কোরক



ছোট গল্প কোরক
দেবশ্রী মজুমদার
হাঁসের ডিম খেতে খুব ভালো বাসে মা ও ছাওল।
ঘরে চাউল আছে। গত পরশুর তিনটি ডিম
আছে। চলে যাবে আজকে। সংসারের হিসেব
নিকেশ একদম সাফ সুতরো। এই সব সাত
সতেরো ভেবে, বাড়ির সীমানার মধ্যে ছোট্ট ফার্মে
প্রায় পঞ্চাশটি পোল্ট্রি মুরগির ছানাদের খাবার
দিতে গেল সরলা।
বাইরে পুকুর পাড়ে হাঁসের মত ঝিমুচ্ছে সরলার
একমাত্র ছেলের বাপ লখাই, ভালো নাম লক্ষণ।
বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে, কি সব ভাবছে!
পাথরকুচি দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে,
অন্যমনা হয়ে পুকুরে ঢিল ছুঁড়তে লাগলো। আর
ঢেউয়ের বৃত্তগুলোর এক এক করে গ্রীন, অরেঞ্জ, রেড বিভিন্ন জোনে হারিয়ে যাওয়া দেখতে থাকলো!
হঠাৎ জলের মধ্যে ত্যালাপিয়ার ঝাঁকের বুদবুদ
দেখা গেল। তা থেমেও গেল!
ঘরে অভাব বলতে সেরকম কিছু নেই এই পরিবারের। পুকুরে
মাছ, বাঁশের ঝাড়, জমিজমাও আছে। তবে
জমিতে নিজে চাষ করে না লখাই, বাইচো দিয়ে দেয়।
আর আছে পোল্ট্রি ফার্ম। এবার তো ধান হয় নি।
পোল্ট্রি ফার্মে নিজের মুর্গি নেই। কোম্পানি ছোট
ছোট ছানা দিয়ে যায়। খাবার দিয়ে যায়। বড়
হলে অর্থাৎ প্রমাণ সাইজের হলে কোম্পানি ৪০৭
গাড়িতে নিয়ে যায়। এক কথায় পালন করা।
লখাই, সরলাকে বলে, সারোগেট মাদার! সরলা
পুরো কথাটার অর্থ ঠিক না বুঝলেও, মাদারের
অর্থ বোঝে। তাই স্বামীর এই কথাটাই খুশিই হয়।
এই পালনের জন্য অর্থ পায়। মুরগির মড়ক
লাগলে ক্ষতি হয়। তবে খুব বেশী না। যা যায়
কোম্পানির। আর নিজের খাটুনির। সাথে
ইলেকট্রনিক বিল। দু-একটি মুরগি বিক্রিও
করে। কোম্পানির লোকেদের দু'একটা মুরগি
মারা গেছে, বলে দু'পয়সা আয় আর কি! তবে
বাড়িতে দু-একটি মুরগি খেলে তারা কিছু বলে
না।
লখাই পড়াশোনায় মন্দ ছিল না। তবে বরাবর
মুখের আগল ছিল না। এখন সেই লখাই কি
রকম ম্যারমেরে বনে গেছে। কি রকম যেন
ঝিমুনি হাঁসের মতো।
বৌ সরলা চায়ের কাপটা ঠক করে সাহানে
নামিয়ে দিয়ে বললো, শুনছো! যে হাঁসটা ডিম
পাড়তো, জ্বরেছে! বলি শুনছো! কিছু একটা
করো?
আমাদের দেশে হলে তো বলতো কোরক
লেগেছে! হাঁসের নাকের ফুটোতে একটা পালক
ছিঁড়ে দাও না ঢুকিয়ে। তাহলেই, আবার ডিম
পাড়া শুরু করবে।
বলি শুনছো? কথা খান? তোমাদের এখানে এসে
তো সব পাল্টে ফেললাম! বেলডাঙায় গেলে ভাই
দাদারা পর্যন্ত বলে রাঢ়ি দেশে গিয়ে অমন সুন্দর
কথার টান টাও হারিয়ে ফেললি! সবই কপাল!
সঙ্গে কে যাবি গোপাল? --- কপাল!
বেলা গড়িয়ে সূর্যটা দক্ষিণ দিকে বাঁশ ঝাড়ের
মাথা দিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। তবু হুঁশ
নেই তার।
আরও দু'একবার -- বলি শুনছো! শোনা গেল।
কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া গেল না এই দিক থেকে।
ছেলেটা ঢাউস মোবাইলে কি একটা সমানে
খোঁচাচ্ছে! আবার টিভিটাও খোলা রেখেছে।
সরলা ফস করে জ্বলে উঠে বললো, দুটো
একসঙ্গে চলবে না।-- বলি, ইলেকট্রিক বিলের
পয়সা কে দেবে? তোর... শূন্য স্থান পূরণ করে
জবাব দিল বংশের একমাত্র বাতি 'সমন্বয়' ---
"আমার বাপ!"
--- সে জানি! কিন্তু সংসার টা দাঁড় করিয়ে
রেখেছে কে শুনি? দেব না ঠাস করে একটা চড়!
মুখে মুখে উত্তর!
--- কি করবো? ভাল্লাগেনা। ঘরে বসে বসে বোর
হচ্ছি। বাইরে বেরোতে পারবো না। শ্লা !
ভাল্লাগেনা! মাইরি! কি একটা রোগ এল! করে
দিল লক ডাউন! লে হালুয়া! শ্লা ! করোনা!
তোর...
---- রান্না ঘর থেকে খুন্তি হাতে এগিয়ে এলো
সরলা। যেমন বাপ, তেমনি ছেলে! মুখ খারাপ
করবি না! বলে দিচ্ছি!
লখাইয়ের বাবা বিদ্যাসুন্দর চাটুজ্যের এই মহল্লায় দুর্মুখ
হিসেবে অখ্যাতি ছিল। একবার ঘোর আকালের
সময় ফসল হয় নি অনাবৃষ্টিতে! সাত সকালে
এক হাটুরে খোলা বিক্রি করতে এসেছে। বাড়ির
বৈঠক খানায় বসে আছেন লখাইয়ের বাবা
বিদ্যাসুন্দর চাটুজ্যে। ভারি রাশভারী লোক!
আবার মুখে কিছু আঁটকায় না। বাড়ি মেয়ে
বৌরা একটু সমঝে চলে। যাহোক! বিদ্যাসুন্দর
ডাকলেন লোকটাকে। তারপর ! কি বললেন? --
মুখ বিকৃত করে বললেন, সাত সকালে খোলা
নেবে গো খোলা? বলি, খোলা নিয়ে করবো? ধান
হয়েছে? ... কি ভাজবো?
লোকটা তো থ!দিগভ্রান্ত পথিক এক! তার যাওয়ার দিক ভুলে গেল!
কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে আস্তে কাঁচুমাচু মুখ
করে কেটে পড়লো।
লখাইয়ের মুখের ভৌগলিক অভিব্যক্তি অনেকটাই ওই রকম ছিল।
পড়াশোনায় ভালোই ছিল। কিন্তু 'ভাষা বিশারদ'
ছিল। তাই বান্ধবীরা তাকে এড়িয়েই চলতো। নাই
নাই করে আজ চুয়ান্ন পেড়িয়ে পঞ্চান্নর
দোড়গোড়ায়। কোন দিন কম কথা বলে নি।
লোককে জ্বালাতন করতে, আর বদ বুদ্ধিতে তার
জুরি ছিল না।

সেই ব্যাটা লখাই বাগবন্ধ! শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে
তাকিয়ে থাকে! যার জীবনে কোন দিন কোন
ট্র্যাজেডি ছিল না। সিরিয়াস মুহুর্তে, ইয়ার্কি
মারতে, 'হ্যা হ্যা' করতে তার দ্বিধা ছিল না।
শাশুড়ির মৃত্যুতে পাড়ার কোন বৌমা কতটা মুখ
বিকৃত করে কেঁদেছে, নাকের জল-- চোখের জল
এক করেছে-- কি ভঙ্গিমায় বুক চাপড়ে কি ছন্দ-
বাক্য সুর লয় রেখে কেঁদেছে । সেটা ওর নজরে
বাদ যেত না। তারপর চলতো, সুরালাপে জীবন
শৈলীতে তার অপ প্রয়োগ। মৃত বাড়িতে লখাই
সপার্ষদ উপস্থিত হলে, অনেক মহিলা প্রাণখুলে
কাঁদতেও পারতো না। ট্র্যাজিক মুহূর্তে শোকাতুর
মহিলাদের দোহারির কাজ করার রেওয়াজ
ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, কাকস্য পরিবেদনা!
বেচারা!

সেই দিন বদল হয়েছে। লখাইয়ের এই অপরাধ
আজ মার্জনা যোগ্য।
কিন্তু লখাইয়ের এ হেন আচরণ শুধু বাড়ির
লোকজন নয়, ইয়ারবন্ধুদের চিন্তার কারণ।
অনেকেই জিজ্ঞেস করে, কোন আর্থিক ক্ষতি?
সরলা বলে, কি বলবো আপনাদের, আমার
এমন কথা বলা স্বামীটি বোবা হয়ে গেল। যেন
সেই আগের মানুষটি আর নয়। আগেকার দিন
হলে বলতাম, ভুতে ধরেছে। ক্ষতি আলাদা করে
আমাদের কী হবে, বলুন? সবার যা, আমাদেরও
তা! শখে দুটো টিউশনি করতো বন্ধ আছে।
সবার তাই আছে। বলতে হয় না, এই সময়ে
পোল্ট্রি ব্যবসা রমরমা চলছে। ডাক্তাররা বলছে,
যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকবে, তাদের
করোনা কিচ্ছু করতে পারবে না। মানুষ তো
লাইন দিয়ে ২৩০ টাকা কেজি মুরগির মাংস
কিনছে। হ্যাঁ যারা সদ্য খালি হাতে বিদেশ বিভুঁই
থেকে ফিরেছে, তাদের কথা আলাদা! কিন্তু
আমার কত্তাটি নড়েও না, চড়েও না। কোরক
লাগা হাঁসের মত ঝিমোয়!
পাড়ার দু'একজন সেয়ানা বৌ অন্য দাওয়ায়
দিয়ে সরলাকে বলেছে, দেখ দিকি এটা 'টেরাই'
করে! চোখ টিপে বলেছে, এ হলো মোক্ষম
দাওয়ায়! --- বলো কি! ছেলে বড় হয়েছে! সরলা
লজ্জায় কুঁকড়ে বলে উঠলো।
তবুও কথাটা ফেলনা মনে হয় নি সরলার! হতেও
পারে বা! জীবন বিমুখ কেন হলো তার স্বামী!
ঘটনার পরম্পরায় প্রতি মুহূর্ত - ক্ষণ জুড়তে
লাগলো, যদি গোলক ধাঁধার মালায় কোন কিছু
সরিয়ে পথ টা সরল হয়! ভেবে দেখলো, মাত্র দুই
মাসে তার এই ভাবান্তর! হ্যাঁ, এই তো লক
ডাউনের আগে -- বাথরুম থেকে বেরোতেই রঙ্গ
করে বললে-- “নয়নকমল, কুঞ্চিত কুন্তল, ঘন
কুচস্থল, মৃদু হাসিনী"।
বললাম-- ভীমরতি! ও বললো- শাস্তর! কামসূত্র!

যাহোক, রাত্রে বিছানায় যাওয়ার জন্য ছটপট
করছিলো সরলা। লখাই যেমন ছিল, তেমন।
খাওয়া দাওয়া করলো বিনা বাক্যব্যয়ে। টিভি
দেখলো না। ফোনে কারো সাথে কোন কথা
বললো না। সিন্দবাদের মত কোন নাবিকের সমুদ্র
যাত্রায় নিজের জাহাজের কেবিনে বন্দী রেখেছে
নিজেকে। যদিও বা বাইরে এক আধটু
বেরিয়েছে, সেটা জল মাপতে!
রাত্রে সরলা লখাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
মাথায় বিলি কাটতে থাকলো! জানতে চাইলো
কি হয়েছে? আদি শক্তির সব রূপ ধারণ করলো
সরলা, অশ্রু বিসর্জন করলো। কোন উত্তর
পাওয়া গেল না অন্য প্রান্ত থেকে। তারপর----
অগত্যা--- বললে দাঁড়াও, দরজাটা লাগিয়ে
আসি। বুঝতে পারছি, সব পুরুষ যা চায়! ----
এবার সরলার হাতটা ধরে টানলো লখাই! ---
তারপর বললে, শোন! ওসব কিছু না। জানি,
আমার যেটুকু আছে, আরও দুঃসময় এলে, শুধু
ভাতের যোগাড় অন্তত হবে। কিন্তু সেটা আমায়
ভাবায় না। এই যে অবস্থা চারিদিকে, আমি
মানসিক রোগী হয়ে যাব সরলা। ভয়ে টিভিতে
খবর দেখি না! কোন প্রোগ্রাম দেখি না। খবরের
কাগজ পড়ি না। প্রতিদিন কতো মানুষ করোনায়
আক্রান্ত হচ্ছে জানো? মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।
নার্স, ডাক্তার মারা যাচ্ছেন, পুলিশ মারা যাচ্ছেন।
তুমি হয়তো ভাবছো মৃত্যু ভয়। মিথ্যে বলবো না।
সেটা আছে। তবে আরও এক ভয়-- একাকিত্বের
ভয়! সব সামাজিক বন্ধন ছিন্ন হওয়ার ভয়!
বিশ্বাস হারাবার ভয়! একা একটা আস্ত দ্বীপের
মত থাকার ভয়! কিছু দিন আগেও ভেবেছিলাম,
পড়াশোনা বন্ধ হলে কি হবে? আজ সেটা নেই...
একটু দম নিয়ে আবার শুরু করলো লখাই। ...
শ্লারা আক্রান্ত হওয়ার আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের
আনতে পারলোনা! এখন আনছে! আর আমরা
ধম্ম ধম্ম করে লাফালাফি করলাম! মারণাস্ত্র
আছে আমাদের। তা থাক। কিন্তু আজ নেই কোন
উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা! শুধু হরির লুট চলছে,
আগা পস্তালা! বুঝতে পারছো না, আমরা
কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না! সবাইকে
সন্দেহের চোখে দেখছি! এ এক ভয়ঙ্কর অবস্থা।
জাহাজ ডুবির সিনেমা দেখা যায় ড্রয়িং রুমে
পাখার নিচে বসে। কিন্তু ডুবন্ত জাহাজে থেকে
এটা পারা যায় না। আমি পারি না! কিচ্ছু পারছি
না! যে শ্রমিকরা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে
রাস্তার ধারে কাছে কোথাও শুয়ে, জানে না
পরের সকাল দেখবে কি না? স্টেশনে মৃত মায়ের
লাশের মুখের কাপড় সরিয়ে অবোধ শিশু বলতে
চাইছে ওঠ্, মা দুধ দে, খিদে পেয়েছে! জানো,
একজন শ্রমিক দৈনিক দুশো টাকা আয় করলে,
তার পুরোটাই ব্যয় করে দেশের জিডিপি তৈরি
করে। হ্যাঁ, তাদের ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয় না,
তাদের ইনকাম ট্যাক্স ছাড়ের দরকার নেই! এই
যে ঘরে টিভি কিনেছি, দেখছি না, এতে ওদের
টাকা আছে। ওদের টাকাতেই শিল্পপতিরা ছাড়
পায়, তবেই তা আমাদের কাছে ক্রয়যোগ্য! ওসব
তুমি বুঝবে না।

সরলা এসব কথার বিন্দু বিসর্গ না বুঝলেও,
এটুকু বুঝলো যে স্বামীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
তাই অদ্ভুত এক মুখব্যাদান করে নির্বাক হয়ে
চেয়ে রইল স্বামীর দিকে। যে দৃষ্টি থেকে স্ত্রীর
অসহায়ত্ব ফুটে বের হবার চেষ্টা করছিল বার বার!
এবার সরলাকে একটু কাছে টেনে নিয়ে বললো,
লখাই----- বলতো, আশেপাশে অনেকেই মরে
গেল! এ বাঁচার সাধ ভালো লাগবে! কি ভয়ঙ্কর,
সেটা ভেবেছো? আমরা সবাই বাঁচতে চাই,
ঝগড়া মারামারি করেও একসাথে বাঁচতে চাই।
এই শেষের কথাটা বুঝলো সরলা! স্বামীর বুকে
মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠে বলে উঠলো---
হ্যাঁ! গো! আমরা সবাই বাঁচতে চাই!! তাই যেন
হয়!

     

জামাই ষষ্ঠী --- দেবশ্রী মজুমদার

জামাই ষষ্ঠী:
দেবশ্রী মজুমদার

আমার এক প্রিয় ছাত্র, আমাকে মেসেজ
করেছিল, স্যর! আপনার আন্তর্জাতিক ছুটির
দিন এবার তো বাদ গেল!
তার এই সহমর্মিতা থাকার কথা নয়। কারণ
অদ্যাবধি সে অবিবাহিত। কিন্তু তার এই বার্তার
জন্য আমিই দায়ী। কারণ, বেশ কয়েক বছর
আগে আমার কাছে সে পড়তে আসতো, শুধু সে
কেন, অন্যান্য ছাত্র, ছাত্রী, অভিভাবকদের এটাই
জানা ছিল যে প্রায় ছয় থেকে সাত দিন জামাই
ষষ্ঠীর ছুটি থাকবে। তার প্রস্তুতি চলতো আগে
থেকে। কামাই গুলো আগে ও পরে পড়িয়ে
দিতাম। কিন্তু এনিয়ে মসকরা হতো। শেষের
দিকে কেউ কেউ আড়ালে আবডালে বলতো,
বুড়ো বয়সে জামাই ষষ্ঠী! তবুও কানে নিতাম না।
অনেকেই ঠাট্টা করে কার্তিক বলতো। ফুলবাবুর
মতো সেজে শ্বশুর বাড়ি যেতাম। চুলে পাক ধরার
পর কলপ নিতাম। কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম
প্যাঁচার নকশায় বর্ণিত-- সে এক 'উঁচুগতি
কার্তিকের মত বাউরি চুল' পরিপাটি বলা যায়!
মেজো জামাই! আদর প্রচুর! প্রথম দিকে আদি
শ্বশুর বাড়ি নদীয়ার সিলিন্দায় যেতাম!আমার
শ্বশুরের তিন সন্তান সন্ততি। তবে কাকা, কাকিমা,
জ্যেঠা, জ্যেঠিমা, খুড়তুতো শালাশালী, আত্মীয়
স্বজনে ভরপুর। মেটে আলু, চালতা, কামরাঙা,
ডালিম, করমচা, জলপাই, বাতাবি, আতা,
বিলাতি আমড়া, মৌসুম্বি, তেঁতুল গাছ, কাশীর
পেয়ারা গাছ, কলা বাগান, আনারসের বন,
তেজপাতা গাছ, সাতটি কাঁঠাল গাছ আর
কুড়িটি আমের বনের মাঝে ঘর। এই সময়
ফলের গন্ধে ম'ম করতো চারিধার। খুব হই হই
হতো। জেঠতুতো শালারা ছাড়া সবাই একটু দূরে
দূরে থাকতো। খুড়তুতো শ্যালিকার দায়িত্ব ছিল
আমার আপ্যায়নে। মাঝে মধ্যে দেখতে যেতাম
নিশ্চিন্দপুর গ্রামের আশপাশের এলাকা। দেখতে
যেতাম মজে যাওয়া ইচ্ছেমতি নদী। তার উপর
সেতুতে দাঁড়িয়ে থাকা, সে কি অনুভূতি!
সিলিন্দার নদীয়া ও উত্তর চব্বিশ পরগনার
সীমান্ত এলাকা। গোপালনগর থেকে কিছুটা
গিয়ে একবার দেখতে গেছিলাম বিভূতিভূষণ
বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। স্ত্রীর মর্মর মূর্তি! একজন
কেয়ারটেকার দেখা শোনা করতেন তখন। ঠিক
তাঁর সামনের বাড়িতে থাকতেন "পথের পাঁচালীর
হরিহর রায়ের বংশ ধর"। তাঁদের পূর্ব পুরুষদের
একজনকে নিয়ে নাকি হরিহর রায়ের চিত্রায়ন।
সেই ঘরে ওই বংশের বৌমাদের হাতে চা খেলাম
একবার। সঙ্গে জেঠতুতো শ্যালক রাজু।
কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেছিলাম হরিহর রায়,
সর্বজয়া, ইন্দির ঠাকরুন, অপু ও দুর্গার মাঝে।
আমরা যখন যায়, তখনও বেঁচে ছিলেন নব্বই
উত্তীর্ণ বৃদ্ধ। যিনি নাকি বিভূতিভূষণ
বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিয়ের গরুর গাড়ি হাঁকিয়ে
গোপাল নগর এসে ছিলেন।
ক্রমে সিলিন্দার পরিবর্তে চাকদহে শ্বশুর
মহাশয়ের নতুন বাড়িতে হতে থাকলো জামাই
ষষ্ঠী।
একুশ বছর বিয়েতে, একবারও না যাওয়া হয়
নি। মনে, আছে আমার ছোট ছেলের যখন
দু'মাস বয়স, তখনও জামাই ষষ্ঠীতে আমি
একাই গেছি। শ্বশ্রুমাতা আমায় খাওয়ালেন
চিঙড়ি মাছের মালাইকারি, ইলিশ মাছের
পাতুরি! জলপাইয়ের চাটনি! কত রকমের পদ।
সিলিন্দায় একবার ঘ্যাটকলের শাক
খেয়েছিলাম। অপূর্ব!
শ্বশ্রুমার প্রয়াত হওয়া আড়াই বছর হলো। ১৭
নভেম্বর এলে তিন বছর পূর্ণ হবে। জগদম্বার
মতো সুন্দরী ছিলেন। সব থেকে ছিল তাঁর মধুর
হাসি। ছেলের মত ভালো বাসতেন। শুয়ে থাকলে
মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। জানি, আমাদের
সমাজে শ্বশ্রুমাতা নিয়ে প্রশংসা আদিখ্যেতা
হিসেবে বিবেচিত। তবে, যেটুকু দেখেছি তাতে,
আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজির প্রথম প্রতিশ্রুতির
সত্যবতী ছিলেন না তিনি। তাঁর ক্ষেত্রে সে অর্থে
গৌরীদান না হলেও, খুব অল্প বয়সে বিয়ে
হয়েছিল। অন্যদিকে, সত্যবতীর মতো
পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী নারী ছিলেন না
মোটে। তবে, ওই ভুবন ভোলানো হাসিতেই সব
জয় করে নিতেন। সব দ্বন্দ্ব, সব দ্বেষ শেষ হয়ে
যেত।
যোগ তত্ত্ব উপনিষদে বলা আছে, যঃ পিতাঃ স
পুনঃ পুত্রো যঃ পুত্র স পুনঃ পিতা। এবং সংসার
চক্রেণ কূপচক্রে ঘটা ইব। এখন যে পিতা
জন্মান্তরে সেই হয়ত পুত্র। আবার এখন যে পুত্র,
জন্মান্তরে সেই হয়ত হবে পিতা-- সংসার চক্র
ঘুরে চলেছে কূপ চক্রে ঘটের মত। জন্মান্তরবাদ
সত্য কিনা জানিনা। যদি, সত্য হয়, তাঁকে পাব
কিনা জানিনা। তবে, এমন মা আজ নেই ভাবতে
কষ্ট হয়!
এবার তো লক ডাউন! তাই বাড়িতেই। আগের
বছর গেছিলাম, তাই হয়তো, আমার ছাত্রটি
মেসেজে সেটাই বলেছিল। আসলে অভাব! ---
অভাব অনেক রকমের! অনুভবও অনেক।
করোনা, লক ডাউন আমাদের অনেক ক্ষতি
করেছে, আরও করবে হয়তো। তবে, এদুটো না
থাকলে, এই অভাব, ভালো বাসার ফাঁক ফোকর
গুলো এত স্পষ্ট হতো না। আজ সকালে
কাজলদার একটা পোস্টে পড়লাম-- '' রক্তের
সম্পর্ক নিছক এক বায়োলজিকাল ট্রুথ"। সত্যি
মনে হলো আবার। ‘য একো জালবান্ ঈশত
ঈশনীভিঃ সর্বান্ লোকান্ ঈশত ঈশনীভিঃ। সেই
পরমাত্মা যিনি মায়াবী (জালবান), যিনি নিজের
মায়াশক্তিতে সকল জগৎ শাসন করেন। সব কী
মায়াবাদ?
ষষ্ঠীর দিন আমার মন ভালো ছিল না, বিভিন্ন
পারিপার্শ্বিক কারণে। আমার স্ত্রী আমাকেই
ষষ্ঠীর হলুদ সুতো ও কপালে টিপ দিলেন। মনে
মনে হয়তো বললেন, আমি তোমার সব!
হয়তো বা!
সত্যি স্ত্রীর বহু রূপ। একদিন ভগবান বুদ্ধ,
সুজাতাকে সাত প্রকার ভার্যার কথা বলেন। তার
মধ্যে মাতৃসমা ভার্যা, ভগ্নিসমা ভার্যা, সখীসমা
ভার্যা, দাসীসমা ভার্যা। এই প্রেক্ষিতে অবশ্য
সুজাতা চেয়েছিলেন, নিজেকে দাসীসমা ভার্যা
হিসেবে। স্ত্রীকে স্বামীর দাস। এটা অনেকেই
মানতে পারেন না। তাই--" ন স্ত্রী স্বাতন্ত্রমর্হতি"
মানতে চান না। একি কথা--- স্বাধীনতায় নারীর
কোন অধিকার নেই? অন্যদিকে, মহাভারতের
উদ্যোগ পর্বে মহামতি বিদুরের শ্লোকটি বেশ
ভালো। তার মধ্যে একটি উল্লেখ করছি--- "
পতয়ো বান্ধবাঃ স্ত্রীণাং ।। অর্থাৎ স্বামীরা স্ত্রীদের
বন্ধু। পুরোটা হলো--মেঘ পশু গণের বন্ধু, মন্ত্রীরা
রাজার বন্ধু, স্বামীরা স্ত্রীদের বন্ধু। আর বেদ
ব্রাহ্মণ অর্থাৎ জ্ঞানীদের বন্ধু।

     



(বাংলাদেশে বাউল শিল্পীর উপর আক্রমণের প্রতিবাদে...)

আম্ফান
দেবশ্রী মজুমদার
তুমি খুঁজে নাও
ভাটির দেশ, নিষিদ্ধ
যেখানে উজান
সে পথ খুঁজে নাও, আম্ফান
বাজাও বিষম ঢাক, চলুক ঝাপান!
হাতিয়া নিঝুম দ্বীপে শব্দভেদী
গর্জন ছাড়, আছড়ি পড়
সুনামগঞ্জে! চৌচির হোক লাউড় পর্বত!
মৃত্তিকা, নদী আসমানী পথ।
অঝোরে ঝরুক ঝরে
শিল্পীর দু'চোখের ধারে
প্লাবন দেখেছে সরমা নদী!
ছুঁয়ে যাও হাহাকার তট,
এই সুনামগঞ্জে, চাও যদি।

রাজা ভগদত্ত একদিন ছুটেছিল এই সরমায়
রণপোতে পালতুলে
কুরুক্ষেত্রে যাব বলে!
তাঁর ফেরার পথে বৃথা চেয়েছিল
কোন দুটি চোখ!
বিজয় মাণিক্য যবে ছুটে
এসেছিল তোমার আশ্রয়ে
লক্ষণ সেন ভয়ে ভীত হয়ে,
সেও যেন ইতিহাস হোক!
তারও পরে সুনামদি মোগল, গঞ্জ উঠিল জেগে
হারালে সুনাম কালে কালে।
শিল্পীরে তওবা বলিয়ে
কি খোঁজ? পোড়াও বাড়ি ঘর
চার দশকের সৃজন যত
বাদ্যযন্ত্র আরও কত!
রণেশ ঠাকুর শুধু নয়,
আব্দুল করিম, লালন
করেছে যে সুধা পালন
তার সুখটুকু নিলে না।
চিনলে না, চিনলে না
রাজবাড়ি পাংসায়
সাধু সঙ্গে কি খোঁজে
কুষ্টিয়া পাবনায়!
চুল দাড়ি কেটে
পুড়িয়ে ঘর, যা কিছু সব...
জড়ো করো যে ধর্ম নির্মম বাণীতে
যে ভেদ এনেছো শোণিতে
ভেসে যাবে হাতিয়ার মেঘনায়
ভাসমান হবে মৃত শব বলে
খুঁজে নেবে ঝড় থেমে গেলে
সেই আদি ধর্ম হীন মানব গ্রন্থিতে!
ভুলে যাব, যে ভেদ এনেছো শোণিতে।
তাই এসো আম্ফান !
বাজাও বিষম ঢাক, চলুক ঝাপান!
ধর্মের কাপড় ছিনিয়ে নাও,
আরো আরো কিছু দাও।
যত পুস্তক আছে এসব
ছানিয়ে নিয়ে রস
কঠিন কঠোর দণ্ডে
মানবেরে করো বশ!!

     

পরিযায়ী-- দেবশ্রী মজুমদার



পরিযায়ী
দেবশ্রী মজুমদার
বসন্তে উত্তরে উদ্ভিন্ন সবুজ পৃথিবী...
দক্ষিণে শীতের নিরন্ন হাভাতে
তোমার পরিযান সম্বৎসর ।
দেখে না কেউ, চোখে পড়ে না
চিকিৎসকের পরামর্শ ল্যাকটোজেন ট্যু, দুধের
কৌটো।
বুকে দুধ নেই সদ্য প্রসূতির,
বৃদ্ধ বাবার ইনহেলার, মায়ের প্রেসারের ওষুধ,
ছোট্ট বুলবুলি মেয়েটার বায়নাক্কা!
থাক, আড়ালে সমাহিত স্থির
শান্তিতে চৌধুরী বাড়ির রঙিন রোশনাইয়ে রাস
উৎসব...
ফের ধূসর পৃথিবী সভ্যতার ধ্বংসের পর বীজ
বুনে ধ্যানস্থ মৌনী হবে সবুজে‌ সবুজে...
তা হোক...
তার মাঝে ক'টা বছর অতিক্রান্ত হোক
রাজপথে পদাতিকের ত্রস্ত পদ
দগ দগে ক্ষত জেগে ওঠা।
বছর তিনেকের কন্যারত্নকে পিঠে পিছমোড়া
করে বেঁধে হাঁটার অভ্যেস আছে তোমার...
তোমরা গড়ো ইমারত!
আর সভ্যতার শৃংখল, তোমাদের জন্য...
হায়! সভ্যতার বিষে নীলকন্ঠ
হতে হতে তোমাদের
লীন হয়ে যাওয়া
অভ্যেস দেখে আরমোড়া ভেঙে জাগে শতাব্দীর
সকাল!
গাজিপুর, নয়ডা, দিল্লিতে
ট্যান্টালুস বয়ে আনে গাড়ির খবর-- ঘরে ফেরার
স্বপ্ন যখন এক!
লক ডাউন শেষ! এবার বাড়ি!
নিজের দেশ, গাঁ ঘর, পুকুর ঘাট-- গামছা ঘুরিয়ে
দলে দলে গা গতরে ময়লা তোলা...
না দেখা কত দিনের কত তৃপ্তি মুখ দরজার
আড়ালে
সে স্মৃতি সুখ... দর্পণের
মত স্বচ্ছ মনে হয় হৃদয়ের প্রতি কম্পনে।
তোমাদের জন্য...
ও খুড়োর কল বিশ্বাস করো না বন্ধু...
তাহলে ছিনিয়ে নেবে রাতের তন্দ্রা টুকুও অসহায়
রমণীর।
আর স্ত্রী যদি হয় সহযাত্রী,
তবে বলে রেখো, এই বেলা
কে ফিরবে, কে ফিরবে না
চলার পথে কারে চুমো দেব ঘুম সাঙ্গ করে
খেলা...
সব বলে রাখো এই বেলা।
প্রখর রৌদ্রে তপ্ত রাজপথ
তৃপ্ত উপ্ত রাজনীতি
তারই মাঝে তোমার চলার পথ!
অজস্র চক্ষু নিক্ষেপে
গড়ো আপন শর শয্যা!
কিচ্ছু করার নেই
মহামারীর ইতিহাস লিখেছো
শহরের প্রতি ইঁটে ইঁটে
আজ লিখে যাও
রাজপথে রক্ত রিক্ত হয়ে
গড়ে উঠুক হোর্ডিং তোমার আমার শবে।
যাঁরা স্মিত হাস্যে
ঠেস দিয়ে বলে
বছর বিয়োনি ঘরে
দু'চারটে গেলে
তারা খসা বলে।
মাথায় দুহাত ঠেকিয়ে
ভোটার তালিকা শোক করে তবে।
জেনো, তোমার আপন আপনি তুমি!
কেউ নয় তোমার!
হাড় ভাঙা খাটুনি
চোখ জোড়া আলুনি
বিছানো সুজনিতে
ট্যাকসোর ছাড় লাগে না তোমার!
তখনও তোমার ঝরা ঘামে পুরো আয় পায় এ
পোড়া দেশ!
যত বৈভব প্রতি ঘরে ঘরে
তার ঋণ মেটায় তোমার ঘাম
তাই এত কষ্ট তোমার, নেই কোন দাম!
তুমি পরিযায়ী! গলিত লাশের সাথে ফের ঘরে
সব শেষে
অভুক্ত মৃত লাশ হয়ে ফের পথে পথে!
মৃত শব কি জানে না শিশু!
প্রাণপণে আবরণ সরিয়ে
মৃত মায়ের মুখ দেখে যিশু।
এভাবেই অভুক্ত ভারত হাঁটে পথে
জেনো, ভারতও অসহায় তখন
তোমার সাথে সাথে!!

     

নারী ও মা



নারী ও মা

--- দেবশ্রী মজুমদার

(আন্তর্জাতিক মাতৃদিবসে)

ম্যাক্সিম গোর্কির "মা" উপন্যাসের পেলাগোয়া
নিলভোনাকে আমরা কেউ ভুলি নি। ভুলতে
পারি না তাঁর আদর্শ ছেলে পাভেল
মিখাইলভিচকে। কিন্তু মনে আছে কী মিখাইল
ভ্লাসভকে?
যে প্রতিদিন নিলভোনাকে স্বামীত্বের অধিকারে
নিদারুণ অত্যাচার চালাতো?
আসলে আমরা অনেকেই বনি চেম্বারলিনের দ্য
ফেস অফ জুডাস ইসক্যারিয়ট গল্পের সেই
চিত্রকরের নির্মাণ মুখ। শৈশবে যার মুখ ছিল দেবদূতের
মতো। কিন্তু বহু বছর পর তাঁর অসমাপ্ত যীশুর
মুখের আদলের জন্য যে মডেল পেল, আদতে
সেই একই মানুষ। যা শিল্পীর চোখে বিশ্বাস
ঘাতক জুডাস!
প্রতিদিন যে মেয়েটিকে রাস্তায় দেখি, তার জন্য
আমার অন্য চোখ, অন্য খোঁজে। তার
পোশাকের দোষ! তাই বক্ষ বিভাজিকার
ইতিউতি উঁকি মারে সন্দিগ্ধ লোলুপ!
সেও তো অনাগত মা! কিম্বা কোন পরস্ত্রী!
হায়! মাতৃবৎ পরদারেষু। সে তো পুস্তকেই আছে
পরম নিশ্চিন্তে!
মা কি? অনির্বচনীয় শব্দ- অনুভূতি! না থাক,
রক্তের সম্পর্ক। যেমন ধরুন বনফুলের ছোট
গল্প "দুধের দাম" এর কুলি ও সেই বৃদ্ধার
কথোপকথন। ----- "আমি তো তোমাকে দুধ
খাওয়ানি বাবা। সামান্য যা দিচ্ছি তা দুধের দাম
মনে করেই নাও।"
আবার ফিরে আসি সেই অনুভূতির আঁচলে।
বাবা মা! কি স্বর্গীয় অনুভূতি!
মাতরং পিতরঞ্চৈব সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ দেবতাম।
বা-- জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী। শুধু
মাত্র গর্ভধারণের কারণে তিনি পিতার অধিক।
এতো সবার পড়া।
এবার সরলীকরণের জন্য এক গল্পে আসা
যাক।--
একবার চুরি করার অপরাধে মঠের এক
পরিচারককে স্বামীজি তাড়িয়ে দেন। চতুর চোর
মা সারদার স্মরণাপন্ন হন। মা বাবুরাম
মহারাজকে বললেন, তোমরা সন্যাসী অত বোঝ
না। লোকটি গরীব। অভাবের তাড়নায় চুরি
করেছে। ওকে ফিরিয়ে নাও। বাবুরাম পড়লেন
উভয় সঙ্কটে। স্বামীজি ফের ওই পরিচারককে
দেখে রেগে উঠলেন। কিন্তু যেই শুনলেন "মা"
রেখেছেন। এই মা ছিলেন সবার মা। হেসে
ফেললেন স্বামীজি। আর বললেন, ব্যাটা
হাইকোর্ট চিনেছে। হ্যাঁ, এই হাইকোর্ট হলো মা।
আগাগোড়া যেটা বলবার বিষয়, তা হলো: মা
একজন নারী। আন্তর্জাতিক মাতৃদিবসে মনে হয়
একটি কথা। যাঁরা বৃদ্ধাশ্রমে আছেন, তাঁদের
কথা স্বতন্ত্র। কিন্তু আমাদের অনেকের ঘরে এক
একটি বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে পৃথক চৌহদ্দির
মধ্যে। সেটাও কম বেদনার নয়!
আমরা প্রায় ভুলে যায়, মাও একজন নারী!
"নারীর মূল্য" প্রবন্ধে শরৎ চাটুজ্জে কি বলেন,
একবার মনে করা যাক। ----- "নারীত্বের মূল্য
কি? অর্থাৎ কি পরিমানে তিনি সেবাপরায়না,
স্নেহ শীলা, সতী এবং দুঃখ কষ্টে মৌনা। অর্থাৎ
তাঁহাকে লইয়া কি পরিমানে মানুষের সুখ ও
সুবিধা ঘটিবে ... ।"
সেক্ষেত্রে বৈকুণ্ঠের উইলের গোকুল - বিনোদের
মা হোক! কিম্বা আপনার আমার! যে কেউ
বলতে পারেন, সান্নিধ্য না পেয়ে-- "আমি কি
তোমার ছেলে নয়? আমাকে তোমার মানুষ
করতে হয় নি?"
সেক্ষেত্রেও বোধহয় বিধাতার অন্যসময় কিছু
বলার আছে! তাই অপেক্ষা ছাড়া উপায় থাকে
না।
তবে, জন্ম থেকে লালন পালন সমগ্র ঘটনার
স্মৃতি এক বিষয়, এক আবেগ নিশ্চয়। তবে ঘটা
করে পালনের সময় অনেক ক্ষেত্রে অনাদরে
গড়ে ওঠা বার্ধক্য আমাদের দিকে তীর্যক দৃষ্টিতে
চাইবেই! এর কারণ একটাই! আদর্শ ছেলে
পাভেল মিখাইলভিচের মা নিলভোনাকে
সহজেই আমরা গৌরাবান্বিত করতে পারি! কিন্তু
ভুলে যেতে চাই মিখাইল ভ্লাসভকে যে প্রতিদিন
অত্যাচার চালাতো নিলভোনার উপর!
পুরুষের হাত ধরে আলোর পথে!
বড় কথা, তুমি পূজার্হা!
কিন্তু এখানেও যেন সেই ভাবনা
হে মানবী তুমি যতই মা হও, তুমি নারী
--- প্রজাতন্তুং মা ব্যবচ্ছেৎসি--
সন্তান ধারাকে বিচ্ছিন্ন করো না।
সত্যি! তোমার গরিমা অটুট!
প্রজনার্থং মহাভাগাঃ পূজার্হা গৃহদীপ্তয়ঃ।
স্ত্রিয়ঃ শ্রিয়শ্চ গেহেষু ন বিশেষোহস্তি কশ্চন।। (৯/২৬)।
অর্থাৎ, স্ত্রী লোকেরা সন্তানাদি প্রসব ও পালন করে
বলে তারা অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী।
তারা গৃহের দীপ্তি বা প্রকাশস্বরূপ।
এই কারণে স্ত্রীলোকদের সকল সময়ে
সম্মান-সহকারে রাখা উচিত।
বাড়ীতে স্ত্রী আর শ্রী এদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
এতো শাস্ত্রের বচন! শুধু তাতেই স্বস্তি!
অন্যথায়, সে তোমার কপালে যা জোটে জুটুক!

     

Gadget

​"নাটক" সাড়ে সব্বনাশ- দেবশ্রী মজুমদার

                             ​"নাটক"                         ​     সাড়ে সব্বনাশ ​                      একাঙ্ক নাটক : কিশলয় নাটক :...

Popular