জামাই ষষ্ঠী --- দেবশ্রী মজুমদার

জামাই ষষ্ঠী:
দেবশ্রী মজুমদার

আমার এক প্রিয় ছাত্র, আমাকে মেসেজ
করেছিল, স্যর! আপনার আন্তর্জাতিক ছুটির
দিন এবার তো বাদ গেল!
তার এই সহমর্মিতা থাকার কথা নয়। কারণ
অদ্যাবধি সে অবিবাহিত। কিন্তু তার এই বার্তার
জন্য আমিই দায়ী। কারণ, বেশ কয়েক বছর
আগে আমার কাছে সে পড়তে আসতো, শুধু সে
কেন, অন্যান্য ছাত্র, ছাত্রী, অভিভাবকদের এটাই
জানা ছিল যে প্রায় ছয় থেকে সাত দিন জামাই
ষষ্ঠীর ছুটি থাকবে। তার প্রস্তুতি চলতো আগে
থেকে। কামাই গুলো আগে ও পরে পড়িয়ে
দিতাম। কিন্তু এনিয়ে মসকরা হতো। শেষের
দিকে কেউ কেউ আড়ালে আবডালে বলতো,
বুড়ো বয়সে জামাই ষষ্ঠী! তবুও কানে নিতাম না।
অনেকেই ঠাট্টা করে কার্তিক বলতো। ফুলবাবুর
মতো সেজে শ্বশুর বাড়ি যেতাম। চুলে পাক ধরার
পর কলপ নিতাম। কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম
প্যাঁচার নকশায় বর্ণিত-- সে এক 'উঁচুগতি
কার্তিকের মত বাউরি চুল' পরিপাটি বলা যায়!
মেজো জামাই! আদর প্রচুর! প্রথম দিকে আদি
শ্বশুর বাড়ি নদীয়ার সিলিন্দায় যেতাম!আমার
শ্বশুরের তিন সন্তান সন্ততি। তবে কাকা, কাকিমা,
জ্যেঠা, জ্যেঠিমা, খুড়তুতো শালাশালী, আত্মীয়
স্বজনে ভরপুর। মেটে আলু, চালতা, কামরাঙা,
ডালিম, করমচা, জলপাই, বাতাবি, আতা,
বিলাতি আমড়া, মৌসুম্বি, তেঁতুল গাছ, কাশীর
পেয়ারা গাছ, কলা বাগান, আনারসের বন,
তেজপাতা গাছ, সাতটি কাঁঠাল গাছ আর
কুড়িটি আমের বনের মাঝে ঘর। এই সময়
ফলের গন্ধে ম'ম করতো চারিধার। খুব হই হই
হতো। জেঠতুতো শালারা ছাড়া সবাই একটু দূরে
দূরে থাকতো। খুড়তুতো শ্যালিকার দায়িত্ব ছিল
আমার আপ্যায়নে। মাঝে মধ্যে দেখতে যেতাম
নিশ্চিন্দপুর গ্রামের আশপাশের এলাকা। দেখতে
যেতাম মজে যাওয়া ইচ্ছেমতি নদী। তার উপর
সেতুতে দাঁড়িয়ে থাকা, সে কি অনুভূতি!
সিলিন্দার নদীয়া ও উত্তর চব্বিশ পরগনার
সীমান্ত এলাকা। গোপালনগর থেকে কিছুটা
গিয়ে একবার দেখতে গেছিলাম বিভূতিভূষণ
বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি। স্ত্রীর মর্মর মূর্তি! একজন
কেয়ারটেকার দেখা শোনা করতেন তখন। ঠিক
তাঁর সামনের বাড়িতে থাকতেন "পথের পাঁচালীর
হরিহর রায়ের বংশ ধর"। তাঁদের পূর্ব পুরুষদের
একজনকে নিয়ে নাকি হরিহর রায়ের চিত্রায়ন।
সেই ঘরে ওই বংশের বৌমাদের হাতে চা খেলাম
একবার। সঙ্গে জেঠতুতো শ্যালক রাজু।
কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেছিলাম হরিহর রায়,
সর্বজয়া, ইন্দির ঠাকরুন, অপু ও দুর্গার মাঝে।
আমরা যখন যায়, তখনও বেঁচে ছিলেন নব্বই
উত্তীর্ণ বৃদ্ধ। যিনি নাকি বিভূতিভূষণ
বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিয়ের গরুর গাড়ি হাঁকিয়ে
গোপাল নগর এসে ছিলেন।
ক্রমে সিলিন্দার পরিবর্তে চাকদহে শ্বশুর
মহাশয়ের নতুন বাড়িতে হতে থাকলো জামাই
ষষ্ঠী।
একুশ বছর বিয়েতে, একবারও না যাওয়া হয়
নি। মনে, আছে আমার ছোট ছেলের যখন
দু'মাস বয়স, তখনও জামাই ষষ্ঠীতে আমি
একাই গেছি। শ্বশ্রুমাতা আমায় খাওয়ালেন
চিঙড়ি মাছের মালাইকারি, ইলিশ মাছের
পাতুরি! জলপাইয়ের চাটনি! কত রকমের পদ।
সিলিন্দায় একবার ঘ্যাটকলের শাক
খেয়েছিলাম। অপূর্ব!
শ্বশ্রুমার প্রয়াত হওয়া আড়াই বছর হলো। ১৭
নভেম্বর এলে তিন বছর পূর্ণ হবে। জগদম্বার
মতো সুন্দরী ছিলেন। সব থেকে ছিল তাঁর মধুর
হাসি। ছেলের মত ভালো বাসতেন। শুয়ে থাকলে
মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। জানি, আমাদের
সমাজে শ্বশ্রুমাতা নিয়ে প্রশংসা আদিখ্যেতা
হিসেবে বিবেচিত। তবে, যেটুকু দেখেছি তাতে,
আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজির প্রথম প্রতিশ্রুতির
সত্যবতী ছিলেন না তিনি। তাঁর ক্ষেত্রে সে অর্থে
গৌরীদান না হলেও, খুব অল্প বয়সে বিয়ে
হয়েছিল। অন্যদিকে, সত্যবতীর মতো
পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী নারী ছিলেন না
মোটে। তবে, ওই ভুবন ভোলানো হাসিতেই সব
জয় করে নিতেন। সব দ্বন্দ্ব, সব দ্বেষ শেষ হয়ে
যেত।
যোগ তত্ত্ব উপনিষদে বলা আছে, যঃ পিতাঃ স
পুনঃ পুত্রো যঃ পুত্র স পুনঃ পিতা। এবং সংসার
চক্রেণ কূপচক্রে ঘটা ইব। এখন যে পিতা
জন্মান্তরে সেই হয়ত পুত্র। আবার এখন যে পুত্র,
জন্মান্তরে সেই হয়ত হবে পিতা-- সংসার চক্র
ঘুরে চলেছে কূপ চক্রে ঘটের মত। জন্মান্তরবাদ
সত্য কিনা জানিনা। যদি, সত্য হয়, তাঁকে পাব
কিনা জানিনা। তবে, এমন মা আজ নেই ভাবতে
কষ্ট হয়!
এবার তো লক ডাউন! তাই বাড়িতেই। আগের
বছর গেছিলাম, তাই হয়তো, আমার ছাত্রটি
মেসেজে সেটাই বলেছিল। আসলে অভাব! ---
অভাব অনেক রকমের! অনুভবও অনেক।
করোনা, লক ডাউন আমাদের অনেক ক্ষতি
করেছে, আরও করবে হয়তো। তবে, এদুটো না
থাকলে, এই অভাব, ভালো বাসার ফাঁক ফোকর
গুলো এত স্পষ্ট হতো না। আজ সকালে
কাজলদার একটা পোস্টে পড়লাম-- '' রক্তের
সম্পর্ক নিছক এক বায়োলজিকাল ট্রুথ"। সত্যি
মনে হলো আবার। ‘য একো জালবান্ ঈশত
ঈশনীভিঃ সর্বান্ লোকান্ ঈশত ঈশনীভিঃ। সেই
পরমাত্মা যিনি মায়াবী (জালবান), যিনি নিজের
মায়াশক্তিতে সকল জগৎ শাসন করেন। সব কী
মায়াবাদ?
ষষ্ঠীর দিন আমার মন ভালো ছিল না, বিভিন্ন
পারিপার্শ্বিক কারণে। আমার স্ত্রী আমাকেই
ষষ্ঠীর হলুদ সুতো ও কপালে টিপ দিলেন। মনে
মনে হয়তো বললেন, আমি তোমার সব!
হয়তো বা!
সত্যি স্ত্রীর বহু রূপ। একদিন ভগবান বুদ্ধ,
সুজাতাকে সাত প্রকার ভার্যার কথা বলেন। তার
মধ্যে মাতৃসমা ভার্যা, ভগ্নিসমা ভার্যা, সখীসমা
ভার্যা, দাসীসমা ভার্যা। এই প্রেক্ষিতে অবশ্য
সুজাতা চেয়েছিলেন, নিজেকে দাসীসমা ভার্যা
হিসেবে। স্ত্রীকে স্বামীর দাস। এটা অনেকেই
মানতে পারেন না। তাই--" ন স্ত্রী স্বাতন্ত্রমর্হতি"
মানতে চান না। একি কথা--- স্বাধীনতায় নারীর
কোন অধিকার নেই? অন্যদিকে, মহাভারতের
উদ্যোগ পর্বে মহামতি বিদুরের শ্লোকটি বেশ
ভালো। তার মধ্যে একটি উল্লেখ করছি--- "
পতয়ো বান্ধবাঃ স্ত্রীণাং ।। অর্থাৎ স্বামীরা স্ত্রীদের
বন্ধু। পুরোটা হলো--মেঘ পশু গণের বন্ধু, মন্ত্রীরা
রাজার বন্ধু, স্বামীরা স্ত্রীদের বন্ধু। আর বেদ
ব্রাহ্মণ অর্থাৎ জ্ঞানীদের বন্ধু।

     

Comments

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার