বিধবা মাছ ছোবে না ছ'মাস, ক্রান্তিকাল কি তার আগেই উত্তীর্ণ? দেবশ্রী মজুমদার
সহজে অনুমেয়। সেই মহা সন্ধিক্ষণ সমুপস্থিত। বৃহস্পতিবার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সারির তিন নেতৃত্বের হাতে পদ্ম পতাকা ধরিয়ে দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বললেন, ‘এই মুহূর্তে সুখেন্দু শেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইকের একমাত্র পরিচয়, তাঁরা বিজেপি কর্মী।’ তিনি আরও বলেন, ‘চার ঘণ্টার তৃণমূলের জন্য দরজা বন্ধ। যাঁরা মানুষকে লুঠ করেছে তাঁদের জন্য দরজা বন্ধ।’
রঙ্গিলা রসিকতা করবে। অনেক নিন্দুক বলতে শুরু করেছে, জানতুম, বিধবা ছ'মাস মাছ ছোঁবে না। এতো দেখছি, এদের এতো দেরিও সয় না! আই এ্যাম তো অবাক!
অবাক হওয়ার কিছু নেই। জার্সি বদল করে দল বদল খেলারই অঙ্গ। দর্শকের কাজ দেখা, শুধু দেখা সে কেমন খেলছে। কেউ কেউ তো তলে তলে একাদশী বিধবার মতো নিরম্বু উপবাস রেখে পুকুরে ডুব দিতে যাওয়ার নাম করে ডুবে ডুবে জল খায়।
মহাভারতে মহামতি ভীষ্ম একবার যুধিষ্টিরকে বলেন- "শত্রুর্ মিত্রং ভবত্যেব, মিত্রং চাপি প্রদুষ্যতি।
কার্যাকার্যবশাদ্ রাজন্, নিত্যং লোকস্য বর্তনম্॥" যার বাংলা অর্থ হলো- হে রাজন, শত্রুও মিত্র হয়ে যায়, আবার মিত্রও শত্রু হয়ে যায়। মানুষের সম্পর্ক কার্য, প্রয়োজন ও পরিস্থিতির কারণেই পরিবর্তিত হয়।
তাই অবাক হওয়ার কিছুই নেই। ইহাও সম্ভব, উহাও সম্ভব, সম্ভব তো যুগে যুগে। রাজনীতি যারা করেন, তারা জানেন, রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী থাকে স্বার্থ, লক্ষ্য ও পরিস্থিতি। রাজনীতির মতো যতো কিছু জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সব ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে।
পুরাণে দেখা যায়, রাম–সুগ্রীব: প্রয়োজনে মৈত্রী। দ্রোণ–দ্রুপদ: বন্ধু থেকে শত্রু। বিভীষণ–রাম: ধর্মের জন্য পক্ষ পরিবর্তন।
দেবতা–অসুর: স্বার্থে সাময়িক জোট। স্বার্থ একটা থাকেই। একটু বৃহৎ পরিমণ্ডলে দেখলে আরও ভালো পরিষ্কার হবে।
ইতিহাসের পাতায়, এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে দেখা যায়—স্থায়ী শত্রু বা স্থায়ী মিত্র বলে কিছু নেই; পরিস্থিতি ও ব্যবহারের ভিত্তিতেই সম্পর্ক বদলে যায়। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেওয়াই যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে যুক্ত রাজ্য ও সোভিয়েত ইউনিয়ন আদর্শগতভাবে একে অপরের বিরোধী ছিল। কিন্তু হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার পর তারা একই জোটে যোগ দেয়। যুদ্ধ শেষে আবার ঠাণ্ডা লড়াইয়ে তারা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। পুরন্দরের সন্ধি চুক্তি হয় শিবাজী ও জয় সিংহের মধ্যে। পরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে আবার সংঘাত শুরু হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বহুল উদ্ধৃত নীতি রয়েছে: "Nations have no permanent friends or permanent enemies, only permanent interests."
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তো এব্যাপারে রাজনৈতিক নজির স্থাপন করেছে।
এব্যাপারে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো:
ভারতীয় জনতা পার্টি ও জনতা দল (ইউনাইটেড)
বহু বছর জোটসঙ্গী। তাবলে কি মাঝে মাঝে তাদের মধুচন্দ্রিমা ভঙ্গ হয় নি?
২০১৩ সালে তাদের জোট ভাঙে।
২০১৭ সালে আবার জোট।
২০২২ সালে আবার বিচ্ছেদ।
২০২৪ সালে পুনরায় জোটে ফেরা। ফের ২০২৬ শে জোট সঙ্গী। শিবসেনা ও ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র। ২০১৯ মহারাষ্ট্র সরকার গঠন-এর পর জোট ভেঙে যায়। পরে শিবসেনার একাংশ একনাথ শিন্ডে-র নেতৃত্বে আবার বিজেপির সঙ্গে সরকার গঠন করে। পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও ভারতীয় জনতা পার্টি মতাদর্শে ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও জম্মু ও কাশ্মীর-এ সরকার গঠন করে।
তাই নীতি ও আদর্শ এই কথাটা কাঁঠালের আমসত্ত্বের মতো শোনায়। অনর্গল সুন্দর কথার ফাঁকে শমীকবাবু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য অর্গল খোলা হবে। এদিন তার সূচনা হলো। এটা অনেকের কাছে শুধু আবেগ নয়, বেগের। কারণ উন্নয়ন থেমে আছে। পঞ্চায়েত ত্রিস্তরে, পৌরসভায় এই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য অনেক খেলোয়াড় প্রায় বসে আছে। দাঁতে বসা রস আর রসিকতা, এক নয় বস।
রসায়নের পরিভাষায়, এই ধারণাকে বলে, কালেক্টিভ ইফেক্ট। অনেক মৌল, আয়ন, বা অনু একসঙ্গে যুক্ত হলে এমন আচরণ দেখা দিতে পারে যা একক কণার পক্ষে সম্ভব নয়। সমবায়ী বন্ধন, আয়নীয় আকর্ষণ, বা জালিকা গঠনের মাধ্যমে তা সমষ্টিগত বৈশিষ্ট্যে রূপ নেয়। পদার্থ বিদ্যায়, যেমনটা তড়িৎ পরিবাহিতা, চৌম্বকত্ব। সমাজ বিজ্ঞানে এমার্জেন্ট সোশ্যাল ফোর্স। এরা ডিম ছুঁড়তে পারে। এরা কি না পারে। একুশের বিধান সভার নির্বাচনোত্তর সহিংসতা দেখলে, এখন তাদেরই আচরণ দেখলে সহিষ্ণুতা বলে ভ্রম হতে পারে। এই বিচিত্রতা আছে। অনেকেই কোন রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যত নিয়ে ইতি টানছেন। অনেক সময় অনেক শাসক দল রিবাউণ্ড ইফেক্ট বুঝতে পারেনা। জার্মানিতে নাৎসি দল আর ফেরে নি। তবে নব্য নাৎসি ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক পার্টি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তাই কোন দলকে না ভেঙে, শর্ত দিয়ে দমাতে চায় অনেকে। কিন্তু তাতেও খুব ফল হয় নি।
প্রতিবেশী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ: ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ করেছিল; পরে স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে পুনর্জীবিত হয়, আর বহুদলীয় রাজনীতি ফিরে এলে আবার সক্রিয়ভাবে সংগঠিত হয়।
জামায়াতে ইসলামী: স্বাধীনতার পর দলটি নিষিদ্ধ ছিল; ১৯৭৯ সালে আবার সক্রিয় হয়, যদিও পরে আবার নানা আইনি ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে নাস্তানাবুদ হয়। প্রতিক্ষেত্রে পট পরিবর্তনে রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা থাকে, আবার অবিশ্বস্ততা থাকে। এব্যাপারে বিদুরনীতিই শ্রেষ্ঠ :
"ন বিশ্বসেদ্ অবিশ্বতে, বিশ্বস্তে নাতি বিশ্বসেদ্। বিশ্বাসাত্ ভয়মুৎপন্নং, মূলান্যপি নিকৃন্ততি। অবিশ্বস্ত কে বিশ্বাস করবে না। আবার বিশ্বস্তকেও অতিরিক্ত বিশ্বাস করবে না। অতি বিশ্বাস যে কোন শিকড় পর্যন্ত কেটে ফেলতে পারে।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Gadget
Popular
-
বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই: দেবশ্রী মজুমদার ‘বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই, যাচ্ছে ফাটি বুকের ছাতি তোমার শোকে ভাই’। ব...
-
রম্যরচনা: দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার এখন আর সেই দুটি গ্রাম না থাকলেও, আই ডোন্ট নোউ, কেউ বলে না। তবে পাড়ায়...
-
আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার বড়শাল। কোনভাবেই আজ আর তাকে প্রত্যন্ত গ্রাম বলা যায় না। এখন শহরের হাওয়া লেগ...
No comments:
Post a Comment