কোরক



ছোট গল্প কোরক
দেবশ্রী মজুমদার
হাঁসের ডিম খেতে খুব ভালো বাসে মা ও ছাওল।
ঘরে চাউল আছে। গত পরশুর তিনটি ডিম
আছে। চলে যাবে আজকে। সংসারের হিসেব
নিকেশ একদম সাফ সুতরো। এই সব সাত
সতেরো ভেবে, বাড়ির সীমানার মধ্যে ছোট্ট ফার্মে
প্রায় পঞ্চাশটি পোল্ট্রি মুরগির ছানাদের খাবার
দিতে গেল সরলা।
বাইরে পুকুর পাড়ে হাঁসের মত ঝিমুচ্ছে সরলার
একমাত্র ছেলের বাপ লখাই, ভালো নাম লক্ষণ।
বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে, কি সব ভাবছে!
পাথরকুচি দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে,
অন্যমনা হয়ে পুকুরে ঢিল ছুঁড়তে লাগলো। আর
ঢেউয়ের বৃত্তগুলোর এক এক করে গ্রীন, অরেঞ্জ, রেড বিভিন্ন জোনে হারিয়ে যাওয়া দেখতে থাকলো!
হঠাৎ জলের মধ্যে ত্যালাপিয়ার ঝাঁকের বুদবুদ
দেখা গেল। তা থেমেও গেল!
ঘরে অভাব বলতে সেরকম কিছু নেই এই পরিবারের। পুকুরে
মাছ, বাঁশের ঝাড়, জমিজমাও আছে। তবে
জমিতে নিজে চাষ করে না লখাই, বাইচো দিয়ে দেয়।
আর আছে পোল্ট্রি ফার্ম। এবার তো ধান হয় নি।
পোল্ট্রি ফার্মে নিজের মুর্গি নেই। কোম্পানি ছোট
ছোট ছানা দিয়ে যায়। খাবার দিয়ে যায়। বড়
হলে অর্থাৎ প্রমাণ সাইজের হলে কোম্পানি ৪০৭
গাড়িতে নিয়ে যায়। এক কথায় পালন করা।
লখাই, সরলাকে বলে, সারোগেট মাদার! সরলা
পুরো কথাটার অর্থ ঠিক না বুঝলেও, মাদারের
অর্থ বোঝে। তাই স্বামীর এই কথাটাই খুশিই হয়।
এই পালনের জন্য অর্থ পায়। মুরগির মড়ক
লাগলে ক্ষতি হয়। তবে খুব বেশী না। যা যায়
কোম্পানির। আর নিজের খাটুনির। সাথে
ইলেকট্রনিক বিল। দু-একটি মুরগি বিক্রিও
করে। কোম্পানির লোকেদের দু'একটা মুরগি
মারা গেছে, বলে দু'পয়সা আয় আর কি! তবে
বাড়িতে দু-একটি মুরগি খেলে তারা কিছু বলে
না।
লখাই পড়াশোনায় মন্দ ছিল না। তবে বরাবর
মুখের আগল ছিল না। এখন সেই লখাই কি
রকম ম্যারমেরে বনে গেছে। কি রকম যেন
ঝিমুনি হাঁসের মতো।
বৌ সরলা চায়ের কাপটা ঠক করে সাহানে
নামিয়ে দিয়ে বললো, শুনছো! যে হাঁসটা ডিম
পাড়তো, জ্বরেছে! বলি শুনছো! কিছু একটা
করো?
আমাদের দেশে হলে তো বলতো কোরক
লেগেছে! হাঁসের নাকের ফুটোতে একটা পালক
ছিঁড়ে দাও না ঢুকিয়ে। তাহলেই, আবার ডিম
পাড়া শুরু করবে।
বলি শুনছো? কথা খান? তোমাদের এখানে এসে
তো সব পাল্টে ফেললাম! বেলডাঙায় গেলে ভাই
দাদারা পর্যন্ত বলে রাঢ়ি দেশে গিয়ে অমন সুন্দর
কথার টান টাও হারিয়ে ফেললি! সবই কপাল!
সঙ্গে কে যাবি গোপাল? --- কপাল!
বেলা গড়িয়ে সূর্যটা দক্ষিণ দিকে বাঁশ ঝাড়ের
মাথা দিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। তবু হুঁশ
নেই তার।
আরও দু'একবার -- বলি শুনছো! শোনা গেল।
কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া গেল না এই দিক থেকে।
ছেলেটা ঢাউস মোবাইলে কি একটা সমানে
খোঁচাচ্ছে! আবার টিভিটাও খোলা রেখেছে।
সরলা ফস করে জ্বলে উঠে বললো, দুটো
একসঙ্গে চলবে না।-- বলি, ইলেকট্রিক বিলের
পয়সা কে দেবে? তোর... শূন্য স্থান পূরণ করে
জবাব দিল বংশের একমাত্র বাতি 'সমন্বয়' ---
"আমার বাপ!"
--- সে জানি! কিন্তু সংসার টা দাঁড় করিয়ে
রেখেছে কে শুনি? দেব না ঠাস করে একটা চড়!
মুখে মুখে উত্তর!
--- কি করবো? ভাল্লাগেনা। ঘরে বসে বসে বোর
হচ্ছি। বাইরে বেরোতে পারবো না। শ্লা !
ভাল্লাগেনা! মাইরি! কি একটা রোগ এল! করে
দিল লক ডাউন! লে হালুয়া! শ্লা ! করোনা!
তোর...
---- রান্না ঘর থেকে খুন্তি হাতে এগিয়ে এলো
সরলা। যেমন বাপ, তেমনি ছেলে! মুখ খারাপ
করবি না! বলে দিচ্ছি!
লখাইয়ের বাবা বিদ্যাসুন্দর চাটুজ্যের এই মহল্লায় দুর্মুখ
হিসেবে অখ্যাতি ছিল। একবার ঘোর আকালের
সময় ফসল হয় নি অনাবৃষ্টিতে! সাত সকালে
এক হাটুরে খোলা বিক্রি করতে এসেছে। বাড়ির
বৈঠক খানায় বসে আছেন লখাইয়ের বাবা
বিদ্যাসুন্দর চাটুজ্যে। ভারি রাশভারী লোক!
আবার মুখে কিছু আঁটকায় না। বাড়ি মেয়ে
বৌরা একটু সমঝে চলে। যাহোক! বিদ্যাসুন্দর
ডাকলেন লোকটাকে। তারপর ! কি বললেন? --
মুখ বিকৃত করে বললেন, সাত সকালে খোলা
নেবে গো খোলা? বলি, খোলা নিয়ে করবো? ধান
হয়েছে? ... কি ভাজবো?
লোকটা তো থ!দিগভ্রান্ত পথিক এক! তার যাওয়ার দিক ভুলে গেল!
কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে আস্তে কাঁচুমাচু মুখ
করে কেটে পড়লো।
লখাইয়ের মুখের ভৌগলিক অভিব্যক্তি অনেকটাই ওই রকম ছিল।
পড়াশোনায় ভালোই ছিল। কিন্তু 'ভাষা বিশারদ'
ছিল। তাই বান্ধবীরা তাকে এড়িয়েই চলতো। নাই
নাই করে আজ চুয়ান্ন পেড়িয়ে পঞ্চান্নর
দোড়গোড়ায়। কোন দিন কম কথা বলে নি।
লোককে জ্বালাতন করতে, আর বদ বুদ্ধিতে তার
জুরি ছিল না।

সেই ব্যাটা লখাই বাগবন্ধ! শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে
তাকিয়ে থাকে! যার জীবনে কোন দিন কোন
ট্র্যাজেডি ছিল না। সিরিয়াস মুহুর্তে, ইয়ার্কি
মারতে, 'হ্যা হ্যা' করতে তার দ্বিধা ছিল না।
শাশুড়ির মৃত্যুতে পাড়ার কোন বৌমা কতটা মুখ
বিকৃত করে কেঁদেছে, নাকের জল-- চোখের জল
এক করেছে-- কি ভঙ্গিমায় বুক চাপড়ে কি ছন্দ-
বাক্য সুর লয় রেখে কেঁদেছে । সেটা ওর নজরে
বাদ যেত না। তারপর চলতো, সুরালাপে জীবন
শৈলীতে তার অপ প্রয়োগ। মৃত বাড়িতে লখাই
সপার্ষদ উপস্থিত হলে, অনেক মহিলা প্রাণখুলে
কাঁদতেও পারতো না। ট্র্যাজিক মুহূর্তে শোকাতুর
মহিলাদের দোহারির কাজ করার রেওয়াজ
ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, কাকস্য পরিবেদনা!
বেচারা!

সেই দিন বদল হয়েছে। লখাইয়ের এই অপরাধ
আজ মার্জনা যোগ্য।
কিন্তু লখাইয়ের এ হেন আচরণ শুধু বাড়ির
লোকজন নয়, ইয়ারবন্ধুদের চিন্তার কারণ।
অনেকেই জিজ্ঞেস করে, কোন আর্থিক ক্ষতি?
সরলা বলে, কি বলবো আপনাদের, আমার
এমন কথা বলা স্বামীটি বোবা হয়ে গেল। যেন
সেই আগের মানুষটি আর নয়। আগেকার দিন
হলে বলতাম, ভুতে ধরেছে। ক্ষতি আলাদা করে
আমাদের কী হবে, বলুন? সবার যা, আমাদেরও
তা! শখে দুটো টিউশনি করতো বন্ধ আছে।
সবার তাই আছে। বলতে হয় না, এই সময়ে
পোল্ট্রি ব্যবসা রমরমা চলছে। ডাক্তাররা বলছে,
যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকবে, তাদের
করোনা কিচ্ছু করতে পারবে না। মানুষ তো
লাইন দিয়ে ২৩০ টাকা কেজি মুরগির মাংস
কিনছে। হ্যাঁ যারা সদ্য খালি হাতে বিদেশ বিভুঁই
থেকে ফিরেছে, তাদের কথা আলাদা! কিন্তু
আমার কত্তাটি নড়েও না, চড়েও না। কোরক
লাগা হাঁসের মত ঝিমোয়!
পাড়ার দু'একজন সেয়ানা বৌ অন্য দাওয়ায়
দিয়ে সরলাকে বলেছে, দেখ দিকি এটা 'টেরাই'
করে! চোখ টিপে বলেছে, এ হলো মোক্ষম
দাওয়ায়! --- বলো কি! ছেলে বড় হয়েছে! সরলা
লজ্জায় কুঁকড়ে বলে উঠলো।
তবুও কথাটা ফেলনা মনে হয় নি সরলার! হতেও
পারে বা! জীবন বিমুখ কেন হলো তার স্বামী!
ঘটনার পরম্পরায় প্রতি মুহূর্ত - ক্ষণ জুড়তে
লাগলো, যদি গোলক ধাঁধার মালায় কোন কিছু
সরিয়ে পথ টা সরল হয়! ভেবে দেখলো, মাত্র দুই
মাসে তার এই ভাবান্তর! হ্যাঁ, এই তো লক
ডাউনের আগে -- বাথরুম থেকে বেরোতেই রঙ্গ
করে বললে-- “নয়নকমল, কুঞ্চিত কুন্তল, ঘন
কুচস্থল, মৃদু হাসিনী"।
বললাম-- ভীমরতি! ও বললো- শাস্তর! কামসূত্র!

যাহোক, রাত্রে বিছানায় যাওয়ার জন্য ছটপট
করছিলো সরলা। লখাই যেমন ছিল, তেমন।
খাওয়া দাওয়া করলো বিনা বাক্যব্যয়ে। টিভি
দেখলো না। ফোনে কারো সাথে কোন কথা
বললো না। সিন্দবাদের মত কোন নাবিকের সমুদ্র
যাত্রায় নিজের জাহাজের কেবিনে বন্দী রেখেছে
নিজেকে। যদিও বা বাইরে এক আধটু
বেরিয়েছে, সেটা জল মাপতে!
রাত্রে সরলা লখাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
মাথায় বিলি কাটতে থাকলো! জানতে চাইলো
কি হয়েছে? আদি শক্তির সব রূপ ধারণ করলো
সরলা, অশ্রু বিসর্জন করলো। কোন উত্তর
পাওয়া গেল না অন্য প্রান্ত থেকে। তারপর----
অগত্যা--- বললে দাঁড়াও, দরজাটা লাগিয়ে
আসি। বুঝতে পারছি, সব পুরুষ যা চায়! ----
এবার সরলার হাতটা ধরে টানলো লখাই! ---
তারপর বললে, শোন! ওসব কিছু না। জানি,
আমার যেটুকু আছে, আরও দুঃসময় এলে, শুধু
ভাতের যোগাড় অন্তত হবে। কিন্তু সেটা আমায়
ভাবায় না। এই যে অবস্থা চারিদিকে, আমি
মানসিক রোগী হয়ে যাব সরলা। ভয়ে টিভিতে
খবর দেখি না! কোন প্রোগ্রাম দেখি না। খবরের
কাগজ পড়ি না। প্রতিদিন কতো মানুষ করোনায়
আক্রান্ত হচ্ছে জানো? মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।
নার্স, ডাক্তার মারা যাচ্ছেন, পুলিশ মারা যাচ্ছেন।
তুমি হয়তো ভাবছো মৃত্যু ভয়। মিথ্যে বলবো না।
সেটা আছে। তবে আরও এক ভয়-- একাকিত্বের
ভয়! সব সামাজিক বন্ধন ছিন্ন হওয়ার ভয়!
বিশ্বাস হারাবার ভয়! একা একটা আস্ত দ্বীপের
মত থাকার ভয়! কিছু দিন আগেও ভেবেছিলাম,
পড়াশোনা বন্ধ হলে কি হবে? আজ সেটা নেই...
একটু দম নিয়ে আবার শুরু করলো লখাই। ...
শ্লারা আক্রান্ত হওয়ার আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের
আনতে পারলোনা! এখন আনছে! আর আমরা
ধম্ম ধম্ম করে লাফালাফি করলাম! মারণাস্ত্র
আছে আমাদের। তা থাক। কিন্তু আজ নেই কোন
উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা! শুধু হরির লুট চলছে,
আগা পস্তালা! বুঝতে পারছো না, আমরা
কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না! সবাইকে
সন্দেহের চোখে দেখছি! এ এক ভয়ঙ্কর অবস্থা।
জাহাজ ডুবির সিনেমা দেখা যায় ড্রয়িং রুমে
পাখার নিচে বসে। কিন্তু ডুবন্ত জাহাজে থেকে
এটা পারা যায় না। আমি পারি না! কিচ্ছু পারছি
না! যে শ্রমিকরা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে
রাস্তার ধারে কাছে কোথাও শুয়ে, জানে না
পরের সকাল দেখবে কি না? স্টেশনে মৃত মায়ের
লাশের মুখের কাপড় সরিয়ে অবোধ শিশু বলতে
চাইছে ওঠ্, মা দুধ দে, খিদে পেয়েছে! জানো,
একজন শ্রমিক দৈনিক দুশো টাকা আয় করলে,
তার পুরোটাই ব্যয় করে দেশের জিডিপি তৈরি
করে। হ্যাঁ, তাদের ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয় না,
তাদের ইনকাম ট্যাক্স ছাড়ের দরকার নেই! এই
যে ঘরে টিভি কিনেছি, দেখছি না, এতে ওদের
টাকা আছে। ওদের টাকাতেই শিল্পপতিরা ছাড়
পায়, তবেই তা আমাদের কাছে ক্রয়যোগ্য! ওসব
তুমি বুঝবে না।

সরলা এসব কথার বিন্দু বিসর্গ না বুঝলেও,
এটুকু বুঝলো যে স্বামীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
তাই অদ্ভুত এক মুখব্যাদান করে নির্বাক হয়ে
চেয়ে রইল স্বামীর দিকে। যে দৃষ্টি থেকে স্ত্রীর
অসহায়ত্ব ফুটে বের হবার চেষ্টা করছিল বার বার!
এবার সরলাকে একটু কাছে টেনে নিয়ে বললো,
লখাই----- বলতো, আশেপাশে অনেকেই মরে
গেল! এ বাঁচার সাধ ভালো লাগবে! কি ভয়ঙ্কর,
সেটা ভেবেছো? আমরা সবাই বাঁচতে চাই,
ঝগড়া মারামারি করেও একসাথে বাঁচতে চাই।
এই শেষের কথাটা বুঝলো সরলা! স্বামীর বুকে
মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠে বলে উঠলো---
হ্যাঁ! গো! আমরা সবাই বাঁচতে চাই!! তাই যেন
হয়!

     

Comments

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার