Skip to main content
নারী ও মা
নারী ও মা
--- দেবশ্রী মজুমদার
(আন্তর্জাতিক মাতৃদিবসে)
ম্যাক্সিম গোর্কির "মা" উপন্যাসের পেলাগোয়া
নিলভোনাকে আমরা কেউ ভুলি নি। ভুলতে
পারি না তাঁর আদর্শ ছেলে পাভেল
মিখাইলভিচকে। কিন্তু মনে আছে কী মিখাইল
ভ্লাসভকে?
যে প্রতিদিন নিলভোনাকে স্বামীত্বের অধিকারে
নিদারুণ অত্যাচার চালাতো?
আসলে আমরা অনেকেই বনি চেম্বারলিনের দ্য
ফেস অফ জুডাস ইসক্যারিয়ট গল্পের সেই
চিত্রকরের নির্মাণ মুখ। শৈশবে যার মুখ ছিল দেবদূতের
মতো। কিন্তু বহু বছর পর তাঁর অসমাপ্ত যীশুর
মুখের আদলের জন্য যে মডেল পেল, আদতে
সেই একই মানুষ। যা শিল্পীর চোখে বিশ্বাস
ঘাতক জুডাস!
প্রতিদিন যে মেয়েটিকে রাস্তায় দেখি, তার জন্য
আমার অন্য চোখ, অন্য খোঁজে। তার
পোশাকের দোষ! তাই বক্ষ বিভাজিকার
ইতিউতি উঁকি মারে সন্দিগ্ধ লোলুপ!
সেও তো অনাগত মা! কিম্বা কোন পরস্ত্রী!
হায়! মাতৃবৎ পরদারেষু। সে তো পুস্তকেই আছে
পরম নিশ্চিন্তে!
মা কি? অনির্বচনীয় শব্দ- অনুভূতি! না থাক,
রক্তের সম্পর্ক। যেমন ধরুন বনফুলের ছোট
গল্প "দুধের দাম" এর কুলি ও সেই বৃদ্ধার
কথোপকথন। ----- "আমি তো তোমাকে দুধ
খাওয়ানি বাবা। সামান্য যা দিচ্ছি তা দুধের দাম
মনে করেই নাও।"
আবার ফিরে আসি সেই অনুভূতির আঁচলে।
বাবা মা! কি স্বর্গীয় অনুভূতি!
মাতরং পিতরঞ্চৈব সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ দেবতাম।
বা-- জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী। শুধু
মাত্র গর্ভধারণের কারণে তিনি পিতার অধিক।
এতো সবার পড়া।
এবার সরলীকরণের জন্য এক গল্পে আসা
যাক।--
একবার চুরি করার অপরাধে মঠের এক
পরিচারককে স্বামীজি তাড়িয়ে দেন। চতুর চোর
মা সারদার স্মরণাপন্ন হন। মা বাবুরাম
মহারাজকে বললেন, তোমরা সন্যাসী অত বোঝ
না। লোকটি গরীব। অভাবের তাড়নায় চুরি
করেছে। ওকে ফিরিয়ে নাও। বাবুরাম পড়লেন
উভয় সঙ্কটে। স্বামীজি ফের ওই পরিচারককে
দেখে রেগে উঠলেন। কিন্তু যেই শুনলেন "মা"
রেখেছেন। এই মা ছিলেন সবার মা। হেসে
ফেললেন স্বামীজি। আর বললেন, ব্যাটা
হাইকোর্ট চিনেছে। হ্যাঁ, এই হাইকোর্ট হলো মা।
আগাগোড়া যেটা বলবার বিষয়, তা হলো: মা
একজন নারী। আন্তর্জাতিক মাতৃদিবসে মনে হয়
একটি কথা। যাঁরা বৃদ্ধাশ্রমে আছেন, তাঁদের
কথা স্বতন্ত্র। কিন্তু আমাদের অনেকের ঘরে এক
একটি বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে পৃথক চৌহদ্দির
মধ্যে। সেটাও কম বেদনার নয়!
আমরা প্রায় ভুলে যায়, মাও একজন নারী!
"নারীর মূল্য" প্রবন্ধে শরৎ চাটুজ্জে কি বলেন,
একবার মনে করা যাক। ----- "নারীত্বের মূল্য
কি? অর্থাৎ কি পরিমানে তিনি সেবাপরায়না,
স্নেহ শীলা, সতী এবং দুঃখ কষ্টে মৌনা। অর্থাৎ
তাঁহাকে লইয়া কি পরিমানে মানুষের সুখ ও
সুবিধা ঘটিবে ... ।"
সেক্ষেত্রে বৈকুণ্ঠের উইলের গোকুল - বিনোদের
মা হোক! কিম্বা আপনার আমার! যে কেউ
বলতে পারেন, সান্নিধ্য না পেয়ে-- "আমি কি
তোমার ছেলে নয়? আমাকে তোমার মানুষ
করতে হয় নি?"
সেক্ষেত্রেও বোধহয় বিধাতার অন্যসময় কিছু
বলার আছে! তাই অপেক্ষা ছাড়া উপায় থাকে
না।
তবে, জন্ম থেকে লালন পালন সমগ্র ঘটনার
স্মৃতি এক বিষয়, এক আবেগ নিশ্চয়। তবে ঘটা
করে পালনের সময় অনেক ক্ষেত্রে অনাদরে
গড়ে ওঠা বার্ধক্য আমাদের দিকে তীর্যক দৃষ্টিতে
চাইবেই! এর কারণ একটাই! আদর্শ ছেলে
পাভেল মিখাইলভিচের মা নিলভোনাকে
সহজেই আমরা গৌরাবান্বিত করতে পারি! কিন্তু
ভুলে যেতে চাই মিখাইল ভ্লাসভকে যে প্রতিদিন
অত্যাচার চালাতো নিলভোনার উপর!
পুরুষের হাত ধরে আলোর পথে!
বড় কথা, তুমি পূজার্হা!
কিন্তু এখানেও যেন সেই ভাবনা
হে মানবী তুমি যতই মা হও, তুমি নারী
--- প্রজাতন্তুং মা ব্যবচ্ছেৎসি--
সন্তান ধারাকে বিচ্ছিন্ন করো না।
সত্যি! তোমার গরিমা অটুট!
প্রজনার্থং মহাভাগাঃ পূজার্হা গৃহদীপ্তয়ঃ।
স্ত্রিয়ঃ শ্রিয়শ্চ গেহেষু ন বিশেষোহস্তি কশ্চন।। (৯/২৬)।
অর্থাৎ, স্ত্রী লোকেরা সন্তানাদি প্রসব ও পালন করে
বলে তারা অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী।
তারা গৃহের দীপ্তি বা প্রকাশস্বরূপ।
এই কারণে স্ত্রীলোকদের সকল সময়ে
সম্মান-সহকারে রাখা উচিত।
বাড়ীতে স্ত্রী আর শ্রী এদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
এতো শাস্ত্রের বচন! শুধু তাতেই স্বস্তি!
অন্যথায়, সে তোমার কপালে যা জোটে জুটুক!