থানা থেকে আসছি-- দেবশ্রী মজুমদার

থানা থেকে আসছি-- দেবশ্রী মজুমদার
বিয়ে বাড়ির রিসেপশন মানেই সানাই, রঙিন আলোর রোশনাই, ফুরফুরে সুগন্ধি, আর বিভিন্ন পদের সুবাস! কবজি ডুবিয়ে ভুঁড়ি ভোজন আর কি! এক কথায়, হই হই ব্যাপার, রৈ রৈ কাণ্ড বলতে যা বোঝায়!
তার মাঝেই, মহিলা মহলের খুনসুটি, ভাই ! মাথায় টোপর তো পড়লে! কেউ এক কলি গেয়েও শুনিয়েও দিল---
'মাথায় টোপর পড়ার আগে ওজন করে দেখো ,শোলার টুপি লোহার হবে সেটা মনে রেখো '
বিয়ে যে শুধু ওজনদার নয়, কতটা দায়িত্বের উপলব্ধির আগেই- - এক জোড়া হেলমেট নিয়ে হন হন করে -- থানা থেকে আসছি!! বর সৌম্য শংকর চিনতে ভুল করলেন না সিউড়ি ট্রাফিক ওসি সুমন প্রামাণিককে। কারণ তাড়াহুড়োয় হেলমেট মাথায় না নিয়ে বেরিয়েছিলেন বাইরে। স্টেট ব্যাংকের কাছে এই ওসির কাছে ফাইন গুনতে হয়েছিল। নববধূ সায়ন্তীর কাছে চমক। পুলিশ আসায় অনুষ্ঠানে তাল কাটেনি একটুও। কারণ হাতে উপহার, ফুলের ব্যুকে। তাঁদের দুজনের ডিজিটাইজড ছবি দিয়ে স্মারক।আর একগাল হাসি!
আসাটা তাঁদের সারপ্রাইজ হলেও, আন্দাজ একটু ছিল। কারণ বিয়ে বাড়ি থেকে কেটেরারের ফোন নং নিয়েছিল ট্র্যাফিক পুলিশ। বলা হয়েছিল ' পথ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বার্তা' রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হবে। সেভ ড্রাইভ সেফ লাইভের প্রচার হিসেবে এখন বিয়ে বাড়িকেই টার্গেট করেছে ট্রাফিক বিভাগ। আগেও একই ভাবে লাভপুরে নবদম্পতিকে হেলমেট দেওয়া হয়েছে।
এবার একটু পরিচয় দেওয়া যাক। বীরভূমের সিউড়ি শহরের ৭ নং ওয়ার্ডের কালিবাড়ি এলাকায় বর সৌম্য শংকর রায়ের বাড়ি। পেশায় ওষুধ ব্যবসায়ী। ১৫ অগাষ্ট হুগলি জেলার উত্তর পাড়াতে বিয়ে হয়। তার দুদিন পর জাতীয় সড়ক সংলগ্ন এক বেসরকারি ভবনে ছিল রিসেপশন। নিমন্ত্রিত অতিথিরাও পুলিশের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। জেলা পুলিশ সুপার শ্যাম সিং বলেন, পথ নিরাপত্তা নিয়ে আমরা এই ধরণের কর্মসূচি নিয়ে থাকি। মানুষ খুব ভালো সাড়া দিচ্ছেন।
নববধূর কাছে এই অভিজ্ঞতা বেশ ভালো। যদিও একটি হেলমেট বাড়িতে আছে। তবে উপহার বলে কথা! স্বামীর বাইকের পিছনে বসে কোন বিশেষ মুহূর্তে দুজনে এক কলি গুনগুনিয়ে উঠতেও পারেন---এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো-

     

পটুয়ার চোখে জলছবি---দেবশ্রী মজুমদার

পটুয়ার চোখে জলছবি
দেবশ্রী মজুমদার
শিল্পীর চোখে যখন জল, বিশ্ব স্রষ্টাও কী কাঁদে! হয়তো তাই। কারণ তখন শিল্প ও শিল্পীকে আলাদা করে চেনা যায় না!
" তোমার সিন্ধু মারা গেছে সরযু নদীর কূলে আরে কি কার্য করিলি রাজা কি কার্য করিলি আমার অন্ধের লড়ি রাজা তু কেন ভাঙিলি"(সিন্ধু বধ)। পটুয়াগানের তালে তালে পট দেখানো আর হয় না। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই শান্তনু পটুয়ার কথায় শিল্পী অরুণ পটুয়ার চোখ ছলছল করে উঠলো। ভারাক্রান্ত হয়ে বলে চললেন, শান্তিনিকেতনের খোয়াইয়ে শনিবারের হাটে বছর দুয়েক আগে পর্যন্ত এসেছেন পটের গান শোনাতেন দাদা। দাদা আর জীবিত নেই। আর বলতে পারলেন না। চোখে আর বাঁধ মানলো না ভাইপোর কথা বলতে গিয়ে। একটু থেমে বললেন, ভাইপো পট ছেড়ে পেটের ধান্ধায় কোন এক দোকানে কাজে লেগেছেন। এক বুক দুঃখ নিয়ে এঁকে চলেছেন....
শান্তিনিকেতনের নন্দন আর্ট গ্যাল্যারী। শিল্পী আপন মনে বসে পট আঁকছেন। পর্যটক থেকে উৎসাহী মানুষের আগ্রহের উত্তরও দিচ্ছেন। চলতি মাসের ১৬ তারিখ বিশ্বভারতীর কলাভবনের পেন্টিংস বিভাগের উদ্যোগে বেলা দুটো নাগাদ নন্দন আর্ট গ্যালারীতে পট প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। সেখানে বেশ কয়েকজন পটুয়ার পট নিয়েই এই প্রদর্শনী। প্রদর্শনী চলবে ১৯ তারিখ পর্যন্ত। খোলা থাকবে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
শনিবারের প্রদর্শনীর দুপুরে একা পাওয়া গেল এক পটুয়াকে। নাম অরুণ পটুয়া। বাড়ি ময়ুরেশ্বর থানার ষাটপলশা অঞ্চলের সেরুনিয়া গ্রাম। তাঁর পিতামহ শ্রীপতি পটুয়া ও বাবা বাঁকু পটুয়া ছিলেন এলাকার বিখ্যাত পটুয়া শিল্পী। অরুণ পটুয়া বলেন, পটের গান শুনিয়ে আর পেট ভরে না। দু’এক কেজি চালে কী হবে বলুন? তাই অবসর সময়ে আঁকা শেখাই। তবে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তাঁর জন্য মাসিকা হাজার টাকা শিল্পী ভাতা পাই। তাতে নুন তেলটা হয়। এর মধ্যেই মেয়ে পায়েল পটুয়া একাদশ শ্রেণীতে পড়ছে। তারপর পট শিল্পের কথা উঠতেই তিনি বলেন, পট শিল্প একদিন হারিয়ে যাবে। আমাদের পূর্বপুররুষরা ছিলেন বেদে। আমরা উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ। আমাদের রক্তে পট শিল্প। কিন্তু এখন আর কেমূল্য বোঝে! সরকারের উচিৎ পটের জন্য একটা মিউজিয়াম করে পট শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা। বর্তমান প্রজন্ম এই পট কি তা জানে না! তবে এই প্রদর্শনীতে এসে অনেকেই আগ্রহের সাথে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, কী রঙ ব্যবহার করেছি। কি করে পট বানানো হয়। পটের গান কী নিজেই লিখেছি ইত্যাদি। জানা গেছে, এর আগে দিল্লী ও ভোপালে তিনি প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণ করেন।
পট কিভাবে তৈরী হয়? তার উত্তরে তিনি জানান, আর্ট পেপারে ছবি আঁকা হয়। বিশেষ ঘরানার এই ছবি। আগে কালিঘাটে পটের কথা অনেকেই শুনেছেন। বা যামিনী রায়ের শিল্প কর্ম অনেকেই দেখেছেন। সেই আর্ট পেপারের নীচে কাপড় সাঁটানো হয়। আদিবাসীরা শিকারে গেলে কাঠবেড়ালি শিকার করে। তার লেজেই বানানো হয় তুলি। রঙ প্রাকৃতিক। মোরাম থেকে লাল রং। কাঁচাহলুদ থেকে হলুদ রং, সাদা রঙের সাথে অন্য রং মিশিয়ে বেগুনি, খোলার কালি থেকে কালো রং।
অরুণ পটুয়া বাবার ৮টি এবং দাদুর ১টি পট নিয়ে এসেছেন প্রদর্শনীতে। ১২৫ বছরের পুরানো পট সিন্ধুবধ দেখা গেল প্রদর্শনীতে। শ্রীপতি পটুয়া লিখেছেন পটের গান—অর্জ রাজার পুত্র রাজা/ নামে দশরথ/ সভা করে বসলেন লয়ে প্রজাগন/ প্রজাগণে বলেন উনি/ শোনেন মহাশয়। শনি রাজাকে নিলে রথ যাত্রায় …
বাঁকু পটুয়ার মোট ৮ খানা পট স্থান পেয়েছে এই প্রদর্শনীতে। যেমন- পরিবার কল্পনা, সিন্ধু বধ, নিমাই সন্যাস, গোপালন, বেহুলা লক্ষ্মীন্দর ও রবীন্দ্রনাথ অন্যতম। তিনি লিখেছেন- আমার ধ্যানের গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ জন্ম নিয়েছে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে/ পিতা তাঁর দেবেন্দ্রনাথ/ মাতা সারদা দেবী/ তাঁহার গর্ভে জন্ম নিলে …

বিলাপ করলেই,ব্রেক আপের দুঃখ বিলোপ-- দেবশ্রী মজুমদার

বিলাপ করলেই, বিলোপ ব্রেক আপের দুঃখ—দেবশ্রী মজুমদার   
 ব্রেক আপ ! ব্রেক আপ! শুনতে শুনতে ফেড আপ!  এতো আর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মনো মালিন্য নয়! যে ‘ম্যয় তো মাইকা ঘর চলা যাউঙ্গি’ বলা মাত্রই স্বামী সোজা হয়ে যাবেন। এখন ব্রেক আপ মানেই ফাইনাল ব্রেক আপ!
কে আর খুলে বসে মধ্য যুগীয় বৈষ্ণব পদাবলী বলুন! আহা!--
 খুলিয়া চাঁপার মালা এলায়ে কবরী
বধূঁর যুগল পদ বাঁধেন কিশোরী।  
এই ‘মান’, ‘আভিসার’ ,  ‘মিলন’ এসব তখন মূল্যহীন। ব্যস্ত জীবনে প্রেমের ফুল কুসমিত হওয়ার আগেই ‘ব্রেক আপ’। এরই নাম হয়ত আধুনিক প্রেম।  তাই অনেককেই বলতে শোনা যায়, স্বামীকে পাওয়ার আগেই নাকি অনেকের সাথেই ‘ব্রেক আপ’ হয়েছে।  কিন্তু কেন এত বেশী করে ব্রেক আপ?  এই প্রশ্ন কী আমরা কখনও  নিজেদের করেছি? বিজ্ঞরা বলেন,  মননের দরকার আছে।  পুনরায় পর্যালোচনা করা দরকার সেই ছোট ছোট অভ্যাস গুলোকে সম্পর্কের রাস্তায় হাঁটবার সময় যা হয়ত নিতান্ত অবহেলায় রাস্তার দুধারে ফেলে এসেছি অনেকদিন আগেই!
অনেকেই বেশ স্বস্তির সাথেই বলেন,  যাহোক আমি সেই দুঃসময় শেষমেশ কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।  কিন্তু কতটা সময় লাগতে পারে এই অপূর্ণ ভালোবাসার ক্ষত সেরে উঠতে?  তখন কী করবেন আপনি? দেবদাসের মত উড়ু উড়ু ভাব নিয়ে ঘুরবেন? না পারোর মত দুঃখের অনলে আগুন পোহাবেন? কবি বলেছেন যে, আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে, আসেনাই কেহ অবনী পরে। ঠিক তাই, আমাদের বাঁচাটাই পরস্পরের জন্য। এব্যাপারে মনস্তত্ববিদরা অর্থাৎ যাঁদের কাজ মানুষের মন নিয়ে, তাঁরা আপনাদের সাহায্য করতে পারবেন।  অবশ্য যদি আপনি চান।
মনের ভার লাঘব করতে গেলে, দুঃখ চেপে রাখলে হবে না। মোদ্দা কথা, দুঃখ করুন। হাল্কা হবেন।  যদি নিজেকে নিয়ে ঘরের কোনে গুটিসুটি মেরে দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে পড়ে থাকবেন ভাবেন, সেটা কোন সমাধান নয়।  জ্যাকসন নামে একজন পাশ্চাত্যের থেরাপিস্ট মনে করেন, নতুন সম্পর্কে প্রবেশের আগে, পুরানো সব মন থেকে ঝেড়ে ফেলুন।  আর এটা খুব কঠিন কাজ। কারণ বার বার এরকম ঘটলে, কারো মনে হওয়া স্বাভাবিক, কেন আমার ক্ষেত্রেই বার বার এমন হয়?
কোন প্রিয় সম্পর্কেই ইতি মানেই একটা মৃত্যু। আশা, স্বপ্ন, কত মুহূর্ত, সব কিছুর মৃত্যু। সেই মৃত্যু শোক বহন সহজ নয়।  মনস্তত্ব বিদ ট্রিসিয়া ওয়ালনিন অনেকটা তাই মনে করেন।  কিন্তু এক্ষেত্রে দুঃখ পেয়ে বিলাপ করলে, দুঃখ বিলোপ হবে। মনের ক্ষত সারবে। এটাও আধুনিক শাস্ত্রে এক নিরাময়ী চিকিৎসা। কেউ কেউ বলেন, টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার। সময় সব করতে পারে না। যদি, আমরা নিজেরা চেষ্টা না করি। এলিনা জ্যাকসন একজন চিকিৎসক মনে করেন,  নিরাময় নির্ভর করে রোগী কেমনভাবে  ব্যর্থতা, প্রত্যাখ্যান এবং ত্যাগের মত বিষয়ে কেমন প্রতিক্রিয়া দেয়। আর এটাই ‘ মোরনিং প্রসেসে’ অর্থাৎ দুঃখ অনুভূতির মধ্য দিয়ে নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে।
চিকিৎসক ডানি মোয়ের মতে মনের এই ক্ষত সারানো যেতে পারে কতগুলি উপায়েঃ –
১) নতুন প্রেমে পড়ার মধ্য দিয়ে এই ক্ষত অনেকটাই সারানো যেতে পারে।  
২) মজা পাওয়ার মত কোন কাজে নিযুক্ত হওয়া। তার পর সেটা শেষ হতেই দুঃখের প্রকাশটা সহজেই হতে দেওয়া।  
এমিলি জ্যাকসন আবার মনে করেন,  কোন কিছু সৃজনশীলতা, চিন্তন ও তার মধ্য দিয়ে শোক ভুলে পুনর্যৌবন লাভ করা যায়।  
চিন্তন নিয়ে আসে আত্মবিশ্লেষণ। তখন বোঝা যায় নিজের ছোট ছোট ভুল ত্রুটি গুলো। পারস্পরিক ভালবাসার অর্থ পারস্পরিক সমঝোতা।  হয়ত সময়ের ফেরে সেগুলো কেউ ভুলে থাকতে পারে। আর তাতেই সম্পর্কের টানাপোড়েন।  ক্রোধ, দুঃখ, অভিমান এসবের বিয়োজন দরকার। সাফ কথা, কান্না পেলে কাঁদুন।  এই উপদেশ খ্যাতনামা চিকিৎসক ওয়ালনিনের।  ব্রেক আপের সময় খুব স্ট্র্যাটেজিক ভাবে চলা উচিৎ। দুঃখকে বেরোতে দিন। সেই সময় যেটা ভালো লাগে করুন।  তবে সেটা বাঁচবার জন্য।  কিন্তু অনেক সময় অনেকেই ভাবে না, একটা খারাপ সম্পর্ক শেষ হওয়া ভালো। কারণ একটা ভালো সম্পর্ক পাওয়ার অধিকার বা যোগ্যতা তার বা তাদের আছে।  
এবার আসা যাক, চিন্তার প্রসঙ্গে, যদি প্রাক্তনী বা প্রক্তনের কথা চিন্তা করতেই হয়,  তখন ভাবতে হবে সেই সময় তার নিজের আচরণ কেমন ছিল?
ভাবতে হবে  হারানোর দুঃখ  থেকে সেই মুহূর্তগুলো বেশী করে যেগুলো উভয়ে মেনে নিতে পেরেছিলেন। আর সেটা  দুঃখের মধ্য দিয়েই।  
জীবন থেমে থাকে না। তাই শুরু করুনঃ
১) ফের ডেটিং
 ২) নতুন স্মৃতি, নতুন অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩)  বিবাহিতরা নিজেদের যৌন জীবন গড়ে তুলুন নতুন  বৈচিত্রের মধ্যে দিয়ে। যাতে এক ঘেয়েমি কাটে। তবে জোরাজুরি নয়। নির্দিষ্ট আবেগ ঘন মুহূর্তের জন্য যে সময় উভয়ের মন সাড়া দেবে। বিবাহিত জীবন মানেই যৌন জীবন নয়। পরস্পরের ছোট ছোট ভালো লাগাগুলো গুরুত্ব দিন। নিজেদের জন্য সময় বের করুন। তাহলে কখনও হাঁফিয়ে উঠবেন না।  
৪) সহজ সাবলীল প্রশ্নের মধ্য দিয়ে বোঝাপোড়া গড়ে তুলুন।
৫)  আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার মধ্যে পরিস্থিতি সামলান। কোন মিথ্যা ভাষণ নয়।
৬)  খুব পজিটিভ চিন্তার শরিক হোন।
৭) ছোট খাটো সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে  দিয়ে সম্পর্কের ভিত গড়ুন।  
বেস্ট অফ লাক।              

     

এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে ঃ দেবশ্রী মজুমদার

এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে ঃ দেবশ্রী
মজুমদার
বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে
পরান্মুখ সবুজ নালিঘাস
দুয়ার চেপে ধরে—
অবনী বাড়ি আছো? – শক্তি চট্টোপাধ্যায়
জানি না এখানে বৃষ্টি বারোমাস কিনা! মেঘ গাভীর মত চরে কিনা? আমরা অবনীর মতো নিজেকে খুঁজে বেড়াই। পরান্মুখ নালিঘাস যে মায়ার মত আমাদের চেপে ধরেছে। তাই বিচিত্রবোধে এত হানাহানি। খুব সত্যি কথা আমাদের জীবনে যেমন ধর্ম আছে, তেমনি জিরাফও আছে। আসতে আসতে জিরাফের জয় হবে। এই আশায় বসে থাকা- বলতে শুনি অনেক প্রবীণদের। মোদ্দা কথা, জিরাফের জয় না হলে, মানুষ ধর্মকে হাতিয়ার করে ফতোয়া দেবে চিড়িয়াখানায় জিরাফ দেখা যাবে না। হিন্দু মুসলিম কোন গ্রহ্নে তার উল্লেখ নেই। দিনে ফতোয়া চললেও, রাতে আবার ফতোয়াবাজরাও চুপি চুপি দেখে যাবেন। আর তাহলেই হয়ত একদিন ধর্মান্ধতা দূর হবে। ফিরে আসি সেই ভাব নিয়ে- এখানে মেঘ গাভীর মত চরে। প্রাচীন গ্রহ্ন ঋগ্বেদে, এরকম বলা আছে। ইন্দ্র গাভীকে দোহন করেন। অর্থাৎ এই মেঘ আসলে গাভী। ইন্দ্র তাকে দোহন করেন। অর্থাৎ বৃষ্টি আনেন। আর এই গাভীই রূপক অর্থে মেঘই হোক আর যাই হোক, গোমাতা হিসেবে ভারতবর্ষের মূল বিষয়। তাই প্রায়ই গোরক্ষকদের তান্ডব চলে। হিন্দুদের নিষিদ্ধ মাংস রাখা নিয়ে বিতর্কে মৃত্যুর খবর কারো অজানা নয়। নিষিদ্ধ বললে, অনেকেই ঋগ্বেদ সংহিতা (৬।১৭।১১ ঋকবেদ) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলবেন-- স্বাদোরিত্থা বিষ্ণু মধ্বঃ পিবন্তি গৌর্য্যঃ – সৌবর্ণ গাভী সকল সুস্বাদু এবং এ প্রকারে সর্ব যজ্ঞে ব্যপ্ত মধুর সোমরস পান করে। তোমার বৃষদিগকে ইন্দ্র ভক্ষণ করুন, তোমার অতি চমৎকার, অতি সুখকর হোমদ্রব্য তিনি ভক্ষণ করুন। বৈদিক ধর্মাচরণে যজ্ঞের একটি উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল বলে অনেকে মনে করেন। সেই যজ্ঞে পশুবলি আবশ্যকীয় ছিল। এই পশুবলি ছিল উৎসর্গ প্রথা। পরবর্তীকালে ভাগবত সম্প্রদায় যজ্ঞে পশু হত্যার কঠোর সমালোচনা করেন ও তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁর মধ্যে অনেকেই আছেন। (অজিত কুমার চক্রবর্তী- হিন্দু ধর্ম)।
এবার আসি প্রসঙ্গে। হরফ প্রকাশনীর বইয়ের মুখবন্ধে—বিদগ্ধ আব্দুল আজীজ আল আমান ১০।৮৬।১৩ ঋগ্বেদের উল্লেখ করে বলেছেন, তোমার বৃষদিগকে ইন্দ্র ভক্ষণ করুন, তোমার অতি চমৎকার, অতি সুখকর হোমদ্রব্য তিনি ভক্ষণ করুন। এই অকাট্য প্রমাণের পর, আর তো কিছু বলার থাকে না। আর শুধুমাত্র গাভী নিয়ে এত দ্বন্দ্ব। যেখানে গাভীকে জ্যোতিঃরাজি হিসেবে বোঝানো হয়েছে। বিষয়টি পরিষ্কার করতে ঋষির ব্যাখায় বলি-- ‘গাবো মতয়ঃ’ এদেরই মুক্ত করতে হবে অন্ধকারের কারাগার থেকে। গো অশ্ব স্থূল ভৌতিক গো অশ্ব নয়। এগুলো আধ্যাত্মিক ধনরাজির প্রতীক। একইভাবে সোমরস মধু মদিরাময় নয়। ইহা নদীগুলিতে অবস্থান করে। সমুদ্রে অবস্থান করে। সেক্ষেত্রে যজ্ঞে অন্যান্য নিবেদনও প্রতীকার্থক হতে বাধ্য। বাহ্য যজ্ঞ আন্তর দানের প্রতীক ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। ( বেদ রহস্য ঃ শ্রী অরবিন্দ) সমগ্র বেদ রূপকল্পে পরিপূর্ণ। মুনিঋষিরা তাঁদের জ্ঞান অযোগ্যদের হাত থেকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। হয়তো এই কথা বিশ্বাস করে যে সর্বোত্তম বস্তুর অশুদ্ধতা নিয়ে যাবে নিকৃষ্টতম অবস্থার দিকে এবং সোমদেবতার শক্তিশালী সুরাসার হয়তো দিতে হবে দুর্বল শিশুহস্তে। ( বেদ রহস্য—উত্তরার্ধ—শ্রী অরবিন্দ) তাহলে, গাভীর মাংস সুস্বাদু, আমার উদরের দুই দিক পরিপূর্ণ করবে, এই যুক্তি বাহ্যিক লক্ষণ মাত্র। কিন্তু সেকারণেই অন্যরা ভক্ষণ করলে বাধা দিতে হবে, এমন কথা শুধু বেঠিক নয়, অন্যায়, নীতিবিরুদ্ধ ও অমানবিক। আর এই অর্বাচীনদের জন্য হিন্দুদের গোমাতার আদর্শ সন্তান বলে টিপ্পনি শুনতে হয়। হিন্দু ধর্ম বলতে যেটা আমরা বুঝি। তা স্বামী বিবেকান্দ এক কথায় সহজভাবে বুঝিয়ে গেছেন- জীবে প্রেম করে যেই জন সেই জন সেবিছে ঈশ্বর। সেই কথাই, বহুযুগ আগে উচ্চারিত যাজ্ঞ বল্ক্য উপনিষদে- ঈশ্বরো জীবকলয়া প্রবিষ্টো ভগবানিতি। প্রণমৎ দণ্ডবৎভূমা-বাশ্চণ্ডাল গোখরম। জীবদেহ পরমাত্মারই অংশ। তিনিই প্রতিটি জীবদেহে প্রবিষ্ট হয়ে আছেন বলেই ভগবান। সুতরাং সন্যাসী চণ্ডাল থেকে শুরু করে গরু, গর্দভ, চতুষ্পদ পশুকেও ভগবান জ্ঞানে ভূমিতে দণ্ডবৎ হয়ে প্রণাম জানাবেন।
আমরা কিছুতেই একমত হতে পারি না এই ভেবে অনেকেই হতাশাগ্রস্থ হন। ঠিক আছে অন্ততঃ এটাতেই আমরা একমত হই। পরে যুক্তি দিয়ে বিচার করা যাবে। লেট আস গোউ দেন, ইউ এন্ড আই …
টু লিড ইউ টু এন ওভারহোয়েলমিং কোশ্চেন …(দ্য লভ সঙ অফ জে আলফ্রেড প্রুফ্রক- টি এস ইলিয়ট)
আর সেটা অবশ্যই জয়শ্রীরাম ধ্বনি। এতৎ অক্ষরং হি ব্রহ্ম এব। এভাবে হাটে ঘাটে মাঠে এই ধ্বনি ছড়াবার দরকার কী খুব আছে?
আমরা কিন্তু কেউ প্রুফ্রক নই। তাই বলব দ্বিধা ছাড়াই। না হলে তর্ক জমে না। অমর্ত্য সেনের অমূল্য বই 'তর্কপ্রিয় ভারতীয়' আছে আমাদের কাছে। তাই তাঁর পক্ষপাতিত্ব বিষয়ক বিশ্লেষণ প্রসঙ্গ উদ্ধৃত করলামঃ ‘ --বলা হয় যে যখন বহু বিবাহের কারণে একজন হিন্দুকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। তখন ইসলামি আইনি ব্যবস্থায় একজন মুসলমানের চারটি স্ত্রী থাকতে পারে। ( কার্যক্ষেত্রে যদিও ভারতীয় মুসলিমরা এই আইনের সুযোগ কদাচিৎ গ্রহণ করে থাকেন।) ১৯৫৫-৫৬ সালে হিন্দু আন্দোলনের ফলে হিন্দুদের এই ব্যক্তিগত আইনের বেশ কিছু ধারা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত আইন পালটায় নি। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি হিন্দুদের উপর চাপানো হল, মুসলিমদের উপর হল না’।
বিয়ের পার্থক্য যদি বড় হয়, তাহলে স্ত্রীর পরিচয় না দিয়ে একাধিক বিয়ের পথে অনেকে পা বাড়াবেন বলে মনে হয় না।
অমর্ত্যবাবু বলেছেন, ‘বার বার যে হিন্দু হিন্দু বলি, হিন্দু শব্দটি দেশ ও স্থান নির্দেশক। ইন্দাস বা সিন্ধু নাম থেকে ইণ্ডিয়া শব্দ এসেছে। একসময় ভারতীয় মুসলিমদের ফারসি বা আরবি ভাষায় বলা হত ‘হিন্দভী’ মুসলিম। ব্রিটিশরাও আগে ‘হিন্দু মুসলমান’ বা ‘ হিন্দু খ্রিষ্টান’ বলতেন। অন্যদিকে, মুসলিম আনুগত্য নিয়ে অনেক কথা উঠে আসে। তার মধ্যে ভারত পাকিস্তানের ম্যচে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাজি পোড়ানো’। এক্ষেত্রে এই পার্থক্য খেলাচ্ছলে দূর করতে না পারলে, দুই পক্ষের লোকসান। কারণ একটি নৌকায় আমরা উভয় সম্প্রদায় আছি। বর্তমান ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা কতটা প্রয়োজন তার আলোচনায় লেখক বলেছেন, অতীতের মুসলিম সম্রাটেরা কি করেছেন বা না করেছেন, তাঁরা সাম্প্রদায়িক ছিলেন, না পরকে আপন করতে চাইতেন, পীড়ন করতেন, না সহনশীল ছিলেন, সে বিষয়ে কোনও বক্তব্য কোন ভাবেই আবশ্যক নয়। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য এরকম এক অবস্থান – যথা, মুঘলরা অমুকটা করেছিল অথবা করেনি—কোনও অপরিহার্য কারণ হতে পারে না। মুসলিম শাসকদের অপরাধ আজকের ভারতের চোদ্দো কোটি মুসলমানের স্কন্ধে চাপানোর কোনও অর্থ নেই। বহু শতাব্দী আগে মুসলিম শাসকরা কী করেছিলেন বা না করেছিলেন, তার নিরিখে বর্তমান ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা বা তাঁদের রাজনৈতিক আনুগত্য সম্পর্কে কোনও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
হিন্দুদের বহুত্ব অর্থাৎ বহু ঈশ্বর বাদ থাকলেও, আল বিরুণীর বিবরণে হিন্দুদের কাছে শিক্ষণীয় বলে একটা দিক উল্লেখ করা আছে। একাদশ শতকে ভারতে এসে উনি হিন্দুধর্মের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ঈশ্বর সম্পর্কে ধর্মালম্বীদের মধ্যে বিশেষ কলহ হয় না। বড়জোর বাগযুদ্ধ অর্থাৎ তর্ক বিতর্ক চলে। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই নিজের দেহ, আত্মা বিসর্জন দিয়ে অর্থাৎ ‘খুনোখুনি’র পথে ধর্মীয় কলহের নিষ্পপ্তি করতে চায় না। তাই বিষয়টি কিন্তু শিক্ষণীয়( অমর্ত্য সেন)।
হিন্দু মুসলমানের আরেক বিবাদের কারণ পৌত্তলিকতা। আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে, হুজুরদের ফতোয়া দিতে শোনা যায়, মূর্তি ভাঙার। মানুষের উপর আক্রমণ যা অনেক সময় অবিভক্ত ভারতে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামকে কিছুটা হলেও মনে করিয়ে দেয়। আমাদের দেশে সাতগাছিয়া, ধুলাগড়,কালিয়াচকের মত কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভোট রাজনীতির কারণে সাম্প্রদায়িক রূপ নিলেও, এরকম ঘটনা খুব একটা ঘটে না। ফিরে আসি সেই কথাতে যেটা বলতে চাই। এখানে শুধু মূর্তি নয়, আঘাত হয় বিভিন্ন ধর্মস্থানেও। তাই এই বিবাদের মূলে কিছু কথার প্রয়োজন আছে। হিন্দু ধর্মের আরেক লক্ষণ মূর্তি পূজা। বৈদিক যুগে মূর্তি পূজার প্রচলন ছিল না। মূর্তিপূজার ধারণা বহুপরবর্তী কালের। বেদ – উপনিষদের ঋষিগণ নিরাকার আনন্দ –স্বরূপ ব্রহ্মোপলবদ্ধিতে সক্ষম হলেও, সাধারণ লোকের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না বলেই পরবর্তীকালে অধিকারভেদে ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন গুণ অনুসারে প্রতীকরূপে মূর্তিপূজার প্রচলন হয়েছিল। পুরাণের যুগেই এই সব দেব কল্পনা ও মূর্তিপূজার প্রচলন হয়েছিল। খ্রীষ্টপূর্ব চতূর্থ শতকে ইতিহাসখ্যাত মেগাস্থিনিস তাঁর বিখ্যাত ভারত বিবরণে বলেছেন – ভারতীয়গণ মন্দিরে দেবতাদিগের আরাধনা করিত না। খ্রীষ্ট পূর্ব প্রথম শতকে ভগবান বুদ্ধের মূর্তি নির্মিত হয় নি। পরিবর্তে বুদ্ধের প্রতীকরূপে পদচিহ্ন, ধর্ম চক্র, বোধিবৃক্ষ প্রভৃতি প্রতীকগুলি পাথরে খোদাই করে উপাসনা করা হত। গুপ্ত যুগে এই মূর্তি পূজার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। বেদে একেশ্বরবাদ স্বীকৃত। আমাদের দেশে বহু দেবতায় বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও শিকড় একেশ্বরবাদে। সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম তজ্জ্বলানীতি—ব্রহ্মেই সব কিছুর উৎপত্তি, স্থিতি, বিলয়। ( ছান্দোগ্য উপনিষদ)। তাই মূর্তি নিয়ে দুই সম্প্রদায়ের বিভেদ খুব একটা যুক্তিযুক্ত নয়। বিভিন্ন ধর্মস্থানে আঘাত প্রসঙ্গে আসি। যদি বিশেষ কোন ধর্মীয় রেলিকসকে ভেঙে দেখা যায় তাহলে হিন্দু, বৌদ্ধ, সেমিটিক ধর্মকে পাবো। এমনকি পাঁচ হাজার বছরের প্যাগান ধর্মকে ফিরে পাবো। সেটা নিয়ে হানাহানি ঠিক নয়। ধর্ম পরিবর্তিত হয়। সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচা যেতে পারে। যা আমাদের সমৃদ্ধ করতে পারে ( শিল্পী- সাজ্জাদ হামদানি)।
ধর্মীয় গোঁড়ামি নিয়ে বলতে গেলে একটু পিছোতে হবে। বিশ শতকের গোড়ার দিকে ১৯০২ সালে আমেরিকান বাইবেল লীগের প্রতিষ্ঠা হয়। ‘দ্য ফাণ্ডামেন্টালস’ নামে এই সংগঠন ১২টি পুস্তিকা প্রচার করেন। বাইবেলের সবরকম সমালোচনার সমালোচনা ছিল এদের লক্ষ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এদের কার্যকারিতা জঙ্গী আকার ধারন করে। সেই সময় এদের ধ্যান ধারনাকে মৌলবাদ বলা হয়। এরা সংস্কার বিমুখ। ধর্মীয় ব্যাপারের কোন পরিবর্তনে তাঁরা খড়গ হস্ত। তাঁরা বিবর্তনে অবিশ্বাসী। (উৎস – দ্য ফাণ্ডামেন্ট্যালস- সৌরীন ভট্টাচার্য)। আমাদের দেশেও যে এমনটি ঘটে না, তা নয়। আর এই দিকটাকেই আমরা আলোচনার মধ্যে প্রকট করি। কিন্তু দেখি না শাস্ত্রীয় অনুশাসনকে এড়িয়ে মারফতি ধর্মীয় ও মানবিক দর্শনকে। এই দর্শনের উদ্ভব সুফি সাধনার ঐতিহ্য থেকে। মারেফত অর্থাৎ জ্ঞান। সত্যকে জানার জ্ঞান। তাই এই সাধনা সংস্কার মূলক। এখানে গুরুর প্রভাব প্রবল। এটাই এই দর্শনের সীমাবদ্ধতা। তবে এরা ঐশী প্রেমে পাগল হওয়ায়, সে দোষ ওতটা প্রকট নয়। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, ধর্মীয় অনুশাসনের সাথেই মিশে আছে এই মারফতি দর্শন। অনেকটা দুধের মধ্যে থাকা মাখনের মত। (উৎস- মারফতি দর্শন- দিব্যজ্যোতি মজুমদার)।
মনে এক বুক আশঙ্কা নিয়ে কেউ কেউ বলেন আদমসুমারীতে ধর্ম ভিত্তিক সংখ্যাতত্ত্বের কথা। কিন্তু উল্টো ভাবে বলা যেতে পারে, হিংস্রতার জন্য সংখ্যাটা বড় কথা নয়, তার প্রমান ইজরায়েল। সোজাকথা বিদ্বেষ তাই এত বিভাজন। কিন্তু অনেক সময় বিদ্বেষ না থাকলেও, বিভাজন চলেই আসে! বাসে, ট্রেনে চট করে একটা রুমাল জানালা দিয়ে গলিয়ে, নিজের জায়গা তো করলুম, কিন্তু পাশের জায়গাটাও চাই। ওটা রেখেছি ভাইয়ের জন্য। একজন ভিড় ঠেলে এসে বললে, দাদা কেউ আছে? উত্তর ছিল যথাযত- ভাই বসবে। বোধ হয় রসিকতা করেই বললে কেউ একজন—দাদা, আমরা কী কেউ আপনার ভাই হতে পারি না? অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি!!
আসলে কি জানেন? আমরা মাথায় ভূত বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, –‘মানুষের মৃত্যু আছে, ভূতের মৃত্যু নেই’। এই সর্বনেশে কর্তার ভূত , লেখকের কথায়, দেশটাকে নাড়েও না, অথচ ছাড়ে না। তাই আজ মানুষ ভয় পাচ্ছে! কেন জানেন? তারপদবাবুকে জিজ্ঞেস করুন, বলবে। মানে তারাপদ রায়ের কথা বলছি। তবে শুনুনঃ
জনৈক ভূত দ্বিতীয় ভূতকে জিজ্ঞাসা করল,
‘আচ্ছা, তুমি মানুষ বিশ্বাস করো,
তুমি মানো যে মানুষ আছে?’
দ্বিতীয় ভূত একটু ভীরু প্রকৃতির।
প্রশ্নটা শোনামাত্র শিউড়ে উঠল,
এদিক –ওদিক দেখে তারপর বলল,
‘এই ভর সন্ধ্যাবেলা এসব কি কথা!’
প্রথম ভূত সরাসরি প্রশ্ন করল,
‘কিন্তু কিভাবে বুঝলে যে ওরা মানুষ ?
ওদের বুকের মধ্যে তলিয়ে দেখেছ,
ওদের ভিতরে মানুষের মন আছে কি না,
মানুষের আত্মা, মানুষের বিবেক আছে কিনা?’
দ্বিতীয় ভূত সতর্কভাবে বলল,
‘তত কাছে যাইনি,
অতটা সাহস হয়নি।’  

     

জাপানী তানাবাতা উৎসব,যখন ইচ্ছেগুলো ডানা মেলে বিশ্বভারতীতে : দেবশ্রী মজুমদার

জাপানী তানাবাতা উৎসব,যখন ইচ্ছেগুলো ডানা
মেলে বিশ্বভারতীতে : দেবশ্রী মজুমদার
তানাবাতা। ইচ্ছেপূরনের জন্য চিঠি লেখা। কেউ কেউ আবার কবিতার আকারে লেখে! আর সেই চিঠি লেখা কেন? ওরিহিমে তাঁর স্বামী হিকোবসির সাথে দেখার জন্য কান্নাকাটি করলে, তার বাবা বললেন, “চন্দ্রমাসের সপ্তম মাসের সপ্তম দিনে ৭ম জুলাই তোমরা দেখা করতে পারবে”। সেই দিনই তানাবাতা হয়। এবার বিশ্বভারতীর পাঠভবনের পড়ুয়ারা যথারীতি উদয়ন গৃহের সামনে ইচ্ছে ডানা চিঠি সমেত বাঁশের ডালটি রেখে পালন করল এই উৎসব। পাঠভবনের এক পড়ুয়া জানান, বেশ ভালো লাগে এই উৎসব। খুব মজা হয়। পাঠভবনের অধ্যক্ষা বোধিরূপা সিনহা জানান, পাঠভবনের পড়ুয়ারা এই ‘তানাবাতি’ উৎসব পালন করে। ছোট ছোট কাগজে লেখা। আর সেই কাগজকে জাপানীরা বলে তানজাকু। জাপানের প্রসঙ্গ উঠলে, তুমিকোবার নাম আসবেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গুণগ্রাহী তিনি। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে নানা রকম কাজ কর্ম করেন। বাস ছিল জাপানী ইউকোহামা শহরে।
প্রসঙ্গে আসি, জাপানে মোটামুটি ভাবে অগাস্ট মাসে বাঁশ গাছের ডালে এভাবেই ইচ্ছাগুলো গাছে টাঙানো হয়। বিশ্বভারতীতেও সেই একইরীতিতে পালিত হয় বলে জানান জাপানী বিভাগের অধ্যাপিকা গীতা কীনী।
তিনি জানান, এই উৎসবের পিছনে আছে এক লোককথা। কেন উৎসব এই তানাবাতা? স্বর্গের যিনি দেবতা তাঁর কন্যার নাম ওরিহিমে। জাপানী শব্দ ওরির অর্থ বোনা। যে বিভিন্ন ধরনের কিমোনোর সুন্দর সুন্দর পোশাক বোনে। হিমের অর্থ কন্যা। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য সন্ধান করতে লাগলেন তাঁর নাম হিকোবসি। হিকোবসির কাজ গোপালন। আকাশ গঙ্গার প্রান্তে থাকত। খুব পরিশ্রমী ছিলেন। তাই মনে হলো এদের দুজনের বিয়ে দিলে ভালো হয়। বিয়ের পর তারা তাদের কাজকর্ম সব ভুলে গেল। তারা আনন্দে বৈবাহিক জীবন কাটাতে লাগলো। তারফলে, কেউ আর কিমোনো বুনছে না। তারজন্য পোশাক বোনার কেউ নেই। অন্যদিকে, গরুরা যত্র তত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তাই সবাই স্বর্গের দেবতার কাছে নালিশ করতে লাগলো। তখন তিনি ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, যাও তোমরা আকাশ গঙ্গার পূব ও পশ্চিমে চলে যাও। তোমরা গিয়ে নিজের কাজে মন দাও। এই লোক কথার মূলে আছে, সবাইকে কাজ ঠিক ঠাক করতে হবে। এই আলাদা হওয়ায় ওরিহিমের খুব দুঃখ যে হিকোবসির সাথে আর দেখা হবে না। তখন ওরিহিমে কান্নাকাটি করতে লাগলো তার বাবার কাছে। তখন বাবা বললেন, চন্দ্রমাসের শেষ সপ্তম মাসের সপ্তম দিনে ৭ম জুলাই তোমরা দেখা করতে পারবে। সেই দিনই তানাবাতা হয়। বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন সময় হয়ে থাকে। মোটামুটি ৭ জুলাই থেকে ৭ অগাস্টের মধ্যে জাপানের বিভিন্ন জায়গায় হয়ে থাকে। কিন্তু যখন ওরিহিমে আকাশ গঙ্গা পার হতে চায়, তখন ওরিহিমের কান্নাকাটির জন্য নীলকণ্ঠ পাখি, জাপানীরা যাকে বলে হাসাসাগি একটা সেতু তৈরী করে দেয়। যাতে করে ওরিহিমে হিকোবসির কাছে যেতে পারে। এই দিনটি এক অর্থে প্রেমিক প্রেমিকাদের মিলনের দিন। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সবাই তাদের নিজেদের মনোবাসনাকে জানাই। ওরিহিমে ও হিকোবসি দুই নক্ষত্রকে প্রতিনিধিত্ব করে। ওরিহিমে শ্রবণা নক্ষত্র এবং হিকোবসি অভিজিৎ নক্ষত্র। তাই এই উতসবকে তারার উৎসবও বলেন জাপানীরা।  

     

গুফকার রোড ট‍্যু শান্তিনিকেতন: শান্তি খুঁজছেন কাশ্মিরী অধ্যাপক সাজ্জাদ হামদানি

গুফকার রোড ট‍্যু শান্তিনিকেতন: শান্তি
খুঁজছেন কাশ্মিরী অধ্যাপক সাজ্জাদ হামদানি 
---দেবশ্রী মজুমদার
শ্রীনগর গুফকার রোড । যেন দিল্লির ১০ জনপথ!  গুফকার নীচেই সোনওয়ার বসতি। ওখান থেকে জাস্ট ১০ মিনিটের হাঁটা পথ। দেখা যাবে কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লার বাড়ি। আমদের গন্তব্য ওখানে নয়। গন্তব্য সোনওয়ার বসতি এলাকায়। ওখানেই বাস করেন পঁচাত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধ আলী মুহাম্মদ। ব্যবসা ট্রান্সপোর্টের। জম্মু শ্রীনগর রুটে তাঁর বেশ কয়েকটি বাস চলাচল করে। তাঁর স্ত্রী বিয়োগ আগেই হয়েছে।  দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে সাজাদ হামদানি। বিশ্বভারতীর কলাভবনের অধ্যাপক তিনি।
চারদিন হল কাশ্মীরের পুরো পরিস্থিতি ভিন্ন, উত্তেজনা পূর্ণ। তাই বাড়ির জন্য চিন্তা হলেও, উদ্বিগ্ন নন হামদানি সাহেব। থাকেন শান্তিনিকেতন এলাকায়। তিনি জানান, এটা নতুন কিছু নয়। মাত্র চার দিনে পড়েছে। ছোট বেলায় একটানা কুড়িদিন কারফিউ দেখেছি। কাশ্মীরীরা জানে এই সময় কি করতে। ৬ মাসের চাউল আমরা আগে থেকেই মজুত করে রাখি। সিটিতে কিছু অসুবিধা হতে পারে। কিন্তু গ্রামে কোন অসুবিধা হয় না। তিনি বলেন, সমস্যাটা অন্য জায়গায়। কারফিউ, জঙ্গী হানা আর কারফিউয়ে ৩০ বছর ধরে বাবার মত অনেকের ট্রান্সপোর্ট সহ বিভিন্ন ছোটখাটো ব্যবসা ধাক্কা খাচ্ছে। পর্যটন বন্ধ। এরকম চলতে থাকলে মানুষ বাঁচবে কী করে?  সাজাদ হামদানির একটু পরিচয় দেওয়া ভালো। আম আদমির থেকে তাঁর দৃষ্টিকোন আলাদা। জন্ম সূত্রে কাশ্মীরী। একজন অধ্যাপক। আবার শিল্পী। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং তারপর কলাভবন থেকে স্নাতকোত্তর করেন তিনি। তাঁর কথায় উঠে আসে কাশ্মীরীদের স্বপ্ন ও ব্যর্থতার কথা।  তিনি জানান, ৩৭০ ধারা তুলে লাভ কি ক্ষতি সেটা ভবিষ্যত বলবে। আমরা জাস্ট ফেড আপ। আমরা চাই এই সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান।  তারপর বলতে থাকেন, আমার প্রজন্মের ৭০ শতাংশ মানুষ তো মারা গেছেন।  কেন তা আপনারা জানেন। ৩০ শতাংশ আছে যারা চেষ্টা করছে এই সমস্যার মধ্যে থেকে এগিয়ে যেতে। আমার তিনটে ব্যাচমেট ছিল।  তার মধ্যে একজন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান।আরেকজন  শ্রীনগর আর্ট কলেজে পড়ান। কাশ্মীরের অবস্থা ঠিক থাকলে এরকম অনেক কিছু হতে পারত। আপনি বুঝতে পারছেন, আমি কি বলতে চাইছি?  এখন তো মাছি বর্ডার পেরোতে পারে না। দক্ষিণ এশিয়ায় যদি দ্বন্দ্বগুলো না থাকতো,  অনেক স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারতাম।  ইউরোপে দেখুন, একটাই কারেন্সি আছে। এক জায়গা থেকে এক জায়গায় কাজ করতে যেতে পারছে।  ইস্টার্ন ইউরোপ থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত যেতে পারবেন। একই টাকা চালাতে পারবেন। কোথাও বর্ডারে এমন সমস্যা নেই। আপনি ইটালি, ফ্রান্স, পোল্যান্ড যান কোন অসুবিধা নেই।  জীবনটা তো মাত্র ৬০- ৭০ বছরের।  আপনি সব সময় যদি চাপের মধ্যে থাকেন,  নিজের মানসিকতার উন্নতি হলো না, দেশের উন্নতি কী করে হবে?  ? রাগ, আক্রোশ, নিরক্ষরতা, হিংসা থাকবে, তাহলে উন্নতি কী করে হবে? যে দিকে তাকাই, শুধু রাগ আর হিংসা। তাহলে সৌন্দর্য্য কোথায় থাকবে? কাশ্মীরে সব রকম সম্ভবনা ছিল। কাশ্মীরে আমার বাড়ি থেকে যদি হাঁটতে শুরু করতাম, তাহলে পাকিস্তান, পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তান, সেখান থেকে ইরান। ইরান থেকে তুর্কি। তুর্কি থেকে ফ্রান্স। স্রেফ হেঁটে হেঁটে যেতে পারতাম। আমার এক বন্ধু আছে।  ইংল্যান্ডের লোক। তার নাম  তারা সিং বিরিয়ানা। ছোট বেলায় বাড়ি থেকে পালিয়ে ইংল্যান্ড পৌঁছে গেছিল।  ওখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর একদিন ইচ্ছে হল, নিজের গ্রামে যাবে।  ইংল্যান্ড থেকে হাঁটতে শুরু করে। হেঁটে হেঁটে লাহোর থেকে ওয়াঘা বর্ডার হয়ে পাঞ্জাবে বাড়ি পৌঁছায়।  ৫৪০ দিন লাগে বাড়ি পৌঁছাতে। এটা ছিল ওর জীবনের একটা এডভেঞ্চার।  ওকে জিজ্ঞেস করি, কেমন অভিজ্ঞতা হল? ও বলেছিল, আমি যেখানে গেলাম, মানুষের সাথে মিশলাম। দেখলাম মানুষের মনটা বিশাল।  সবাই সাহায্য করেছে, করবে। কোন জাতি, ধর্ম নিয়ে কোন গল্প নেই। কথার সুতো টেনে বললেন,  আমিও অহিংস লোক। তার জন্য আমি শান্তিনিকেতনে আছি। রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাস আমি পড়েছি। অবশ্য সেটা ইংরেজি অনুবাদ।  রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন উগ্রজাতীয়তাবোধ থেকে মানবতা পৃথিবীর সব থেকে বড় জিনিস।  সেখানে একজন ব্রাহ্ম নেতাকে গোরা বলছেন, আপনি আমাকে আজ সেই দেবতার মন্ত্র দিন। যিনি হিন্দু, মুসলমান খ্রিষ্টান সকলের। একদিন গোটা বিশ্বকে ভারত শান্তির বার্তা দিত।  এখন দেশ থেকে সেটা চলেই যাচ্ছে। কাশ্মীরী নতুন প্রজন্মকেও দেখে আমার অবাক লাগে। ওদের মাথায় কি যে ঢুকে গেছে । আমি বুঝতে পারি না! বিশ্বভারতীতে মাঝে মাঝে কাশ্মীরী ছাত্ররা আসে। কিন্তু নিজস্ব সংস্কৃতি সম্পর্কে ওদের কোন ধারনা নেই। একজন ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলাম ইংরেজী শব্দ কাইটের কাশ্মীরীটা জানো? ওতো জানে পতঙ্গ।  ওরা জানে  না কাইটের কাশ্মীরী শব্দ ‘গাঁট ব্রেয়ার’। যখন ছোট ছিলাম তখন, পাহাড় ও ক্ষেতে ৬ রকমের শাক নিয়ে আসতাম।  নিজে থেকেই হত।  খেতে খুব সুস্বাদু।  নতুন প্রজন্ম জানে না।নিজে থেকেই হত।  খেতে খুব সুস্বাদু।  নতুন প্রজন্ম জানে না। কোন ধর্ম মানুষকে হিংস্র করে না। মানুষ ধর্মের নামে এসব করছে। মানুষের ঐতিহাসিক সত্যকে  বোঝে না।  কাশ্মীরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই ওখানে আর কেউ থাকবে না, এমন ভাবনা একটা কাজ করে! যদি এখন কোন বিশেষ ধর্মীয় রেলিকসকে ভেঙে দেখি, তার মধ্যে একের পর কোন না কোন ধর্মের সাইন বা চিহ্ন পাবো।  এভাবে দেখতে থাকলে হিন্দু, বৌদ্ধ, সেমিটিক ধর্মকে পাবো। এমনকি পাঁচ হাজার বছরের পুরানো প্যাগান সংস্কৃতিকে পাবো। এগুলো নিয়ে ঝগড়ার বিষয় নয়, সমৃদ্ধ হওয়ার বিষয়। ধর্ম পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু সংস্কৃতির পরিবর্তন হয় না।  এখন তো হিন্দু সংস্কৃতি বলতে একটা জেনারেলাইজেশনের রূপ পায়।  কিন্তু এক সময় কাশ্মীরকে জ্ঞানের জন্য সারদাপীঠ বলা হত।   অষ্টম শতাব্দীর অভিনব গুপ্তা, আনন্দ বর্ধনের মত দার্শনিকরা ওখানে ছিলেন। কলহনের রাজতরঙ্গনী পড়লে বুঝতে পারবেন একদিন হিন্দু বেশি ছিল, আজ মুসলিম। কিন্তু সংস্কৃতি পাল্টায় নি। হরপ্পা মহেঞ্জাদাড়োর পুরাতত্ত্ব আমরা শিখব। হতে পারে তাদের একটা ধর্ম ছিল। কিন্তু এতদিন পর সেটা পুরো দেশের উপর লাগু হবে এটা হয় না।  কোন রাজ‍্যে বা কোন দেশে কোন ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে বাকিদের সেটা মেনে চলতে হবে বা প্রভূত্বকারী হতে হবে এটা ঠিক না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ধর্মের বেড়াজালে ছিলেন না। উনি আসল মানুষ ছিলেন। তাঁর কাছে দেশ নয়, পৃথিবী বড়ো ছিল। মানুষ ও মানবতা বড়ো ছিল। ভারতের মধ্যে যে বৈচিত্র তা পৃথিবীর কোথাও নেই। ৪০ কিমি ব্যবধানে ভাষার পার্থক্য দেখা যেতে পারে।  আমাদের  জম্মু কাশ্মীর লাদাখে ১২টি ভাষা আছে। যা অন্যর থেকে আলাদা। আসলে ভারতের মূল সুর বহুত্ব। এটা না থাকলে ভারতের স্বাদই থাকবে না।  
একটা কথা শুনছি, কল কারখানা হবে। এটা ঠিক হবে না। কাশ্মীর বড় জায়গা নয়। ৭২ মাইলস ব্যাসের জায়গা।  ওখানে গাছপালা, পাহাড়, নদী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জায়গা। ভূস্বর্গ , জান্নাত বলে লোকে। নরক হয়ে যাবে।  ওখানে ফ্যাক্টরি করে কী জায়গাটা নষ্ট করে দেবেন? এটা একটা অজুহাত।  এটা হলে জেনোসাইড হবে—মানুষ ও প্রকৃতি এক সাথে শেষ হবে।  যদি এলাকা শান্ত থাকত কাশ্মীরীরা ব্যবসা করত।  আমি আমার ঘরে টিভি লাগাব সেটা চিন থেকে চেন্নাই, ব্যাঙ্গোলর হয়ে দিল্লী, কোলকাতা হয়ে কাশ্মীরে আসছে। বর্ডারে ট্রেড খুললে ১২ ঘন্টায় জিনিসপত্র চলে আসবে।  কিন্তু সন্ত্রাসবাদ বাড়ছে  সমস্যার জন্য।  সমস্যা মিটলে  বর্ডার খুলতো। ট্রেড হতো ।  সসারের মত এই ভ্যালি। দূষণ হলে, ওখানে থাকা যাবে না।   ওখানে ৫ থেকে ৬ পাওয়ার প্ল্যান্ট চলছে। বিভিন্ন জায়গায় ড্যাম হয়েছে। ২০১৩ সালে বন্যা হয়। কারণ কী? প্রকৃতির সাথে অন্যায় করলে। সেটাই হবে।  অথচ ফল, পর্যটন যথেষ্ট কাশ্মীরের উন্নতির জন্য। থাইল্যাণ্ড তো পর্যটন নিয়ে ভালোভাবেই বেঁচে আছে।  হেরিটেজের জায়গা কাশ্মীর।  কাশ্মীরে শুধু আপেল নয়,  উদ্ভিদের অনেক বৈচিত্র আছে। কাশ্মীরকে কেউ আবিষ্কার করে নি। করতে চায় নি। আমাজন যেমন ভাবে এক্সপেরিমেন্টের জন্য হারিয়ে যাচ্ছে। কাশ্মীরে সেটা হলে, কাশ্মীরও একদিন হারিয়ে যাবে।  আমাদের ভারতের যে শান্তির বাণীর জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল। গত বছর একটি সাইকোলজিক্যাল স্টাডি পড়েছিলাম। সেখানে বলা হয়েছে, ভারত হতাশায় ভুগছে। কেন জানেন? নিজস্বতা হারালে এই মানসিক বৈকল্য আসে। 
(চিত্রঃ না অন কংটালান্যান্ট থাইল্যান্ড)            

     

রঙ্গ মঞ্চের চেনা এক দৃশ্যে নাট্যকর্মী অন্বেষার সাথে আমি, আপনি, আমরা —দেবশ্রী মজুমদার

রঙ্গ মঞ্চের চেনা এক দৃশ্যে নাট্যকর্মী অন্বেষার
সাথে আমি, আপনি, আমরা —দেবশ্রী মজুমদার
অন্বেষা! বিনোদিনী পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যকর্মী অন্বেষা ঘোষের বিয়ে। বিয়ে দিচ্ছে নাট্য সংগঠনের ছেলেরা তাদেরই সংস্কৃতি ভবনে।যেখানে চলে নাটকের মহড়া! সেখানেই বিয়ে! আর যে- সে বিয়ে নয়! রীতিমত নাটকীয়! রূপকের মত শোনালেও, এ যেন নাটকের মধ্যে রসদের অন্বেষণ!
অন্বেষার স্বামী অমিতবাবু স্বাস্থ্য দপ্তরে কাজ করেন। ভালো দোতরা বাজান তিনি। সে অর্থে রাজযোটক। বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী নাট্যদলের সাথে অন্বেষার জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তাই বিয়ের আয়োজনের পরতে পরতে সেই নাটকের ছাপ! এহেন বিয়ের আদ্যপান্ত দেখে তাজ্জব হয়ে অনেকেই বলছেন, অভূতপূর্ব!

অন্বেষার নাট্যবোধের ভাবনাতেই বহুবার উচ্চারিত- যদেতত হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম। সে অর্থে তাঁর কাছে বিয়ে শুধুমাত্র লোকাচার বা শাস্ত্রমতে আচার অনুষ্ঠান নয়। ফেলে আসা জীবনের কুড়িটি গৌরবময় নাটকীয় অধ্যায়ের এক অনবদ্য কোলাজ! কোলাজই তো বটে! নাটকের প্রপস দিয়ে তৈরি হয়েছে মেয়ে বসার জায়গা। আর দেওয়াল জুড়ে শোভা পাচ্ছে রাজ্যসরকারের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসাবে পুরস্কার নেওয়ার ছবি, রাষ্ট্রপতি প্রনব মুখোপাধ্যায় হাত থেকে নেওয়া পুরস্কার, দেওয়ালে পাত্রীর (অন্বেষার) দীর্ঘ নাট্যজীবনের বিভিন্ন মূহুর্তের ছবি। রিহার্সাল রুমে কুলো চালুনিতে লোকশিল্পের ছোঁয়ায় সেজেছে কন্যাসন। বিয়ে তো একদিন অনেকেই করে। কনকাঞ্জলী দিয়ে সব মেয়েই তো শ্বশুর বাড়ি যায়! কিন্তু এ যাওয়া যেন নাটকের দৃশ্যান্তর ! প্রকৃত অর্থে জীবনের সাথে রঙ্গমঞ্চে নিজেকে মেলে ধরা! জনান্তিকে আমাদের সাথে কিছু কথা বলা! সেখানে যেমন চরিত্র, সংলাপ, পরিণতি ও দর্শক! জীবনের কুড়িটি বসন্ত কাটিয়েছে সংস্কৃতিবাহিনীর নাটকের মঞ্চে এই মেয়ে! তাই তার বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল আপাদমস্তক প্রাণবন্ত, নাটকীয়।
সমর কেতন ঘোষ ও তার স্ত্রী অঞ্জলি ঘোষ বলেন," উজ্জ্বল আমাদের বললো, অন্বেষা বাড়ি থেকে বেশি সংস্কৃতি ভবনে সময় কাটিয়েছে। তাই আপনারা অনুমতি দিন আমরা আমাদের মেয়ের জন্য এই ভবনে বিয়ের আয়োজন করব। আমরা তো হাপ ছেড়ে বাঁচলাম। ওরাই সব করেছে। যা আমি পারতাম না। কি আর বলবো, এভাবে বিয়ে অন্বেষার কাছে তাঁর নাট্যজীবনের সেরা প্রাপ্তি”। পাত্রী অন্বেষার কথায়," স্বপ্নের অতীত। নাট্য জীবনের সেরা প্রাপ্তি। নাট্য দলের দাদা ভাইরাই সব করেছে নিজে হাতে। আর বাবা শুধু কন্যা সম্প্রদান করলেন। একটা নাটকের দলের কাছ থেকে এর থেকে আর কী পাওয়ার বাকি থাকল।"
এবার আসি বিয়ে বাড়ির কথায়। নাটকের গেটের আদলে বিয়ে বাড়ির গেট। মঞ্চের তোরণ দেখলে মনে হবে, কুশীলবদের মঞ্চে প্রবেশ ও নিষ্ক্রমণের পথ। নাট্য কর্মীর বিয়ের আসর বসেছে নাট্য সংগঠনের নিজস্ব ভবনে। বরাসন ও কন্যাসন তৈরী নাটকের উপাদান দিয়ে। দেওয়ালে পাত্রীর নাট্যজীবনের বিভিন্ন সম্মান, পুরস্কার এর ছবি দিয়ে তৈরি কন্যাসন।ছাতনাতলায় মাটির কলসিতে আঁকা জলসচেতনতার বিভিন্ন বার্তা। কুলো চালনিতে লোকশিল্পের ছোঁয়ায় সেজেছে বিয়ের আসর । নাটকের রসটাম (চৌকি) দিয়ে।ছাতনা তলায় থাকা বিয়ের মাঙ্গলিক চারটে কলস। তাও সংস্কৃতি বাহিনীর ছেলেরা নিজেরাই রঙ করেছে। অভ্যাগত অতিথিদের বেশীরভাগ নাটকের সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত। কেউ কেউ প্রশাসনের সাথে যুক্ত। সবাই আড্ডা দিচ্ছেন। জেলার বিয়ের ইতিহাস নিয়ে আড্ডা হয়েছে। আলোক সজ্জা আছে। কিন্তু শব্দ দৈত্য নেই। কেউ বাজাচ্ছেন মাউথ অরগ্যান। বরযাত্রীদের অভ্যর্থণার ভাবনা অনন্য। সবার হাতে দেওয়া হল বকুল চারা। সে কোন অনাগত দিনের জন্য, ভাবনার ধারায়…ঝরিছে বকুল /আঁচল আকাশে হতেছে আকুল। বিয়ে উপলক্ষে পদ্য কবেই উঠে গেছে! ফিরে এল সেটাই, তবে নতুন আঙ্গিকে! সকলের হাতে ছন্দোবদ্ধ বিভিন্ন নাটকে অন্বেষার নামভূমিকার তালিকা। সেটা একবার দেখাই যাকঃ
মর্জিনা বসে আছে হোসেনের জন্য
সন্ধ্যা হরিকে পেয়ে কবে হবে ধন্য?
পিঙ্গলা চেয়ে থাকে, নাগু আগমনে –
ফুলমনি রহমত মিলবে কেমনে?
কানোড়ার অবশেষে লাউসেন জয় -
অঙ্কু -অমিতে মিলে শুভ পরিণয়।।
প্রাথমিকভাবে ধাঁধার মত হলেও, এটাই অন্বেষার নাট্যজীবনের কিছু অংশ মাত্র। যেমন ধরুন, আলিবাবা নাটকে অন্বেষা ‘মর্জিনা’র চরিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর নায়ক হোসেন। আবার বোগলো বায়েন নাটকে সন্ধ্যার ভূমিকায় আর তাঁর বিপরীতে হরি। একইভাবে, নাগিনী কন্যা নাটকে পিঙ্গলা চরিত্রে অভিনয় করেন অন্বেষা। সেখানে বিপরীত চরিত্রে নায়ক নাগু ঠাকুর। তেমনি ‘নজর’ নাটকে ফুলমনির ভূমিকায় তিনি। তার বিপরীতে রহমত। ধর্ম মঙ্গলে দুই প্রধান চরিত্র কানোড়া ও লাউসেন। ধর্ম মঙ্গলে আছে, লাউসেন কানোড়াকে বিয়ে করবে না। অন্যদিকে, কানোড়া প্রতিজ্ঞা করে সে লাউসেনকে যুদ্ধে পরাজিত করবে। সেক্ষেত্রে লাউসেন তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হবে। যুদ্ধে লাউসেন কানোড়ার কাছে পরাজিত হয় এবং কানোড়াকে বিয়ে করে। শেষ লাইনে- অঙ্কু, অন্বেষার ডাক নাম। তার সাথে অমিত সাধুর পরিণয়।
মেনু কার্ডের বিষয়েও নাটকের ছাপ। নাটকের নাম দেওয়া হয়েছে-‘ চেটে- চুষে- কামড়ে- গিলে’। নির্দেশনা- সমর কেতন ঘোষ, পরিবেশনা- বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী। মুখ্য ভূমিকায়- অমিত ও অন্বেষা। প্রথম দৃশ্য- কাঁসার থালা, জল, স্যাল্যাড। দ্বিতীয় দৃশ্যে – শস, পনির স্যাটে। তৃতীয় দৃশ্যে- বেবি নান, চিলি চিকেন/ চিলি পনির। চতূর্থ দৃশ্যে- ফ্রাইয়েড রাইস, কাশ্মিরি আলুর দম, খাসির মাংস/ মাছ/ পনির মশলা, আনারসের চাটনি, পাঁপড়। বিরতি- পঞ্চম দৃশ্যে- রসগোল্লা, হীরামণি। ষষ্ঠ দৃশ্যে- আইস্ক্রিম, পান। গোটা অনুষ্ঠানের ভিডিও রেকর্ডিং হয়েছে। তবে তা কোনভাবেই গড়পড়তা ভিডিও রেকর্ডিং নয়। নাটক ও প্রশাসনের সাথে যুক্ত অতিথিদের নিয়ে নাটক ও অন্বেষার জীবন নিয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। সেখানে আছে অন্বেষার নাটকের ছবি তার প্রসঙ্গ। সম্পূর্ন ভিন্ন স্বাদের তথ্য চিত্র।
দেরিয়াপুর অঞ্চল উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ড.উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায়। তিনিই বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী নাট্যদলের কর্ণধার। তিনি বলেন, “২০০৩ সালের সূচনা লগ্ন থেকে অন্বেষা নাটক করে। তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। হালখাতা নাটক দিয়ে অভিনয় শুরু। তৃতীয় শ্রেণী থেকে অন্বেষা ও রুপা নামে একটি মেয়ে অবশ্য এই নাট্যদলের সাথে যুক্ত। নাটকের সাথে হারিয়ে যাওয়ায় হিউম্যান পাপেট নিয়ে অর্থাৎ নাটকের আদলে পুতুলনাচ বহুবার মঞ্চস্থ করেছেন তাঁরা। ধর্ম মঙ্গল নাটকের এক দৃশ্যে রাইবেশের নৃত্যের সাথে অনেকগুলো লোকশিল্পকে নাটককে এনেছেন তাঁরা। আর এইসব ভাবনা থেকেই বোঝা যায় নাটকই গড়েছে তাঁদের জীবনবোধ। তিনি বলেন, অন্বেষা নাটকের মেয়ে। আমার ছাত্রী। কুড়িটি বছর নাটকের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। তাই তার বিয়েটাও নাটকের মত হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। আর সেটাই হয়েছে। কনে বিদায় অনুষ্ঠানটি হয়েছে সংস্কৃতিভবন থেকেই। বিদায় লগ্নে নব দম্পতিকে দিয়ে মঞ্চের পাশে একটি বকুল চারা লাগানো হয়েছে”।
একদিন বকুল মঞ্জরিত হবে। এই নাটকীয় দিনকে স্মরণে রেখে সেও হয়ত বলবে- বকুল ফুল এসেছে- তুমি যে গিয়েছ বকুল বিছান পথে।

রিলে নয়, রিয়েল লাইফের নায়িকা আজমিরা-- দেবশ্রী মজুমদার



রিলে নয়, রিয়েল লাইফের নায়িকা আজমিরা
--দেবশ্রী মজুমদার
-- ক্রীং ক্রীং ক্রীং
-- হ‍্যালো, হ‍্যালো, কে বলছেন?
-- শান্তিনিকেতন থানা থেকে বলছি।
-- ও! কস্তুরী ম‍্যাডাম, বলছেন! বলুন!
--কি খবর? আপনাদের ওখানে?
-- আজকে, আপনাকে ফোন করবো। আগে আমরা ধরবো। তারপর আপনার হাতে তুলে দেব। এরপর আপনাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে গাঁজা উদ্ধার করবো। খবর পেয়েছি, গ্রামের একজন বেশ কিছু গাঁজা বাড়িতে রেখেছে।
-- ওকে। তাও, কটা নাগাদ ফোন করবেন?
--- এই ধরুন, বিকেল পাঁচটা।
--- ওকে, বাই! হোপ ফর দ্য বেস্ট!!
ফোনটা রেখেই আজমিরা বিবি তাঁর প্রমিলা বাহিনীর ২৩ জন সদস্যদের নিজের বাড়িতে মিটিংয়ের জন্য ডাকলেন।
মিটিং হল। কিভাবে একশন হবে, তার ব্লু প্রিন্ট তৈরি হল। অপরাধীকে কোথায় পাওয়া যাবে। কিভাবে তাকে আঁটকে রাখা হবে। আর কিভাবে বাকিরা গাঁজা মজুত কারীর বাড়ির উপর নজরদারি করবে ইত্যাদি...
কে এই আজমিরা বিবি? যিনি ভালো রাঁধেন আবার খুব সুন্দর পরিপাটি করে চুলও বাঁধেন। মোদ্দা কথা, সুগৃহিনীর মত সংসার সামলে, সমাজের কথা ভাবেন তিনি। রান্না বান্না করা, সকালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলেকে পৌঁছে দেওয়া। আবার দুপুরে মেয়েকে উচ্চ বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়া। তাদের পড়ানো, স্বামীর দিকে নজর দেওয়া। তার মাঝে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো...
এই লক্ষ্যে অবিচল আজমিরা বিবি! বোলপুরের কাছে রূপপুর পঞ্চায়েতের মোলডাঙার গৃহবধূ। অবশ্য তাঁকে শুধু মাত্র নিপাট গৃহবধূর অভিধায় রাখা যাবে না। কারণ রিলে নয়, রিয়াল লাইফের নায়িকা তিনি! তাঁর লক্ষ্য নেশামুক্ত গ্রাম গড়া! আর সেই কাজে এগিয়ে এসেছে আজমিরা বিবির নেতৃত্বে তাঁর মত এলাকার গৃহবধূরা। আলাপচারিতায় আজমিরা বিবি জানান, শুনতে খুব খারাপ লাগতো  ড্রাগ পাচারের গ্রাম হিসেবে নিজের গ্রাম মোলডাঙার পরিচিতি।  কেউ ড্রাগপাচারকারী হিসেবে ধরা পড়লে, উঠত সেই মোলডাঙার নাম। একদিন গ্রামের সেখ সোহারাব ড্রাগ বিক্রি করা অবস্থায় ধরা পড়ে তাঁর হাতেই। আজ ড্রাগ বিরোধী আন্দোলনের মুখ  সেই আজমিরা বিবি।  বাড়িতে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে ভরপুর সংসার। ছেলে দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র। মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। তাঁর হাতেই এক বছর আগে গড়ে ওঠা এই ড্রাগ বিরোধী প্রমিলা বাহিনীর কাজ বন্ধ হতে দেন নি তিনি।  তাঁর মহিলাদের শ্যেন দৃষ্টি এড়িয়ে এলাকায় ঢুকতে পারে না কোন ড্রাগ পাচারকারী।  
এই কাজে ব্রতী হওয়ার ক্ষণ কম নাটকীয় ছিল না! ঠিক এক বছর আগে রূপপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে কোন এক রাজনৈতিক দলের সদস্যা তিনি। গ্রামবাসীদের অনুরোধ ছিল পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলে অভিযুক্তকে ছেড়ে দিতে। তিনি তা করেন নি, উল্টে পুলিশের হাতে তুলে দেন। আর এভাবেই পথ চলা বছর খানেক আগে। সেদিনই রূপপুর পঞ্চায়েতের ২৩ জন মহিলা মিলে ড্রাগ বিরোধী আন্দোলনে সামিল আজমিরা বিবি। আজ আজমিরা বিবি ড্রাগ বিরোধী আন্দোলনের মুখ।  এব্যাপারে বর্তমান পঞ্চায়েতের সদস্য নারেন্দ্র নাথ সরকার জানান, এই আন্দোলনে পঞ্চায়েত তাঁদের পাশে আছে। একইভাবে শান্তিনিকেতন মহিলা থানা তাঁদের পাশে আছে বলে জানিয়েছে।
এবার আসি, শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনার দিন। নেশাগ্রস্থ অবস্থায়  সেখ সোহরাব ও হাঁসু সেখ নামে দুজনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয় তাঁরই নেতৃত্বে প্রমিলা বাহিনী। জানা গেছে, একদিন গ্রামের সেখ সোহারাব ড্রাগ বিক্রি করা অবস্থায় ধরা পড়ে তাঁর হাতেই। তখন রূপপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলের সদস্যা তিনি। এদিন ফের সোহরাব ধরা পড়ে তাঁর হাতেই। হাঁসু সেখ ও তাঁর এক ভাই ও বাবা এই ড্রাগ পাচারের অভিযোগে ৬ মাস জেল খেটে গ্রামে ফিরেছে। ফের শুরু করেছিল এই ব্যবসা। আজমিরা বিবি জানান,  হাঁসু সেখ একজন নেশাখোর। বছর তিরিশের এই যুবক পেশায় মজদুর। তার পরিবার আছে। গোটা দিন খেটে তার আয় তিনশো টাকা। নেশা করতে ব্যয় পাঁচশো টাকা। আজমিরা বিবি বলেন,  এই দুশো টাকার  জন্য হাঁসুর মত অনেককেই স্ত্রীর গহনা বা চুরির পথে নামতে হয়। আর মোলডাঙার মত গরীব গ্রামের দুর্দশা দিন দিন বেড়েই চলছিল। আর একই সঙ্গে বাড়ছিল দুর্নাম। দুই সন্তানের মা আজমিরি বিবি এলাকার অন্যান্য মহিলাদের বোঝাতে সমর্থ হন নিজেদের ছেলে মেয়েদের ড্রাগের হাত থেকে বাঁচাতে একটা কমিটি তৈরী করতে হবে। বর্তমানে তাঁদের সদস্যার সংখ্যা ২৩। তাঁরা মাসে একটা করে মিটিংয়ের জন্য একজায়গায় মিলিত হন।  কোন হুমকি পান এই প্রশ্ন করতেই, তিনি বলেন, হাঁসু সেখকে ধরেই, গ্রামের আশরফ মিঞার বাড়ি থেকে আড়াই কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। তার পরিবার কী আমাদের ছেড়ে দেবে ভেবেছেন? গালমন্দ করছেন। তবে হুমকিকে আমরা ভয় পায় না। ভালো কাজ করলে, হুমকি পেতে হয় আমরা জানি।     
 জানা গেছে,  একটা সময় ছিল যখন ওই গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ মানুষ নেশায় বুঁদ হয়ে থাকত। বাইরে থেকে কিছু ড্রাগ পাচারকারী গ্রামে ব্রাউন সুগার, চরস, গাঁজা সরবরাহ করত। গ্রামের কয়েকটি পরিবার সেই ড্রাগের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। গ্রামকে নেশামুক্ত করতে মহিলারা সঙ্গবদ্ধ হয়। এরপর আজমিরা বেগমের নেতৃত্বে ২৩ জনের একটি কমিটি গঠন করে মাদক বিরোধী অভিযানে নামেন প্রমীলারা। তারা পাশে পান পুলিশ প্রশাসন ও পঞ্চায়েতকে।   পুলিশ জানিয়েছে, দুজনকে আটক করা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া গাঁজার ক্ষেত্রে কোন অভিযোগ না থাকায় কাউকে আটক করা হয়নি। আজমিরা বিবি বলেন, আমরা চাই, নতুন করে কেউ যেন গ্রামের নেশাগ্রস্থ না হয়ে পড়ে।  আমাদের লক্ষ্য নেশামুক্ত গ্রাম। মাদক চক্রের হাতে তাঁর জীবনের ইতিও হতে পারে! তবে তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই তাঁর। নতুন ভোরের অপেক্ষায় আজমিরা বিবি। তাঁর বিশ্বাস, ভোর হয়ে একদিন সকাল হবে। আর সেদিন একমাত্র তিনিই বলতে পারেন, একমাত্র তিনিই বলার অধিকারী---
'তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি। সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি...'

Gadget

​"নাটক" সাড়ে সব্বনাশ- দেবশ্রী মজুমদার

                             ​"নাটক"                         ​     সাড়ে সব্বনাশ ​                      একাঙ্ক নাটক : কিশলয় নাটক :...

Popular