​"নাটক" সাড়ে সব্বনাশ- দেবশ্রী মজুমদার




                             ​"নাটক"

                        ​    সাড়ে সব্বনাশ

​                      একাঙ্ক নাটক : কিশলয় নাটক :

                     উৎসর্গ: বড়শাল বান্ধব সমিতি ও

                     বড়শাল সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি


         নির্দেশনায় - মহীতোষ চট্টোপাধ্যায় 

              রচনা: দেবশ্রী মজুমদার 


                             বিষয় : নন সিরিয়াস

                            মূল বিষয় : ভন্ডামি  

​                                       চরিত্র :

১) চপ্পল ঠাকুর (৬২) - হস্তবিশারদ, গঙ্গার ঘাটে বসেন। লোক ঠকানো ব্যবসা।

২) চেলা - হরেকম্ম (৫৬)। গুরু যা বলে তার দ্বিগুণ করে।

৩) দালাল - ধূর্তনারায়ণ সর্দার (৩২) খদ্দের ধরে।

৪) চপ্পল চোর - নদনারায়ণ ধর (২৮)

৫) ভক্ত - এক - বিছুটিবালা দাসী (৫৫)

৬) ভক্ত - দুই - ক্যাবলাচরণ হাতি (৫৬)

৭) ন্যায়রত্ন তর্কবাগীশ - চমৎকার চন্দ্র চক্রবর্তী।  


               নাটকের মুখবন্ধ:


​'সাড়ে সব্বনাশ' একাঙ্ক নাটকটির মূল উপজীব্য বিষয় হলো সমাজে রটে থাকা জ্যোতিষশাস্ত্রীয় ভণ্ডামি ও অন্ধবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষকে ঠকানো। চপ্পল ঠাকুর ও তার শিষ্য হরেকম্ম গঙ্গার ঘাটে পাঁজি, পাথর ও ভূয়ো জ্যোতিষের ভয় দেখিয়ে খদ্দেরদের থেকে টাকা-পয়সা ও জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়। কিন্তু নাটকের শেষে তাদের সমস্ত কৌশল ধরা পড়ে যায়; প্রতারিত সাধারণ মানুষ, পুলিশ এবং পণ্ডিত ন্যায়রত্ন তর্কবাগীশের তাড়া খেয়ে ভণ্ডদের পরিণতি চরম দুর্গতিতে রূপ নেয়।  


​১

​: নাটক :

সাড়ে সব্বনাশ 


​            (প্রথম দৃশ্য) :


 চপ্পল ঠাকুরের বাড়ি। অন্ধকার (অর্ধেকটা)। হাতে পাঁজি। (আলো নিভু নিভু / আবছা)

চপ্পল ঠাকুর :- (পাঁজির পাতা ওলটাতে ওলটাতে বিড়বিড় করে বকে চলেছেন)

(দরজায় - ঠক্ ঠক্) – কে? কে?

হরেকম্ম (চেলা) :- আজ্ঞে, আমি।

চপ্পল ঠাকুর :- আমিও তো আমি। বলি, আমিটা কে?

হরেকম্ম :- আমি অধম হরে। আপনার দাসানুদাস।

চপ্পল ঠাকুর :- ভিতরে আয়। নাকি সুরে কথা বলছিস কেন? আমি তো ভাবছি, এত ভোরে 'ভুলো' ধরতে এলো নাকি?

হরেকম্ম :- কি যে বলেন কর্ত! একটু ঠান্ডা লাগসি তাই। তিনারা কি আপনার ধারে কাছে ঘেঁষতে পারে? সেই সাবাস কি আছে? হেঁ হেঁ।

(ভিতরে প্রবেশ করে, হাত কচলাতে কচলাতে গুরুর পায়ের কাছে)  


​২


​চপ্পল ঠাকুর :- কী ব্যাপার হরে? এত ভক্তি কেন? উহুঁ লক্ষণ তো ভালো ঠেকছে না!

হরেকম্ম :- পায়ের ধুলো দিন কর্তা ঠাকুর।

চপ্পল ঠাকুর :- হঠাৎ?

হরেকম্ম :- ঘাটে যাওয়ার আগে তো? তাই।

চপ্পল :- ঘাটে যাবি মানে? এখনই তোর পরপারে ডাক এসে গেল নাকি?

হরেকম্ম :- না, কর্তাঠাকুর। আমি ভাবছি, আপনার আশীর্বাদে আমি গঙ্গার অন্য ঘাটে বসবো। আলাদা বসবো।

চপ্পল ঠাকুর :- মানে? এত সাহস! দুধকলা দিয়ে সাপ পোষা? (নকল কান্না ভেজা গলায়) তোদের জন্য সংসারই করলাম না। শেষে কিনা? এমন কথা শুনতে হলো।

হরেকম্ম :- আজ্ঞে সে তো আপনি পাত্রী পান নি, ইঁয়ে মানে আপনাকে কেউ বিয়ে করেনি, তাই!

চপ্পল ঠাকুর :- হরে! ভালো হবে না, বলে দিচ্ছি। যত বড় মুখ নয়, তত বড় কথা! আমি পাত্রী পেতাম না? বেয়াদপ! এ জন্যই বলে গুরু মারা ​বিদ্যা কাউকে শিখিয়ো না। যাকগে, তোর রাগের কারণটা বল? বলতো সোনা?

হরেকম্ম :- আমার পার্সেন্টেজটাই একটু বাড়াতে হবে। আর চুরি যাওয়া চপ্পল থেকে ভালো চপ্পল রোজ আমাকে দিতে হবে।

চপ্পল ঠাকুর :- ওরে বেইমান, ধম্মে সইবে না। আমি চপ্পল ঠাকুর। ভালো চপ্পল জোড়ায় আমার অধিকার। আর ব্যবসাপাতি বাড়লে, তোদের ভাগ দেব। সব্বার ভাগ বাড়িয়ে দেব।

হরেকম্ম :- আমি পরের কথা বলতে পারবো না। হলে বলুন, না হলে পাতু।

চপ্পল ঠাকুর :- ঠিক আছে বাপধন, তাই হবে। তুই কী আর বলবি রে! আমার সাড়ে সর্বনাশ হতে আর বাকি নেই। চল্, এবার সত্যি ঘাটে চল্।।  


​                               লাইট অফ  


​৪


​                     : দ্বিতীয় দৃশ্য :



: গঙ্গার ঘাট : সময়: সকাল  


​ঠাকুরের ছবি সামনে রেখে চাদর, আসন পেতে বসেছে চপ্পল ঠাকুর। গায়ে নামাবলী। আঁকা হাতের রেখা যুক্ত ছবি। বিভিন্ন গাছগাছড়া, মূলকো, পাথর। কপালে তিলক, টিকিতে ফুল।

চপ্পল ঠাকুর :- হরে - হরে - তুই এইদিকটাই বস। অ্যাই (হরে কাছে আসতেই) তোর টিকিতে অত বড় ফুল বাঁধা কেন রে?


হরেকম্ম :- সে বলছি ঠাকুর! তার আগে বলি, এখানে মানসের সামনে হরে - হরে - বলে চিল্লাচিল্লি করবেন না। আমারও তো একটা প্যাটিস আছে।

চপ্পল ঠাকুর :- মানে? ও--ওটা প্যাটিস না, প্রেসটিজ! শোন, আমার উপরে যাবি না। টিকির ফুল তোর লাগবে না। আর তোকে শ্রীহরি বলে ডাকবো, হবে তো? এখন রামায়ণ কথা সুর ধরে পড়া শুরু কর তো।  


​৫

(হরেকম্ম পড়তে শুরু করে)


​হরেকম্ম :- রামায়ণে রামচন্দ্র পিতারই কারণ

গিয়েছিল বনবাসে ছেড়ে সিংহাসন।

আমার কারণ তুমি আমার জীবন

জীবনের প্রতি পদে দুঃখ বরণ।।

চপ্পল ঠাকুর (খদ্দের আসতে দেখে উল্লসিত) :-

হরে জোরে, জোরে পড়। তবে শ্রীহরি।

(হরে কম্ম ওই চারলাইন আরও উচ্চস্বরে সুর করে দুলে দুলে পড়তে থাকে)

(ক্যাবলাচরণ হাতি এদিক ওদিক দেখতে থাকে)


(ধূর্তনারায়ণ সর্দার তাকে পথ দেখিয়ে চঞ্চল ঠাকুরের কাছে নিয়ে আসে)


ধূর্তনারায়ণ সর্দার :- এদিকে আসুন বাবু! একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন। (কপালে হাত ঠেকিয়ে) চপ্পল ঠাকুর, অত্যন্ত জ্যোতিষী, কপাল দেখে ঝর ঝর করে সব বলে দিতি পারেন। একেবারে অন্নপ্রাশনে কি ভাত খেয়েছিলেন, মায় ভবিষ্যতে আপনার কপালে কী কী ফাঁড়া আছে। শনি, মঙ্গল, রাহু, কেতু সব এঁর হাতে বাঁধা।

ক্যাবলাচরণ :- (এড়িয়ে) কিন্তু আমি।

ধূর্তনারায়ণ :- বাক্যি ব্যয় করতে হবে না কত্তা, ও আমি ঠিক বুঝে গেছি।  


​৬


​(মুখে আঙুল দিয়ে) এই, এই— এই—

(হাত ধরে, টেনে একেবারে চপ্পল ঠাকুরের সামনে। হোঁচট খেয়ে একেবারে চপ্পল ঠাকুরের সামনে।)

(খপাৎ করে ধরে, আতশ কাঁচ চোখে রেখে, ক্যাবলাচরণের মুখ মণ্ডল দেখতে থাকে চপ্পল ঠাকুর)

ধূর্ত :- দেখুন কর্তা ঠাকুর! দোহাই উদ্ধার করুন।

(নগদনারায়ণের প্রবেশ। নিঃশব্দে নগদনারায়ণ ধূর্তনারায়ণ, ক্যাবলার চটি পায়ে গলিয়ে চম্পট)

হরেকম্ম :- কী দেখছেন কর্তা?

ক্যাবলাচরণ :- (হাঁড়িকাঠে মাথা রাখার মতন) – ভয়ে অস্থির হয়ে—

উঁঃ, উঁঃ — আমার কী হবে গো!

হরেকম্ম :- চুপ! চুপ! একদম চুপ!

চপ্পল ঠাকুর :- বালক! কাঁদছো কেন?

ক্যাবলাচরণ :- আজ্ঞে, আমি বালক নই। আমার মাথার চুল পেকে গেছে। নাতিপুতি নিয়ে আছি।  


​৭


​চপ্পল ঠাকুর :- আমার দুইশত আটাশ বছর বয়সের কাছে তুমি নেহাতই বালক! যাকগে—

হরেকম্ম: (উদ্গ্রীব চোখে, ক্যাবলার হাত দেখতে হাত বাড়িয়ে) :- আমি একবার দেখি—

চপ্পল ঠাকুর :- শ্রী হরি— হাতটা আমার দিকে দিক করে বাড়িয়ে দে।

হরেকম্ম :- আপনি কপাল দেখছিলেন তো, তাই আমি হাত—

চপ্পল ঠাকুর :- না, ওসব তোমার কম্ম নয়। রাহু, কেতু একেবারে ঘিরে রেখেছে। পদে পদে দুর্ঘটনা। একেবারে দু:স্থান। ষষ্ঠ, অষ্টম ও দ্বাদশ ভাব।

ক্যাবলাচরণ :- আমার কী হবে?

(আবার কান্না)

চপ্পল ঠাকুর :- ষষ্ঠভাবে রোগ, শত্রু, ঋণ, ও মানসিক চাপ!

ক্যাবলাচরণ :- ওগো বাবাগো! কী হবে গো! আমার গিন্নিকে কে দেখবে গো?

চপ্পল ঠাকুর :- অষ্টম ভাব! (চোখ বড় বড় করে) সাড়ে সর্বনাশ!

কাবলাচরণ :- হ্যাঁ?

হরেকম্ম :- হ্যাঁ  

​চপ্পল ঠাকুর :- অষ্টম ভাব বিপজ্জনক। বিপদ, দীর্ঘমেয়াদী রোগ, মৃত্যু ভয়, উত্তরাধিকার নিয়ে সমস্যা।

(হরেকম্ম শক্ত করে ধরে ক্যাবলাচরণকে)

ক্যাবলাচরণ :- (চোখ উল্টে, দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে) কী হবে গো গিন্নি তুমি কোথায়?

চপ্পল ঠাকুর :- হরে, চোখ মুখে জল দে!

হরেকম্ম :- অজ্ঞান হয়ে গেল নাকি? তখনই বলছিলাম, অত ভয় না দেখানোই ভালো।

চপ্পল ঠাকুর :- কথা বাড়াস নি। চোখ মুখে জল দে।

(জল দিতেই— ক্যাবলাচরণ উঠে বসে)

ক্যাবলাচরণ :- আমি কোথায়?

হরেকম্ম :- আপনি চপ্পল ঠাকুরের খপ্পরে!

চপ্পল ঠাকুর :- হরে—এ!

হরেকম্ম :- দ্বাদশ ভাবটা বলবেন না কত্তা?

চপ্পল ঠাকুর :- (লেন্সটা চোখের সামনে ধরে, ক্যাবলার হাত দেখতে দেখতে)

অর্থক্ষয়, বিদেশবাস, একাকিত্ব ও খরচ বৃদ্ধি।  


​৯


​ক্যাবলাচরণ :- আমার কী হবে?

হরেকম্ম :- সবেরই উপায় আছে, চিন্তা করবেন না। চপ্পল ঠাকুর আছেন। চিন্তা করবেন না। একদম না।

চপ্পল ঠাকুর :- এ দু'রতি নীলা নেন, একদম সব ঠিক হয়ে যাবে। দাম ১৫,০০০ টাকা।

ক্যাবলাচরণ :- অত পয়সা আমার নেই।

হরেকম্ম :- কত আছে?

ক্যাবলাচরণ :- বেশি নেই।

হরেকম্ম :- দেখি কত আছে?

(পকেটে হাত ঢোকায়— ৫০০ টাকার নোট বের করে)

এতেই হবে না কর্তা?

ক্যাবলাচরণ :- (কাঁদো কাঁদো গলায়) এভাবে মোর ডর—

হরেকম্ম :- ছিঃ ছিঃ! এমন বলবেন না। উপকারই আপনার।

চপ্পল ঠাকুর :- কী আপনি চান না, বাড়ির উত্তরাধিকারের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে ঝামেলা মিটুক? আপনার স্ত্রীর হাড়ের ব্যথা কমুক?

তাহলে এই নিন (হাত থেকে একটা মূলকো দিয়ে), এই দিন। (বলে পকেটে টাকাটা পুরে নিলেন।


হরেকম্ম: যান, যান। খুব সস্তায় হয়ে গেলো। নেহাতই কত্তা নির্লোভী তাই। 

(প্রস্থান )  


                             লাইট অফ

 

​                                 দৃশ্য ৩: 


বিছুটিবালা দাসীর বাড়ির উঠোন

​সময়: বিকেল  

​স্থান: বাড়ির উঠোন  

​বিবরণ: বিছুটিবালা দাসী (বয়স ৫৫), চুল ছোট করে ছাঁটা, গলায় তুলসীমালা, আতার বিচির মতো দাঁত) উঠোন ঝাঁট দিচ্ছেন।  

​বিছুটিবালা দাসী: (ঝাঁট দিতে দিতে) এই মরেছে, কী অলুক্ষণে ব্যাপার রে! ডান চোখটা বারবার লাফাচ্ছে কেন? বলি, এই নগদনারায়ণ? বাবা নগদনারায়ণ কোথায় গেলি রে? এদিকে আয় দিকি!  

​নগদনারায়ণ: (মঞ্চে প্রবেশ করে) যাই পিসিমা— বলুন পিসিমা, নগদে বলে ফেলুন।  

​বিছুটিবালা: ও হ্যারে, গরুকে জাবনা দিয়েছিস? দেখিস পাতনা যেন খালি না থাকে। সাঁঝে গোয়াল ঘরে ধুনো দিস। যা মশা আর ডাঁশ, আমার ছিদেবীর যেন কষ্ট না হয়।  

​নগদনারায়ণ: হুঁ ছি দেবী! যা শিং লাড়ে! হ্যাঁ সব হবে 'খন। আগে কিছু ছাড়ো তো!  

​বিছুটিবালা: এই দ্যাখো! কী ছাড়বো আবার! নদাদে—  

​নগদনারায়ণ: ৫০ টা টাকা ছাড়ো!  

​বিছুটিবালা: ৫০ টাকা? প-ঞ্চা-শ? দেখছিস না— কাজেরর ক্ষেমী দু'দিন ধরে কাজে আসছে না। গায় গতরে একেবারে সব গেলে গা। সব আমপুরে চলে যাচ্ছে। গাঁ ঘরে আর কাজের লোক আর মিলবিনা।  

​নগদনারায়ণ: তোমার কাঁদুনি গাওয়া বন্ধ রাখ তো। ৫০ টাকাটা ছাড়ো। আমার মানে মানে নগদে বিদায় কর।  

​বিছুটিবালা: এই রে আবার ডান চোখটা লাফাচ্ছে। কী হবে রে নগদা।  

​নগদনারায়ণ: আরে দাঁড়াও তো—  

​বিছুটিবালা: দাঁড়া হাত ধুয়ে দিচ্ছি। ঝ্যাঁটা হাতে ছিলো তো। একে তো তোর পিসেমশাই সগ্গে যাওয়ার পর আমার অবস্থা হাঁড়ির হাল হয়েছো। চল্, চল্। হ্যাঁরে বাছা! আমার কী হবে?  

​নগদনারায়ণ: ও তুমি চিন্তা কোরোনা। কাল গঙ্গার ঘাটে হাত নাইতে যাওয়ার সময় চপ্পল ঠাকুরকে হাতটা দেখিয়ে নিও। চলো চলো। (প্রস্থান)  


                                ​দৃশ্য ৪: 


গঙ্গার ঘাট


​সময়: সকাল

​স্থান: গঙ্গার ঘাট  

​বিবরণ: আসন পাতা, ঠাকুরের ছবি, হস্তরেখার ছবি। চপ্পল ঠাকুর বসে আছেন। পাশে চ্যালা হরেকম্ম।  

​বিছুটিবালা: কইরে? তোদের চপ্পল ঠাকুর। কী নামরে বাবা। চপ্পল ছেঁড়া, ছ্যা ছ্যা। বমি, বমি। পায়ের জিনিস কি না মাথায়!

​নগদনারায়ণ: ও, তুমি বুঝবে না। এই এই ডান দিকে বসো। বল্, এই তো চপ্পল ঠাকুর মুশকিল আসান!  

​চপ্পল ঠাকুর: কী হলো নগদনারায়ণ?  

​নগদনারায়ণ: পিসির কপাল তো ঝরঝরে। তিনকালে গিয়ে এককালে ঠেকেছে। হাত দেখে দিন!  

​বিছুটিবালা: এই মুখপোড়া! এক কাল কিসের? আমি তো পা বাড়িয়েই আছি— যাগ— দেখো তো বাবা—  

​হরেকম্ম ও নগদনারায়ণ: চপ্পল ঠাকুর!  

​চপ্পল ঠাকুর: (হাত উল্টেপাল্টে দেখে) হুম হুম। ঘোরতর বিপদ!  

​বিছুটিবালা: আমি তোকে ঠিকই বলেছিলুম বাবা নগদনারায়ণ, আমার ডান চোখ কাঁপছে।  

​চপ্পল ঠাকুর: জ্যোতিষশাস্ত্রে একে—  

​বিছুটিবালা: রাখো তো তোমার জ্যোতিষশাস্ত্র— তুমি কী বলতে চাচ্ছো, বলো কত্তা ঠাকুর। ভয়ে, আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া।  

​চপ্পল ঠাকুর: বলছি বলছি— শনির কোপ পড়েছে, তাই ডান চোখ লাফাচ্ছে। শনির প্রভাব সাড়ে সাত বছর চলে। একেই শনির সাড়ে সাতি বলে। আর একেই সবাই বলে— সাড়ে সর্বনাশ!  

​হরেকম্ম ও নদনারায়ন: সাড়ে সর্বনাশ!  

​বিছুটিবালা: (গলা ছেড়ে সুর করে) ওগো তুমি কোথায় গেলে গো— আমাকে কেন সঙ্গে করে নিয়ে গেলেনা গো...  

​নগদনারায়ণ: চুপ করো পিসিমা! চুপ করো, পিসেমশাই তোমার কান্না শুনে চলে এলে সে আরেক ফ্যাসাদ।  

​বিছুটিবালা: (কান্না থামিয়ে) নগদনারায়ণ, আমাকে নিয়ে যা বলিস বলিস। পিসেমশাইকে নিয়ে খারাপ বললে কিছু শুনবো না।  

​নগদনারায়ণ: শান্ত হও পিসিমা। চপ্পল ঠাকুর একদম উপায় বের করবে।  

​চপ্পল ঠাকুর: (চিন্তিত) উপায় একটা আছে, তবে খরচপাতি আছে।  

​বিছুটিবালা: কত?  

​চপ্পল ঠাকুর: (হাতে একটা পাথর নিয়ে) তিন রতি নীলা ২০,০০০ টাকা পড়বে।  

​বিছুটিবালা: (গলা ছেড়ে) ওগো কে আমার গা গতরে বিছুটি দিয়ে দিল গো...  

​হরেকম্ম: চুপ করুন মা। আচ্ছা কত্তা, এনার ডান চোখ লাফাচ্ছে, তুকতাক করে বাঁ চোখ লাফানোর ব্যবস্থা করলি হয় না?  

​চপ্পল ঠাকুর: চুপ, একদম চুপ!  

​হরেকম্ম: কেন বিষে বিষে বিষক্ষয়। ছেলেপুলেরা কী যেন বলে— প্লাসে প্লাসে মাইনাস।  

​চপ্পল ঠাকুর: ওটা প্লাসে মাইনাসে মাইনাস। তোমাকে আর বুদ্ধি খরচ করতে হবে না।  

​বিছুটিবালা: আমার ডান চোখ এখন তিড়িং তিড়িং করে লাফাচ্ছে। ওরে নগদনারায়ণ, মণি চোখের গোলক থেকে বেরিয়ে পড়বে না তো? কী হবে? যদি অন্ধ হয়ে যাই? সব লুটেপুটে খাবে।  

​চপ্পল ঠাকুর: আপনি শুধু ব্রাহ্মণ দক্ষিণা ১০১ টাকা দিন। কিচ্ছুটি লাগবে না, উপায় বাতলে দিচ্ছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।  

​বিছুটিবালা: সেও তো কম না। বাড়িতে ছিদেবীর ছাড়া তো কিছু নেই। আর কয়েক বিঘা জমি, আর একটা পুষ্করিনী আছে।  

​চপ্পল ঠাকুর: আপনার নকল কান্না দেখে এত অভাবী দরিদ্র নিঃস্ব মানুষ আমি দেখিনি। (নকল কান্নার ভান করে) আপনি আমাকেই একসের দুধ দেবেন, তাহলেই হবে।  

​বিছুটিবালা: তাই হবে, ঠাকুর। (লাইট অফ)  


​                                দৃশ্য ৫: 


               অন্তিম দৃশ্য


​স্থান: চপ্পল ঠাকুরের বাড়ির সামনে উঠোন  

​নগদনারায়ণ: এইরে! প্রায় ২০ জোড়া চপ্পল বিক্রি করেছি। দুই-এক জোড়া এখনও পড়ে আছে। সামলে রাখি (প্রস্থান)।  

​ধূর্তনারায়ণ: আর থাকলে হবে না। যে খবর পেয়েছি, পিঠের চামড়া থাকবে না। ED/CBI, পাবলিক সব চলে আসবে। যাই, ভালোই ভালোই কেটে পড়ি (প্রস্থান)।  

​হরেকম্ম: (প্রবেশ করে) কর্তা ঠাকুর? কর্তা ঠাকুর? বাড়িতে আছেন?  

​চপ্পল ঠাকুর: ওরে হরে, এখন শ্রীহরিই ভরসা। নদনারায়ন ও ধূর্তনারায়ণরা কোথায়?  

​হরেকম্ম: সবাই কেটে পড়েছে।  

​চপ্পল ঠাকুর: জাহাজ ডুবির আগে, সবার আগে যে পালায়।  

​হরেকম্ম: ইঁদুর কর্তা!  

​চপ্পল ঠাকুর: হ্যাঁ। আমার তো সাড়ে সর্বনাশ হয়ে গেল!  

​বাইরে চিৎকার: কোথায় চপ্পল? চামড়া তুলে দেব!  

​চপ্পল ঠাকুর: এইরে!  

​হরেকৃষ্ণ: কর্তা— কোন দিকে যাওয়ার রাস্তা নাই। চলুন, বাড়িতে চালের ড্রাম থাকলে লুকিয়ে পড়ি।  

​বাইরে চিৎকার: এই চপ্পল? গামছা বেরিয়ে আয়।  

​বিছুটিবালা: (ঝাঁটা হাতে প্রবেশ করে) কোথায় বিটলে বামুন? এই সামনে পেলে ঝাঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দিতাম।  

​চমৎকার চন্দ্র চক্রবর্তী: (প্রবেশ করে) কোথায়? কোথায়? চপ্পল ছেঁড়া? জুতো ছেঁড়া চপ্পল? আমি কিনা ন্যায়রত্ন তর্কবাগীশ চমৎকার চন্দ্র চক্রবর্তী, আমাকে টপকে ডোন্ট কেয়ার? তুই শাস্ত্রের কী জানিস? জন্মকুন্ডলী নিয়ে পণ্ডিতি? যাকে তাকে কালসর্প দোষ? আমার বিচারের ওপর বিচার? খোদার ওপর খবরদারি! একবার কাছে পেলে হয়।  

​হরেকম্ম: (নিচু গলায়) কর্তা, বের হোন। এইবেলা কেউ নাই মনে হচ্ছে।  

​চপ্পল ঠাকুর: তুই আমার আসল শিষ্য রে। আই বাবা বুড়ে আয়।  

​হরেকৃষ্ণ: বুকে পর আসা যাবে। আগে মাথাটা বাঁচুক, হাত, পা অক্ষত থাকুক। চলুন—  


​ন্যাযরত্ন ও বিছুটিবালার প্রবেশ  


​ন্যায়রত্ন: কোথায় পালাবে? পুলিশ আসছে।  

​বিছুটিবালা: তার আগেই পাবলিক পেঁদিয়ে হাসপাতাল দেখিয়ে দেবে। যাবে কোথায় ঠাকুর? ঝাঁটা মারো, এমন জোচ্চোরের মুখে। আগে আমার গাইয়ের একসের দুধ হজম করে দিলে গা!  

আমার এক চোখ লাফাচ্ছিল। এখন দু চোখ লাফাচ্ছে। মার ব্যাটাকে—

​(চপ্পলকে ন্যায়রত্ন ধরতেই, হরেকৃষ্ণ পলাতক)

​হরেকম্ম: বাবারে! এ বেলা বাঁচলে বাপের নাম!

​চপ্পলঠাকুর: (জোড়হাত করে— মাপ করে দিন)

​ন্যায়রত্ন: মাপ করবো?

​বিছুটিবালা: (ঝ্যাঁঠা তুলে)—মাপ? (মাথার উপরে ঝ্যাঁঠা)

                        ​: লাইট অফ :

        : যবনিকা পতন :



​

No comments:

Post a Comment

Gadget

​"নাটক" সাড়ে সব্বনাশ- দেবশ্রী মজুমদার

                             ​"নাটক"                         ​     সাড়ে সব্বনাশ ​                      একাঙ্ক নাটক : কিশলয় নাটক :...

Popular