ধর্ম ও রাজনীতি: সোনায় সোহাগা --দেব ঋষি

ব্রজবাসী শ্রীজীব গোস্বামীর দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন সম্রাট আকবর। কে এই দৈন্য বেশ ধারী অতি সাধারণ জীবন যাপনকারী সাধু! তাঁর চোখে বিস্ময়ের শেষ নেই। শ্রদ্ধায় তাঁর হৃদয় বিগলিত হলো। বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সমাজ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তাঁদের প্রার্থনা বৈষ্ণবদের মন্দির নির্মাণে বাধা দূর করুন সম্রাট। শ্রীজীব গোস্বামীর প্রজ্ঞা, তিতিক্ষা ও ধর্ম নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে ভূমি দান করলেন দিল্লীশ্বর। আদেশ দিলেন, বৃন্দাবনের যেকোন স্থানে মন্দির নির্মাণ করা যাবে। শুধু তাই নয়, বৃন্দাবনে মৃগয়া নিষিদ্ধ হলো। ঘোষণা করলেন, বৃন্দাবনে পশু হত্যা নিষিদ্ধ।। ( বৈষ্ণবাচার্য শ্রীজীব গোস্বামী: ভারতের সাধক-সাধিকা (দ্বিতীয় খণ্ড), সুবোধ চক্রবর্তী। অন্যদিকে, ঔরঙ্গজেবের ধর্ম ও রাজনীতি যে ধর্ম নীতি তৈরি করেছিলো, তা ইতিহাসে ভৎর্সিত। কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর শাসনকাল (১৬৫৮–১৭০৭ খ্রি.) ছিল অত্যাচারের। অথচ তিনি ছিলেন ধার্মিক। সুন্নি ইসলামি আদর্শকে ভিত্তি করে রাজনীতি পরিচালনা করেন তিনি। তিনি নিজেকে ইসলামের রক্ষক মনে করতেন এবং শরিয়তসম্মত শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তাঁর শাসনকালে জিজিয়া কর পুনরায় চালু করা হয়, বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস বা রূপান্তর করা হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তাঁর ধর্মনীতি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। রাজপুত, জাট, শিখ ও মারাঠাদের বিদ্রোহ বৃদ্ধি পায়, যা মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, ঔরঙ্গজেবের সময়ে ভারতের বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস হয়। এই পরিস্থিতিতে বৃন্দাবনের শ্রীশ্রী রাধা-দামোদর মন্দিরের সেবায়েতরা বিগ্রহের সুরক্ষার জন্য তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনেক চিন্তাভাবনার পর বিগ্রহটি নিরাপদে জয়পুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে যথাযথ পবিত্রতা বজায় রেখে নিয়মিত পূজা-অর্চনা শুরু হয়। রাজা কোনো বিশেষ ধর্মের অনুসারী হলে, রাজধর্ম ভুলে প্রজাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা তিনি হরণ করতে পারেন। এমন প্রমাণ ইতিহাসে ভুরি ভুরি আছে। গণতান্ত্রিক দেশে ভোট রাজনীতিতে প্রশ্রয় ও প্ররোচনা দুটোই হয়ে থাকে। নিরপেক্ষতা রাখতে ভারতের ডান ও বাম কেউ পারে নি। বামেরা জাতপাতের রাজনীতি করতে গিয়ে হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ করেছে। চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ। তারা গীতার এই বাণী বিশ্বাস করতে চায় নি। আজও ২৫ ডিসেম্বর 'মনুস্মৃতি দহন দিবস' পালন হয়। হিন্দু ধর্ম সহনশীলতার ধর্ম, তাই এই আচরণ সহ্য করা হয়। অভিযোগ, বিষ্ণুর পদ যুগল থেকে শুদ্র-র জন্ম হয়, বলা হয়েছে। কেন, এই ধর্ম বৈষম্য? ব্রাহ্মণদের আক্ষেপ হয়, কী অপরাধে শ্রীবিষ্ণুর চরণ যুগল থেকে তাঁদের জন্ম হলো না! শুদ্র কোনো জাতি বাচক শব্দ না। কে বোঝাবে! ক্ষত্রিয় রাজা জনশ্রুতি-পৌত্রায়ণকে ‘শূদ্র’ বলিয়া অভিহিত করা হয়েছে।কারণ বেদান্ত-দর্শনের ব্রহ্মসূত্রে (১।৩।৩৪–৩৫) এবং তার টীকায় শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য বলেছেন— এখানে ‘শূদ্র’ জাতিবাচক নহে। ‘শুচা দ্রবতি ইতি শূদ্র’ অর্থাৎ ব্রহ্ম জ্ঞানী শকট রৈক্বের জ্ঞানের মহিমা ও নিজের পুত্রের দীনতা দর্শনে শোকে দ্রবীভূত হন রাজা জনশ্রুতি-পৌত্রায়ণ। দানবীর হিসেবে শ্রেষ্ঠ হলেও বিদ্যা বা জ্ঞানে শকট রৈক্বের থেকে ছিলেন তুচ্ছ। দেবতাদের কাছে এই সত্য জেনে রাজার মন শোকে দ্রবীভূত হয়। তাহার নিকট দ্রুত গমন করেন জ্ঞান লাভের জন্য। সে কারণে ক্ষত্রিয় রাজাকে ‘শূদ্র’ বলা হয়। বহুজন সমাজ পার্টির কাঁসিরামের মতো নেতারা মি.গান্ধীকে রেয়াত করেন নি। তাঁর অপরাধ সমাজের পিছিয়ে থাকা বর্গের মানুষদের "হরিজন" বলতেন। হরিজন অর্থাৎ "ঈশ্বরের সন্তান" বলে নাকি তাদের অপমান করা হয়েছে। ভারসাম্যহীনতার এই রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতার হাতবদল করতে পারে। অবস্থার পরিবর্তন করতে অনেক ক্ষেত্রে অপারগ হয়। বিষয় যখন ধর্ম ও রাজনীতি, অপ্রিয় এই কাজটি করতেই হবে, কেউ পড়ুক না পড়ুক, আজ দিন হোক প্রবন্ধ -র। ধর্ম ও রাজনীতি, সোনায় সোহাগা সম্পর্কিত। তবে তা ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধ সোনা কিনা বলা বেশ শক্ত। এই দুইয়ের মিশেলে বিশুদ্ধতা না থাকতে পারে, কিন্তু টেকসই কতটা মানুষ কখনও হৃদয়ে আবার কখনও অস্থিতে অস্থিতে বোঝে। সুফী সাধকরা কিন্তু কাঁচা সোনার কথা বলেছেন। পাকা সোনা তো ভঙ্গুর! --দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা। তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলে ধরা দেয় না...সে যে মানুষ চেনা, সোনার মানুষ চেনা। যা হোক, এসব ভাবের কথায় ভাবনা বেশি। তবে, প্রথমে জানা দরকার ধর্ম কী? তার পরিভাষা কী? শাস্ত্রকাররা কী বলেন। আর আমরা কী জানি? -- মানুষ জন্মে ছিলো ধর্ম হীন হয়ে। তারপর পরিশীলিত জীবনের তাগিদে কার আবির্ভাব বলার অপেক্ষা রাখে না। এ কথা কেন বললুম? মহাভারত এ প্রসঙ্গে বলে, 'ধারণাদ্ ধর্মমিত্যাহুর্, ধর্মো ধারয়তে প্রজাঃ॥" অর্থাৎ যা ধারণ করে, রক্ষা করে এবং সমাজকে স্থিতিশীল রাখে, তাকেই ধর্ম বলা হয়; কারণ ধর্মই প্রজাদের ধারণ ও রক্ষা করে। আবার আরেকটি বহুল প্রচলিত শ্লোক হলো-- ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ॥ বাংলায় যার অর্থ- যে ধর্মকে রক্ষা করে, ধর্মও তাকে রক্ষা করে। এই ভাবনা থেকে অনেকে উজ্জীবিত হয়ে অত্যুৎসাহী হয়ে ওঠেন। তারা পূর্ণ শ্লোকটি খেয়াল করেন না। "ধর্ম এব হতো হন্তি, ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ। তস্মাদ্ ধর্মো ন হন্তব্যো, মা নো ধর্মো হতোহবধীত্॥" বাংলা অর্থ ধর্মকে নষ্ট করলে ধর্মই মানুষকে বিনষ্ট করে; আর যে ধর্মকে রক্ষা করে, ধর্মও তাকে রক্ষা করে। তাই কখনও ধর্মকে ধ্বংস করা উচিত নয়, পাছে ধ্বংসপ্রাপ্ত ধর্মই আমাদের ধ্বংস করে। এখন আমরা কিভাবে ধর্মকে রক্ষা বা ধ্বংস করতে পারি? মনুস্মৃতির ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৯২ তম শ্লোক বলে, - ধৃতিঃ ক্ষমা দমোহস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ। ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্॥ যার বাংলা অর্থ হলো- ধৈর্য, ক্ষমা, আত্মসংযম, চুরি না করা, শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, ধী (বিবেক), বিদ্যা, সত্য এবং ক্রোধহীনতা—এই দশটি হলো ধর্মের লক্ষণ। এই লক্ষণ যদি আমরা রাজনীতির মধ্যে দেখতে পাই, তাহলে রাজনীতি ও ধর্ম নিঃসন্দেহে সোনায় সোহাগা। কিন্তু বাস্তবে ধর্ম কী শুধুই মোহ? শুধু মরে আর মারে? শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৩২ তম শ্লোক বলে, - অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমসাবৃতা। সর্বার্থান্ বিপরীতাংশ্চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।। যার বাংলা তর্জমা হলো-- হে পার্থ! যে বুদ্ধি তমোগুণে আচ্ছন্ন হয়ে অধর্মকে ধর্ম বলে মনে করে এবং সকল বিষয়কেই বিপরীতভাবে উপলব্ধি করে, সেই বুদ্ধিই তামসী বুদ্ধি। এখন একটা গল্প বলি: একদা পুরাকালে অতি শিলাবৃষ্টির কারণে কুরুদেশ বিধ্বস্ত হয়ে গেলো। চক্র পুত্র ঋষি উষস্তি বালিকা বধূ আটিকীকে নিয়ে ইভ্য গ্রামে উপস্থিত হলেন। খাদ্যের সন্ধানে একটি বাড়িতে ভিক্ষা করতে গিয়ে দেখলেন, গৃহস্বামী আধপঁচা মাষকলাই খাচ্ছেন। তার গৃহে আর কোনো খাদ্য দ্রব্য অবশিষ্ট না থাকায় এবং খিদের জ্বালায়, গৃহস্বামীর উচ্ছিষ্ট মাষকলাই খেলেন এবং স্ত্রীর জন্য সামান্য কিছু সঙ্গে নিলেন। তারপর গৃহস্বামী বললেন, বাড়িতে আর পানীয় জল নেই। আপনি কি আমার এঁটো জল খাবেন? -- উত্তরে উষস্তি বললেন, পানীয় জল উচ্ছিষ্ট তিনি খাবেন না। তার উত্তরে গৃহস্বামী বিস্মিত হলেন। তার বিস্ময় দূর করতে, উষস্তি বললেন, খাদ্য গ্রহণ আমার কাছে খুবই প্রয়োজনীয় ছিলো। কিন্তু জল তেষ্টা আমার পাই নি। আর তা পেলে আমি যোগাড় করে নিতে পারবো। ছান্দোগ্য উপনিষদের গল্প আমাদের বলে দেয়, কোনটাকে আমরা উচ্ছিষ্ট মনে করবো। আর এই জন্যই রাজনীতিতে যা উচ্ছিষ্ট তা কখনও সত্য-ই উচ্ছিষ্ট। ঢাকঢোল পিটিয়ে তার প্রচার হয়। আবার কোনো উচ্ছিষ্ট দিব্যি উচ্ছিষ্ট হয়ে যায় না। "চোর ধরো জেল ভরো" প্রচার দেখে তাই গৃহস্বামীর মতো বিস্মিত না হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। মনে হতে পারে, ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্ম যুদ্ধে প্রশ্রয় দিচ্ছি। না, তা মোটেও না। ধর্মের প্রকৃত রূপ দেখুন। খুব ভালো লাগবে। আবার একটি বহুশ্রুত উপনিষদের গল্প বলি, মহাভারতে মহারাজা পাণ্ডু তাঁর পত্নী কুন্তীকে বলেছিলেন। ব্রাহ্মণ সেবার জন্য নিজ পত্নীকে অর্থাৎ তাঁর মাতাকে পুংশ্চলী বা পরপুরুষের অনুবর্তী হতে দেখে একবার খুবই ক্রুদ্ধ হন শ্বেতকেতু। তিনি পিতা উদ্দালকের কাছে প্রতিবাদ করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, এ কী নিয়ম? পুত্রের ক্রোধ দেখে উদ্দালক বলেন, মা তাত কোপং কার্ষীস্ত্বমেষ ধর্মঃ সনাতনঃ।। হে বৎস! তুমি রাগ কোরো না। এটিই চিরন্তন প্রথা এবং প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সামাজিক নিয়ম। আরও বললেন তিনি : অনাবৃতাঃ কিল পুরা স্ক্রিয় আসন্নবাননে। কামচারবিহারিণ্যঃ স্বতন্ত্রাশ্চারুহাসিনি॥ অর্থাৎ প্রাচীনকালে নারীরা কোনো নির্দিষ্ট পুরুষ বা সামাজিক নিয়মের অধীনে আবদ্ধ ছিলেন না। তাঁরা সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন এবং নিজের ইচ্ছামতো বিচরণ করতে পারতেন। তারপর শ্বেতকেতু কর্তৃক বিবাহ আইনের প্রবর্তন হলো। মহারাজা পাণ্ডু কুন্তীকে বললেন, হে মহাভাগে! এরপর শ্বেতকেতু ক্ষুব্ধ হয়ে মানবসমাজের কল্যাণের জন্য এই নতুন নিয়ম আইন প্রতিষ্ঠা করেন। এর বাইরে চলাকে তিনি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই সামাজিক সংস্কার যে ধর্মে নেই, সেই ধর্ম যথার্থ- ই অনাচার, অধর্ম। এই সমাজকে বাদ দিয়ে রাজনীতির অস্তিত্ব নেই। রাজনৈতিক নেতারা যে সব সিদ্ধান্ত নেন, তার প্রভাব পরে সমাজ জীবনে। রাজা ধর্মস্য কারণম্। যার বাংলা অর্থ হলো- রাজা (শাসক) ধর্ম বা ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রধান মাধ্যম। "রাজনীতি" শব্দটি আধুনিক বাংলা শব্দ। সংস্কৃত শাস্ত্রে এর সমার্থক শব্দগুলো হলো—রাজধর্ম, দণ্ডনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং নীতিশাস্ত্র। আমরা গণতন্ত্রে সবাই নিজেদের রাজা বলে থাকি। কারণ আমরাই রাজা নির্বাচন করে থাকি। আর রাজা কী করেন? সাম, দাম, ভেদশ্চ, দণ্ডশ্চেতি চতুরূপায়াঃ। সাম, দান (বা দাম), ভেদ এবং দণ্ড—এই চারটিই রাষ্ট্রনীতির চারটি উপায় বা কৌশল অবলম্বন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। যার ফল আমরা প্রত্যাশা করে থাকি। মহাভারতের রাজধর্মপর্ব পড়লে দেখা যায়, "সর্বে ত্যাগা রাজধর্মেষু দৃষ্টাঃ। সর্বাঃ দীক্ষাঃ রাজধর্মেষু চোক্তাঃ। সর্বা বিদ্যা রাজধর্মেষু যুক্তাঃ। সর্বে লোকাঃ রাজধর্মে প্রবিষ্টাঃ॥ বাংলায় যার অর্থ হলো-- সমস্ত ত্যাগ, সমস্ত দীক্ষা, সমস্ত বিদ্যা এবং সমগ্র সমাজব্যবস্থা রাজধর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আর এই কারণে, গুজরাট দাঙ্গার ঘটনায় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী খুবই স্বল্প শব্দ চয়নে, গুজরাটের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রীকে অনেক বড় কথা বলেছিলেন, "রাজধর্ম পালন করো।" আমি কী ধারণ করবো, আমাকে কে বা কী ধারণ করবে? তার সঙ্গে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশভাগের আগে এবং পরে কোনভাবেই ধর্মকে আলাদা করা যায় নি। যে কোনো রাষ্ট্র বিপ্লবে ধর্মকে বাদ দিয়ে বিশুদ্ধ আন্দোলন করতে চেয়েছেন রাষ্ট্রনেতারা। তারা পেরেছেন কী? খুব কম। হিন্দু স্বরাজ গ্রন্থে মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী বলেছেন, ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতির কোনো অর্থ নেই। ধর্ম ও রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি আবার সত্যকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে বলেছেন, "The truth will set men free." তাহলে, সত্যই মানুষকে মুক্ত করে; রাষ্ট্রের ভয় বা শক্তি নয়। আর এই সত্যের সন্ধান যদি ধর্ম দেয়, তার ফল ঔরঙ্গজেব দেবে। আর যদি আধ্যাত্মিকতা দেয়, তার ফল আকবর দেবে। এ বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করেছি। আধ্যাত্মিকতা শুধু ধার্মিক হলে আসে না। প্রথাগত ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা বিস্তর ফারাক। এই প্রসঙ্গে সুক্ষ পর্যবেক্ষণ আছে। জানিনা সেটা কতটা তাবড় রাজনীতিবিদদের প্রভাবিত করতে পেরেছে। নেতাজি সুভাষ বোস চিরদিন আমাদের অনন্য পথের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "Our task is to stand on the basis of perfect equality, irrespective of religion, caste or creed." (ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে আমাদের দাঁড়াতে হবে।) কিন্তু তাঁর ধর্ম নিরপেক্ষতার উপর একটা সুমিষ্ট আবরণী ছিল। মাতৃভূমি চেতনা ছিলো সবার উপরে। তিনি বলেছেন,"The common bond that unites all Indians is the love of our mother land." এই জাতীয়তাবাদের একটা মাত্রা ছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই পরিমিত জাতীয়তাবাদের পক্ষে ছিলেন। উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে ছিলেন। জাতীয়তাবাদ তো হিটলারেরও ছিলো। কী ফল দিয়েছিলো? অন্যদিকে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অখণ্ড ভারত চেতনা বা জাতীয়তাবাদ চরম জাতীয়তাবাদ অভিমুখী বলে থাকেন অনেকেই। সমালোচনা করেন অনেক রাজনৈতিক দল। যদিও, তারা আদর্শগতভাবে নিজেরাও কোনোদিন ধর্ম নিরপেক্ষ থাকতে চেষ্টা করে নি বা পারে নি। তবুও তাদের বলবো, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে অস্বীকার করতে পারা অসম্ভব। তাঁর জাতীয়তাবাদ অখণ্ডতা, পূর্ণতা। সেটা যদি অন্যকোনো আদর্শ সাংঘর্ষিক হয়, মানুষ তা গ্রহণ করেছে। সেই পথেই তিনি হেঁটেছেন, বন্দি হয়েছেন ও মৃত্যু বরণ করেছেন। তিনি এক জাতির জন্য এক সংবিধান, এক পতাকা এবং এক রাষ্ট্রনেতৃত্বের দাবি জানিয়ে বলেন, "We demand one Constitution, one Flag and one Head for one Nation." ১৯৪১ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ছাড়া কৃষক প্রজাপার্টির প্রাদেশিক মন্ত্রী সভায় অর্থ মন্ত্রী ছিলেন তিনি। ১৯৪২ সালের ১৬ নভেম্বর মাসে পদত্যাগও করেন তিনি। তারপর থেকেই হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে পৃথক পশ্চিমবঙ্গ দাবির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠলেন তিনি। ইতিহাস সাক্ষ্মী, বঙ্গভঙ্গ ও উদ্বাস্তু সমস্যা শুধুমাত্র সংখ্যালঘু হিসাবে দেখলে অর্ধসত্য হবে। ভারতীয় উপমহাদেশের দুপাড়েই তা ছিল ধর্ম ও রাজনীতি। গান্ধী বাদ ছিলো ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতি। তলস্তয়ের আদর্শ এবং খ্রীষ্টীয় অহিংস নৈতিকতা মি. গান্ধীকে অনেকটাই প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত উক্তি হলো- "A man cannot at the same time obey God and obey the State when the State demands what is contrary to God's law." ধর্ম এখানেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে বলে অনেকে মনে করেন। সব ধর্ম না হলেও, কিছু ধর্ম, যেগুলো প্রিন্সপিলস্ নয়, রুলস। ড.আম্বেদকর সোশ্যাল ডেমোক্রেসির কথা সব সময় বলেছেন। দেশভাগের প্রাক্কালে তাঁর কিছু কথা শোনা যেতে পারে। যেগুলো কালোত্তীর্ণ নাও হতে পারে। তবুও উল্লেখ করা প্রয়োজন। -="Hindu society as such does not exist. It is only a collection of castes." এবং, "Caste is not merely a division of labour. It is also a division of labourers. ইসলাম ধর্ম সম্পর্কেও তিনি সমালোচনায় ভারসাম্য রেখে বলেছেন, "Islam is a close corporation and the distinction that it makes between Muslims and non-Muslims is very real." মাতৃভূমি ও সৌহার্দ্য সম্পর্কিত আরও কিছু বক্তব্য আমি বলা সমীচীন মনে করছিনা, কারণ সেগুলি ছিলো মূলত পাকিস্তান দাবির প্রেক্ষিতে করা মন্তব্য। এখন তার প্রাসঙ্গিকতা নাও থাকতে পারে। এবার আসি বীর সাভারকারের বক্তব্যে। সাভারকর তাঁর Hindutva: Who Is a Hindu? (১৯২৩) গ্রন্থে লিখেছেন, "A Hindu is one who regards this land of Bharatvarsha as both his Fatherland (পিতৃভূমি) and Holyland (পূন্যভূমি)." আর এখানেই মুসলিমের সাথে হিন্দুত্ববাদের বিরোধ। অন্যদিকে, মি. গান্ধীর সঙ্গে ড. আম্বেদকরের বিরোধ একটা ছিল। গান্ধী 'রিলিজিয়াস মরালিটি'র কথা বলতেন। আর আম্বেদকরের কাছে, ধর্ম কোন নিয়ম ছিলো না। শুধু মাত্র নীতি। তিনি 'কনস্টিটিউশনাল মরালিটি'তে বিশ্বাসী ছিলেন। জওহরলাল নেহরু অবশ্য ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নিয়ে একটা ধারণা পোষণ করতেন। তিনি বলেছেন, "We call our State a secular one. The word 'secular' perhaps is not a very happy one... It means freedom of religion and conscience, including freedom for those who may have no religion." জার্মান দার্শনিক কার্লমার্কস ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলেছেন, " ধর্ম হলো নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন বিশ্বের হৃদয়, আত্মাহীন অবস্থার আত্মা। ধর্ম হলো জনগণের আফিম। "জনগণের আফিম" এই অংশ বিশেষ নিয়ে ভারতে বামপন্থীরা চর্চা করতে ভালো বাসেন। তবে ভুললে চলবে না যে, উনিশ শতকে এই আফিম ছিলো ব্যাথা উপশমকারী ওষুধ। সমাজ জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী এবার কিছু অন্য ধর্মশাস্ত্রর দিকে দেখা যাক। সূরা আল-মায়িদা (৫:৮) বাংলা উচ্চারণ: ই'দিলু, হুয়া আকরাবু লিত্-তাকওয়া। বাংলা অর্থ: ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার (ভয় ভীতি, নির্দেশ ইত্যাদি) অধিক নিকটবর্তী। ত্রিপিটকের ধম্মপদ (১৮৩) বলে, সব্বপাপস্স অকরণং, কুসলস্স উপসম্পদা। সচিত্তপরিয়োদপনং, এতং বুদ্ধান সাসনং॥ যার বাংলা অর্থ: সব পাপ থেকে বিরত থাকা, সৎকর্ম সম্পাদন করা এবং নিজের মনকে পবিত্র করো। এটাই বুদ্ধদেবের উপদেশ। একইভাবে জরথ্রুষ্টীয় ধর্মের মূল নৈতিক বার্তা হলো- হুমতা, হুখতা, হ্বর্ষ্তা। যার বাংলা অর্থ হলো- সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম। পরিশেষে বলা যায়, সমস্ত ধর্ম -ই মানব ধর্ম হওয়া উচিৎ। সব ধর্ম মোটের উপর কম বেশি সমাজ মুখী। তবে গোঁড়ামী, ধর্মান্ধতা অন্য প্রসঙ্গ। ধর্মান্ধতা বিচ্ছিন্নতার কথা বলে। স্বামীজী বিশ্ব হিন্দু ধর্ম সম্মেলনে কী বলেছিলেন? - বলেছিলেন, "We believe not only in universal toleration, but we accept all religions as true." এই অমোঘ বাণী না মানতে পারলে, "ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।" আর ধর্ম ছাড়া রাজনীতি? এই দেশে অসম্ভব! ভারত জমীন কা টুকড়া নহী, জীতা-জাগতা রাষ্ট্রপুরুষ হ্যায়। হিমালয় ইসকা মস্তক হ্যায়, গৌরীশঙ্কর শিখা হ্যায়। কাশ্মীর কিরীট হ্যায়, পাঞ্জাব ঔর বঙ্গাল দো বিশাল কাঁধে হ্যায়। বিন্ধ্যাচল কটি হ্যায়, নর্মদা করধনী হ্যায়। পূর্বী ঔর পশ্চিমী ঘাট দো বিশাল জঙ্ঘায়েঁ হ্যায়। কন্যাকুমারী ইসকে চরণ হ্যায়। সাগর ইসকে পগ পখারতা হ্যায়। ইসকা কঙ্কর-কঙ্কর শঙ্কর হ্যায়, ইসকা বিন্দু-বিন্দু গঙ্গাজল হ্যায়। হম জিয়েঙ্গে তো ইসকে লিয়ে, মরেঙ্গে তো ইসকে লিয়ে। (অটল বিহারী বাজপেয়ী)

Comments