরুচি?
গোবিন্দমাণিক্যঃ করে নি পান। মুখ ফেরাতেন দেবী শোনিত পাতে। এই নাটকে অপর্ণা চরিত্রে জলি ওরফে টুটু মুখোপাধ্যায় সারাজাগানো অভিনয় করেন। অপর্ণাঃ জয়সিংহ! কোথা জয়সিংহ? কেহ নাই এ মন্দিরে। তুমি কে দাঁড়াইয়ে আছ অমর মুরতি? বিসর্জন নাটকটি মঞ্চস্থ হয় বড়শাল উচ্চবিদ্যালয়ে। বড়শালে বঙ্গে বর্গীতে নারী চরিত্রে অভিনয় করেন অভয়াপদ। এছাড়াও অভিনয় করেন পঞ্চানন মুখোপাধ্যায়, বংশীধর মুখোপাধ্যায়, বলরাম বন্দ্যোপাধ্যায়, শিব শেখর মুখোপাধ্যায়ের ভাড়াটে অরুণ বন্দোপাধ্যায়। অভয়াপদ ভট্টাচার্য্যের সম্পর্কে বেয়াই নেপাল মোড়লও ছিল মহিলার অভিনয়ে সমান পারদর্শী।
এক নাটকের দৃশ্যে বিধবার অভিনয়ে নেপাল মোড়ল। তখনকার দিনে বিধবাদের চুল কাটা থাকত। দর্শকের আসনে বংশীধর মুখোপাধ্যায়। মঞ্চে অভিনয় চলাকালীন চিৎকার করে বলে উঠলঃ ‘হারে নারি তোর চুল কই’। আর সাথে সাথে হাসির রোল। তবে তাতে অভিনয়ে কোন প্রভাব পড়ে নি। কপাল কুণ্ডলায় কাপালিকের অভিনয় করেছিলেন অভয়াপদ ভট্টাচার্য্যের দাদা তারাপদ ভট্টাচার্য্য। দা নিয়ে বলি দিতে যাওয়ার দৃশ্য আর সংলাপ বলার ভঙ্গিমা আজও অনেকে মনে রেখেছেন।
গ্রীন রুমে তোলা ছবিতে
বড়শালের মানুষের কাছে যাত্রা ছিল প্রাণ। একটা বাড়ি খুঁজে পাওয়া ছিল ভার যে বাড়ি থেকে কেউ অভিনয় করেনি। পুকুরে মাছ ধরা হত। থাকা খাওয়া, রান্না বান্না। দুর্গাপুজোয় এতটা হত না। পুরুষ অভিনেতারা থাকত ক্লাবে। মহিলারা দুলু চাটুজ্যের বাড়িতে। তাদের বাইরের ঘরটা ছেড়ে দেওয়া হত। কনসার্ট, ড্রেসার এবং পেন্টাররা তিনদিন ধরে বড়শালে থাকত, খেত। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চৌকি জোগাড় করে তৈরী হত স্টেজ। রেল থেকে পেট্রোল এক্স পেঁচানো লাইট। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ওরফে লালু মুখুজ্যে ছাড়া ওই ডে লাইট জ্বালাবার কোন লোক ছিল না গ্রামে। সে গফুর ডাকাতের অভিনয় হোক বা ‘একটি পয়সা’ যাত্রাপালার বদ্রী প্রসাদ হোক, যখনই তাঁর নজরে পড়ত আলোর ঘাটতি, অভিনয় করতে করতে দুবার পাম্প দিয়ে দিতেন। মুখে সংলাপ চলছে—মঞ্চের মেঝেতে হ্যাজাক নামিয়ে ‘কক কক’ করে দুহাতে সমানে পাম্প চলছে। হিন্দী ভাষী বদ্রী প্রসাদ সংলাপের ফাঁকে ঝুলন্ত পেট্রোম্যাক্সের হ্যাজাকে পাম্প দিলে দর্শকের কোন আপত্তি ছিল না। যা হত যাত্রার স্বার্থে। যাত্রার স্বার্থেই অমৃত শেখর মুখোপাধ্যায় ওরফে লারু মুখুজ্যে এবং দুলু চাটুজ্যে জিয়াগঞ্জ যেতেন বনমালী পেন্টারকে বায়না করতে। অমৃত শেখর মুখোপাধ্যায়কে রাজার অভিনয়ে মানাত বেশ। আর অভিনয়ও করতেন খুব সুন্দর। উদ্যমী মানুষ হিসেবে নিজের স্কুল বড়শাল উচ্চ বিদ্যালয়ে অন্যান্য শিক্ষক ও ছাত্রদের সাথে বড়শালের মদন ও খোকনদের নিয়ে যাত্রা করাতেন। তাঁর বন্ধু গোপালপুরের জগন্নাথ সাহা খুব ভালো অভিনয় করতেন। এক নাটকে ফেলারাম চরিত্রে অভিনয় করে তাক লাগিয়ে ছিলেন সকলকে। যাইহোক প্রতিবার লারু মুখুজ্যে এবং দুলু চাটুজ্যে ট্রেনের টিকিট কেটে ট্রেনে জিয়াগঞ্জ পৌঁছাতেন। গোটা দিন কাটাতে হবে। হাতে পয়সা নেই। খুঁজেপেতে বাসি সিঙ্গারা খেয়েছে তারা, যাতে অম্বল হয়ে জল খেয়ে সারাদিন চলে যায়। তখনকার দিনে যাত্রায় সাড়ে তিন হাজার খরচ বিশাল ব্যাপার। পাল ড্রেসার, বনমালী পেন্টার, আর আছে ফিমেলের পারিশ্রমিক।
দুলু চাটুজ্যের ছেলে অশোক ওরফে মদন চট্টোপাধ্যায় আর শ্যাম মুখুজ্জ্যের ছেলে শান্তনু মুখোপাধ্যায় ওরফে খোকন নায়ক থেকে খলনায়ক, ভাঁড় সমস্ত ধরণের অভিনয়ে তাদের পারদর্শিতা দেখে মুগ্ধ হয় নি এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার। এমন এক দৃশ্যে ‘মদন’ মরা সেজেছে। বাঁশের চাঙে বাঁধা তাঁর মরদেহ। কেঁদে গড়াগড়ি দিচ্ছে খোকন এবং অন্যান্যরা। আবার সৎকার্যের জন্য চাঁদাও তোলা হচ্ছে। এভাবে বাঁড়ুজ্যে বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে অর্থ জোগাড় করা হত যাত্রার জন্য। মঞ্চের বাইরেও এরা অভিনয় করে মানুষকে মুগ্ধ করেছে জাত অভিনেতাদের মত। তখন নতুন জামাইদের কাছে চাঁদা নেওয়ার একটা চল ছিল। গোটা রাত মেয়ের বাড়িতে খাটা খাটুনি, বরযাত্রীর সেবা ফরমাইশ খাটার পর নতুন বরের কাছে চাঁদা। সেখানেও অস্ত্র ছিল বাক চাতুর্যতা আর তুখোড় অভিনয়। মঞ্চে লিপিবদ্ধ সংলাপ ঘটনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আওড়ে যেতে হয়। এখানে তাৎক্ষণিক সংলাপে অপরিচিত লোকের কাছে টাকা আদায়। তারপরে মেয়ের বাড়ির অনুরোধ উপরোধ তো আছেই নতুন জামাইকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য। বুদ্ধদেব চাটুজ্যের মেয়ের বিয়ে। খোকন গলায় রুমাল বেঁধে নামকরা কুখ্যাত গুণ্ডার ভূমিকায়। পার্ষদরা তাঁর মহিমা নতুন জামাইয়ের কাছে এমনভাবে তুলে ধরলেন, যে টাকা পেতে বেগ পেতে হল না। যাত্রার জন্য গাছ কেটে বিক্রি। আর ড্রেসিংএ বসে- খোকনের চিৎকার- আরে মদনা তোর চাঁদাটা দিয়েছিস তো? তখন কার দিনে ৫টাকা আদায় করা কঠিন ছিল। তাঁদের রাত জাগা। ভোর বেলায় কেউ চলে যাওয়ার আগে তাঁর কাছ থেকে চাঁদা নিতে হবে, অভিনয় করা ছাড়াও এসব মাথায় রাখতে হত।
কমেডির অভিনয়ে বড়শালের সূর্যকান্ত ভট্টাচার্য্য আর পাশের গ্রাম বেলের বিকাশ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলতে গিয়ে আজও সেই দিনের দর্শক হো হো করে হাসে। উপানন্দের ভূমিকায় অচ্যুতানন্দ মুখোপাধ্যায় ওরফে মেলাই মুখুজ্জ্যের অভিনয় ছিল বেশ ভালো। এই দুই রথীর অভিনয় নিয়ে এক মজার ঘটনা আছে। সূর্য্যকান্ত ভট্টাচার্য্যের একটি সংলাপে আপত্তি ছিল অচ্যুতানন্দ ওরফে মেলাই মুখোপাধ্যায়ের। সেই মোতাবেক সূর্য্যকান্ত ভট্টাচার্য্য ওই অংশটুকু বাদ দিয়ে প্রতিদিন রিহার্সাল দিতেন। কিন্তু সূর্য্যকান্ত ভট্টাচার্য্যের মনে দুরভিসন্ধি ছিল, বন্ধুকে ফাইনাল খেলায় বধ করার। মঞ্চে যখন সংলাপ বলার সময় এল অবলীলা ক্রমে বললেনঃ বেশী বেশী ফটর ফটর করবি তো এক চড়ে মুতাই ফেলুম না। হালার পাঁঠার বাচ্চা! ব্যস আর যাই কোথা। সাজঘরে ফিরে এসেই যাত্রায় আর নামবেন না বলে ঘোষণা করলেন মেলাই মুখুজ্জে। রেগে গিয়ে মেলাই মুখুজ্জ্যে সূর্য্যকান্ত ভট্টাচার্য্যকে বলছেনঃ বলেছিলাম না, হালার পাঁঠার বাচ্চা বলা যাবে না। সূর্য্যকান্ত তখন মুচকি মুচকি হাসছেন।
সূর্যকান্ত ভট্টাচার্য্য ও বিকাশ কুমার চট্টোপাধ্যায় দুর্দান্ত অভিনয় করেন বাগদত্তায়। শ্রীদামের অভিনয়ে সূর্যকান্ত ভট্টাচার্য এবং গান্দার মা অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় বিকাশ কুমার চট্টোপাধ্যায়। সূর্যকান্ত ভট্টাচার্য্য বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে হাসিয়ে পেটের খিল ধরিয়ে দিতেন। তাঁর সেই ‘গান্দার মাকে, গান্দার মাও’ ডাক বেশ সাড়া ফেলেছিল গোটা গ্রামে। এমনকি আজও প্রয়াত সূর্য কান্তের স্ত্রী বিকাশ চট্টোপাধ্যায়কে দেখলে রসিকতা করে বলেন, “এসো, আমার সতীন”। তাঁর স্ত্রী হিসেবে অভিনেত্রী বিকাশ চাটুজ্যে কম যান না। এমনিতেই তাঁদের ক্যারিকেচার দেখে হাসির গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তার মাঝেই বাঙাল মেয়ে মানুষের গলায় বিকাশ চাটুজ্যে বলে উঠলেনঃ “মানুসডা যে সেই হাত সক্কালে, পান্তা মুহে দিয়া চইলা গেল, এহেন ফিরে আওনার নামটা নাই। থাকত আজ আমার গান্দার বাপটা, মজাডা টের পাইয়া দিতাম। দেহি মুরগিগুলা খুপরায় ঢুকল কিনা, দেহি”। বাগদত্তার এই দৃশ্যে দর্শক তখন মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। সেটা প্রায় পাঁচ মিনিটেরও বেশী। দুলু চাটুজ্যে গ্রীন রুমে পরের অভিনেতাদের উদ্দেশ্যে বললেন, এখন কাউকে পাঠিও না। কারন দর্শকের হাসির রোলে কেউ কোন অভিনেতার কথা শুনতে পাবে না। অতএব মিউজিক হোক। গোপালপুর গ্রামে বেগম যাত্রায় অভিনয় করেন বিকাশ চাটুজ্যে। তখন এই দুই অভিনেতার বয়স ২৬-২৭ বছর।
তাদের যোগ্য উত্তরসূরী অমল ওরফে চাঁদ চট্টোপাধ্যায়। গলার আওয়াজ বিকৃত করে ‘পাঁচ পয়সার পৃথিবী’ যাত্রায় মহেশ বেতো রুগীর ভূমিকায় অমল কুমার ওরফে চাঁদ চট্টোপাধ্যায় অভিনয় ছিল খুব হাসির। এই যাত্রায় মহেশের স্ত্রী মণিমালার ভূমিকায় করেন শান্তনা মুখোপাধ্যায় (চট্টোপাধ্যায়)। দুজনের সংলাপ ছিল অনেকটা এই রকম। মহেশঃ ওরে বাবারে! পাঁজরে ব্যাথা! পায়ে ব্যাথা! মণিমালা! মণিমালাঃ মণি বলতে পার না। মহেশঃ মনে থাকে না। চেষ্টা করব। মণিমালাঃ চেষ্টা করব কি গো? আজকাল তো নাম ছোট করে বলার চল হয়েছে। এই নাটকে বিজন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সুন্দর অভিনয় করেন জ্যোতিষীর ভূমিকায়। মণিমালার হাত দেখতে থাকার সময় এক চরিত্রের (কল্যাণ মুখোপাধ্যায়ের) প্রবেশ। কোন কারনে এক পাতার পর পঁচিশ পাতার সংলাপ বলতে শুরু করেছেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই পার্শ্ব চরিত্রের অসুবিধা হবেই। মণিমালার হাত দেখতে দেখতে জ্যোতিষী সংলাপ বললেনঃ হ্যাঁ হাত তো ভালো। দিন ভালো যাবে। ওঃ হুঁ হুঁ ১ পাতার পার্টে ২৫ পাতার পার্ট! ভুলে গেলে বুঝি! হেঁ হেঁ ! দর্শকরা বুঝতে পারল না। বুঝল মঞ্চের পাত্র পাত্রীরা। বিজন বন্দোপাধ্যায় এক নাটকে হিলতলা জুতো পড়ে মহিলার অভিনয় করে গ্রাম মাত করেন।
ভিডিও দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন
পুরানো দিনের যাত্রার কোন ছবি প্রমাণ হিসেবে নেই। তবে বর্তমানকালের নাটকের ছবি দেওয়া হল। গ্রামের মেয়েদের দিয়ে নাটক করাচ্ছেন বেলা চট্টোপাধ্যায়ঃ
যাত্রা, থিয়েটার, নাটকের পীঠস্থান বড়শাল। পৌরাণিকের পাশাপাশি অনেক ঐতিহাসিক, সামাজিক যাত্রা হয়েছে বড়শালে। এক যাত্রায় মহারাজ সিন্ধিয়ার অভিনয় করেন গুরুকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ( সম্পর্কে মৃন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাকা)।সেনাপতি রঘুপন্থের অভিনয় করেন অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এরকম অনেক ভালো ভালো যাত্রা নাটক পরিবেশিত হয়েছে এই গ্রামে। তবে ব্যাড প্যাচ অর্থাৎ খারাপ সময় যাত্রা নাটকের জীবনেও আসে। সেই সুবর্ণ যুগেও এসেছিল শাহজাহান যাত্রা মঞ্চস্থ হওয়ার সময়। এর আগেও কড়ি ডাক্তার শাহজাহান। আর জাহানারার ভূমিকায় বলরাম বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম দিন ফ্লপ হওয়ায়, পরের দিন পুনরায় অভিনীত হয় শাহজাহান। পরের দিন জাহানারার অভিনয় করেন বিকাশ চট্টোপাধ্যায়। তৃতীয়বারের জন্য ফের ‘শাহজাহান’ যাত্রাপালা নিয়ে একটা হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার ছিল। কিন্তু ফ্লপ হয়েছিল। দেবীপ্রসন্ন ওরফে কাশী চট্টোপাধ্যায় যাত্রা পার্টি অর্থাৎ ফিমেল, ড্রেসার, কনসার্ট এসব ঠিক করেছিলেন। রিহার্সাল চলছে। সকলের মাঝে বললেন, “পার্টি যে আসছে দাঁড়াতে পারবে না তোমরা। ভালোভাবে পার্ট মুখস্থ থাকতে হবে। শাহজাহান ক্যাসেট শুনতে হবে। কস্টিউম ওরা নিয়ে আসবে। পার্ট কাস্টিং হয়ে গেছে”। তারপরেই অশোক চট্টোপাধ্যায় অর্থাৎ মদনের উদ্দেশ্যে বললেন, আচ্ছা, মদন শোলেমান পারবা? করতে? উত্তরের অপেক্ষা না করেই নিজেই বলে উঠলেন, ‘পারবা না’। নাছোড়বান্দা সোলেমান বলে উঠল, “হ্যাঁ, কাশীদা পারব”। সোলেমান পর্ব শেষ হতেই, শুরু হল মুহাম্মদ পর্ব। শান্তনু মুখোপাধ্যায় ওরফে খোকনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে স্বয়ং ঔরঙ্গজেব বললেন, ‘তুমি হচ্ছ মুহাম্মদ। ঔরঙ্গজেবের ছেলে’। তারপর মুহাম্মদের সংলাপ আওরাতে লাগলেন, ‘ভাইজান ভাইজান!’ তারপর নিজেই বলে উঠলেন, ‘এই দৃশ্য পারবি না’। শান্তনু ওরফে খোকন সুযোগ ফুকলে যাচ্ছে দেখে, দ্বিগুণ উৎসাহে বলে উঠল, “পারব পারব!” ঐতিহাসিক যাত্রায় সামান্য রোল। তাই সামাজিক পালায় একটা ছোটোখাটো রোলের ইচ্ছে প্রকাশ করতেই, কাশী মুখোপাধ্যায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলে উঠলেন, এই রোলের পর আবার সামাজিক পালায়! যেন অসম্ভব কিছু চেয়ে ফেলেছেন!
এবার একটু সাজ ঘরের দিকে উঁকি মারা যাক। অত্যুৎসাহী ক্ষুদে দর্শকদের মধ্যে অনেকে সাজঘরে উঁকি ঝুঁকি মারছে। মঞ্চ থেকেও সাজঘরের গল্প কম আকর্ষনীয় ছিল না। যাত্রার জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব করতেন দুলু চাটুজ্যে। কনসার্ট বসে গেছে। তিন বারের বেলায় ফাইনাল কনসার্ট পড়ার পর যাত্রা শুরু হবে। মদন আর খোকন সাজ ঘরে ঢুকে দেখে, তাদের রাজকীয় পোশাক বেদখল। প্রশান্ত (প্রয়াত)চট্টোপাধ্যায় আর টোটোন মুখোপাধ্যায় দুজনেই সৈন্য। সৈন্যের ভূমিকায় --শুধু হুজুর। তারা রয়্যাল ড্রেস পরে বসে আছে। সাজ কৈ? খোকন, মদনকে বলছে, আমাদের সৈন্য মারতে হবে। প্রশান্ত দাঁত মুখ খিচিয়ে বলে উঠল, একেবারে বিরাট অভিনেতা!! তারা পোশাক কিছুতেই খুলবে না। অন্যদিকে, অচ্যুতানন্দ ওরফে মেলাই মুখোপাধ্যায় বাইরে বিড়ি খেয়ে সবে সাজ ঘরে ঢুকেছেন। মঞ্চে তখন বাবার অভিনয়ে বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য। অত্যন্ত স্পষ্ট উচ্চারণ করে সংলাপ বলতেন বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য। এবার মঞ্চে ছেলে হিসেবে মেলাই মুখোপাধ্যায়ের প্রবেশ আসন্ন। তাই ঢুকেই বললেন, আমার পাগড়ি দে। পাগড়ি কোথায়? মদন খোকনের পাজামা খুঁটিয়ে দেখছেন তিনি। মুতের গন্ধে ভরপুর এক ধুতিকে পাগড়ি করে দেওয়া হল। ক্ষিপ্ত হয়ে মেলাই মুখোপাধ্যায় বলে উঠলেন, ‘কিছুতেই নামব না। মুতের গন্ধে ভূত পালায়”। কিন্তু এদিকে বাবার ভূমিকায় বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্যের সাথে ছেলের ভূমিকায় মেলাই মুখোপাধ্যায়ের কথোপকথন হবে। কিন্তু কিছুতেই ছেলে ঢুকছে না। অগত্যা ‘বাবা’ই ছেলে ও বাবা দুজনের সংলাপ বলে চললেন। খুব কায়দা করে যাকে বলে ‘স্টেজ মেকাপ’ দিলেন বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য।
একবার হায়ার করা ফিমেল ভরাডুবি করেছিল শাজাহান যাত্রার। জাহানারা যিনি করবেন, তিনি আসেন নি। তাই তার জায়গায় অন্য মহিলা, যার সংলাপ মুখস্থ থাকা তো দূর অস্ত চরিত্র সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই। বিশাল দেহী পুরুষালি চেহারা। সবার কানাকানি, এই বোধ হয় জাহানারা। প্রশ্ন করতেই ওদের একজন জানাল, জাহানারা এখনও ঠিক হয় নি। মা- বলছে কি রে? সম্পর্কে নাতি খোকনকে ফিস ফিস করে বললেন দুলু চাটুজ্যে। এবার জাহানারা নিজেই প্রশ্ন করে বসল, আচ্ছা, জাহানারা সধবা না বিধবা? এবার কপালে চোখ তুলে ফের দুলু চাটুজ্যের বিস্ময়াভূত প্রশ্নঃ মা- বলছে কি রে?
যা অনুমান করা গেছিল, তার চক্ষু কর্ণ বিবাদ ভঞ্জন হল মঞ্চে। প্রম্পটারের কথা শুনে শুনে পার্ট বলছে। তাও যদি ঠিক ঠাক শুনত। প্রম্পটার দুষ্ট বললে, জাহানারা শুনছে দুশমন। ঔরঙ্গজেবকে ঔরঙ্গজীব বলে চলেছে বার বার। আর তা শুনে মঞ্চে চরিত্র ঔরঙ্গজেবের নাজেহাল অবস্থা। প্রথম সিন পচে যাওয়ায় , সব সিন ঝুলে গেল।
শাহজাহানে সুজার অভিনয়ে সতীনাথ ভট্টাচার্য্যের অসুস্থতার কারণে যাত্রার মাঝপথে নামতে হয়েছিল তুষার ওরফে বাচ্চু মুখপাধ্যায়কে। মাঝপথে অভিনয় কি করে সম্ভব? কারণ তখন রিহার্সালটা খুব মন দিয়ে করানো হত। যারা শুনত, তাদের মুখস্থ হয়ে যেত। তাই তুষার মুখোপাধ্যায়ের কোন অসুবিধা হয় নি। এই যাত্রায় জল্লাদ জীহন খাঁর অভিনয় করেন প্রসন্ন ওরফে স্বপন চট্টোপাধ্যায়। দারাকে বধ করতে মঞ্চে তার আগমন ঘটেছিল। দারার ভূমিকায় অভিনয় করেন অমৃত শেখর ওরফে লারু মুখোপাধ্যায়, যশোবন্ত সিংহের ভুমিকায় বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য। অভিনয় ছিল প্রাণবন্ত।
শাহজাহান যাত্রায় প্রম্পটারের কাছে দাঁড়িয়ে জাহানারা নিষ্প্রাণ সংলাপ বলে চললঃ প্রজা যদি নির্দয় হয়, সম্রাট কি তাকে পুত্র বলে ক্ষমা করবে? শাজাহান বলে চলেছে —এ ভয়ানক রাজনীতি কি করব? যুদ্ধ তার প্রয়োজন হয়েছিল। আমি শুধু ভাবছি, এই ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধে কাজ নেই। না না না । নির্বিরোধের রাস্তা নিয়ে আসতে দাও, আমি তাদের বুঝিয়ে বলব। দারা- আদেশ দিন সম্রাট, আমি সিংহাসনের প্রত্যাশী নয়। আমি তাদের বন্দী করে পিতার পদতলে আনব। সম্রাট পারলে তাদের ক্ষমা করবেন। কিন্তু তারা জানুক, সম্রাট স্নেহশীল, কিন্তু দুর্বল নয়।
জাহানারা- কার আজ্ঞায় দুর্গ অধিকার করেছ? মহম্মদ- পিতার আজ্ঞায়।
শাহজাহান—আমি তোমার পিতার পিতা। তোমার পিতা যদি তার পিতার প্রতি অত্যাচারী হয়, তুমি কেন তার আজ্ঞাবহ হবে?
ঔরঙ্গজেবঃ চলো মহম্মদ মক্কায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও।
ঔরঙ্গজেব-ভগিনী। জাহানারা – চমৎকার। ঔরঙ্গজীব, আমি তোমার প্রশংসা না করে পারছি না। এতক্ষণ আমি বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে ছিলাম। যখন আমার চমক ভাঙল, তখন আমি সব কিছু হারিয়ে বসে আছি। চমৎকার!
ঔরঙ্গজেব আশ্বস্ত করে বলল- যত দিন সিংহাসনে থাকব, তোমার এবং পিতার কোন অসুবিধা হবে না। কুর্নিশ করে জাহানারার প্রস্থান—আবার বলি ওরঙ্গজীব চমৎকার! জাহানারার সমস্ত অভিনয় ছিল নিষ্প্রাণ, থেমে থেমে আর ভুল উচ্চারণে ভরা। যা সহ অভিনেতাদের দফারফা করে ছেড়েছিল।
পরের দিন সনৎ দত্তের বাড়ির পিছনের মাঠে সবাই বসে আগের দিনের যাত্রা শাহজাহান নিয়ে আলোচনা করছে। ফ্লপ হওয়ায় সকলের মন খারাপ। আলোচনা হচ্ছেঃ একটা মেয়ে আসে নি। সেই কারণে একজনকে দিয়ে ডবল রোল করে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। দুলু চাটুজ্যে বসে আছেন। কাশী মুখোপাধ্যায় বসে আছেন। তাঁর দিকে একপ্রকার অভিযোগের তিরঃ কি পার্টি নিয়ে এলে ইত্যাদি ইত্যাদি। কাশী মুখুজ্জ্যে বললেন, দেখা যাক আজ কি হয়। শাহজাহান যাত্রার পার্টি টাকা নিয়ে বিদেয় হবেন। টাকা দিতেই একজন বলে উঠলঃ এত কমে তো হবে না। আর কিছু বাড়িয়ে দেন। বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য অনেকক্ষণ ধরেই কিছু একটা বলতে চাইছেন। থাকতে না পেরে বলে উঠলেন, “অনেক দেওয়া হয়েছে। প্রচুর পেয়েছেন”। যাকে উদ্দেশ্যে করে বলা, তিনি প্রশ্ন ছুঁড়লেন, কি পেলাম? -- ‘ফুলোট পেলেন। হারমোনিয়াম পেলেন, ঢোল পেলেন। সবই তো পেলেন। এগুলো তো একটাও পেতেন না’—এসবই তো পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। -- বলতে চাইলেন রাগে দর্শকরা সব ভেঙে দিত। ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে কাশী মুখোপাধ্যায় চরম রেগে গেলেন। তিনি বললেন, আমি আর নাটক করব না।
শাহজাহানের পর আর কোন ঐতিহাসিক যাত্রা বড়শালে হয় নি। তবে সামাজিক যাত্রাপালা ‘মা যদি মন্দ হয়’ ‘মা মাটি মানুষ’, ‘একটি পয়সা’, ‘অচল পয়সা’, ময়লা কাগজ, খুব ভাল হিট করেছিল। ট্র্যাজিক চরিত্রে প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের মত অভিনেতার জুড়ি মেলা ভার। ‘মা যদি মন্দ হয়’- যাত্রায় নায়ক চরিত্রে ভোলার পার্ট করেছিলেন প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়। ভাস্করের পার্ট করেছিলেন তুষার ওরফে বাচ্চু মুখোপাধ্যায়। ভিলেন ডাক্তারের অভিনয় করেন শান্তনু। স্লো-পয়জন করে রোগী মারায় সিদ্ধহস্ত। নার্সের অভিনয়ে শবাসনা মুখোপাধ্যায়। মদন চাটুজ্যে নাগর দ্বারিকানাথের ভূমিকায়। এই নাটকে প্রদীপ চাটুজ্যের নির্দেশনায় দ্বারিকানাথের গলায় ‘আজ আমি আসছিরে’ আজও সেই দিনগুলির স্মৃতি নস্টালজিক করে অনেককে। মা মাটি মানুষ যাত্রা মানুষের এত ভাল লেগেছিল যে দুবার হয়েছিল।
মা মাটি মানুষে প্রথমবার শিব ঠাকুরের ভূমিকায় অভিনয় করেন প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়। দ্বিতীয়বার এই চরিত্রে অভিনয় করেন রূপেন চট্টোপাধ্যায়। দুজনেই অনবদ্য অভিনয় করেন। আর দুবারই মহিম গাঙ্গুলীর ভূমিকায় অভিনয় করেন দুলু চাটুজ্যে। গৌতম মুখোপাধ্যায় অভিনয় করেন জটা চরিত্রে। আদুরি—মাছ ধরতে চললুম। আর আস্তায় কাদা। বেশ মাতিয়েছিল দর্শকদের।
প্রদীপ চাটুজ্যে শিব ঠাকুর। মঞ্চে আবেগ নিয়ে সংলাপ বলে যাচ্ছেনঃ দেখছি গাঁয়ে বাস করার ইচ্ছে তোমার নেই। যে শালা মাকে ভালবাসে না, সে শালা উল্লু। মা মাটি মানুষকে নিয়ে ব্যবসা করতে চাই তাদের ঘেন্না করি। শোন প্রেসিডেন্ট, মহিম গাঙ্গুলি! এই গ্রামে বাস করতে হলে এই গ্রামকে মায়ের মত সেবা করতে হবে। গাঁয়ে বাস করবে। মাটির ফসল তুলবে। অথচ মা মাটি মানুষকে ঘেন্না করবে তা হয় না, হয় না।
যিনি নতুন বিডিওর অভিনয় করছেন, তাঁর দিকে এগিয়ে বললেন, --দেখে আসুন, গ্রাম না বাঁচলে শহর বাঁচবে না। স্যুট বুট খুলে নেমে পড়ুন। তাই তো, তাই তো শহরের বাবুদের বলি গ্রামে ফিরে চল। এখানে অনেক কাজ। শহরে যা না পাবে, গাঁয়ে তা পাবে। এখানে পাবে, মা মাটি মানুষ।
অসীমের অভিনয় করেন উজ্জ্বল (প্রয়াত) মুখোপাধ্যায়। খলনায়কের গলায় অসীম বলে ওঠেন–সবই তোমার কাছেই শিখেছি দাদা। এই অসীম ইন্দ্রকে চাকরি দেওয়ার নাম করে শিবুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়।
আবার, ইন্দ্রকে ভ্রাতৃস্নেহে কাছে টেনে নিয়ে শিবু বলে উঠল —আমি মনে করেছিলাম তুই আমার সেই ছোট্ট ভাইটি আছিস। যাকে সাইকেলে চাপিয়ে নিয়ে বেড়াতাম। আমি যখন গাছ থেকে পড়ে গেছিলাম, তোর মনে পড়ে ইন্দ্র। ইন্দ্রের ভুমিকায় অশোক ওরফে মদন চট্টোপাধ্যায়।
ইন্দ্র- চলে এস সাবিত্রী।
ইন্দ্র- তাহলে কি বুঝবো ভাসুরের সঙ্গে তোমার? সাবিত্রী--না না। শিবু—না----
প্রদীপ চাটুজ্যের একটা স্টাইল ছিল কোন ট্র্যাজিক সিনে মুখটা একটু নামিয়ে ডান হাত দিয়ে ঢেকে অভিনয় করা। যা সত্যিই দর্শকের মনে দাগ কেটে দিত।
আবার দুলু চাটুজ্যের, মহিম গাঙ্গুলির খল নায়কের চরিত্রে অভিনয়ঃ- তোকে দেখলে বুকটা টন টন করে ওঠে। কবে আমার বাড়ি যাবি? আদুরি- যাব আর আসব। তারপরেই দৃশ্যান্তর।
মদ খেয়ে শিব ঠাকুর—যাদের মা হবে মাটি আর দেবতা হবে মানুষ।
গৌরী পুরের শিব ঠাকুরের ভাই জেলে। মহিম গাঙ্গুলীর ভাই অসীমের হাত থেকে বৌমা সাবিত্রীকে উদ্ধার, ইন্দ্রর জামিন। আর শেষে মহিম গাঙ্গুলীর বোন চিত্রাকে বিডিওর হাতে তুলে দিতেই যবনিকা পতন।
অন্যদিকে, ‘ময়লা কাগজ’ ছিল সামাজিক যাত্রাপালা। এই যাত্রায় কমেডির রোলে মদন আর খোকনের ভাগ্যধর ও ভগবানের অভিনয় ছিল হেসে লুটোপুটি খাওয়ার মত। মল্লিক এণ্ড কোম্পানী নিজেদের ইউনিফর্মে লিখে এনেছিল দুজনেই। সেটা লিখে দিয়েছিল, বলা ভাল, এঁকে দিয়েছিল শান্তনু মুখোপাধ্যায়ের খুড়তুতো এক ভাই। যাত্রা নিয়ে নিজেরা কতটা ভাবত এই ঘটনা তার উজ্জ্বল প্রমাণ। ‘গরীব কেন মরে’ যাত্রায় (সুখনা-দুখনার ভূমিকায়) এই দুই জুটির—‘থেক থেক ঝনাৎ’ সকলের মুখে মুখে ফিরত একটা সময়। তাদের সকৌতুক সংলাপের চোটে কোএ্যাক্টাররা হাসি সংবরণ করতে পারছিল না। কোএ্যাক্টার রূপেণ চট্টোপাধ্যায় গ্রীন রুমে এসে ওই দুই জুটিকে বললেন, বেশী বাড়াবাড়ি করিস না, আমাদের অভিনয় করতে অসুবিধা হচ্ছে। এই জুটির সাথে কোএ্যক্টারদের অভিনয় করা মুশকিল ছিল। হায়ারড মহিলারাও অভিযোগ করত, কি সংলাপ বলছেন, মিলছে না। ময়লা কাগজ নাটকে ভগবান ভাগ্যধর জুটিতে চাকরের অভিনয় করে মদন খোকন। এই জুটি সংলাপের বাইরে অনেকটা বানিয়ে বলত। আর কমিক রোলে ছাপিয়ে যেত সবাইকে। তাই অন্যান্যদের অসুবিধা হত। যেটা হত না দুলু চাটুজ্যের সাথে অভিনয় করে। তাঁর নিজের সংলাপ তো মুখস্থ থাকতই, তাঁর সহ অভিনেতার সংলাপও মুখস্থ থাকত। তাই নিজের সংলাপের পর সহ অভিনেতা ভুলে গেলে, ‘তুমি এটাই তো বলতে চাইছিলে তাই না—বলে তার সংলাপটা গড় গড় করে বলে দিতেন। আর এই কারসাজি দর্শক বিন্দুমাত্র টের পেত না।
‘অচল পয়সা’র মতই ‘ময়লা কাগজ’ যাত্রা খুব হিট হয়েছিল। ময়লা কাগজে হায়ার করা ফিমেলদের মধ্যে ছিলেন দুবরাজপুরের সন্ধ্যা ও ঊমা নামে দুই বোন। সন্ধ্যার অভিনয় করেন ডোরা আর বিদিশার অভিনয় করেন ঊমা। শরৎ মল্লিকের বোন ডোরা এবং ডোরার স্বামী তাপস। তাপসের ভূমিকায় অভিনয় করেন হরকিঙ্কর ওরফে খিরু মুখোপাধ্যায়। একজন মল্লিক এণ্ড কোম্পানীর অন্যতম ডাইরেক্টর। অন্যজন বিবাহসূত্রে ভাবী এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর। গেটের বাইরে ভিক্ষুকদের এঁটো পাতা নিয়ে কুকুরের সাথে মারামারির দৃশ্যকে ‘হাউ ফানি’ বলার পর তাপস বলে উঠল ঃ ক্যামেরা নিয়ে আসব মিসেস ডোরা দত্ত। তার মানে? মল্লিক এণ্ড কোম্পানির অন্যতম ম্যানেজিং ডিরেক্টার তার ওয়েল ডেকোরেটেড রুমে বসে অবসর বিনোদন করবেন। তারপর ডোরার কাছে যখন ভিক্ষে চাইতে এল নবীন চন্দ্র দাস নামে এক বাউল, তাকে দূর ছাই করে তাড়িয়ে দিতেই ডোরার দাদা হেমন্তের প্রবেশ। স্টেজের উপরে স্টেজে দাঁড়িয়ে দুর্দান্ত অভিনয় হেমন্তর। তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল এই কপট সভ্যতা। শিল্পী মন তার। প্রতিবাদে হেমন্ত বলে উঠলঃ জাস্ট এ মিনিট মাই সুইট সিস্টার। গ্রাম আজ শহরের কাছে নতজানু হয়ে ভিক্ষে চাইছে। এই দৃশ্যটা আমি ক্যানভ্যাসে বন্দী করে রাখি। হেমন্তের অভিনয় করে মিহির ভট্টাচার্য। তাপস দত্তের দাদা তপন চটকলের মিস্ত্রী। সে চাই, ভাই তাপস যেন মাস্টারি না করে, শরৎ মল্লিকের কথা মত চলে সংসারের আখের গুছিয়ে নেয়। এবিষয়ে ভাইয়ের সাথে দ্বিমত। বৌদি পারুলকে তাপস বলে, “ আত্মসুখকে আমি ঘৃণা করি। মাথায় আমার অজস্র যন্ত্রণা। মাঝে মাঝে আমার মাকে মনে পড়ে। অনেক সময় তুমি আমার মা হয়ে যাও”। ‘মল্লিক স্পিকিং’ টেলিফোনে শরৎ মল্লিক। মল্লিক এণ্ড কোম্পানীর কর্ণাধার শরৎ মল্লিকের অভিনয় করেন রূপেণ চট্টোপাধ্যায়। তাপসের বাবা সাধুচরণ এবং তাপস শরৎ মল্লিকের কথায় রাজি না হওয়ায় ক্রোধিত শরৎ মল্লিক জনান্তিকে বলে উঠলঃ একদিন তোমাকে ডাস্টবিন থেকে তুলে এনেছিলাম, আজকে আবার ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। বিদ্রোহী শ্রমিক নেতাকে ফার্নেসের গলন্ত লোহার মধ্যে ফেলে দাও। তাপসকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তপন। যাওয়ার আগে তাপস আবেগ মথিত গলায় জানায়, তাপসের তপস্যা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার বিশ্বাসকে মলিন হতে দিও না। সাধুচরণ বড় ছেলের হাতে কপাল ফাটিয়ে আকুতিতে চিৎকার করে ওঠেঃ দাদু, বৌমা, ওরে একটা আলোও কি জ্বলছে না? সেই অন্ধকারের রেশ ধরে বিবেকের প্রবেশ। তার কন্ঠ গেয়ে ওঠেঃ আলোর গাড়ি পৌঁছে গেল আঁধার ইস্টিশনে। দুঃখবাবু স্টেশন মাস্টার, নাও গো টিকিট কেনে। ডোরার মত হেমন্ত অসুস্থ। কাশির সাথে হেমন্তর মুখে রক্ত উঠছে। শরৎ মল্লিককে বিদ্রুপ করে সে বলে, আজ আমি তোমার হাতে আঁকা ছবি। সেই ভয়ঙ্কর শেষ ধাপ সিঁড়ির ছবিটা এখনো আঁকা হয় নি। ওটা শেষ করে আমি তোমাকে দেখাব, তোমার সামনে,পেছনে, ডাইনে, বাঁইয়ে তুমি আর তুমি। কঙ্কালের হাতে আংটি দেখে তাপসের চিৎকার- মায়ের কঙ্কাল মাথায় নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস মানা? শরৎ মল্লিক যখন নিজের ছেলে অংশুমানের শোকে পাগল, তখন আবার হেমন্তের প্রবেশ। তার মুখে সংলাপঃ সেই আশ্চর্য সিঁড়িটার শেষ ধাপ আমি এঁকে গেলাম। সিঁড়ির শীর্ষে তাপস। হাত তার সূর্যের দিকে। আর সিঁড়ির নিচে শরৎ মল্লিক ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।
অভিনয় শুধু অভিনয় ছিল না। ছিল জীবনও। তখন কার দিনে অনেকে শখে চাঁদা দিয়েও অভিনয় করত। সেক্ষেত্রে কম গুরুত্বপূর্ণ রোল অর্থাৎ সৈনিক বা পুলিশ কনস্টেবলের অভিনয় দেওয়া হত। গোপাল দত্তের অভিনয়ের শখ ছিল তাই তাকে ময়লা কাগজে কনস্টেবলের অভিনয় দেওয়া হয়। ১০০ টাকা চাঁদাও দিয়েছে। কিন্তু মঞ্চে উঠে সব ভুলে গেল। কিচ্ছুটি বলছে না। পুলিশ অপরাধীকে গ্রেফতার করবে। অপরাধী তো নিজে নিজে গ্রেফতার হতে পারে না। অগত্যা মল্লিক এন্ড কোম্পানির ছেলে বলল – বাবা উনি আমাদের সমস্ত কিছু ধরে ফেলেছেন। কোথায় কি আছে। তাহলে আপনি আমাদের এ্যারেস্ট করুন। গোপাল দত্তকে আর বলতেই হল না তার পার্ট। পেয়াদা এসে ধরে নিয়ে গেল।
ভিডিও দেখার জন্য এখানে ক্লিক করুন
‘ময়লা কাগজে’র মত ‘অচল পয়সা’ খুব নাম করেছিল। ময়লা কাগজে দুলু চাটুজ্যের কোন রোল ছিল না। কিন্তু ‘অচল পয়সা’য় দয়াল বাঁড়ুজ্জ্যের অভিনয় করেন তিনি। অবশ্য দয়াল বাঁড়ুজ্জ্যের চরিত্রে একবার বেচু চাটুজ্যেও অভিনয় করেন। তাঁর মুখে ‘হরে রাম হরে রাম’ করে নামাবলী নিয়ে শঠের অভিনয় দেখে- দর্শকের আসন থেকে অনেক মহিলা দর্শক তাকে- অনামুখো মিন্সে বলে গালি গালাজও করেছিল। একটা সিনে দুলু চাটুজ্যে বিবেকের অভিনয়ও করেছিলেন। তাঁর গলায় ঝুমুর গান—‘কানের পাশা হারিয়ে গেল ওই ঘোলা জলে’- এক কথায় মাত করেছিল দর্শকদের। কনসার্টের সাথে সাথে গান গাইতে গাইতে প্রবেশ পথ দিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করছেন। শান্তনু ওরফে খোকন মুখোপাধ্যায় ফটকে মিত্তিরের অভিনয় ছিল দুর্দান্ত। ফটকে মিত্তির ঝিনুককে তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ায় উন্মুক্ত পিস্তল উঁচিয়ে চাঁদু মাস্টারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছে —মাস্টারি করছেন করুন। তারপর চাঁদু মাস্টারের স্ত্রী হৈমন্তিকে দেখে তাঁর মাথাটা কেমন যেন গোলমাল শুরু করল। মনে পড়ল-- ---লাল পাড় শাড়ি, কপালে জ্বল জ্বল করছে ---না –না। তুমি শালা চাঁদু মাস্টার পরকে দেখেছ, নিজের ঘরকে দেখ নি। নাটকীয় ভঙ্গীতে সেই সংলাপ ছিল গায়ে শিহরণ জাগানোর মত। ফটকে মিত্তির চরিত্র ছাড়া সাজানো বাগানে ক্ল্যাসিক টাচ পাওয়ায় যায় বাঞ্ছারামের চরিত্রে। এই চরিত্রে কি অনবদ্য অভিনয় করেন শান্তনু ওরফে খোকন মুখুজ্জ্যে। বৃদ্ধ জবু থবু গোটামুখে পাকা দাড়ি, চোখের কোনে পিচুটি সব মিলে বাঞ্ছারামের কি সুন্দর সংলাপঃ বড় কত্তা একডা কাতমিরি শাল পেলে বড় ভাল হতো। এই অভিনয়ের পর স্বয়ং অভিনেতার চোখে জল এসে গেছিল। এই নাটকে জমিদারের চরিত্রে সুন্দর অভিনয় করেন তাপস মুখোপাধ্যায়। বাঞ্ছারামের নাতির অভিনয় করেন নিতাই চট্টোপাধ্যায়। ‘অচল পয়সা’ দুবার হয়েছিল। তার মধ্যে একবার করেছিলেন প্রদীপ চাটুজ্যে। ক্ষণজন্মা শিল্পী ছিলেন এই প্রদীপ চাটুজ্যে। ট্রাজিক নায়কের চরিত্রে তাঁর বিকল্প কোন দিন পাওয়া যায় নি।
‘অচল পয়সা’য় হায়ারড ঝুমুর দারুন অভিনয় করেছিল। পরে তিনি নট্ট কোম্পানীতে অভিনয় করেছেন। ঝিনুকের সেই অভিনয় –ও বাবা! গায়ে নেগে গেল। এক নাইনের নোক তো? আরে যাও যাও শালা ডাক্তার না ফাক্তার। গরীব বাউড়ির মেয়ে বলে ঝুমুর গাওনা গেয়ে মদ তুলে সংসার চালায় বলে কি মানুষ লই? বাউড়ির মেয়ে এক ধাক্কায় বাঁড়ুজ্জ্যে বাড়ির লোহার ফটক ঝন ঝন করে উঠবে।
দয়াল বাঁড়ুজ্জ্যের ছেলে প্রশান্তর ভূমিকায় অভিনয় করে মদন। ক্ষুব্ধ হয়ে ঝিনুকের প্রস্থানের পর প্রশান্ত চাঁদু মাস্টারকে বললেন, “ নাটকে আপনার চরিত্র তো আপনাকেই (সতী বলে) গাল দিয়ে গেল”। তার অট্টহাস্যকে দমিয়ে দিয়ে চাঁদু মাস্টারের সংলাপঃ গাল নয় প্রশান্ত। এ ওদের উত্তরণ। পতনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ওরা আজ রুখে দাঁড়িয়েছে, ওরা আজ জাগছে। ওদের মিলিত নিশ্বাসে সারা পৃথিবীতে ঝড় আসছে”। চাঁদু মাস্টারের অভিনয় করেন তুষার ওরফে বাচ্চু মুখোপাধ্যায়। তার ভরাট গলার স্বরে চাঁদু মাস্টারের অভিনয় মনোহরণ করে দর্শকের। দ্বিতীয়বার প্রশান্তের অভিনয় করেন তুষার ওরফে বাচ্চু চট্টোপাধ্যায়।
প্রশান্তের ভাই প্রসূনের ভূমিকায় অভিনয় করে ত্রিদিব ভট্টাচার্য্য। দুর্দান্ত তার সংলাপঃ রক্তাক্ত পাখিটা ডানা ঝাপ্টায়। নিষাদের চোখে মুখে বর্বর উল্লাস। পৃথিবী নিহত পাখি। ধনতন্ত্র ব্যাধ শোষণের শরে বায় অন্তিম নিশ্বাস। তারপর চাঁদু মাস্টারের হানা বাঁড়ুজ্জ্যে বাড়িতে। ‘কটা বাজে ডাক্তারবাবু? (দিব্যেন্দুকে, দিব্যেন্দুর অভিনয় করেন কুশল মুখোপাধ্যায়) আমার কথার জবাব দিলেন না যে? উনি বাঁড়ুজ্জ্যে বাড়িতে চাকরি করতে আসেন নি। উনি এসেছেন হেলথ সেন্টারে কাজ করতে। যান হাসপাতালে দেখে আসুন, লাইনে দাঁড়িয়ে রুগী কষ্ট পাচ্ছে, আর উনি বাঁড়ুজ্জ্যে বাগান বাড়ি এসেছেন চা খেতে আর গল্প করতে।
চাঁদু মাস্টারের প্রস্থানের পর দয়াল বাঁড়ুজ্জে কুচক্রীর মত বলে ওঠে —চাঁদু মাস্টার ছোট লোক গুলোকে তাতাচ্ছে। তাতাক না। ঠাকুরের কৃপায়, ওদের আমার কাছেই তো হাত পাততে হবে। হরে রাম হরে রাম—। এই নাটকে কৈলাশ বাউড়ির অভিনয় করেন সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ছিলেন সকলের প্রিয় ব্যানার্জীবাবু।
দিনে ঢাউস লাইটের মুখে লাল, নীল রঙের কাগজ ঘুরিয়ে আলোকিত করা হত দৃশ্যের চাহিদা অনুযায়ী। দ্বিতীয়বার ‘অচল পয়সা’য় চাঁদু মাস্টারের অভিনয় করেন বেচু। ভিলেনের অভিনয়ে প্রশান্ত চরিত্রে মদনের অভিনয়ে ফুটে উঠেছিল অসাধারনত্ব। মিউজিক কনসার্ট আর অন্ধকার স্টেজে স্পট আলো প্রশান্তের মুখে পড়তেই তা হয়ে উঠেছিল অনবদ্যভাবে ক্রুর। মানিয়েছিল দারুন তার গলায়ঃ চন্দ্রানিটা দেখতে বেশ মন্দ না। ওতো কেনা বই, যখন খুশি পড়ব। তার আগে ঝিনুক। বুনো বুনো গন্ধ। মাল খেয়ে যা বেয়ালা করছিল। মাত্র এক হাঁটু জল। এক বুক মুক্ত নিয়ে পড়ে আছে ঝিনুকটা। পাহারাদার ফটিক তাকে সরিয়ে, ও ঝিনুক--। সৎ ভাইয়ের অপবাদ দিয়ে বেরিয়ে যায় ভাই শঙ্কর এবং বোন চন্দ্রানী। স্ত্রী হৈমন্তীর প্রশ্নে চাঁদু মাস্টার বলেন, নিজের হাসি চুরি করে শঙ্করটাকে ডাক্তার করতে ৩ হাজার টাকা জমিয়েছিলাম। তাই আমার থেকে বোকা বোধ হয় আর কেউ নেই। অন্তিম দৃশ্যে ফটকেমিত্তির দয়াল বাঁড়ুজ্জ্যেকে কুকুরের বাচ্চা বলে চিৎকার করে ধরিয়ে দেয় পুলিশের হাতে। অনুনয় করে বলে, বিচার করুন স্যর এই দয়াল বাঁড়ুজ্জ্যের। এই আমার মেয়ের চিঠির শেষ অংশ। এই শয়তান আমার জন্মদাতা।
পাশাপাশি, ‘কনে বিভ্রাট’ বা ‘শ্রীমতি ভয়ঙ্করী’র মত যুগান্তকারী অভিনয় মঞ্চস্থ হয় বড়শালে। সব গুলোই হাসির নাটক। ‘কনে বিভ্রাটে’ পেপার রোল গড়িয়ে উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে কনের লিস্ট দেখা ছিল অভিনব দৃশ্য। ‘শ্রীমতি ভয়ঙ্করীতে’ খোকন ওরফে শান্তনু মুখোপাধ্যায় স্বামীর ভূমিকায় ‘মিলন’ চরিত্রে অভিনয় করেন। স্ত্রীর অভিনয়ে ছিলেন শ্রাবণী ভট্টাচার্য্য। আর অচিন্ত্য মুখোপাধ্যায়ও ওই একই নাটকে স্বামীর ভুমিকায় অভিনয় করেন। সেক্ষেত্রে তাঁর মুখরা স্ত্রীর ভূমিকায় শ্রীমতি ভয়ঙ্করীর অভিনয় করেন শবাসনা মুখোপাধ্যায়। এই নাটকটি দুবার মঞ্চস্থ হয়। প্রথমবার মধুরেণ নামে মঞ্চস্থ হয়। শ্রীমতি ভয়ংকরীর অন্য নাম। এই নাটকে প্রলয় শঙ্করের ভূমিকায় ছিলেন সুখেন মুখোপাধ্যায়। মাইকে এনাউন্সমেন্টের দায়িত্বে থাকতেন নিতাই ওরফে আলু চট্টোপাধ্যায়। এই নাটকে অভিনয় করেন তিনি। নাটকের শুরুতেই ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে পাঠ হয় প্রাক কথন—সেক্সপিওরের ‘টেমিংস অফ দ্য শ্রু অবলম্বনে ‘শ্রীমতি ভয়ঙ্করী’। পুরুষের চরিত্রে অভিনয় করেন অচিন্ত্য মুখোপাধ্যায়, দেবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়েরা। মুখরা মেয়ের অভিনয়ে অনবদ্য ছিলেন শবাসনা মুখোপাধ্যায়। তেমনি অভিনয় বিয়োগান্তক নাটকে। ‘অভাগীর কান্না’য় তাঁর অভিনয় ছিল মর্মস্পর্শী। ট্র্যাজিক চরিত্রের অভিনয়ে যদি প্রদীপ চাটুজ্যের নাম উঠে আসে, ট্র্যাজিক নায়িকা হিসেবে অবশ্য বড়শালবাসী মনে রাখবে শবাসনা মুখোপাধ্যায়কে। যাত্রা, নাটক, থিয়েটার মিলে প্রায় শ’খানেক চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। ব্যানার্জী বাবুরা যখন বড়শালে প্রথম এলেন, তখন বিশ্বকর্মা পুজোয় নাটক হয়। সেখান থেকেই তাঁর অভিনয় শুরু। ‘অভাগীর কান্না’য় মালা মুখোপাধ্যায় বিনতা চরিত্রে এবং শান্তনা মুখোপাধ্যায় খলনায়িকা মালতীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। সংলাপের সাথে সাথে মালতীর অভিব্যক্তি ছিল দেখার মত। মালতীঃ লাথির ভুত কথায় যায় না চেনা। দেখলে না, কি রকম ঢং করতে। ওই মেয়ের সাথে বিয়ে হলে মাথাটা কচ কচ করে চিবিয়ে খেত। সংলাপের শেষ কথাটা দাঁত চেপে দুই হাতে আঙুল মটকিয়ে অভিনয় ছিল দেখার মত। অবশ্য এই শিল্প কর্মের নির্দেশক ছিলেন অজিত চট্টোপাধ্যায়।
‘অভাগীর কান্না’ নাটকে হেড মাস্টারের ভূমিকায় খুব সুন্দর অভিনয় করেন দেবযানী মুখোপাধ্যায় (ভুটুন)। রিতা ওরফে বাচ্চি মুখোপাধ্যায়, মালবিকা চট্টোপাধ্যায় এবং মৃন্ময়ী মুখোপাধ্যায় এই নাটকে অভিনয় করেন। এই নাটকে মেয়েরা পুরুষের অভিনয় করেন। আরেকটি নাটকে দৃশ্যে মঞ্চের সামনের দিকে আঙুলে চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে স্মার্ট লেডির অভিনয় করে ভুটুন চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিলেন অনেকের। ফ্যাশন থ্রিলারের অভিনয়ে আরেক জনের নাম অনেকের মনে থাকবে। গোটা দেহ ভাঙা, যেন বল বিয়ারিংয়ের উপর দাঁড়িয়ে। মাথায় হেডফোন নিয়ে কল্যাণ মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় মন কেড়েছিলেন অনেকের। অনেকদিন পরে ওই নাটক দ্বিতীয়বার অভিনীত হলে ঠিক একই অভিনয় সলীল মুখোপাধ্যায় করেন। ‘বেকার’ নাটকের রোমহর্ষক সংলাপ হয়ত আজও অনেকের মনে আছে। বাচ্চু ওরফে তুষার মুখোপাধ্যায় বড় দাদা হয়ে বাবাকে দেখেন না। বাবা ভিক্ষে করেন। ছোট ভাইয়ের ভূমিকায় অশোক ওরফে মদন চট্টোপাধ্যায় সাম্যবাদে বিশ্বাসী। বড়ভাইঃ সুধা অভিলাষী দৈত্যগণ, যেমন সুধার বিনিময়ে বিষ পান করেছিল, তেমনি সাম্যবাদের পরিবর্তে সাধারণ মানুষ পাবে নির্যাতন।
ছোটভাইঃ দুদুটো জোয়ান ছেলে বেঁচে থাকতে যার বাবাকে ভিক্ষে করতে হয়, সে সমস্ত ছেলেদের তুমি ঘৃণা কর না বড়দা? ‘টাকার রং কালো’ নাটকে অভিনয় করেন অচিন্ত্য মুখোপাধ্যায়। দার্শনিক দিগম্বর চরিত্রে তিনি ভালোই অভিনয় করেন। তাঁর সংলাপ ছিলঃ মানুষ আজ মানব জাতিকে ধ্বংস করার জন্য যেমন মারণ অস্ত্র আবিষ্কার করতে পেরেছে, তেমনি বাঁচার সঞ্জীবনী আবিষ্কার করতে পারে নি। এই নাটকের সংবাদ বেরিয়েছিল জঙ্গীপুরের পণ্ডিত প্রেসের নিজস্ব সংবাদপত্রে। ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ নাটক চাকপাড়া গ্রামে মঞ্চস্থ হয়। সেখানে শিশু শিল্পী হিসেবে ময়নার অভিনয় করেন অচিন্ত্য মুখোপাধ্যায়। অভিনয়ের জন্য শংসাপত্রও পান তিনি। এছাড়াও ‘বাঘ’ নাটকে ফটকে চাকরের অভিনয় করেন তিনি। তিনজন মাত্র একবার অভিনয় করেন। তাঁরা হলেন অমর গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়, রমানাথ ভট্টাচার্য্য এবং নরনাথ ভট্টাচার্য্য। ‘এরই নাম সংসার’ নাটকে অমর গোপালের সংলাপ ছিলঃ ফিরে যাও ওগো বন্দিনী কন্যা সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি ছোঁয়ার সুখে নিদ্রা যাও, ফিরে যাও। সুনীল ওরফে বাবলু মুখোপাধ্যায় এবং রমানাথ ভট্টাচার্য্যের পরিচালনায় ‘ফুটপাথ’ নাটকে রাইচরণের ভূমিকায় অভিনয় করেন রমানাথ ভট্টাচার্য্য। ‘রক্তে বোনা (রোঁয়া) ধানে’ অভিনয় করেন নরনাথ ভট্টাচার্য্য। এছাড়াও বুনু ভট্টাচার্য্য, প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায়, দেবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়, মহিতোষ চট্টোপাধ্যায়, বিশ্বপ্রিয় ভট্টাচার্য্য, অমৃত গোপাল বন্দ্যোপাধ্যায়, সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও রাজীব দত্ত ভাল অভিনয় করতেন। ওই নাটকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ‘রিতা, রিতা’ বলে ডাকতে ডাকতে মঞ্চে উল্টে পড়ে যান। যাহোক আবার উঠে সংলাপও বলেন। নাটকের মান এতটুকু অবনমন ঘটে নি। এঁদের মধ্যে অনেকেই ‘মহব্বতের ইনামে’র মত অনেক নাটকে দক্ষতার সাথে অভিনয় করেন। একটি নাটকে অমৃত গোপালের নায়িকা চরিত্রে এক হায়ারড মহিলা অভিনয় করেন। তিনি বয়সে বেশ বড় ছিলেন। এই বিষয়টা নিয়ে ইয়ারবন্ধু থেকে অন্যান্যদের মধ্যে বেশ রসিকতা হয়। এক নাটকে সুপ্রীতি মজুমদার ও তুলিকা মজুমদারের অভিনয় ছিল তারিফ করার মত। ছোটদের মধ্যে উৎপল ভট্টাচার্য্য, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, হীরু মণ্ডল, রাজীব দত্ত, কল্যাণ (রায়) মুখোপাধ্যায়, বিশ্বরূপ ভট্টাচার্য্য, ধ্রুব বন্দোপাধ্যায়, দেবশ্রী মজুমদারেরা অভিনয় করেছে। তবে সামান্য। গৌতম মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রক্ষাকালী তলা, দক্ষিণ কালীতলায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। ‘ক্ষুধার জ্বালার’ মত অনেক শিশু নাটকও হত। এই নাটকে প্রম্পটার হিসেবে শান্তনু মুখোপাধ্যায় নাটকের চরিত্রে সন্তানহারা অখিলকে দিয়ে নিজের চা খাওয়ার বাসনা প্রকাশ করিয়ে নিয়েছিলেন। ট্র্যাজিক সিনে প্রম্পটারের ভূমিকায় ইতিপূর্বে এভাবে কেউ হাস্যরস আনতে পারেন নি। ভূতবাড়ির ডাঙায় ‘অচল পয়সা’য় বড়দের সাথে শিশু শিল্পী হিসেবে একটি সিনেই অভিনয় করে সে।
সকলের নামের পদবী আছে। কিন্তু কিরণ কুমারের নামের পাশে পদবী বসানো হত না। কারণ উনি যাত্রা জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। বড়শালের পাশের গ্রাম খরুণে বাড়ি। ‘এ্যান্টনী ফিরিঙ্গি’ খ্যাত অভিনেতা। তরুণ কুমারের মত যাত্রা জগতের অনেক মহারথীর সাথে অভিনয় করেছেন তিনি। তাঁর লেখা ‘জায়া যখন জননী’ রামপুরহাট টাউন হলে মঞ্চস্থ হয়েছিল। এই নাটকে গ্রামের অনেকেই অভিনয় করেছিলেন। কিরণ কুমার হয়েছিলেন রামকৃষ্ণ, রিণা ওরফে মনো চট্টোপাধ্যায় সারদা, মা কালি স্নিগ্ধা বন্দ্যোপাধ্যায়, উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় বিবেকান্দ, মদন চট্টোপাধ্যায় রামডাক্তার , শান্তনু হৃদে (হৃদয়), তুষার ওরফে বাচ্চু মুখোপাধ্যায় গিরীশ চন্দ্র ঘোষ। রাম কৃষ্ণ থিয়েটারে প্রদীপ চাটুজ্যে রামকৃষ্ণের অভিনয় করেন। গিরীশ ঘোষের স্ত্রীর অভিনয় করেন শবাসনা। অসাধারণ অভিনয় করেন এই দুজন। কিরণ কুমার নিজেই এই অভিনয়ের প্রশংসা করে যান।
বড়শালের অনেক অভিনেতাই কিরণ কুমারের কাছে যাত্রার গ্রামার হাতে কলমে শিখেছিলেন। এই নাটকের রিহার্সাল হয়েছিল মাসাধিক কাল ধরে। আগেকার দিনের মহিলারা ব্লাউজ পরতেন না। তাই ব্লাউজের একটা হাত কেটে সারদার কস্টিউম ধারণা তাঁর মাথা থেকেই বেরিয়েছিল। স্টেজ লাইট নিয়ে ফাইনাল রিহার্সাল হয়েছিল রঞ্জিত মুখোপাধ্যায়ের কাকার বাড়িতে। যাত্রার সময় এবং এ্যকশন বোঝাতে কিরণ কুমারের মুখেই মিউজিক ক্লিং-ইং -ইং তখন ছেলে ছোকরার মুখে ফিরত। ছোটদের মধ্যে অভি মুখোপাধ্যায়, তৌতিক ভট্টাচার্য্য, সোমনাথ গোস্বামী, হামু বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেন, যা ছিল মনে দাগ কাটার মত। যাত্রা নাটকের এই গৌরবময় অধ্যায় শেষ হওয়ার নয়। প্রকৃত অর্থে কোন যাত্রা শেষ হবার নয়। যেখানে ভাবি শেষ, সেখানেই আবার শুরু হতে পারে। এই পথের দেবতারা তাই নির্নিমেখ মহাশূন্য থেকে বললেন, ‘ মূর্খ বালক পথ শেষ হয় নি। দিন-রাত্রি পার হয়ে জন্ম-মরণ পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায় – তখনও ফুরায় না --- চলে –চলে—চলে – এগিয়েই। ( পথের পাঁচালি)
Subscribe to:
Posts (Atom)
Gadget
Popular
-
বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই: দেবশ্রী মজুমদার ‘বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই, যাচ্ছে ফাটি বুকের ছাতি তোমার শোকে ভাই’। ব...
-
রম্যরচনা: দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার এখন আর সেই দুটি গ্রাম না থাকলেও, আই ডোন্ট নোউ, কেউ বলে না। তবে পাড়ায়...
-
আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার বড়শাল। কোনভাবেই আজ আর তাকে প্রত্যন্ত গ্রাম বলা যায় না। এখন শহরের হাওয়া লেগ...
বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:
দেবশ্রী মজুমদার
‘বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই, যাচ্ছে ফাটি বুকের ছাতি তোমার শোকে ভাই’। বর্ষার ছাতা হারিয়ে কারো মনের অবস্থা কেমন হয়, তা কবি কালিদাস রায়ের লেখনিতে স্পষ্ট। কিন্তু বৃষ্টিই তো নাই! তার পরে আবার ছত্রবিয়োগের দুঃখ কেন মশাই!-- ফেলে যাওয়া ছাতাটা ফেরত দিতেই, এক ক্রেতা কথাগুলো আওড়ালেন। উদ্দেশ্য, সেই বিক্রেতাকেই, যিনি তাঁর ফেলে যাওয়া ছাতাটা ফেরত দিলেন। ক্রেতা হসপিটাল পাড়ার বাসিন্দা চাঁদ মণ্ডল। তাঁর হাতেও ছিল এক ছেঁড়া ছাতা। উদ্দেশ্য যাইহোক! বিধেয়, পরিচিত দোকানে ছাতাটা সারানো। সকালে বাজার সারার সাথে সাথে ছাতাটাও গা'গতরে ঠিক করে নেওয়া। সকালেই বাজারের থলের সাথে এটিকেও ধরিয়ে দিয়েছে। বাজার সেরে পায়ে পায়ে ছাতা সারানো রামপুরহাটের ভাঁড়শালাপাড়া মোড়ের এক গলিতে। সেখানেই বসেন বছর পঞ্চাশের ছোটকা মুনসরি। বাড়ি রেলপাড় লোকোপাড়া। রামপুরহাট পুরসভার-১ নং ওয়ার্ডে বাড়ি। ২৫ বছর ধরে ভাঁড়াশালার এই গলিতে ছাতা সারাইয়ের কাজ করেন। বাজার সেরে মুখে আগুন নেন এখানেই। তার পর সংসারের গপ্প সেরে বলেন, না ভাই সংসার এক্কেবারে রাবড়ির মত শুধু পাকে পাকে জমে উঠেছে। এবয়সে কাজ শুধু দেখে যাওয়া। পেনসনের টাকা তোলা। আর বেঁচে আছি, এটা প্রমাণ করতে ব্যঙ্কে লাইফ সার্টিফিকেট জমা দেওয়া। -- বেঁচে যে আছেন, তার প্রমাণের একটা জায়গা তো আপনাদের আছে। আমাদের? মনসুরির প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই চাঁদ মণ্ডল বলে উঠলেন-- তাহলে, উঠি- বলেই বৈঠক শেষ। - ঠিক আছে - বলে ছাতার কাপড় এফোঁড় ওফোঁড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল মনসুর।
ছাতা সারানোর সামগ্রী যা আছে চলে যাবে এবার। তাই স্থানীয় পিয়ারীর দোকানে আর ঢুঁ মারে নি সে। বর্ষার একমাস আগে ছাতা সারাইয়ের কাজ শুরু করেন। কোনদিন ৬০ টাকা, কোনদিন ৭০ টাকা, আবার কোনদিন কোন আয় হয় না। দুদিন আগে আড়াইশো টাকার কাজ হয়। তার মধ্যে ৫০ টাকা ছাতা সাড়ানোর সামগ্রীর খরচ বাদে, হাতে ২০০ টাকা থাকে। সেটা অবশ্য ওই একদিনই হয়েছে। পাশের খদ্দের দরকষাকষি করায় ছোটকা মুসসুরি জানান, এবার বৃষ্টি না হওয়ায় বাজার খুব খারাপ। দামদর করবেন না। আষাঢ পেরিয়ে গেল। শ্রাবন চলে এল। বৃষ্টি কই? এবার জিনিসের দাম বাড়বে।
সত্যি ছাতা সারাতে লোক কই ? আগে, ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সামলাতে পারতাম না। আর এই বৃষ্টি না হওয়ার কারণে গৃহস্থের ছাতা তোলায় আছে। বের করে নি। গল্পের ফাঁদ আর সেলাইয়ের ফোঁড় একসাথে চলতে থাকে। বলেই চললেন-- এখন তো আগের মত বেতের ঢাউস ছাতা আর পাওয়া যায় না। যে ছাতা মাথায় নিয়ে রাস্তায় চললে, কে আসছে সেটা দেখা যেত না। এখন ফেন্সি ছাতা। টেকেও কম। তবে ইতিমধ্যে কেউ কেউ বর্ষার ছাতির ছেঁড়া ফাটা বা ঘোড়া সব সারিয়ে নিয়েছেন। যারা ছাতা হারিয়েছেন এখনও কিনে ফেলেন নাই। সবাই যেন চাতকের মত ফটিক জল ফটিক জল করছে। চাষিদের মাথায় হাত। আর সেই সাথে মাথায় হাত আমারমত মানুষের! মনসুরি মূলতঃ সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ভূক্ত। গ্রীষ্মের দুপুরে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে খোলামাঠে এদের ধুনুরি হাতে লেপ বানাতে দেখা যায়। শীতের লেপ এরাই অর্ডারমাফিক দোকানে ও বাড়িতে সরবরাহ করে থাকে। নুন আনতে পানতা ফুরায় এই পরিবারের। আলাপচারিতায় বলে ফেলে অনেক কথা। কারণ এরা সোজা কথা সোজা করেই বলে। এক কথায় অভাবের সংসার। পরিবারে মোট সাত জন সদস্য। তিনটি মেয়ে। রামপুরহাটের হাজী মৌলা বক্স মাদ্রাসায় বড় মেয়ে পড়ে। এক ছেলে হোসেন মুনসুরি। ভারীর কাজ করে। বাড়ি বাড়ি জল সরবরাহ করে। তাতে যা আয় হয়, সংসারের সাশ্রয়। সম্প্রতি সরকারি প্রকল্পের আওতায় বাড়ি পাওয়ার কাগজ হাতে পেয়েছেন। তাই মনে একটু নিশ্চিন্ত ভাব। দুটাকা কেজি চাল পান। তাতেই ভাতের জোগার হয় কিছুটা। বড় ছেলে কাজ করতে পারলেও, ছোট ছেলে সুলতান মুনসুরি দুই চোখে অন্ধ। জন্ম থেকে একটা চোখ অন্ধ ছিল। পরে আরেকটাও পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যায়। তার প্রতিবন্ধী কার্ড আছে। তবে এখনও ভাতা পাওয়া যায় নি। ছাতা সারাতে সারাতে খদ্দেরের সাথে গল্প করে সময় কাটতো তাঁর। এখন সেটাও কাটে না! কাজের ফাঁকে শুধু আকাশ পানে চায়- আর বলে- আল্লাহ ম্যাঘ দে, পানি দে!!!