বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার
বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই: দেবশ্রী মজুমদার ‘বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই, যাচ্ছে ফাটি বুকের ছাতি তোমার শোকে ভাই’। বর্ষার ছাতা হারিয়ে কারো মনের অবস্থা কেমন হয়, তা কবি কালিদাস রায়ের লেখনিতে স্পষ্ট। কিন্তু বৃষ্টিই তো নাই! তার পরে আবার ছত্রবিয়োগের দুঃখ কেন মশাই!-- ফেলে যাওয়া ছাতাটা ফেরত দিতেই, এক ক্রেতা কথাগুলো আওড়ালেন। উদ্দেশ্য, সেই বিক্রেতাকেই, যিনি তাঁর ফেলে যাওয়া ছাতাটা ফেরত দিলেন। ক্রেতা হসপিটাল পাড়ার বাসিন্দা চাঁদ মণ্ডল। তাঁর হাতেও ছিল এক ছেঁড়া ছাতা। উদ্দেশ্য যাইহোক! বিধেয়, পরিচিত দোকানে ছাতাটা সারানো। সকালে বাজার সারার সাথে সাথে ছাতাটাও গা'গতরে ঠিক করে নেওয়া। সকালেই বাজারের থলের সাথে এটিকেও ধরিয়ে দিয়েছে। বাজার সেরে পায়ে পায়ে ছাতা সারানো রামপুরহাটের ভাঁড়শালাপাড়া মোড়ের এক গলিতে। সেখানেই বসেন বছর পঞ্চাশের ছোটকা মুনসরি। বাড়ি রেলপাড় লোকোপাড়া। রামপুরহাট পুরসভার-১ নং ওয়ার্ডে বাড়ি। ২৫ বছর ধরে ভাঁড়াশালার এই গলিতে ছাতা সারাইয়ের কাজ করেন। বাজার সেরে মুখে আগুন নেন এখানেই। তার পর সংসারের গপ্প সেরে বলেন, না ভাই সংসার এক্কেবারে রাবড়ির মত শুধু পাকে পাকে জমে উঠ...
আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার
বড়শাল। কোনভাবেই আজ আর তাকে প্রত্যন্ত গ্রাম বলা যায় না। এখন শহরের হাওয়া লেগেছে রামপুরহাট তারাপীঠ উন্নয়ন পর্ষদের দৌলতে। তাই এখানে সেই পুরানো ঘ্রাণ আর পাওয়া যাবে না। অনেক আগে উত্তমকুমার অভিনীত সূর্য্যসাক্ষী সিনেমার একটি জায়গায় অজ পাড়া গাঁর এক দৃশ্যে মোনারপুকুর পাড়ের চলমান ছবি দেখেছি। খুব আনন্দ হয়েছে। আগে ধুলো উড়িয়ে চিত্রা, শ্যামা বাসগুলো রামপুরহাট তারাপীঠ রুটে চলত। এই গ্রাম বড়শাল। এই গ্রামকে ভাগ্নেদের গ্রাম বলা হয়। আদি বাসিন্দা বলতে গ্রামের জমিদাররা। তারপর আস্তে আস্তে খুদ্র জনপদ, বৃহৎ জনপদে পরিণত হল। গ্রামের ইতিহাস লিখতে শুরু করেছিলেন গ্রামের বাসিন্দা সুধাকিংকর মুখোপাধ্যায়। তিনি কোন কালে গত হয়েছেন। বুৎপত্তিগত হিসেবে গ্রামের নামের উৎস পাওয়া আজ মুশকিল। তবে শোনা গেছে, এই গ্রামে নাকি বড় বড় আখের শাল বসত। চলতো আখের গুড় তৈরির কাজ। আবার কেউ বলেন, বড় বড় শাল গাছ ছিল। সেই থেকেই বড়শাল। নাম যাই হোক, এই গ্রামের একটা সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে। বিশেষত নাটক,যাত্রা,থিয়েটার নিয়ে। প্রাচীনকালে প্রায় প্রতিটি গ্রাম না হলেও, অনেক গ্রাম এই সম্পদ নিয়ে গর্ব করত। বড়শাল তার ব্যতিক্রম নয়! সেই জ্বল জ্যান্ত কাহিনীর একটা রূপরেখা ফুটিয়ে তোলা আজ হয়ত সম্ভব নয়। তবুও মনের তাগিদে গ্রামের শুভান্যুধ্যায়ীদের ইচ্ছায় বন্ধু সন্দীপ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে ‘ফিল্ড নোট নিতে শুরু করলাম। গবেষণা ধর্মী এই লেখার কথক ও লেখক একজন! খুব ভালো লাগছে এই ভেবে, যেদিন থাকব না, শুধু এই কাজের মাধ্যমে খুব কাছে আসতে পেরেছিলাম জননী জন্মভূমির! এটা সবাই মনে রাখবে! আমার এই প্রচেষ্টার মূলে ছিল এক ভাবনা, এক ব্যক্তি! গোটা লেখায় তিনি কোথাও নেই! তবুও প্রতিটি অক্ষরে তীব্র এক দুঃখ অনুভূতি নিয়ে তিনি আছেন আমার ভাবনায়! তিনি আমার পিতৃদেব স্বর্গীয় মানস কুমার মজুমদার। যিনি জীবনে প্রচূর সম্মান ও ভালোবাসা পেয়েছেন। কিন্তু একসময় এই গ্রামের প্রতি তাঁর অভিমান ছিল। কারণও ছিল! ঈশ্বরের অমোঘ বিধানে তাঁর অমৃতময় প্রতিশোধ নেওয়া হল তাঁরই সন্তানের কলমে এই অমর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে!
আজও গাঁ আর মা সমান। তাঁকে ঘিরেই গ্রামবাসীর আবেগ। গাঁ নিয়ে আজও লোকায়ত কথার বিরাম নেই। আমাদের গ্রাম ‘তেমাথা’। অর্থাৎ দু’জন মারা গেলে, আরও একজন মারা যাবেন। একথার চল বা মান্যতা আজও আছে। এই লোকায়তের অজস্র শিকড়ের সন্ধান মিলবে গ্রামে। শিকড়ের নস্টালজিয়া নিয়েই তো আজকের কিশলয়দের বেঁচে থাকা। আর সে সন্ধানের পথ স্মৃতিপথ। যে পথে আজও চোখে পড়ে গ্রামের মাথায় গ্রাম্যদেবতা ও গাঁয়ের মাথারা। আজ নেই গাঁয়ের মাথারা। তে মাথা বড়শাল গ্রামের মূল স্তম্ভঃ নাটক, যাত্রা ও থিয়েটার। নাটকের আদিকথা হলঃ বাক্যং রসাত্মকং কাব্যম। অর্থাৎ বাক্য রসাত্মক হলেই কাব্য। কাব্যেষু নাটকং রম্যম। অর্থাৎ কাব্যের মধ্যে নাটক সুন্দর, নাটকই শ্রেষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, তটের সহিত তরঙ্গের মৃদু সংঘাতেই নদীর জলে ঐক্যতান সুর বাজিয়া ওঠে। সেইরূপ শ্রোতা ও লেখকের মধ্যে একাত্মবোধ হতেই উচ্চাঙ্গ নাটকের জন্ম। তাই নাটক সামাজিক সাহিত্য। নট-নটী, নাট্যকার ও প্রেক্ষক এই তিন লইয়ায় এই নাটক, যাত্রা, থিয়েটার। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ বেশীরভাগ নট নটী, প্রেক্ষক পরলোকগত। নাট্যকারকে আমরা সংলাপের মধ্যে পেতে পারি। কিন্তু সেই সময় সেটা সত্যিই সুদূর পরাহত। সকল নটনটী, সময়, পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কালের চক্রে অসম্ভব। চেষ্টা করতে ক্ষতি কী? দেখায় যাক না, মহাকালের যে আবরণ ইহজগতের উপর বিস্তার করে আছে, তা সরিয়ে কিছু দেখার সৌভাগ্য হয় কিনা?
চুপ! সরে এস। নবাব আসছেন আলেয়া।
---নবাব? এই অন্ধকারে? বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার মহান অধিপতি।
কনসার্ট! তোমার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব। তুমি বলেছিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীদের কিছুতেই প্রশ্রয় দিও না। তুমি বলেছিলে সুযোগ পেলেই, তারা এ দেশ কেড়ে নেবে। আমি তাদের প্রশ্রয় দেব না। আমি বেঁচে থাকতে তোমার রাজ্যে তারা দুর্গ তৈরী করতে পারবে না। সৈন্য সমাবেশে সক্ষম হবে না।
পিন ড্রপ সাইলেন্স বলতে যা বোঝায়। বড়শালের ভূত বাড়ির ডাঙ্গায় থিয়েটার। ড্রপসিনে পড়ে থিয়েটার। গ্রামের অভয় মুখোপধ্যায়ের আঁকা সিন ও ড্রপ সিন। গ্রামেরই কড়ি ডাক্তারের বাড়িতে সংরক্ষিত থাকত এই ড্রপ সিন এবং ভেতরের সিন। এই সিন ছিল মূলতঃ দুই -জনপথ এবং বনপথ। সামাজিক এবং ঐতিহাসিক নাটকে দরজা, জানালা, শেকল আঁকা ড্রপ সিন। আর গিরি রঙের বন পথ, গাছপালা আঁকা সিন। সবই ঘটনার সাথে মানানসই। সিরাজদ্দৌলা থিয়েটারে মঞ্চে দৃশ্যমান জনপথ। রাজ পোশাক আর মাথায় উষ্ণীষ ঝলমল করছে নবাবের। অভিনয় করছেন থিয়েটারের অভিনেতা, প্রযোজক, নির্দেশক অজিত চট্টোপাধ্যায়। ডাক নাম দুলু।
মঞ্চের কিছুটা পিছনে আলো আধাঁরিতে হাসির আওয়াজ –কে কে? কে তুমি? কে তুমি? তোমার নাম? তোমার পরিচয়? প্রশ্ন কৌতূহলী নবাবের।
আর পরিচয় কলঙ্কের কালিতে ঢাকা পড়েছে জনাব। আলেয়ার উত্তর। আলেয়ার অভিনয় করেন একজন পুরুষ। নাম অলোক, সম্পর্কে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্যালক। (তখন পড়াশোনার জন্য থাকতেন ডাম্বল চট্টোপাধ্যায়দের বাড়িতে।) ---কি বলে তোমায় ডাকব? আলেয়া। নবাবের প্রশ্ন। আলেয়া বলেই ডাকবেন জাঁহাপনা। আবার হিল্লোলিত হাসি।
নবাব বলে উঠলেন--এমন মিষ্টি হাসি, তুমি কেমন করে হাস?
আলেয়ার বিস্মিত প্রশ্ন-- হারেমে কি এমন হাসি কি কখনও শোনেন নি জনাব।
নবাবের স্বীকারোক্তি- না।
কোন নর্তকীর? কোন বেগমের?- জানতে চাইল আলেয়া।
নবাবের সখেদ উত্তর- বেগমরা হাসতে জানে না। নর্তকীরাও না। সারা বাংলাদেশে কেউ হাসতে জানে না, বাঙালি জানে শুধু কাঁদতে।
আলেয়ার সপ্রতিভ প্রশ্নঃ দেশব্যাপী এই কান্নার কি কোন কারন নেই, জাঁহাপনা?
নবাব কৈফিয়তের ভঙ্গীতে জানতে চাইলেনঃ কি কারন? আমার অত্যাচার? আমার অবিচার?
আলেয়া বলে উঠল--আমি তা বলিনি ----
সরস্বতী পুজোর লাগোয়া সময়। মাঘ মাসের শেষ, ফাল্গুনের শুরু। ধান ঝাড়াইয়ের পর শুরু হত এই থিয়েটার, যাত্রা, নাটক। মাথায় থাকত চটের সামিয়ানা। মাঝে মাঝে বড় বাঁশ তাকে তুলে ধরে থাকত। বড়শালে থিয়েটার শুরু হয় আগে। সংস্কৃতির স্বর্ণযুগে ছিল বোদ্ধা দর্শকও। হালকা শীতে গায়ে কাপড় জড়িয়ে লীন হয়ে যেত দর্শকের আসনও। সবাই তখন এক একজন অভিনেতা। প্রথমে পুরুষেরাই ফিমেলের অভিনয় করত। দু’একজন গাঁয়ের মহিলা ‘সুবর্ণলতা’র মত সাহসীনি হয়ে বাড়ির চৌকাঠ পেরোতে সমর্থ হয়েছিল, তাদের মধ্যে একজন বেলা চট্টোপাধ্যায়। এটা একরকম দুঃসাহস ছিল। অজিত চট্টোপাধ্যায় এবং কুমারীশ চট্টোপাধ্যায়ের দৌত্যেই এই অসাধ্য সাধন হত। কারন সবার ধারণা ছিল, যাত্রা, থিয়েটার, নাটক করলে বাড়ির মেয়েদের বিয়ে হবে না। বেলা রানি ছিল সে অর্থে পথিকৃত। শুধু বড়শাল নয়, কোটাসুর ছাড়াও বেশ কয়েকটি জায়গায় অভিনয় করেছেন। আজকের দিনে বাড়ির মেয়েদের অভিনয়ের জন্য ভিতরে বাহিরে সে লড়াইটা করতে হয় না।
মঞ্চে আলেয়া আর সিরাজদ্দৌল্লার কথোপকথনের মাঝে লুতফার প্রবেশ। ঐতিহাসিক পালায় একজন পুরুষের বামা কণ্ঠের আদল বা ঢং এনে অভিনয় করাটা শুধুমাত্র ছাই দিয়ে দড়ি পাকানোর মত। লুতফার অভিনয়ে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। কি চমৎকার অভিনয়।
--জাঁহাপনা। নবাব-- লুতফা তুমি এই সময়ে? এখানে? হারেমে নর্তকীদের নিরস গান শুনে, কুৎসিত নাচ দেখে ঝিমিয়ে পড়েছিলুম। হঠাৎ যেন শুনতে পেলুম দাদুর কণ্ঠস্বর। ছুটে এলুম এইখানে। আমি যেন দেখতে পেলুম সিংহাসনে তিনি বসে রয়েছেন। চোখে মুখে দারুণ উৎকণ্ঠা। আমি তাকে বোঝাতে চাইলুম, আমি কর্তব্য বিমুখ হব না। কে যেন হেসে উঠল। চেয়ে দেখলাম দাদু নেই। সিংহাসন শুন্য। এই নাটকে তারা প্রসন্ন মুখোপাধ্যায় ওরফে কড়ি ডাক্তার করেন আলিবর্দীর অভিনয়।
পাক্কা তিন ঘন্টার নাটক। কিন্তু দর্শকের টুঁ শব্দটি নেই।
গোলাম হোসেনের অভিনয় করছেন রায়দের শান্তি। পুরোনাম শান্তি মুখোপাধ্যায়। পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধ। কনসার্টে বাজছে যুদ্ধের দামামা। মঞ্চের পিছনে ফাটছে দো’দমা ফটকা গোলার আওয়াজে। গোলাম হোসেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না আসন্ন পরাজয়। মীরমদনের অভিনয়ে রূপেণ চট্টোপাধ্যায় আর মোহনলালের ভুমিকায় দীপক। কালিদাস মুখোপাধ্যায়ের অসাধারণ অভিনয় সিম্ফ্রে ওয়াটসের। দীর্ঘকায় কালিদাসকে মানিয়েছেও দারুণ। জগত শেঠের অভিনয়ে সনৎ দত্ত। রায়দুর্ল্লভের ভূমিকায় বেনু চট্টোপাধ্যায়। নির্দেশক অজিত চট্টোপাধ্যায় নিজের হাত দিয়ে টেনে মঞ্চে অন্যান্য কুশীলবদের স্থান ঠিক করে দিতে দিতে সংলাপ বলে চলেছেন-- কাল যুদ্ধ। আলেয়া ! যদি আর ফিরে না আসি।।।
এদিকে নিজের ক্ষোভকে সংযত করে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলেছে নিজের গলায় গোলাম হোসেন--- - জাঁহাপনা! জয় নিশ্চিত জেনেও, যে সেনাপতি শত্রুকে আক্রমণ করে না, দূরে দাঁড়িয়ে শত্রুর তারিফ করে, হয় সে উন্মাদ, না হয় বিশ্বাসঘাতক।
কাছে গিয়ে গোলাম হোসেনকে মঞ্চের সামনে নিয়ে এসে নবাব বলে উঠলেন-- আমি সব জানি, সব বুঝি। তবুও বাধ্য হয়ে মীরজাফরকে খাতির করি। তোমরা বিরক্ত হও। আমি নিজের উপর নিজে বিরক্ত হই। কিন্তু কি করব গোলাম হোসেন। উপায় নেই। উপাই নেই।
মীরমদন যুদ্ধের খবর দিতে ছুটে আসা মাত্রই—তাকে জায়গা দিতে জায়গা পরিবর্তন করে তাঁর অর্ধ সমাপ্ত কথার রেশ ধরে বলে উঠলেন নবাব-- আমি জানি কি হয়েছে। যুদ্ধ বিরতির আদেশ পেয়ে আমাদের সৈন্যরা বিশ্রামের আয়োজন করছিল –ইংরেজদের হঠাৎ আক্রমণে, সৈন্যরা চারিদিকে ছুটে পালাচ্ছে, মোহনলাল তাদের ফেরাতে পারছে না। মীরজাফর ক্লাইভের শিবিরে। রায়দুর্লভ আর ইয়ারলতিফ-দূরে দাঁড়িয়ে ইংরেজদের রণ নৈপুণ্য দেখছে।
এখন গোলাম হোসেন? আদেশ করুন জাঁহাপানা, বললেন গোলাম হোসেন। ‘যে আদেশ করত, অনুমতি দিত। সে আর আমার মধ্যে নেই বন্ধু। পলাশীর প্রান্তরে লজ্জায় ঘৃণায় সে আত্মহত্যা করেছে। মুর্শিদাবাদে ফিরে এসে করজোড়ে সকলকে অনুরোধ করেছি, আমাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে। রাজকোষ উন্মুক্ত করে দিয়েছি। কিন্তু দিনান্তে দেখলুম, যারা অর্থ নিল, তারা আর ফিরল না। যারা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিল, তারা আর কাছে এসে দাঁড়াল না। আবার মুর্শিদাবাদে ফিরে আসব। রাজ্য পাব, সিংহাসন পাব। পাত্র মিত্র ,পারিষদ সব পাব। নকীব আবার নাম হাঁকবে, বন্দী গান গাইবে। দেশ বিদেশ থেকে আসবে নানা উপঢৌকন, আবার যুদ্ধ হবে, রাজ্যের প্রসার হবে-অ্যাঁ কি? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি। কি সব বলছিলুম—অভিনেতা অজিত চট্টোপাধ্যায়ের নবাবের অভিনয়ে দর্শক তখন অভিভূত। বান্দা বলে, নফর বলে কত অপমান তোমাকে করেছি বন্ধু। আমাকে তুমি ক্ষমা করো।
----জাঁহাপনা যতদিন বেঁচে থাকবেন, গোলাম হোসেনকে বান্দা বলে জানবেন।
এরপরের দৃশ্যে নবাবকে নিয়ে কৌতুক ঠাট্টা তামাসা সাধারণ প্রজাদের।
নবাব সখেদে বলে উঠলেন-- ভাই সব তোমাদের এই পরিহাস নির্মম। কিন্তু নিরর্থক নয়। সত্য পরিহাস যোগ্য। আমি যদি নিশ্চিন্তে দিন কাটাতে চাইতুম, তাহলে কাহারো সাথে আমাকে দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হতে হত না। কিন্তু আমি তা চাইনি। চাইনি বলেই কি আমি তোমাদের বিচারে অপরাধী? বর্গী হামলার সময় নবাব আলিবর্দীর সমরে দিবসে নিশীথে আমিও কি ছুটে ছুটে যায় নি? আমার হাতের অস্ত্র কি মারাঠা দস্যুদের দ্বিখণ্ডিত করে নি --তারই পুরস্কার কি এই ছিন্ন পাদুকা? তারই পুরস্কার কি এই তস্কর লভ্য লাঞ্ছনা?
--হাজার হাজার সৈন্য পুতুলের মত দাঁড়িয়ে রইল। আর পরাজয়, আর কে পিছন থেকে এসে সবার কপালে লাঞ্ছনার কালিমা মাখিয়ে দিয়ে গেল? তার কৈফিয়ত কে দেবে? কোথায় তোমাদের সিপাহশালার ? কোথায় তোমাদের সেনাপতি ইয়ারলতিফ? কোথায় তোমাদের সেনাপতি রায়দুর্ল্লভ? ডাক তাদের। দাও তাদের দন্ড।
শেষ দৃশ্যে যবনিকা পতনের আগে তার জাত চিনিয়ে গেলেন অজিত চট্টোপাধ্যায়। নবাব অনেকের চোখে জল এনে দিয়ে আবেগ ঘন কণ্ঠে বলে উঠলেনঃ তাই যদি সত্য মনে কর, তোমাদের সাথে অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধ , তাহলে এস ভাইসব আর একবার চেষ্টা করে দেখি, পলাশীর প্রান্তরে যে রত্ন আমরা হেলায় হারিয়ে এসেছি। বঙ্গজননীর কনক কিরিটে তা আবার পরিয়ে দিতে পারি কিনা।
আঃ আঃ আঃ মহম্মদি বেগ, তুমি আঃ দিলে না শেষ চেষ্টা করতে, ওরা আমাকে দিলে না। বাঁচতেও দিলে না আমাকে। সুখে থাক ভাই সব। তোমাদের হতভাগ্য নবাবের বক্ষ রক্তে সব অশান্তি ধুয়ে যাক। --যবনিকা পতনের পর করতালিতে ফেটে পড়ল দর্শককুল যা মঞ্চের সামনে থেকে হাগর ভট্টাচার্য্যের বাড়ির বাহির দরজা পর্যন্ত বিস্তৃত। তেঁতুল তলা আর কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের পাউঠিতেও কম লোক বসত না। সেই তেঁতুল গাছ আজ আর নেই।
অজিত চট্টোপাধ্যায়, কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় সহ অন্যান্যদের রিহার্সাল বসত ক্লাবে। আর পার্বতী ভট্টাচার্য্যের গোয়াল বাড়িতে অর্থাৎ বর্তমানে সতীনাথ ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে। মোটামুটি গোটা গ্রামের লোক বসত। সামনে গরু থাকত। আর উপর নিচে থাকত গ্রামের দুই যুবক ফুচু ও নারু। তারা পড়াশোনা করত। যাত্রা হত শীতকালে। তার প্রস্তুতি নেওয়া হত আড়াই থেকে তিন মাস আগে। দুর্গোৎসবের মতই ছিল যাত্রা উৎসব। এই সময় যারা গ্রামের বাইরে থাকতেন তারাও আসতেন। যাত্রা ঘিরে ছিল চরম উন্মাদনা। দুপুর থেকে মঞ্চের আগে চলত চট দিয়ে জায়গা ঘেরার প্রতিযোগিতা। বাড়ির ছোটরা জায়গা ঘিরে রাখত। এনিয়ে ঝগড়াও কম ছিল না। স্কুল থেকে ফিরেই দেছুট ভূতবাড়ির ডাঙ্গায়। ঘুটিংয়ের উপর চট। চটের তলায় হাত ভরে ঘুটিং তুলে ফেলে জায়গা ঠিক করে থিতু হয়ে বসা। যাত্রার ঘন্টা বাজলে কেউ উঠত না।
বরাবর দুটো বই হত। কেউ একটিতে নাম ভূমিকায় থাকলে, অন্যটাতে পেত ছোট রোলে। রিহার্সাল কঠোর অনুশাসনের মধ্যে হত। প্রায় মাস তিনেক আগে থেকে চলত পার্ট কপচানো। গোটাটাই দুলু চাটুজ্যের তদারকিতে। সন্ধ্যে ৭ টা থেকে রাত্রি ১০টা পর্যন্ত চলত রিহার্সাল। ছোটদের অর্থাৎ মদন, খোকনদের ডিউটি ছিল শতরঞ্জি পেতে ধুপ জ্বেলে দেওয়া। রিহার্সালের জায়গা পবিত্র জায়গা হিসেবে দেখা হত। হুটহাট লায়েকের মত ঢুকে যাওয়া বা বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। কয়েকটা উদাহরণ শুনলে বোঝা যাবে ‘ডিসিপ্লিন’ কেমন ছিল তখন। অল্প বয়সী ছেলে ছোকরাদের একটা বিড়ি খেতে অনেক দূরে যেতে হত। কোন কারনে তুষার ওরফে বাচ্চু, খোকন, ছোট হীরু, বড় হীরু বাইরে গেছে। দেরী হয়েছে আধ ঘন্টা। কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় (বেচুর বাবা) বলে উঠল, পায়ে চটি দেখেছ। পা থেকে মাথা অবধি ছিলে দেব। কেউ কিছু বলতে পারল না। ভয়ে তাদের আত্মারাম খাঁচা। দুলু চাটুজ্যে সামাল দিতে বললেন, আরে ছেলে চ্যাংড়ার ব্যাপার একটু আধটু বাইরে যাবে না। তাই হয়। একটু শান্ত হও। একটা যাত্রায় একটি সিনে বেলা ও বেচুর জড়িয়ে ধরে একটা প্রেমের দৃশ্য ছিল। প্রতিদিন সেটা কুমারীশ চাটুজ্যে (বেচুর বাবা অর্থাৎ বেলার শ্বশুর মহাশয়) এটা করাতে চাইতেন, আর বেচু বলতেন ঠিক আছে ওটা একেবারে স্টেজে হবে। কিন্তু করতে হত। সিরাজদ্দৌলা নাটকে বেনু চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেছিলেন রায়দুর্ল্লভের। রিহার্সাল চলছে। কুমারীশ চট্টোপাধ্যায়ের নজর সবার উপর। প্রম্পট করছে কাশী অর্থাৎ দেবীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। রায়দুর্ল্লভের কিছুতেই কৈফিয়ত উচ্চারণ হয় না। বার বার বলছেন কৈফত। আর যায় কোথা। কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় অগ্নি শর্মা। বলে উঠলেন- বামুনের ছেলে, কৈফিয়ত উচ্চারণ হয় না। বলে কিনা কৈফত? এই বলে কষে একখানা থাপ্পড় মারলেন বেনু চট্টোপাধ্যায়ের গালে। কাঁদতে কাঁদতে বাইরে বসে পড়ল বেনু। এখনকার দিনে হয়ত এই অনুশাসন ভাবাই যায় না। এভাবেই যাত্রার সমস্ত রির্হাসাল হত অত্যন্ত নিষ্ঠাভরে।
পুরানো দিনের যাত্রার কোন ছবি প্রমাণ হিসেবে নেই। তবে বর্তমানকালের নাটকের দৃশ্যের ছবি দেওয়া হল। গ্রামের মেয়েদের নিজের হাতে তৈরী করেন বেলা চট্টোপাধ্যায়ঃ
সিরাজউদ্দৌলা, গঙ্গাপুত্র ভীষ্ম, বাঁশের কেল্লায় অভিনয় করেন অজিত চট্টোপাধ্যায়। ‘দ্বিতীয় পানিপথ’ ঐতিহাসিক পালায় আদিল শাহের ভূমিকায় অভিনয় করার কথা ছিল অজিত চাটুজ্যের। তাই বাঁশের কেল্লায়, তাঁর অভিনয় করার কথা ছিল না। মালদার লাল বাথানির রূপেন ওরফে বেচু (রূপেন) চট্টোপাধ্যায়ের র মাসির ছেলে কালি সাধনের, বিশু মণ্ডলের অভিনয় করার কথা ছিল। কিন্তু ছোট রোল হওয়ায় সে অভিনয় করতে চায় নি। মাত্র দুটি সিনের রোল। কে করবে! তাই অগত্যা অজিত চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেন। বিশু মণ্ডল অত্যাচারিত চাষি। ব্রিটিশ গুলি করে মেরে দিয়েছে তার নাতি বাদশাকে। শিশু শিল্পী মিহির ভট্টাচার্য করেছিলেন নাতি বাদশার অভিনয়। নাতির মৃতদেহ কোলে নিয়ে দর্শকের অনেকের চোখে জল এনে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন অজিত চট্টোপাধ্যায়। ওই নাটকে রুপেণ চট্টোপাধ্যায় (বেচু) অভিনয় করেন তিতুমিরের। এই বাঁশের কেল্লায় সেনাপতির ভূমিকায় ছিলেন দীপক। ইংরেজদের কামানের গোলায় মারা যাবে। হিসেব মত বোমার আওয়াজের সাথে সাথে সেনাপতি মাটিতে পড়ে যাবে। বোমে আগুন দেওয়া হল দু’দুবার। কিন্তু ফাটল না। মঞ্চে তিতুমীর ঈশারা করে সেনাপতিকে পড়ে যেতে বলল। ঈশারা মোতাবেক মাটিতে পড়ে যেতেই, তিতুমির বলে উঠল—আমরা হেরে যাচ্ছি ভেবে, তুমি কি বিষপান করে মারা গেলে সেনাপতি। যদিও মূল নাটকে বিষপানের কথা ছিল না। অনোন্যপায় হয়েই এই প্রত্যুৎপন্নমতি। দ্বিতীয় পানিপথে বৈরাম খাঁর চরিত্রে অভিনয় করেন সন্তোষ চট্টোপাধ্যায়, হিমুর ভূমিকায় রূপেণ ওরফে বেচু চট্টোপাধ্যায় এবং ছোট্ট আকবরের ভূমিকায় অভিমূন্য ওরফে মন বন্দ্যোপাধ্যায়।
পৌরাণিক পালা গঙ্গাপুত্র ভীষ্মের অভিনয় করেন অজিত চট্টোপাধ্যায় ওরফে দুলু। তার তখন বয়স ২৭-২৮ বছর। পরশুরামের অভিনয় করে কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় (বেচুর বাবা, কুমারীশ ওরফে শঙ্কর চাটুজ্যে)। অম্বা বেলা চাটুজ্যে। রামী চন্ডীদাস নাটকে অরুণ মুখোপাধ্যায়ের বন্ধু চিতু রামীর অভিনয় করেছিলেন অসাধারণ। শঙ্কর বলে পরিচিত কুমারীশ চট্টোপাধ্যায় নামাবলী গায়ে গেয়েছিল ‘রাই কিশোরী তোমার কানু যায় মথুরায়”। কনসার্টের তাল মিলিয়ে সেই গান শুনে সেদিন বেশীরভাগ দর্শক মুগ্ধ হয়েছিল। আরেক পৌরাণিক পালা উপেক্ষিতায় দাস রাজের ভূমিকায় অভিনয় করেন বটকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। উপেক্ষিতাতে অম্বার ভূমিকায় বেলা, অম্বালিকায়- অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্যালক অলোক এবং ভীষ্মের ভূমিকায় দুলু চাটুজ্যে। ভীষ্মের সেই উদাত্ত কন্ঠ - ত্যাগ ধর্ম বড় ধর্ম। পৃথিবীর সর্বসুখ বিসর্জন ব্রহ্মচর্য করিনু সার। আজি হতে পৃথিবীর সকল রমণীরে মাতা বলি করিব অর্চনা।
‘ বাগদত্তা’ আর ‘উপেক্ষিতা’য় দুটোতেই অভিনয় করেন বেলা চট্টোপাধ্যায়। যাত্রাতে দুটো রাস্তা থাকত। এক দিকে প্রবেশ। আরেকদিকে নিষ্ক্রমণ। গ্রীন রুম থেকে ছুটে আসা সে দৃশ্য রোমকূপে শিহরণ জাগানো। এই নাটকে বাংলার নবাব তুঘরিল খাঁর অভিনয় করেন অমৃত শেখর মুখোপাধ্যায়। সামাজিক যাত্রা পালা ‘কয়েদী’তে উল্কার অভিনয় করেছিলেন বেলা চাটুজ্যে। তাঁর স্বামীর অভিনয়ে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। ছেলে হয়েছিল অবনী বন্দ্যোপাধ্যায়। এই নাটকে অভিনয়ের পর বাড়িতে ফিরে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন বেলারানি চাটুজ্যে। এই ‘কয়েদী’ নাটকে বাংলার রাজা আনন্দ রায়ের অভিনয় করেন অমৃতশেখর (লারু) মুখোপাধ্যায়। ‘ফেলারাম ডাকাত’ যাত্রায় গফুর ডাকাতেরও অভিনয় করেন তিনি। মহারাজ নন্দকুমার থিয়েটারে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মহারাজার অভিনয় হয়েছিল দেখবার মত। মহারাজার রানীর ভূমিকায় ছিলেন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্যালক অলোক। অভাগীর কান্না ছাড়াও নন্দরাণীর সংসারে নন্দরানীর অভিনয় করেন বেলা চাটুজ্যে। নন্দরানীর স্বামীর অভিনয় করেন অজিত ওরফে দুলু চাটুজ্যে। বেলা চ্যাটার্জী ছাড়াও, বানী, নমিতা মুখোপাধ্যায়ও সুন্দর অভিনয় করতেন। সামাজিক পালা দেবদাসে অভিনয় করেছেন সন্তোষ চট্টোপাধ্যায়। আর তার প্রেমিকার অভিনয় করেন আরেক পুরুষ চরিত্র প্রদীপ চাটুজ্যের কাকা নীতু। দেবদাসের নায়িকা পারুর চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন তিনি। কালিদাস মুখোপাধ্যায়, খুরখুরির স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় ভালো অভিনেতা। এক নাটকে মিস্কিন ফকিরের অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন স্বপন।
পৌরাণিক যাত্রা পালা শ্রী রাম চন্দ্র। মঞ্চে ঠিক যেন শ্যাম দূর্বাদল ঘনশ্যাম রামচন্দ্র। পিঠে ধনুক। পিতৃসত্য পালনে বনবাস বেছে নিয়েছেন। সেদিন পঞ্চানন মুখোপাধ্যায়ের রাম চন্দ্রের অভিনয় আর তার সংলাপ শুনে মন্ত্র মুগ্ধ হয়েছিলেন অনেকেই। দীর্ঘাঙ্গী শ্যাম দূর্বাদল গাত্র উন্নত নাসিকা আর অভিনয় দেখে অনেক মহিলা দর্শকের মত শিপ্রা মুখোপাধ্যায় (তিপু) কপালে হাত ঠেকিয়েছিলেন। তখন মাত্র পনের বছর বয়স তাঁর। বারোর সামান্য কয়েকমাস বেশী বয়সে শিব কিঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের ঘরে বৌ হয়ে আসেন তিনি। আজও সেই কথা বলতে বিভোর হয়ে যান সত্তরোর্দ্ধ মহিলা।
আরেক পৌরাণিক যাত্রা পালায় তরণী সেন বধের দৃশ্য। গ্রামেরই বংশীধর মুখোপাধ্যায় অভিনয় করছেন তরণী সেন চরিত্রে। যখন অন্তিম দৃশ্যে তরণী সেন বধ হল, তখন বংশীধর মুখোপাধ্যায়ের মা অশ্বীনীধারী দেবী মঞ্চে উঠে গেলেন। আরে থামো থামো! কে কার কথা শোনে। চিৎকার করে বলতে থাকেন, ওরে আমার ছেলেকে মেরে দিলে? বংশীধর মুখোপাধ্যায় তাঁর একমাত্র ছেলে। যাত্রার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়ে এমন আচরণ সেদিন করেছিল এক মাতৃ হৃদয়। একাত্ম হওয়ার ঘটনার বহু সাক্ষী বড়শালের রঙ্গ মঞ্চ। যেমন কয়েদী যাত্রায় বেলা চট্টোপাধ্যায়ের উল্কার অভিনয়ে দেখে সাজ ঘরে ছুটে এসেছিলেন অভয়াপদ ভট্টাচার্য। বলেছিলেন, মেয়েটাকে একবার দেখব। আগে যে দেখেন নি। তা নয়। অন্যান্য দর্শকের মত মঞ্চস্থ নাটকের সাথে একাত্ম হয়ে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলে উঠেছেনঃ ভাসুর চিনলে না বাবা। এখন কাঁদলে আর কি হবে। এই নাটকে কালো সওয়ারের চরিত্রে অভিনয় করেন রূপেন চট্টোপাধ্যায়।
অভয়াপদ ভট্টাচার্য্য অভিনয় খুব ভালো করতেন। বিসর্জন নাটকে রঘুপতির অভিনয় করেন অভয়াপদ। অসাধারণ তাঁর অভিনয় ক্ষমতা। রিহার্সালেও ছিল না কোন খামতি। অজিত চাটুজ্যে যেমন ড্রেসিং টেবিলের সামনে বা গোয়ালে গরুর দেখাশোনা করতে করতে সংলাপ বলতেন। অভয়াপদ ভট্টাচার্যও তাই করতেন। প্রাতঃকৃত্য করার সময় রঘুপতির চরিত্রে তাঁর কণ্ঠ শোনা যেত—‘দে ফিরায়ে জয়সিংহে মোর। দে ফিরায়ে। দে ফিরায়ে রাক্ষসী পিশাচী’।
এই নাটকে রাজা গোবিন্দ মাণিক্যের ভূমিকায় অমৃত শেখর মুখোপাধ্যায় এবং রঘুপতির ভূমিকায় অভয়াপদ ভট্টাচার্য্যের সংলাপ বাঙ্গময় হয়ে উঠেছিল নিজ নিজ বাচন ভঙ্গিতে। গোবিন্দ মাণিক্যঃ নিষেধ করেছি বলি, সেই অপরাধে মাতা চলে গেল রোষভরে এই তোরা করিলি বিধান। দণ্ডে দণ্ডে ক্ষীণ শিশুকে স্তন্য দিয়া বাঁচায়ে গেলে মাতা। সেকি তার রক্তপান লোভে?
রঘুপতিঃ মূঢ তুমিই শুনেছ দেবীর ডাক! আমি শুনি নাই? লক্ষ লক্ষ বৎসর যে রক্ত করেছেন পান, আজই অরুচি?
গোবিন্দমাণিক্যঃ করে নি পান। মুখ ফেরাতেন দেবী শোনিত পাতে। এই নাটকে অপর্ণা চরিত্রে জলি ওরফে টুটু মুখোপাধ্যায় সারাজাগানো অভিনয় করেন। অপর্ণাঃ জয়সিংহ! কোথা জয়সিংহ? কেহ নাই এ মন্দিরে। তুমি কে দাঁড়াইয়ে আছ অমর মুরতি? বিসর্জন নাটকটি মঞ্চস্থ হয় বড়শাল উচ্চবিদ্যালয়ে। বড়শালে বঙ্গে বর্গীতে নারী চরিত্রে অভিনয় করেন অভয়াপদ। এছাড়াও অভিনয় করেন পঞ্চানন মুখোপাধ্যায়, বংশীধর মুখোপাধ্যায়, বলরাম বন্দ্যোপাধ্যায়, শিব শেখর মুখোপাধ্যায়ের ভাড়াটে অরুণ বন্দোপাধ্যায়। অভয়াপদ ভট্টাচার্য্যের সম্পর্কে বেয়াই নেপাল মোড়লও ছিল মহিলার অভিনয়ে সমান পারদর্শী।
এক নাটকের দৃশ্যে বিধবার অভিনয়ে নেপাল মোড়ল। তখনকার দিনে বিধবাদের চুল কাটা থাকত। দর্শকের আসনে বংশীধর মুখোপাধ্যায়। মঞ্চে অভিনয় চলাকালীন চিৎকার করে বলে উঠলঃ ‘হারে নারি তোর চুল কই’। আর সাথে সাথে হাসির রোল। তবে তাতে অভিনয়ে কোন প্রভাব পড়ে নি। কপাল কুণ্ডলায় কাপালিকের অভিনয় করেছিলেন অভয়াপদ ভট্টাচার্য্যের দাদা তারাপদ ভট্টাচার্য্য। দা নিয়ে বলি দিতে যাওয়ার দৃশ্য আর সংলাপ বলার ভঙ্গিমা আজও অনেকে মনে রেখেছেন।
গ্রীন রুমে তোলা ছবিতে
বড়শালের মানুষের কাছে যাত্রা ছিল প্রাণ। একটা বাড়ি খুঁজে পাওয়া ছিল ভার যে বাড়ি থেকে কেউ অভিনয় করেনি। পুকুরে মাছ ধরা হত। থাকা খাওয়া, রান্না বান্না। দুর্গাপুজোয় এতটা হত না। পুরুষ অভিনেতারা থাকত ক্লাবে। মহিলারা দুলু চাটুজ্যের বাড়িতে। তাদের বাইরের ঘরটা ছেড়ে দেওয়া হত। কনসার্ট, ড্রেসার এবং পেন্টাররা তিনদিন ধরে বড়শালে থাকত, খেত। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চৌকি জোগাড় করে তৈরী হত স্টেজ। রেল থেকে পেট্রোল এক্স পেঁচানো লাইট। শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ওরফে লালু মুখুজ্যে ছাড়া ওই ডে লাইট জ্বালাবার কোন লোক ছিল না গ্রামে। সে গফুর ডাকাতের অভিনয় হোক বা ‘একটি পয়সা’ যাত্রাপালার বদ্রী প্রসাদ হোক, যখনই তাঁর নজরে পড়ত আলোর ঘাটতি, অভিনয় করতে করতে দুবার পাম্প দিয়ে দিতেন। মুখে সংলাপ চলছে—মঞ্চের মেঝেতে হ্যাজাক নামিয়ে ‘কক কক’ করে দুহাতে সমানে পাম্প চলছে। হিন্দী ভাষী বদ্রী প্রসাদ সংলাপের ফাঁকে ঝুলন্ত পেট্রোম্যাক্সের হ্যাজাকে পাম্প দিলে দর্শকের কোন আপত্তি ছিল না। যা হত যাত্রার স্বার্থে। যাত্রার স্বার্থেই অমৃত শেখর মুখোপাধ্যায় ওরফে লারু মুখুজ্যে এবং দুলু চাটুজ্যে জিয়াগঞ্জ যেতেন বনমালী পেন্টারকে বায়না করতে। অমৃত শেখর মুখোপাধ্যায়কে রাজার অভিনয়ে মানাত বেশ। আর অভিনয়ও করতেন খুব সুন্দর। উদ্যমী মানুষ হিসেবে নিজের স্কুল বড়শাল উচ্চ বিদ্যালয়ে অন্যান্য শিক্ষক ও ছাত্রদের সাথে বড়শালের মদন ও খোকনদের নিয়ে যাত্রা করাতেন। তাঁর বন্ধু গোপালপুরের জগন্নাথ সাহা খুব ভালো অভিনয় করতেন। এক নাটকে ফেলারাম চরিত্রে অভিনয় করে তাক লাগিয়ে ছিলেন সকলকে। যাইহোক প্রতিবার লারু মুখুজ্যে এবং দুলু চাটুজ্যে ট্রেনের টিকিট কেটে ট্রেনে জিয়াগঞ্জ পৌঁছাতেন। গোটা দিন কাটাতে হবে। হাতে পয়সা নেই। খুঁজেপেতে বাসি সিঙ্গারা খেয়েছে তারা, যাতে অম্বল হয়ে জল খেয়ে সারাদিন চলে যায়। তখনকার দিনে যাত্রায় সাড়ে তিন হাজার খরচ বিশাল ব্যাপার। পাল ড্রেসার, বনমালী পেন্টার, আর আছে ফিমেলের পারিশ্রমিক।
দুলু চাটুজ্যের ছেলে অশোক ওরফে মদন চট্টোপাধ্যায় আর শ্যাম মুখুজ্জ্যের ছেলে শান্তনু মুখোপাধ্যায় ওরফে খোকন নায়ক থেকে খলনায়ক, ভাঁড় সমস্ত ধরণের অভিনয়ে তাদের পারদর্শিতা দেখে মুগ্ধ হয় নি এমন লোক খুঁজে পাওয়া ভার। এমন এক দৃশ্যে ‘মদন’ মরা সেজেছে। বাঁশের চাঙে বাঁধা তাঁর মরদেহ। কেঁদে গড়াগড়ি দিচ্ছে খোকন এবং অন্যান্যরা। আবার সৎকার্যের জন্য চাঁদাও তোলা হচ্ছে। এভাবে বাঁড়ুজ্যে বাড়ির সামনে রাস্তার ধারে অর্থ জোগাড় করা হত যাত্রার জন্য। মঞ্চের বাইরেও এরা অভিনয় করে মানুষকে মুগ্ধ করেছে জাত অভিনেতাদের মত। তখন নতুন জামাইদের কাছে চাঁদা নেওয়ার একটা চল ছিল। গোটা রাত মেয়ের বাড়িতে খাটা খাটুনি, বরযাত্রীর সেবা ফরমাইশ খাটার পর নতুন বরের কাছে চাঁদা। সেখানেও অস্ত্র ছিল বাক চাতুর্যতা আর তুখোড় অভিনয়। মঞ্চে লিপিবদ্ধ সংলাপ ঘটনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আওড়ে যেতে হয়। এখানে তাৎক্ষণিক সংলাপে অপরিচিত লোকের কাছে টাকা আদায়। তারপরে মেয়ের বাড়ির অনুরোধ উপরোধ তো আছেই নতুন জামাইকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য। বুদ্ধদেব চাটুজ্যের মেয়ের বিয়ে। খোকন গলায় রুমাল বেঁধে নামকরা কুখ্যাত গুণ্ডার ভূমিকায়। পার্ষদরা তাঁর মহিমা নতুন জামাইয়ের কাছে এমনভাবে তুলে ধরলেন, যে টাকা পেতে বেগ পেতে হল না। যাত্রার জন্য গাছ কেটে বিক্রি। আর ড্রেসিংএ বসে- খোকনের চিৎকার- আরে মদনা তোর চাঁদাটা দিয়েছিস তো? তখন কার দিনে ৫টাকা আদায় করা কঠিন ছিল। তাঁদের রাত জাগা। ভোর বেলায় কেউ চলে যাওয়ার আগে তাঁর কাছ থেকে চাঁদা নিতে হবে, অভিনয় করা ছাড়াও এসব মাথায় রাখতে হত।
কমেডির অভিনয়ে বড়শালের সূর্যকান্ত ভট্টাচার্য্য আর পাশের গ্রাম বেলের বিকাশ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলতে গিয়ে আজও সেই দিনের দর্শক হো হো করে হাসে। উপানন্দের ভূমিকায় অচ্যুতানন্দ মুখোপাধ্যায় ওরফে মেলাই মুখুজ্জ্যের অভিনয় ছিল বেশ ভালো। এই দুই রথীর অভিনয় নিয়ে এক মজার ঘটনা আছে। সূর্য্যকান্ত ভট্টাচার্য্যের একটি সংলাপে আপত্তি ছিল অচ্যুতানন্দ ওরফে মেলাই মুখোপাধ্যায়ের। সেই মোতাবেক সূর্য্যকান্ত ভট্টাচার্য্য ওই অংশটুকু বাদ দিয়ে প্রতিদিন রিহার্সাল দিতেন। কিন্তু সূর্য্যকান্ত ভট্টাচার্য্যের মনে দুরভিসন্ধি ছিল, বন্ধুকে ফাইনাল খেলায় বধ করার। মঞ্চে যখন সংলাপ বলার সময় এল অবলীলা ক্রমে বললেনঃ বেশী বেশী ফটর ফটর করবি তো এক চড়ে মুতাই ফেলুম না। হালার পাঁঠার বাচ্চা! ব্যস আর যাই কোথা। সাজঘরে ফিরে এসেই যাত্রায় আর নামবেন না বলে ঘোষণা করলেন মেলাই মুখুজ্জে। রেগে গিয়ে মেলাই মুখুজ্জ্যে সূর্য্যকান্ত ভট্টাচার্য্যকে বলছেনঃ বলেছিলাম না, হালার পাঁঠার বাচ্চা বলা যাবে না। সূর্য্যকান্ত তখন মুচকি মুচকি হাসছেন।
সূর্যকান্ত ভট্টাচার্য্য ও বিকাশ কুমার চট্টোপাধ্যায় দুর্দান্ত অভিনয় করেন বাগদত্তায়। শ্রীদামের অভিনয়ে সূর্যকান্ত ভট্টাচার্য এবং গান্দার মা অর্থাৎ তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় বিকাশ কুমার চট্টোপাধ্যায়। সূর্যকান্ত ভট্টাচার্য্য বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে হাসিয়ে পেটের খিল ধরিয়ে দিতেন। তাঁর সেই ‘গান্দার মাকে, গান্দার মাও’ ডাক বেশ সাড়া ফেলেছিল গোটা গ্রামে। এমনকি আজও প্রয়াত সূর্য কান্তের স্ত্রী বিকাশ চট্টোপাধ্যায়কে দেখলে রসিকতা করে বলেন, “এসো, আমার সতীন”। তাঁর স্ত্রী হিসেবে অভিনেত্রী বিকাশ চাটুজ্যে কম যান না। এমনিতেই তাঁদের ক্যারিকেচার দেখে হাসির গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তার মাঝেই বাঙাল মেয়ে মানুষের গলায় বিকাশ চাটুজ্যে বলে উঠলেনঃ “মানুসডা যে সেই হাত সক্কালে, পান্তা মুহে দিয়া চইলা গেল, এহেন ফিরে আওনার নামটা নাই। থাকত আজ আমার গান্দার বাপটা, মজাডা টের পাইয়া দিতাম। দেহি মুরগিগুলা খুপরায় ঢুকল কিনা, দেহি”। বাগদত্তার এই দৃশ্যে দর্শক তখন মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। সেটা প্রায় পাঁচ মিনিটেরও বেশী। দুলু চাটুজ্যে গ্রীন রুমে পরের অভিনেতাদের উদ্দেশ্যে বললেন, এখন কাউকে পাঠিও না। কারন দর্শকের হাসির রোলে কেউ কোন অভিনেতার কথা শুনতে পাবে না। অতএব মিউজিক হোক। গোপালপুর গ্রামে বেগম যাত্রায় অভিনয় করেন বিকাশ চাটুজ্যে। তখন এই দুই অভিনেতার বয়স ২৬-২৭ বছর।
তাদের যোগ্য উত্তরসূরী অমল ওরফে চাঁদ চট্টোপাধ্যায়। গলার আওয়াজ বিকৃত করে ‘পাঁচ পয়সার পৃথিবী’ যাত্রায় মহেশ বেতো রুগীর ভূমিকায় অমল কুমার ওরফে চাঁদ চট্টোপাধ্যায় অভিনয় ছিল খুব হাসির। এই যাত্রায় মহেশের স্ত্রী মণিমালার ভূমিকায় করেন শান্তনা মুখোপাধ্যায় (চট্টোপাধ্যায়)। দুজনের সংলাপ ছিল অনেকটা এই রকম। মহেশঃ ওরে বাবারে! পাঁজরে ব্যাথা! পায়ে ব্যাথা! মণিমালা! মণিমালাঃ মণি বলতে পার না। মহেশঃ মনে থাকে না। চেষ্টা করব। মণিমালাঃ চেষ্টা করব কি গো? আজকাল তো নাম ছোট করে বলার চল হয়েছে। এই নাটকে বিজন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সুন্দর অভিনয় করেন জ্যোতিষীর ভূমিকায়। মণিমালার হাত দেখতে থাকার সময় এক চরিত্রের (কল্যাণ মুখোপাধ্যায়ের) প্রবেশ। কোন কারনে এক পাতার পর পঁচিশ পাতার সংলাপ বলতে শুরু করেছেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই পার্শ্ব চরিত্রের অসুবিধা হবেই। মণিমালার হাত দেখতে দেখতে জ্যোতিষী সংলাপ বললেনঃ হ্যাঁ হাত তো ভালো। দিন ভালো যাবে। ওঃ হুঁ হুঁ ১ পাতার পার্টে ২৫ পাতার পার্ট! ভুলে গেলে বুঝি! হেঁ হেঁ ! দর্শকরা বুঝতে পারল না। বুঝল মঞ্চের পাত্র পাত্রীরা। বিজন বন্দোপাধ্যায় এক নাটকে হিলতলা জুতো পড়ে মহিলার অভিনয় করে গ্রাম মাত করেন।
যাত্রা, থিয়েটার, নাটকের পীঠস্থান বড়শাল। পৌরাণিকের পাশাপাশি অনেক ঐতিহাসিক, সামাজিক যাত্রা হয়েছে বড়শালে। এক যাত্রায় মহারাজ সিন্ধিয়ার অভিনয় করেন গুরুকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ( সম্পর্কে মৃন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাকা)।সেনাপতি রঘুপন্থের অভিনয় করেন অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায়। এরকম অনেক ভালো ভালো যাত্রা নাটক পরিবেশিত হয়েছে এই গ্রামে। তবে ব্যাড প্যাচ অর্থাৎ খারাপ সময় যাত্রা নাটকের জীবনেও আসে। সেই সুবর্ণ যুগেও এসেছিল শাহজাহান যাত্রা মঞ্চস্থ হওয়ার সময়। এর আগেও কড়ি ডাক্তার শাহজাহান। আর জাহানারার ভূমিকায় বলরাম বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথম দিন ফ্লপ হওয়ায়, পরের দিন পুনরায় অভিনীত হয় শাহজাহান। পরের দিন জাহানারার অভিনয় করেন বিকাশ চট্টোপাধ্যায়। তৃতীয়বারের জন্য ফের ‘শাহজাহান’ যাত্রাপালা নিয়ে একটা হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার ছিল। কিন্তু ফ্লপ হয়েছিল। দেবীপ্রসন্ন ওরফে কাশী চট্টোপাধ্যায় যাত্রা পার্টি অর্থাৎ ফিমেল, ড্রেসার, কনসার্ট এসব ঠিক করেছিলেন। রিহার্সাল চলছে। সকলের মাঝে বললেন, “পার্টি যে আসছে দাঁড়াতে পারবে না তোমরা। ভালোভাবে পার্ট মুখস্থ থাকতে হবে। শাহজাহান ক্যাসেট শুনতে হবে। কস্টিউম ওরা নিয়ে আসবে। পার্ট কাস্টিং হয়ে গেছে”। তারপরেই অশোক চট্টোপাধ্যায় অর্থাৎ মদনের উদ্দেশ্যে বললেন, আচ্ছা, মদন শোলেমান পারবা? করতে? উত্তরের অপেক্ষা না করেই নিজেই বলে উঠলেন, ‘পারবা না’। নাছোড়বান্দা সোলেমান বলে উঠল, “হ্যাঁ, কাশীদা পারব”। সোলেমান পর্ব শেষ হতেই, শুরু হল মুহাম্মদ পর্ব। শান্তনু মুখোপাধ্যায় ওরফে খোকনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে স্বয়ং ঔরঙ্গজেব বললেন, ‘তুমি হচ্ছ মুহাম্মদ। ঔরঙ্গজেবের ছেলে’। তারপর মুহাম্মদের সংলাপ আওরাতে লাগলেন, ‘ভাইজান ভাইজান!’ তারপর নিজেই বলে উঠলেন, ‘এই দৃশ্য পারবি না’। শান্তনু ওরফে খোকন সুযোগ ফুকলে যাচ্ছে দেখে, দ্বিগুণ উৎসাহে বলে উঠল, “পারব পারব!” ঐতিহাসিক যাত্রায় সামান্য রোল। তাই সামাজিক পালায় একটা ছোটোখাটো রোলের ইচ্ছে প্রকাশ করতেই, কাশী মুখোপাধ্যায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলে উঠলেন, এই রোলের পর আবার সামাজিক পালায়! যেন অসম্ভব কিছু চেয়ে ফেলেছেন!
এবার একটু সাজ ঘরের দিকে উঁকি মারা যাক। অত্যুৎসাহী ক্ষুদে দর্শকদের মধ্যে অনেকে সাজঘরে উঁকি ঝুঁকি মারছে। মঞ্চ থেকেও সাজঘরের গল্প কম আকর্ষনীয় ছিল না। যাত্রার জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব করতেন দুলু চাটুজ্যে। কনসার্ট বসে গেছে। তিন বারের বেলায় ফাইনাল কনসার্ট পড়ার পর যাত্রা শুরু হবে। মদন আর খোকন সাজ ঘরে ঢুকে দেখে, তাদের রাজকীয় পোশাক বেদখল। প্রশান্ত (প্রয়াত)চট্টোপাধ্যায় আর টোটোন মুখোপাধ্যায় দুজনেই সৈন্য। সৈন্যের ভূমিকায় --শুধু হুজুর। তারা রয়্যাল ড্রেস পরে বসে আছে। সাজ কৈ? খোকন, মদনকে বলছে, আমাদের সৈন্য মারতে হবে। প্রশান্ত দাঁত মুখ খিচিয়ে বলে উঠল, একেবারে বিরাট অভিনেতা!! তারা পোশাক কিছুতেই খুলবে না। অন্যদিকে, অচ্যুতানন্দ ওরফে মেলাই মুখোপাধ্যায় বাইরে বিড়ি খেয়ে সবে সাজ ঘরে ঢুকেছেন। মঞ্চে তখন বাবার অভিনয়ে বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য। অত্যন্ত স্পষ্ট উচ্চারণ করে সংলাপ বলতেন বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য। এবার মঞ্চে ছেলে হিসেবে মেলাই মুখোপাধ্যায়ের প্রবেশ আসন্ন। তাই ঢুকেই বললেন, আমার পাগড়ি দে। পাগড়ি কোথায়? মদন খোকনের পাজামা খুঁটিয়ে দেখছেন তিনি। মুতের গন্ধে ভরপুর এক ধুতিকে পাগড়ি করে দেওয়া হল। ক্ষিপ্ত হয়ে মেলাই মুখোপাধ্যায় বলে উঠলেন, ‘কিছুতেই নামব না। মুতের গন্ধে ভূত পালায়”। কিন্তু এদিকে বাবার ভূমিকায় বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্যের সাথে ছেলের ভূমিকায় মেলাই মুখোপাধ্যায়ের কথোপকথন হবে। কিন্তু কিছুতেই ছেলে ঢুকছে না। অগত্যা ‘বাবা’ই ছেলে ও বাবা দুজনের সংলাপ বলে চললেন। খুব কায়দা করে যাকে বলে ‘স্টেজ মেকাপ’ দিলেন বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য।
একবার হায়ার করা ফিমেল ভরাডুবি করেছিল শাজাহান যাত্রার। জাহানারা যিনি করবেন, তিনি আসেন নি। তাই তার জায়গায় অন্য মহিলা, যার সংলাপ মুখস্থ থাকা তো দূর অস্ত চরিত্র সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই। বিশাল দেহী পুরুষালি চেহারা। সবার কানাকানি, এই বোধ হয় জাহানারা। প্রশ্ন করতেই ওদের একজন জানাল, জাহানারা এখনও ঠিক হয় নি। মা- বলছে কি রে? সম্পর্কে নাতি খোকনকে ফিস ফিস করে বললেন দুলু চাটুজ্যে। এবার জাহানারা নিজেই প্রশ্ন করে বসল, আচ্ছা, জাহানারা সধবা না বিধবা? এবার কপালে চোখ তুলে ফের দুলু চাটুজ্যের বিস্ময়াভূত প্রশ্নঃ মা- বলছে কি রে?
যা অনুমান করা গেছিল, তার চক্ষু কর্ণ বিবাদ ভঞ্জন হল মঞ্চে। প্রম্পটারের কথা শুনে শুনে পার্ট বলছে। তাও যদি ঠিক ঠাক শুনত। প্রম্পটার দুষ্ট বললে, জাহানারা শুনছে দুশমন। ঔরঙ্গজেবকে ঔরঙ্গজীব বলে চলেছে বার বার। আর তা শুনে মঞ্চে চরিত্র ঔরঙ্গজেবের নাজেহাল অবস্থা। প্রথম সিন পচে যাওয়ায় , সব সিন ঝুলে গেল।
শাহজাহানে সুজার অভিনয়ে সতীনাথ ভট্টাচার্য্যের অসুস্থতার কারণে যাত্রার মাঝপথে নামতে হয়েছিল তুষার ওরফে বাচ্চু মুখপাধ্যায়কে। মাঝপথে অভিনয় কি করে সম্ভব? কারণ তখন রিহার্সালটা খুব মন দিয়ে করানো হত। যারা শুনত, তাদের মুখস্থ হয়ে যেত। তাই তুষার মুখোপাধ্যায়ের কোন অসুবিধা হয় নি। এই যাত্রায় জল্লাদ জীহন খাঁর অভিনয় করেন প্রসন্ন ওরফে স্বপন চট্টোপাধ্যায়। দারাকে বধ করতে মঞ্চে তার আগমন ঘটেছিল। দারার ভূমিকায় অভিনয় করেন অমৃত শেখর ওরফে লারু মুখোপাধ্যায়, যশোবন্ত সিংহের ভুমিকায় বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য। অভিনয় ছিল প্রাণবন্ত।
শাহজাহান যাত্রায় প্রম্পটারের কাছে দাঁড়িয়ে জাহানারা নিষ্প্রাণ সংলাপ বলে চললঃ প্রজা যদি নির্দয় হয়, সম্রাট কি তাকে পুত্র বলে ক্ষমা করবে? শাজাহান বলে চলেছে —এ ভয়ানক রাজনীতি কি করব? যুদ্ধ তার প্রয়োজন হয়েছিল। আমি শুধু ভাবছি, এই ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধে কাজ নেই। না না না । নির্বিরোধের রাস্তা নিয়ে আসতে দাও, আমি তাদের বুঝিয়ে বলব। দারা- আদেশ দিন সম্রাট, আমি সিংহাসনের প্রত্যাশী নয়। আমি তাদের বন্দী করে পিতার পদতলে আনব। সম্রাট পারলে তাদের ক্ষমা করবেন। কিন্তু তারা জানুক, সম্রাট স্নেহশীল, কিন্তু দুর্বল নয়।
জাহানারা- কার আজ্ঞায় দুর্গ অধিকার করেছ? মহম্মদ- পিতার আজ্ঞায়।
শাহজাহান—আমি তোমার পিতার পিতা। তোমার পিতা যদি তার পিতার প্রতি অত্যাচারী হয়, তুমি কেন তার আজ্ঞাবহ হবে?
ঔরঙ্গজেবঃ চলো মহম্মদ মক্কায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও।
ঔরঙ্গজেব-ভগিনী। জাহানারা – চমৎকার। ঔরঙ্গজীব, আমি তোমার প্রশংসা না করে পারছি না। এতক্ষণ আমি বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে ছিলাম। যখন আমার চমক ভাঙল, তখন আমি সব কিছু হারিয়ে বসে আছি। চমৎকার!
ঔরঙ্গজেব আশ্বস্ত করে বলল- যত দিন সিংহাসনে থাকব, তোমার এবং পিতার কোন অসুবিধা হবে না। কুর্নিশ করে জাহানারার প্রস্থান—আবার বলি ওরঙ্গজীব চমৎকার! জাহানারার সমস্ত অভিনয় ছিল নিষ্প্রাণ, থেমে থেমে আর ভুল উচ্চারণে ভরা। যা সহ অভিনেতাদের দফারফা করে ছেড়েছিল।
পরের দিন সনৎ দত্তের বাড়ির পিছনের মাঠে সবাই বসে আগের দিনের যাত্রা শাহজাহান নিয়ে আলোচনা করছে। ফ্লপ হওয়ায় সকলের মন খারাপ। আলোচনা হচ্ছেঃ একটা মেয়ে আসে নি। সেই কারণে একজনকে দিয়ে ডবল রোল করে ঝুলিয়ে দেওয়া হল। দুলু চাটুজ্যে বসে আছেন। কাশী মুখোপাধ্যায় বসে আছেন। তাঁর দিকে একপ্রকার অভিযোগের তিরঃ কি পার্টি নিয়ে এলে ইত্যাদি ইত্যাদি। কাশী মুখুজ্জ্যে বললেন, দেখা যাক আজ কি হয়। শাহজাহান যাত্রার পার্টি টাকা নিয়ে বিদেয় হবেন। টাকা দিতেই একজন বলে উঠলঃ এত কমে তো হবে না। আর কিছু বাড়িয়ে দেন। বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য্য অনেকক্ষণ ধরেই কিছু একটা বলতে চাইছেন। থাকতে না পেরে বলে উঠলেন, “অনেক দেওয়া হয়েছে। প্রচুর পেয়েছেন”। যাকে উদ্দেশ্যে করে বলা, তিনি প্রশ্ন ছুঁড়লেন, কি পেলাম? -- ‘ফুলোট পেলেন। হারমোনিয়াম পেলেন, ঢোল পেলেন। সবই তো পেলেন। এগুলো তো একটাও পেতেন না’—এসবই তো পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। -- বলতে চাইলেন রাগে দর্শকরা সব ভেঙে দিত। ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে কাশী মুখোপাধ্যায় চরম রেগে গেলেন। তিনি বললেন, আমি আর নাটক করব না।
শাহজাহানের পর আর কোন ঐতিহাসিক যাত্রা বড়শালে হয় নি। তবে সামাজিক যাত্রাপালা ‘মা যদি মন্দ হয়’ ‘মা মাটি মানুষ’, ‘একটি পয়সা’, ‘অচল পয়সা’, ময়লা কাগজ, খুব ভাল হিট করেছিল। ট্র্যাজিক চরিত্রে প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের মত অভিনেতার জুড়ি মেলা ভার। ‘মা যদি মন্দ হয়’- যাত্রায় নায়ক চরিত্রে ভোলার পার্ট করেছিলেন প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়। ভাস্করের পার্ট করেছিলেন তুষার ওরফে বাচ্চু মুখোপাধ্যায়। ভিলেন ডাক্তারের অভিনয় করেন শান্তনু। স্লো-পয়জন করে রোগী মারায় সিদ্ধহস্ত। নার্সের অভিনয়ে শবাসনা মুখোপাধ্যায়। মদন চাটুজ্যে নাগর দ্বারিকানাথের ভূমিকায়। এই নাটকে প্রদীপ চাটুজ্যের নির্দেশনায় দ্বারিকানাথের গলায় ‘আজ আমি আসছিরে’ আজও সেই দিনগুলির স্মৃতি নস্টালজিক করে অনেককে। মা মাটি মানুষ যাত্রা মানুষের এত ভাল লেগেছিল যে দুবার হয়েছিল।
মা মাটি মানুষে প্রথমবার শিব ঠাকুরের ভূমিকায় অভিনয় করেন প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়। দ্বিতীয়বার এই চরিত্রে অভিনয় করেন রূপেন চট্টোপাধ্যায়। দুজনেই অনবদ্য অভিনয় করেন। আর দুবারই মহিম গাঙ্গুলীর ভূমিকায় অভিনয় করেন দুলু চাটুজ্যে। গৌতম মুখোপাধ্যায় অভিনয় করেন জটা চরিত্রে। আদুরি—মাছ ধরতে চললুম। আর আস্তায় কাদা। বেশ মাতিয়েছিল দর্শকদের।
প্রদীপ চাটুজ্যে শিব ঠাকুর। মঞ্চে আবেগ নিয়ে সংলাপ বলে যাচ্ছেনঃ দেখছি গাঁয়ে বাস করার ইচ্ছে তোমার নেই। যে শালা মাকে ভালবাসে না, সে শালা উল্লু। মা মাটি মানুষকে নিয়ে ব্যবসা করতে চাই তাদের ঘেন্না করি। শোন প্রেসিডেন্ট, মহিম গাঙ্গুলি! এই গ্রামে বাস করতে হলে এই গ্রামকে মায়ের মত সেবা করতে হবে। গাঁয়ে বাস করবে। মাটির ফসল তুলবে। অথচ মা মাটি মানুষকে ঘেন্না করবে তা হয় না, হয় না।
যিনি নতুন বিডিওর অভিনয় করছেন, তাঁর দিকে এগিয়ে বললেন, --দেখে আসুন, গ্রাম না বাঁচলে শহর বাঁচবে না। স্যুট বুট খুলে নেমে পড়ুন। তাই তো, তাই তো শহরের বাবুদের বলি গ্রামে ফিরে চল। এখানে অনেক কাজ। শহরে যা না পাবে, গাঁয়ে তা পাবে। এখানে পাবে, মা মাটি মানুষ।
অসীমের অভিনয় করেন উজ্জ্বল (প্রয়াত) মুখোপাধ্যায়। খলনায়কের গলায় অসীম বলে ওঠেন–সবই তোমার কাছেই শিখেছি দাদা। এই অসীম ইন্দ্রকে চাকরি দেওয়ার নাম করে শিবুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়।
আবার, ইন্দ্রকে ভ্রাতৃস্নেহে কাছে টেনে নিয়ে শিবু বলে উঠল —আমি মনে করেছিলাম তুই আমার সেই ছোট্ট ভাইটি আছিস। যাকে সাইকেলে চাপিয়ে নিয়ে বেড়াতাম। আমি যখন গাছ থেকে পড়ে গেছিলাম, তোর মনে পড়ে ইন্দ্র। ইন্দ্রের ভুমিকায় অশোক ওরফে মদন চট্টোপাধ্যায়।
ইন্দ্র- চলে এস সাবিত্রী।
ইন্দ্র- তাহলে কি বুঝবো ভাসুরের সঙ্গে তোমার? সাবিত্রী--না না। শিবু—না----
প্রদীপ চাটুজ্যের একটা স্টাইল ছিল কোন ট্র্যাজিক সিনে মুখটা একটু নামিয়ে ডান হাত দিয়ে ঢেকে অভিনয় করা। যা সত্যিই দর্শকের মনে দাগ কেটে দিত।
আবার দুলু চাটুজ্যের, মহিম গাঙ্গুলির খল নায়কের চরিত্রে অভিনয়ঃ- তোকে দেখলে বুকটা টন টন করে ওঠে। কবে আমার বাড়ি যাবি? আদুরি- যাব আর আসব। তারপরেই দৃশ্যান্তর।
মদ খেয়ে শিব ঠাকুর—যাদের মা হবে মাটি আর দেবতা হবে মানুষ।
গৌরী পুরের শিব ঠাকুরের ভাই জেলে। মহিম গাঙ্গুলীর ভাই অসীমের হাত থেকে বৌমা সাবিত্রীকে উদ্ধার, ইন্দ্রর জামিন। আর শেষে মহিম গাঙ্গুলীর বোন চিত্রাকে বিডিওর হাতে তুলে দিতেই যবনিকা পতন।
অন্যদিকে, ‘ময়লা কাগজ’ ছিল সামাজিক যাত্রাপালা। এই যাত্রায় কমেডির রোলে মদন আর খোকনের ভাগ্যধর ও ভগবানের অভিনয় ছিল হেসে লুটোপুটি খাওয়ার মত। মল্লিক এণ্ড কোম্পানী নিজেদের ইউনিফর্মে লিখে এনেছিল দুজনেই। সেটা লিখে দিয়েছিল, বলা ভাল, এঁকে দিয়েছিল শান্তনু মুখোপাধ্যায়ের খুড়তুতো এক ভাই। যাত্রা নিয়ে নিজেরা কতটা ভাবত এই ঘটনা তার উজ্জ্বল প্রমাণ। ‘গরীব কেন মরে’ যাত্রায় (সুখনা-দুখনার ভূমিকায়) এই দুই জুটির—‘থেক থেক ঝনাৎ’ সকলের মুখে মুখে ফিরত একটা সময়। তাদের সকৌতুক সংলাপের চোটে কোএ্যাক্টাররা হাসি সংবরণ করতে পারছিল না। কোএ্যাক্টার রূপেণ চট্টোপাধ্যায় গ্রীন রুমে এসে ওই দুই জুটিকে বললেন, বেশী বাড়াবাড়ি করিস না, আমাদের অভিনয় করতে অসুবিধা হচ্ছে। এই জুটির সাথে কোএ্যক্টারদের অভিনয় করা মুশকিল ছিল। হায়ারড মহিলারাও অভিযোগ করত, কি সংলাপ বলছেন, মিলছে না। ময়লা কাগজ নাটকে ভগবান ভাগ্যধর জুটিতে চাকরের অভিনয় করে মদন খোকন। এই জুটি সংলাপের বাইরে অনেকটা বানিয়ে বলত। আর কমিক রোলে ছাপিয়ে যেত সবাইকে। তাই অন্যান্যদের অসুবিধা হত। যেটা হত না দুলু চাটুজ্যের সাথে অভিনয় করে। তাঁর নিজের সংলাপ তো মুখস্থ থাকতই, তাঁর সহ অভিনেতার সংলাপও মুখস্থ থাকত। তাই নিজের সংলাপের পর সহ অভিনেতা ভুলে গেলে, ‘তুমি এটাই তো বলতে চাইছিলে তাই না—বলে তার সংলাপটা গড় গড় করে বলে দিতেন। আর এই কারসাজি দর্শক বিন্দুমাত্র টের পেত না।
‘অচল পয়সা’র মতই ‘ময়লা কাগজ’ যাত্রা খুব হিট হয়েছিল। ময়লা কাগজে হায়ার করা ফিমেলদের মধ্যে ছিলেন দুবরাজপুরের সন্ধ্যা ও ঊমা নামে দুই বোন। সন্ধ্যার অভিনয় করেন ডোরা আর বিদিশার অভিনয় করেন ঊমা। শরৎ মল্লিকের বোন ডোরা এবং ডোরার স্বামী তাপস। তাপসের ভূমিকায় অভিনয় করেন হরকিঙ্কর ওরফে খিরু মুখোপাধ্যায়। একজন মল্লিক এণ্ড কোম্পানীর অন্যতম ডাইরেক্টর। অন্যজন বিবাহসূত্রে ভাবী এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর। গেটের বাইরে ভিক্ষুকদের এঁটো পাতা নিয়ে কুকুরের সাথে মারামারির দৃশ্যকে ‘হাউ ফানি’ বলার পর তাপস বলে উঠল ঃ ক্যামেরা নিয়ে আসব মিসেস ডোরা দত্ত। তার মানে? মল্লিক এণ্ড কোম্পানির অন্যতম ম্যানেজিং ডিরেক্টার তার ওয়েল ডেকোরেটেড রুমে বসে অবসর বিনোদন করবেন। তারপর ডোরার কাছে যখন ভিক্ষে চাইতে এল নবীন চন্দ্র দাস নামে এক বাউল, তাকে দূর ছাই করে তাড়িয়ে দিতেই ডোরার দাদা হেমন্তের প্রবেশ। স্টেজের উপরে স্টেজে দাঁড়িয়ে দুর্দান্ত অভিনয় হেমন্তর। তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল এই কপট সভ্যতা। শিল্পী মন তার। প্রতিবাদে হেমন্ত বলে উঠলঃ জাস্ট এ মিনিট মাই সুইট সিস্টার। গ্রাম আজ শহরের কাছে নতজানু হয়ে ভিক্ষে চাইছে। এই দৃশ্যটা আমি ক্যানভ্যাসে বন্দী করে রাখি। হেমন্তের অভিনয় করে মিহির ভট্টাচার্য। তাপস দত্তের দাদা তপন চটকলের মিস্ত্রী। সে চাই, ভাই তাপস যেন মাস্টারি না করে, শরৎ মল্লিকের কথা মত চলে সংসারের আখের গুছিয়ে নেয়। এবিষয়ে ভাইয়ের সাথে দ্বিমত। বৌদি পারুলকে তাপস বলে, “ আত্মসুখকে আমি ঘৃণা করি। মাথায় আমার অজস্র যন্ত্রণা। মাঝে মাঝে আমার মাকে মনে পড়ে। অনেক সময় তুমি আমার মা হয়ে যাও”। ‘মল্লিক স্পিকিং’ টেলিফোনে শরৎ মল্লিক। মল্লিক এণ্ড কোম্পানীর কর্ণাধার শরৎ মল্লিকের অভিনয় করেন রূপেণ চট্টোপাধ্যায়। তাপসের বাবা সাধুচরণ এবং তাপস শরৎ মল্লিকের কথায় রাজি না হওয়ায় ক্রোধিত শরৎ মল্লিক জনান্তিকে বলে উঠলঃ একদিন তোমাকে ডাস্টবিন থেকে তুলে এনেছিলাম, আজকে আবার ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম। বিদ্রোহী শ্রমিক নেতাকে ফার্নেসের গলন্ত লোহার মধ্যে ফেলে দাও। তাপসকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তপন। যাওয়ার আগে তাপস আবেগ মথিত গলায় জানায়, তাপসের তপস্যা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমার বিশ্বাসকে মলিন হতে দিও না। সাধুচরণ বড় ছেলের হাতে কপাল ফাটিয়ে আকুতিতে চিৎকার করে ওঠেঃ দাদু, বৌমা, ওরে একটা আলোও কি জ্বলছে না? সেই অন্ধকারের রেশ ধরে বিবেকের প্রবেশ। তার কন্ঠ গেয়ে ওঠেঃ আলোর গাড়ি পৌঁছে গেল আঁধার ইস্টিশনে। দুঃখবাবু স্টেশন মাস্টার, নাও গো টিকিট কেনে। ডোরার মত হেমন্ত অসুস্থ। কাশির সাথে হেমন্তর মুখে রক্ত উঠছে। শরৎ মল্লিককে বিদ্রুপ করে সে বলে, আজ আমি তোমার হাতে আঁকা ছবি। সেই ভয়ঙ্কর শেষ ধাপ সিঁড়ির ছবিটা এখনো আঁকা হয় নি। ওটা শেষ করে আমি তোমাকে দেখাব, তোমার সামনে,পেছনে, ডাইনে, বাঁইয়ে তুমি আর তুমি। কঙ্কালের হাতে আংটি দেখে তাপসের চিৎকার- মায়ের কঙ্কাল মাথায় নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস মানা? শরৎ মল্লিক যখন নিজের ছেলে অংশুমানের শোকে পাগল, তখন আবার হেমন্তের প্রবেশ। তার মুখে সংলাপঃ সেই আশ্চর্য সিঁড়িটার শেষ ধাপ আমি এঁকে গেলাম। সিঁড়ির শীর্ষে তাপস। হাত তার সূর্যের দিকে। আর সিঁড়ির নিচে শরৎ মল্লিক ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।
অভিনয় শুধু অভিনয় ছিল না। ছিল জীবনও। তখন কার দিনে অনেকে শখে চাঁদা দিয়েও অভিনয় করত। সেক্ষেত্রে কম গুরুত্বপূর্ণ রোল অর্থাৎ সৈনিক বা পুলিশ কনস্টেবলের অভিনয় দেওয়া হত। গোপাল দত্তের অভিনয়ের শখ ছিল তাই তাকে ময়লা কাগজে কনস্টেবলের অভিনয় দেওয়া হয়। ১০০ টাকা চাঁদাও দিয়েছে। কিন্তু মঞ্চে উঠে সব ভুলে গেল। কিচ্ছুটি বলছে না। পুলিশ অপরাধীকে গ্রেফতার করবে। অপরাধী তো নিজে নিজে গ্রেফতার হতে পারে না। অগত্যা মল্লিক এন্ড কোম্পানির ছেলে বলল – বাবা উনি আমাদের সমস্ত কিছু ধরে ফেলেছেন। কোথায় কি আছে। তাহলে আপনি আমাদের এ্যারেস্ট করুন। গোপাল দত্তকে আর বলতেই হল না তার পার্ট। পেয়াদা এসে ধরে নিয়ে গেল।
Comments
Post a Comment