মমতার ট্রায়াল, পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া শুরু
মমতার ট্রায়াল, পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া শুরু
দেবশ্রী মজুমদার
ফ্রানৎস কাফকার বিখ্যাত উপন্যাস দ্য ট্রায়ালের কথা বলছিলাম। ব্যস, দুম্ করে পড়ে গেলেন তো? ধীরে, বন্ধু, ধীরে। ঠিকই শুনেছেন, মমতা অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। তার আগে একটু গৌর চন্দ্রিকা সেরে নিই। দ্য ট্রায়াল-এর যোসেফ কে. চরিত্রের সঙ্গে আমাদের রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কিয়দংশ মিল আছে। শুধু মিলের জায়গা টুকু বলবো। অমিলও আছে বিস্তর।
জোসেফ কে. এমন এক ব্যবস্থার শিকার, যেখানে সবাই ভদ্র ব্যবহার করলেও কেউ তাকে সত্যিই সাহায্য করে না। চারপাশের সৌজন্য ও সহানুভূতি শেষ পর্যন্ত তাকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলে। তিনি ক্রমে মনে করতে থাকেন, সবকিছুর আড়ালে কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত রয়েছে। ট্রায়ালের নামে তার প্রহসন হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুন হতে হয়। আমরা অবশ্যই এমন করুন পরিণতি প্রাক্তনীর চাই না, হবেও না। তিনি বিচার পাবেন। তার কৃতকর্মের ফল পাবেন, এটুকুই আশা করতে পারি ।
তবে ওই যে বললুম, মমতার ট্রায়াল শুরু হয়েছে। হেঁয়ালি ছেড়ে বলি, আদালতে তাঁকে এখনো পুরোদস্তুর টেনে নিয়ে যাওয়া হয় নি ঠিকই। কিন্তু তার দলকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি আদালতের রায়ের কপি হাতে নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তারা ছাড়া অন্যকোনো দল 'সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস' নাম কোনক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে না। করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন তারা। এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়গুলো ব্যবহার করতে পারবে না। ইতিমধ্যে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় একাউন্টের ৪২০কোটি টাকা ফ্রিজ করেছে ইডি। সেই টাকা একটি দলের কাছে যতই সামান্য হোক, সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ঋতব্রত তৃণমূল। এটা অবশ্য দুই পক্ষের অস্তিত্বের লড়াই, রাজনীতিতে আবার প্রাসঙ্গিক হওয়ার লড়াই। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু গণতন্ত্রে সংখ্যাধিক্যের জোরে এবং তীক্ষ্ণ কূট চালে অনেক ক্ষেত্রে বাজিমাত করছেন ঋতব্রত তৃণমূলীরা। সংসদীয় গণতন্ত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইনের আইনের হাত থেকে বাঁচতে প্রয়োজনের অধিক বিধায়ক তাদের হাতে। কেন্দ্রে সেই একই আইন থেকে বাঁচতে পুরানো ডরম্যান্ট ব্যাঙ্ক একাউন্টকে এ্যাকটিভ করেছেন সাংসদরা। তাঁরা এন সি পি আই দলের সাংসদ। এনডিএ-র সহযোগী দল। গুঞ্জন উঠছে এবার তারা সরাসরি বিজেপিতে যোগদান করবেন। কিন্তু রাজ্যে তাঁদের সতীর্থরা এন সি পি আই য়ে যোগ দিচ্ছেন না। পুরো দাবার বোর্ডে চাল যেটা পড়ছে, তাতে প্রথমে বোরে, ঘোড়া যেগুলো খাওয়া হচ্ছে সবটাই আমরা দেখছি। চালও কে দিচ্ছে জনতা জনার্দন সবটাই বুঝতে পারছে। এখন যোশেফ কে. কতটা বুঝছেন। বিজেপিকে সমর্থনের জন্য বিভিন্ন ইস্যুতে ওয়াক আউট করেছেন। অবশ্যই যা করেছেন নিজেকে বাঁচাতে করেছেন। এবার বাঁচবেন তো? এখন তো তাঁর টিকিটে জেতা সাংসদ বিজেপিকে সরাসরি সমর্থন করবে। কমিশনেও, আবেদন করেছে ঋতব্রত তৃণমূল। কপিল সিব্বল, মনু সিংভি কোথায়? কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষীয়াণ উকিল হিসাবে বলছেন, রেজিস্ট্রেশনের রিনিউয়ের তারিখ নিয়ে প্রশ্ন আসছে কেন? এই বিজয়ী প্রার্থীদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো সিম্বল দিয়েছিলেন ভোটে দাঁড়াতে? তাহলে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নিলেন কেন?
যুক্তি যতই চালাচালি হোক, এই সবই মমতার ট্রায়ালের অঙ্ক ও অঙ্গ। কিন্তু সব থেকে নির্মম পরিহাস হলো, মমতার নিজের হাতের তৈরি দল ও প্রতীক কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা। প্রত্যেক পদ্মমুখী তৃণমূল মুখে বলছেন, মমতা তাদের সুপ্রিমো। জেলায় ফিরে অনুব্রত মণ্ডল বলছেন, সেই একই কথা। ঋতব্রত তৃণমূলে যোগদানের পরও প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা বলছেন, তিনি মমতার সঙ্গে আছেন। বীরভূম সাংসদ তার নিজস্ব নির্বাচনী গ্রুপ ডেসক্রিপশনে "তৃণমূল" কথাটি বাদ দিয়েও বলছেন, তিনি দিদিকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। দিদির সঙ্গে আছেন। আবার এনসিপিআইয়ে আছেন, সেটাও বলছেন।
বর্তমানে দ্য ট্রায়াল-এর যোসেফ কে. -র মতোই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক ব্যবস্থার শিকার, যেখানে সবাই ভদ্র ব্যবহার করলেও কেউ তাকে সত্যিই সাহায্য করে না। চারপাশের সৌজন্য ও সহানুভূতি শেষ পর্যন্ত তাকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলে দিচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, সবকিছুর আড়ালে কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত রয়েছে। এই ট্রায়াল ট্র্যাপে তিনি আপাতত বন্দি। বাংলায় একটা কথা আছে, আঁধার কিল। সেটাই হচ্ছে। ক্রমশঃ পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া চলতে থাকবে, একদম গোঁড়া পর্যন্ত ।। পর্ব গুলো দেখুন, আর উপভোগ করুন।।
দেবশ্রী মজুমদার একজন সাংবাদিক
Comments
Post a Comment