পুশ ইন - পুশ ব্যাক কোন মুভি থ্রিলার থেকে কম নয়, সুনালি, দানেশ ও সুইটি বিবিদের। পিছন ফিরে তাকালেই, গুলি... দেবশ্রী মজুমদার, বীরভূম :
Green Border (২০২৩)
পোল্যান্ড–বেলারুশ সীমান্তে শরণার্থীদের বারবার পুশব্যাক ঘটনার উপর নির্মিত বাস্তবধর্মী ও আবেগঘন ছবি হাত তালি কুড়িয়েছে অনেকের। কিন্তু আমাদের দেশের নাগরিকদের পুশ - ইনের ছবি এখনো নির্মিত হয় নি। হতভাগ্য সুনালী সুইটি বিবিদের জীবনের এক বছর চোদ্দ দিন, কম মর্মস্পর্শী, হৃদয় বিদারী নয়। এই ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। নাগরিকের বেনাগরিক করে তোলার কাহিনী। অবশ্যই স্যালুট ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাকে!
২০-২১ বছর দিল্লির রোহিনী পল্লিতে থেকে কাজ করে দিন গুজরান করতো সুনালী খাতুন ও সুইটি বিবিদের পরিবার। কিন্তু গতবছর ২৪ শে জুন নেমে এলো সেই ভয়ঙ্কর দিন। রোহিনী পল্লী থেকে দানেশ সেখ ও সুইটি বিবিদের বাংলাদেশী সন্দেহে ধরে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি আগেই হাতিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি অন্তস্বত্বা সুনালীর ডাক্তারি কাগজ, মোবাইল ফোন। হুমকি দেয়, কথা না শুনলে, সুনালিকে আলাদা পাচার করে দেবে। দানেশ সেখ নিজের জবানিতে বলেন, পুলিশ তার কাছে তিন লক্ষ টাকা চেয়েছিলো। দানেশ জানিয়েছিল, তাদের কাছে রয়েছে ২৫-৩০ হাজার কারণ গ্রামের বাড়ি পাইকর থেকে কুরবানী সেরে সদ্য ফিরেছে। পুলিশ দানেশের কাজের জায়গার ম্যানেজার, এলাকার সাফাইকর্মী কারো কথায় শোনে নি। সবাই তাদের হয়ে অনুরোধ করেছিলো, ছেড়ে দিন। গরীব মানুষ। আম্বেদকর মেডিক্যাল হাসপাতালে মেডিক্যাল টেস্ট করে, কোর্টে তাদের তুলে মিথ্যা তথ্য জমা দিয়ে পুলিশ জানালো তারা বাংলাদেশী, কোনো কাগজ তারা জমা দিতে পারে নি।
২৬ শে জুন তাদের নিয়ে মোট ৭০ জনকে এয়ারপোর্ট থেকে আসামের ধুবড়ির কাছে বাংলাদেশ কুড়ি গ্রাম সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। ক্যাম্পে বাংলাদেশীদের হাতে বাংলাদেশী মুদ্রা দেওয়া হয়। দানেশ সেখদের সঙ্গে দুজন বাংলাদেশী ছিল। একজন একটি পোস্টের কাছে নেমে যায়। আরেকজন দালাল গোছের লোক গাড়ি থেকে তাদের মাঝপথে নামিয়ে দেয়। সেখানে বি এস এফ তাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে বলে। দানেশ জানায়, তখন রাত বারোটা না একটা ঠাউর করতে পারছিলাম না। বর্ষার সময়। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল। হঠাৎ আমাদের ছয় জনকে বি এস এফের একজন বললেন, সামনে ফাঁকা জায়গা দিয়ে দৌড় দিয়ে সরসর করে চলে যাবি। পিছনে তাকালে গুলি করে দেবো। ছেলে বৌ সবাই তাদের হাতে পায়ে ধরে কাঁদতে থাকলাম, শুনলো না। বললে, এই সামনের জঙ্গলে বাঘমারারা আসে, ওরা জানতে পারলে বিপদে পড়বি, কাঁদিস না।
অগত্যা এক পা জল ভুঁইয়ে দেড় থেকে দু'দিন হেঁটে চলেছি, বলে চলে দানেশ। সারা রাতা মহিলা ও শিশুদের নিয়ে জংলি পথে হাঁটা। দিনের আলো ফুটলে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে নদীর জল আর কলার বন থেকে কাঁচা কলা খেয়েই জীবন বাঁচাতে হয়েছে। তারপর কুড়ি গ্রামের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে সেখানে প্রাণ ভরে একদিন একটু খাওন দাওন হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আশ্রয় গেল। দানেশ বলেন, আসলে ওটা ছিলো দালালের বাড়ি। যারা বিজিবি ও বিএস এফের মিডলম্যান। সেই বিজিবিকে ফোন করে আমাদের ধরিয়ে দেয়।
তারপর শুরু হলো আরেক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। দানেশ জানান, বিজিবি অফিসার তাদের কাদা জল মাখা পোশাক দেখে বাঘমারা চোরা শিকার পাচারকারি মনে করে। দানেশের কাছে নেই টাকা, নেই কোনো নথি। হিন্দিতে নিজের নাম লিখতে পারতো। সেটা দেখেই বিজিবি নিসন্দেহ হয়, তারা ইণ্ডিয়ান।
এতক্ষণ পুশ ইন কবলে তারা ভুগলো। এবার পুশব্যাক। এবার সেই দালাল তাদের দায়িত্ব নিয়ে, বিজিবিকে জানিয়ে দিলো, সেই ম্যানেজ করে দিচ্ছে। কিন্তু কিছুটা হেঁটে কুড়ি গ্রামের একটা ফাঁকা পথ দেখিয়ে সেই দালাল বলে দিলো, সোজা হাঁটবে। আধ ঘন্টা গেলেই, আমার লোক থাকবে। সেই তোদের বর্ডার পার করে দেবে। যেহেতু আমরা টাকা দিতে পারি নি, তাই সে সাথে গেলো না। বহু অনুরোধ করেও কোনো লাভ হলো না। বিএস এফ হেড লাইটে তাদের যথারীতি দেখে ফেলে চিৎকার করে ওঠে, রুক্ রুক্। গুলি করে দেবো। ক্যাম্পে নিয়ে লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয় আমাকে, বলে দানিশ। লাঠি, ঘুষি চালায়। বন্দুক দিয়ে মারতে গেলে আমি সরে যেতেই, সেই বন্দুকের আঘাত লাগে আমার ওই টুকু ছেলে সাবের সেখের মাথায়। সুনালীকে থাপ্পড় মারা হয়। সন্তান সম্ভবা বলে মাফ করা হয় নি। সুইটিকেও চড় থাপ্পড় মারা হয়। পরে আমার জামা খুলে পিঠে মারের দাগ দেখে ওষুধ দেয়। খাবার ও দেয়। তারপর রাত বারোটা নাগাদ গাড়িতে চাপিয়ে ফের একটা জায়গাতে নামিয়ে দেওয়া হয়। দানেশ বলেন, বিএস এফ বর্ডারে হ্যালোজেন নিভিয়ে বলে সামনের রাস্তা ধরে চলে যা। বুঝলাম, আবার পুশ ইন। আল্লাহ কে ডাকতে ডাকতে অন্ধকারে সবাই চলতে লাগলাম। পিছনে দেশের সৈন্য। তারা বন্ধুক তাক করে আমাদের দিকে। সামনে বিদেশী সৈন্য। আমরা কোথাকার! কোন দেশের! ঠিকানা ছাড়া, ঠিকানার খোঁজে। ছেলেরা ভয়ে কাঁদতে ভুলে গেছে। সুনালীর হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। উপায় নেই। ১০ কিমি হেঁটে একটা নদী পেলাম আমরা। পড়ে শুনেছি ওটার নাম নাকি দুধকুমার। ভারতে শঙ্কোস বলে। জিঞ্জির নৌকা টেনে পেড়িয়ে একটা বড়ো নদী দেখলাম। সেখানে বাঁশের সেতু। ধরলা নদী পেরিয়ে সোনাহাটি বন্দর যাওয়া যায়। এরপর দেখলাম আরেকটা বড়ো নদী। এক ফোঁটা পানি নাই। হেঁটে পেরোলাম। বোধহয় ওটা তিস্তা নদী।
দানেশ বলে, সোজা ঢাকা মেট্রো শহরে হাজির হলাম আমরা। একটা বাড়িতে বললাম, আমাদের কাছে একটা ফোন নাম্বার আছে, একটু ফোন করতে দিন। বাড়িওয়ালা বললো, কাজ করো তারপর ফোন করতে দেবো। তার বাড়িতে তিন দিন রাজমিস্ত্রির কাজ করার পর, একটু খেতে আর ফোন করতে দেয়। দানেশ জানায়, সুইটিবিবির মামাতো ভাই আমির খানের কাছ থেকে ঢাকার ফারুক সেখের নাম্বার পায় সে। সেই নাম্বারে ফোন করে অনেক সমস্যা মিটে যায়। ততদিনে সুনালী, সুইটি ও ছেলেরা হোটেলে বাসন ধোয়ার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ফারুক সেখ একজন চিকিৎসকের ছেলে ও ব্যবসায়ী। তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে তিন চার দিন রাখার পর, বাসা বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। জামা কাপড়, খাবার দাবারের ব্যবস্থা করে দেন। ইতিমধ্যে জানাজানি হয়ে যায় আমাদের কথা। পুলিশ আমাদের জেলে পাঠিয়ে দেয়।
তারপর ভারত থেকে মোফাজিল সেখ বাংলাদেশে এসে মামলার তদবির করে। তিন মাস দশ দিন পর সুনালি ও ছেলে সাবেরের জামিন হয়।
ক্যাপশন: ছেলে আপনকে কোলে নিয়ে দানেশ সেখ
Comments
Post a Comment