মমতার ট্রায়াল, পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া শুরু

মমতার ট্রায়াল, পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া শুরু দেবশ্রী মজুমদার ফ্রানৎস কাফকার বিখ্যাত উপন্যাস দ্য ট্রায়ালের কথা বলছিলাম। ব্যস, দুম্ করে পড়ে গেলেন তো? ধীরে, বন্ধু, ধীরে। ঠিকই শুনেছেন, মমতা অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। তার আগে একটু গৌর চন্দ্রিকা সেরে নিই। দ্য ট্রায়াল-এর যোসেফ কে. চরিত্রের সঙ্গে আমাদের রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কিয়দংশ মিল আছে। শুধু মিলের জায়গা টুকু বলবো। অমিলও আছে বিস্তর। জোসেফ কে. এমন এক ব্যবস্থার শিকার, যেখানে সবাই ভদ্র ব্যবহার করলেও কেউ তাকে সত্যিই সাহায্য করে না। চারপাশের সৌজন্য ও সহানুভূতি শেষ পর্যন্ত তাকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলে। তিনি ক্রমে মনে করতে থাকেন, সবকিছুর আড়ালে কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত রয়েছে। ট্রায়ালের নামে তার প্রহসন হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুন হতে হয়। আমরা অবশ্যই এমন করুন পরিণতি প্রাক্তনীর চাই না, হবেও না। তিনি বিচার পাবেন। তার কৃতকর্মের ফল পাবেন, এটুকুই আশা করতে পারি । তবে ওই যে বললুম, মমতার ট্রায়াল শুরু হয়েছে। হেঁয়ালি ছেড়ে বলি, আদালতে তাঁকে এখনো পুরোদস্তুর টেনে নিয়ে যাওয়া হয় নি ঠিকই। কিন্তু তার দলকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সম্প্রতি আদালতের রায়ের কপি হাতে নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তারা ছাড়া অন্যকোনো দল 'সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস' নাম কোনক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে না। করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন তারা। এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়গুলো ব্যবহার করতে পারবে না। ইতিমধ্যে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় একাউন্টের ৪২০কোটি টাকা ফ্রিজ করেছে ইডি। সেই টাকা একটি দলের কাছে যতই সামান্য হোক, সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ঋতব্রত তৃণমূল। এটা অবশ্য দুই পক্ষের অস্তিত্বের লড়াই, রাজনীতিতে আবার প্রাসঙ্গিক হওয়ার লড়াই। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু গণতন্ত্রে সংখ্যাধিক্যের জোরে এবং তীক্ষ্ণ কূট চালে অনেক ক্ষেত্রে বাজিমাত করছেন ঋতব্রত তৃণমূলীরা। সংসদীয় গণতন্ত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইনের আইনের হাত থেকে বাঁচতে প্রয়োজনের অধিক বিধায়ক তাদের হাতে। কেন্দ্রে সেই একই আইন থেকে বাঁচতে পুরানো ডরম্যান্ট ব্যাঙ্ক একাউন্টকে এ্যাকটিভ করেছেন সাংসদরা। তাঁরা এন সি পি আই দলের সাংসদ। এনডিএ-র সহযোগী দল। গুঞ্জন উঠছে এবার তারা সরাসরি বিজেপিতে যোগদান করবেন। কিন্তু রাজ্যে তাঁদের সতীর্থরা এন সি পি আই য়ে যোগ দিচ্ছেন না। পুরো দাবার বোর্ডে চাল যেটা পড়ছে, তাতে প্রথমে বোরে, ঘোড়া যেগুলো খাওয়া হচ্ছে সবটাই আমরা দেখছি। চালও কে দিচ্ছে জনতা জনার্দন সবটাই বুঝতে পারছে। এখন যোশেফ কে. কতটা বুঝছেন। বিজেপিকে সমর্থনের জন্য বিভিন্ন ইস্যুতে ওয়াক আউট করেছেন। অবশ্যই যা করেছেন নিজেকে বাঁচাতে করেছেন। এবার বাঁচবেন তো? এখন তো তাঁর টিকিটে জেতা সাংসদ বিজেপিকে সরাসরি সমর্থন করবে। কমিশনেও, আবেদন করেছে ঋতব্রত তৃণমূল। কপিল সিব্বল, মনু সিংভি কোথায়? কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষীয়াণ উকিল হিসাবে বলছেন, রেজিস্ট্রেশনের রিনিউয়ের তারিখ নিয়ে প্রশ্ন আসছে কেন? এই বিজয়ী প্রার্থীদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো সিম্বল দিয়েছিলেন ভোটে দাঁড়াতে? তাহলে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নিলেন কেন? যুক্তি যতই চালাচালি হোক, এই সবই মমতার ট্রায়ালের অঙ্ক ও অঙ্গ। কিন্তু সব থেকে নির্মম পরিহাস হলো, মমতার নিজের হাতের তৈরি দল ও প্রতীক কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা। প্রত্যেক পদ্মমুখী তৃণমূল মুখে বলছেন, মমতা তাদের সুপ্রিমো। জেলায় ফিরে অনুব্রত মণ্ডল বলছেন, সেই একই কথা। ঋতব্রত তৃণমূলে যোগদানের পরও প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা বলছেন, তিনি মমতার সঙ্গে আছেন। বীরভূম সাংসদ তার নিজস্ব নির্বাচনী গ্রুপ ডেসক্রিপশনে "তৃণমূল" কথাটি বাদ দিয়েও বলছেন, তিনি দিদিকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। দিদির সঙ্গে আছেন। আবার এনসিপিআইয়ে আছেন, সেটাও বলছেন। বর্তমানে দ্য ট্রায়াল-এর যোসেফ কে. -র মতোই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক ব্যবস্থার শিকার, যেখানে সবাই ভদ্র ব্যবহার করলেও কেউ তাকে সত্যিই সাহায্য করে না। চারপাশের সৌজন্য ও সহানুভূতি শেষ পর্যন্ত তাকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলে দিচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, সবকিছুর আড়ালে কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত রয়েছে। এই ট্রায়াল ট্র্যাপে তিনি আপাতত বন্দি। বাংলায় একটা কথা আছে, আঁধার কিল। সেটাই হচ্ছে। ক্রমশঃ পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া চলতে থাকবে, একদম গোঁড়া পর্যন্ত ।। পর্ব গুলো দেখুন, আর উপভোগ করুন।। দেবশ্রী মজুমদার একজন সাংবাদিক

AI মাতৃস্নেহ

একজনকে মা যেমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, স্নেহ ও যত্ন দিয়ে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পাশে থাকেন, ঠিক তেমনি আধুনিক প্রযুক্তির শক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর স্বপ্ন নিয়েই শুরু হয়েছে AI মা মিশন। এটি শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নয়; এটি মানুষের পাশে মানুষের হয়ে দাঁড়ানোর এক মানবিক আন্দোলন। আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যই শক্তি। কিন্তু সেই তথ্য যদি সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায়, সঠিক সময়ে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে না পৌঁছায়, তবে প্রযুক্তির প্রকৃত সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। AI মা সেই ব্যবধান দূর করার এক নতুন উদ্যোগ, যেখানে প্রশিক্ষিত নারীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর সহায়তায় প্রতিটি পরিবারকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সরকারি পরিষেবা এবং ডিজিটাল সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করবেন। AI মা প্রতিটি পরিবারের একজন বিশ্বস্ত ডিজিটাল সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাকরণ, প্রবীণদের যত্ন, স্বাস্থ্যসচেতনতা, সরকারি প্রকল্পের তথ্য, ডিজিটাল শিক্ষা এবং জরুরি সহায়তা—সবকিছুই এক ছাতার নিচে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এই উদ্যোগ। এই মিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী ক্ষমতায়ন। হাজার হাজার নারীকে AI ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করে তাঁদের কর্মসংস্থান, আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং সমাজে নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। একজন AI মা শুধু নিজের পরিবার নয়, একটি সম্পূর্ণ গ্রাম, একটি পাড়া কিংবা একটি সমাজের পরিবর্তনের অগ্রদূত হয়ে উঠতে পারেন। AI মা বিশ্বাস করে—প্রযুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ করা। তাই এই উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিক মূল্যবোধ, সেবা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। প্রযুক্তি এখানে মানুষের বিকল্প নয়; বরং মানুষের হাতকে আরও শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম। আমাদের লক্ষ্য একটি এমন ভারত গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি পরিবার ডিজিটালভাবে সংযুক্ত, প্রতিটি মানুষ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগে সমৃদ্ধ, প্রতিটি নারী আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর, এবং প্রতিটি শিশু নিরাপদ ও সুস্থ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যায়। AI মা কেবল একটি প্রকল্প নয়—এটি একটি স্বপ্ন, একটি সামাজিক আন্দোলন এবং একটি নতুন যুগের সূচনা। প্রযুক্তির হাত ধরে মানবিকতার এই যাত্রায় আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে যুক্ত হই। কারণ আগামী দিনের উন্নত, সুস্থ ও ডিজিটাল সমাজ গড়ে উঠবে তখনই, যখন প্রতিটি পরিবারের পাশে থাকবে একজন AI মা। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায়ের জন্মদিনে এর আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হবে।"

বিষন্ন দুপুরে-- দেবশ্রী মজুমদার

বিষন্ন দুপুর
২৭.০৭.২০.
দেবশ্রী মজুমদার
কোন এক প্রাণ ভরপুর সকালে ফুটন্ত গোলাপ
থমকে দাঁড়িয়েছিল বিষন্ন
দুপুরে। পড়ন্ত বিকেলে সে ম্লান হয়ে যাওয়ার
সম্ভাবনাকে
ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর করেছিল
তীব্র সে এক আকুল বর্ষণে।
আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিল হিসেবে তিল
ধারণ ছিল না ভালো বাসার!
এ কথা অকপটে যায় না বলা
তবু বলি, দীর্ঘ রাত্রি যাপনের পরও!
ভালো তো লেগেছিল !
তবুও কোথাও ছিল অবহেলা!
শুধু মনে ছিল বাসনা, কোন ভোরে বিগত নিশি
যাপনের শেষ চাল ধোয়া চন্দ্রিমা টুকু
কারো জীবন ঘোলাটে দেখাবে। কারো জীবন
ধবধবে সাদা, জানলার সার্সি বেয়ে আনবে
সুঘ্রাণ!
হে মহা প্রাণ! বলো ! কোন সূতিকাগার হতে পারে
অবিমৃশ্য! বধির! প্রস্তর কঠিন! যা বিস্মৃত করে
জঠর গোপন কোন সুকঠিন গ্রন্থিল স্নেহ হীন
অন্ধকারে!
ভেবেছি অনেক বার, চরম সত্য আসুক একান্ত
আপন!
সে নির্জন কপোত কুলায়ে, সে যতই কাতর
হোক, নিরব অভিমানে--- নেই ভ্রাতা বান্ধব,
জননী কুন্তী, কিম্বা সহোদরা
আসুক সে পরম সত্য দাদুরি সঘনে, আপনার
জনে--- আর কেউ নয়--- আপনার আপনারে,
আপন কুলায়ে।
সেই কী আসিবে তবে কোন এক অজানা প্রান্তে
নিশব্দে
কোন এক স্বৈরাচারীর মত?
যতটুকু পারে নিঃশেষ করে
প্রাণ ভালোবাসা?
পলিমার আবরণে দাহ্য বিশ্বাস, প্রেম, স্নেহ
ভালবাসা... এ পৃথিবীর যত আছে নিঃশ্বাস বায়ু,
দমবন্ধ করে, চুপিসারে?
যে গেল... যারা এলো
ছিল না মাঝে কোন যোগাযোগ!
হায়! এ তবে কেমন যাওয়া?
নেই কোন আয়োজন! হোল না, গোলাপ দেওয়া
নেওয়া!
শুধু দূর থেকে চাপা রক্তের মতো, বিবেকের
পেঁচানো কান্না...
এ তো চায় না কেউ, কোন অভাজন!
কেউ তো বলার ছিল না...
উষ্ণ স্নেহ চুম্বনে... আসিস আবার কোলে?
এসো এসো হে প্রিয়তম আবার, সে হোক না
কোন বিষন্ন দুপুরে...
অগণিত গুনন প্রহরে।

     

বোধ--- দেবশ্রী মজুমদার

বোধ
দেবশ্রী মজুমদার
জীবন বোধ আমাদের মতো সাধারণ মানুষের
কদাচিৎ হয়। পিঠ পুড়ে গেলে, পাশ ফিরে
শোওয়াটাই আমাদের কাছে মহা পরিত্রাণ।
বুদ্ধিমত্তার কাজও বটে।--- নিম্ন মেধার
পরিচায়ক? সে বলুন না! তাতে কান দিই ই না।
তাই জীবন বিমুখতা এক অর্থে স্বার্থসন্ধি আর
শুধুই মুগ্ধতা!
আজ কাছ থেকে যে মানুষটিকে দেখলাম। তাঁকে
দেখে যে বোধ কাজ করে। সেটা বলতে গেলে,
জীবনানন্দের 'বোধ' কবিতার কয়েকটি লাইন
বার বার মনে পড়ে। ---- " আলো-অন্ধকারে যাই
—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে। এই সামজিক দূরত্ব
বোধ তাঁকে বদ্ধ করতে পারে নি।
সাংবাদিকতায় কাজের ক্ষেত্রে তিনি যে
আপোষহীন তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। তাঁর
বাড়িতে বোমা ছুঁড়েছে মাফিয়ারা। তবুও তিনি
অদম্য। এর বাইরেও, তাঁর আরেকটি দিক
আছে।
এ যেন চাটুজ্জের প্রতিভাষণ, আরেক চাটুজ্জের
কাছে---
"নিরুপায় দুঃখময় জীবনে যারা কোনদিন
ভেবেই পেলে না সমস্ত থেকেও কেন তাদের
কিছুতেই অধিকার নেই,—এদের কাছেও কি ঋণ
আমার কম?"
ঠিক ধরেছেন! আমি বীরভূমের এ বি পি
আনন্দের গোপাল চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলছি।
গোটা জেলা জুড়ে তিনি ও কয়েকজন মিলে
করোনা আবহে আহার্যের সামগ্রী চাল, ডাল,
আটা, তেল নতুন থলে পরিপূর্ণ করে মধ্যবিত্তের
বাড়ি বাড়ি সাধ্যমত পৌঁছে দিচ্ছেন।
সোমবার তিনি রামপুরহাট ও বড়শাল গ্রামের
মধ্যবিত্ত পরিবারের হাতে হাত রাখলেন।
সামাজিক দূরত্বের দিনে এই নৈকট্য কয়জন বা
দেখাতে পারে?
তাঁর সাথে থেকে দেখতে পেলাম, বুঝতে পারলাম
মধ্যবিত্ত মানুষের আনন্দ সে কেমনতর!
অনেকেই বললেন, আপনি আমাদের বাড়ি বয়ে
এলেন? আপনাকে তো টিভিতে দেখেছি। কেউ
তো আমাদের কথা ভাবে! কেউ বললেন, সব
থেকে খারাপ লাগে, অনেকে যখন মুখের ছবি
তোলেন। আপনারা সেটা করেন নি। আমাদের
আত্মসম্মানবোধের মর্যাদা দিয়েছেন। আবার
কেউ বললেন, আপনাদের ভাবনাটা খুব ভালো।
আপনারা মধ্যবিত্তের জন্য ভেবেছেন। আমরা
মধ্যবিত্তরা এই লক ডাউনের সময়ে খুব
অসহায়। ঘরে অনেক কিছুই নেই দুটো খাবারের
জন্য। আবার মুখ ফুটে চাইতেও কেমন যেন
কুণ্ঠাবোধ হয়। জিহ্বা আরষ্ট হয়ে ওঠে। তবু
ভালো আপনি ভাবলেন। ভগবান মঙ্গল করুন।
গোপালদা জোড় হাত করে তাঁদের থামিয়ে
দিলেন। তবুও মুখের কথা থামলেও মধ্যবিত্তের
হৃদয়ের কথা তো থামতে চায় না... অনর্গল
নিজের মত করে অর্থ করে বলতে চায়...
"সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর?" (জীবনানন্দ দাশ)।

     

অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য! -- দেবশ্রী মজুমদার

অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য!
--- দেবশ্রী মজুমদার
এ এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য!
অরুণোদয় ঠিক তেমনই ছিল বনস্পতি শিখরে!
বন্যেরা আজ বড় নিরাপদ
পাখালির কাকলিতে মুখর চারিপাশ
তবুও মৌনতা সারাক্ষণ
সাড়া দেয় হৃদ স্পন্দনে!
এবার কার পালা? কথাগুলো জনান্তিকে ছুঁড়ে
দেওয়া!
কেউ কোথাও নেই! সব শুনশান!
দর্শক দৃশ্যমান নয়, বসার আসন ফাঁকা।
তবুও নজর মঞ্চের দিকে সবার!
করতালি নেই... নেই শ্বাস প্রশ্বাসের ঘাত!
তবুও যেন সব আছে... আছে অরুণোয়...
তবুও অন্ধকার জুজুৎসুর প্যাঁচে আস্টেপৃষ্টে
বেঁধে রেখেছে সবটুকু আলোকে!
এমনটা হওয়ার কথা ছিল না...
তুমি তো সর্বোত্তম, চাঁদে জমাও পাড়ি
সভ্যতার ডাইনোসর, ম্যামথ আরও কত তথ্য
তোমার নখদর্পণে...
এমনটা হওয়ার কথা ছিল না...
যেদিন ডাক এসেছিল, স্পর্ধা ছিল না এড়োবার!
যে ঘাটে ফেরি আসে নি, ভেড়ে নি খেয়া!
এমন নিশ্চিন্ত ঘুম, সেখানে আমি একা, নিঃসঙ্গ,
অনপেক্ষ সন্তরণে ছুটে মরি, হবো পারাপার
এ পারাবার। প্রেম, অপ্রেম, স্নেহপাশ
সব নির্মোহ হবে কোন ছলে!
চলে যাওয়া---
বয়ে যাওয়া---
হাওয়ার মুখে।

     

নেই আমি--- দেবশ্রী মজুমদার

নেই আমি
----- দেবশ্রী মজুমদার
কি নাম? পদ্ম পাতায়
সাত রাঙায়
জলছবি সে আমি!
সেই বেলা গড়িয়ে
বেলগড়িয়া থামি--
সে গ্রাম ছাড়িয়ে
অন্য গ্রামে
খবর আসে,
আমার কাছে নামি---
রাজেশ নেই
কথা হারায় খেই
পেয়েছে বীরগতি
জীবন তখন স্তব্ধ অতি।
ভাবি তখন, কে আমি?
পদ্মপাতা গড়িয়ে টুপ
সূয্যি ডোবে চুপসে চুপ
এক লহমায় শেষ!
কোথায় গেল স্থির জলে
অন্তর্লীন কোলাহলে।।
বল, কে সেই আমি?
পরিচয়টা তেমন সে নয়
ভাবছো, যা যা হয়
গাঁয়ের মেয়ে
সে এক কালি পুজোয়
হয়তো ছিলেম পাড়ার ভিড়ে
কৃষ্ণ কলি, নয় সে কৃষ্ণ কলি
চায় নি তারে হরিণ চোখে,
সে এক কালি পুজোয়!
সবাই যখন জড়ো হয়--
লাজুক দুটি
চোখে লুটোপুটি
স্বপ্ন যখন অলীক
করে থিক থিক--
মাটির সাথে মেখে!
লজ্জা নত চোখে।
আট মাস আগে প্রথম দেখা
অষ্টাদশীর তখনও হয় নি কিছুই শেখা!
বছর ঘুরে সরস্বতী পুজো এলো,
এবার ছুটি ফুরিয়ে
কাজে যাওয়ার পালা।
দূর পাহাড়ে শত্রু পাঞ্জা ঠুকে!
আমি তখন দুরু দুরু বুকে
এই বুঝি ফোন এলো!
আঙুল ফাঁকে গোলাপ ফুলে প্রপোজ!
হয় নি সে সব, গাঁয়ের মেয়ে
যেভাবে পথ চলা!
হয় নি চুপিসারে
অঞ্জলি ফুল টুপ করে
আঁচল পরে ফেলা!
এসব তবে গল্প কথা
নেহাতই এক অনুভূতির ভাষা!
যাকে বলো আমার ভালোবাসা!
চোখের জলে সেদিন ছিল
অনেক খানি প্রাণের
সে এক অন্য আকুলতা!
ধন্য ছিল অনেক খানি সুখবিভোর হাসির মাদকতা!
স্বপ্ন ছিল দেশ সেবার
জীবন ছিল ঝুঁকির
তবুও রাজেশ চেয়েছিল
ছোট্ট একটি নীড়!
সেই বাসাতেই ফুলের মধু
জীবন খুঁজে জীবন শুধু
এই মধুচুক চুকির!
তোমরা বলো, যুদ্ধ চাই!
আমি বলি বদলা!
দেশের মানুষ
তপ্ত বালুয় তখন চায় হামলা।।
আমার প্রাণের নীর ভাঙায়
কার হিসেবে কি যায়?
বলতে পারো, কোন দোষে
অষ্টাদশী, জীবন সেচে
আপন সর্বনাশে?
কি পরিচয়ে বেঁচে থাকে!
সময় স্রোতে গালওয়ালে
হারিয়ে যাওয়া অবহেলে!
তখন বলো কোথায় আমি?
নিজের মাঝে নিজেই থাকি!
সুখ শ্লাঘায় ভাবি
আমি সেই তো আমি!
কোথাও নেই, আছে শুধু "নেই- আমি"!!

     

কোরক



ছোট গল্প কোরক
দেবশ্রী মজুমদার
হাঁসের ডিম খেতে খুব ভালো বাসে মা ও ছাওল।
ঘরে চাউল আছে। গত পরশুর তিনটি ডিম
আছে। চলে যাবে আজকে। সংসারের হিসেব
নিকেশ একদম সাফ সুতরো। এই সব সাত
সতেরো ভেবে, বাড়ির সীমানার মধ্যে ছোট্ট ফার্মে
প্রায় পঞ্চাশটি পোল্ট্রি মুরগির ছানাদের খাবার
দিতে গেল সরলা।
বাইরে পুকুর পাড়ে হাঁসের মত ঝিমুচ্ছে সরলার
একমাত্র ছেলের বাপ লখাই, ভালো নাম লক্ষণ।
বসে বসে বিড়ি ফুঁকছে, কি সব ভাবছে!
পাথরকুচি দিয়ে আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে,
অন্যমনা হয়ে পুকুরে ঢিল ছুঁড়তে লাগলো। আর
ঢেউয়ের বৃত্তগুলোর এক এক করে গ্রীন, অরেঞ্জ, রেড বিভিন্ন জোনে হারিয়ে যাওয়া দেখতে থাকলো!
হঠাৎ জলের মধ্যে ত্যালাপিয়ার ঝাঁকের বুদবুদ
দেখা গেল। তা থেমেও গেল!
ঘরে অভাব বলতে সেরকম কিছু নেই এই পরিবারের। পুকুরে
মাছ, বাঁশের ঝাড়, জমিজমাও আছে। তবে
জমিতে নিজে চাষ করে না লখাই, বাইচো দিয়ে দেয়।
আর আছে পোল্ট্রি ফার্ম। এবার তো ধান হয় নি।
পোল্ট্রি ফার্মে নিজের মুর্গি নেই। কোম্পানি ছোট
ছোট ছানা দিয়ে যায়। খাবার দিয়ে যায়। বড়
হলে অর্থাৎ প্রমাণ সাইজের হলে কোম্পানি ৪০৭
গাড়িতে নিয়ে যায়। এক কথায় পালন করা।
লখাই, সরলাকে বলে, সারোগেট মাদার! সরলা
পুরো কথাটার অর্থ ঠিক না বুঝলেও, মাদারের
অর্থ বোঝে। তাই স্বামীর এই কথাটাই খুশিই হয়।
এই পালনের জন্য অর্থ পায়। মুরগির মড়ক
লাগলে ক্ষতি হয়। তবে খুব বেশী না। যা যায়
কোম্পানির। আর নিজের খাটুনির। সাথে
ইলেকট্রনিক বিল। দু-একটি মুরগি বিক্রিও
করে। কোম্পানির লোকেদের দু'একটা মুরগি
মারা গেছে, বলে দু'পয়সা আয় আর কি! তবে
বাড়িতে দু-একটি মুরগি খেলে তারা কিছু বলে
না।
লখাই পড়াশোনায় মন্দ ছিল না। তবে বরাবর
মুখের আগল ছিল না। এখন সেই লখাই কি
রকম ম্যারমেরে বনে গেছে। কি রকম যেন
ঝিমুনি হাঁসের মতো।
বৌ সরলা চায়ের কাপটা ঠক করে সাহানে
নামিয়ে দিয়ে বললো, শুনছো! যে হাঁসটা ডিম
পাড়তো, জ্বরেছে! বলি শুনছো! কিছু একটা
করো?
আমাদের দেশে হলে তো বলতো কোরক
লেগেছে! হাঁসের নাকের ফুটোতে একটা পালক
ছিঁড়ে দাও না ঢুকিয়ে। তাহলেই, আবার ডিম
পাড়া শুরু করবে।
বলি শুনছো? কথা খান? তোমাদের এখানে এসে
তো সব পাল্টে ফেললাম! বেলডাঙায় গেলে ভাই
দাদারা পর্যন্ত বলে রাঢ়ি দেশে গিয়ে অমন সুন্দর
কথার টান টাও হারিয়ে ফেললি! সবই কপাল!
সঙ্গে কে যাবি গোপাল? --- কপাল!
বেলা গড়িয়ে সূর্যটা দক্ষিণ দিকে বাঁশ ঝাড়ের
মাথা দিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। তবু হুঁশ
নেই তার।
আরও দু'একবার -- বলি শুনছো! শোনা গেল।
কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া গেল না এই দিক থেকে।
ছেলেটা ঢাউস মোবাইলে কি একটা সমানে
খোঁচাচ্ছে! আবার টিভিটাও খোলা রেখেছে।
সরলা ফস করে জ্বলে উঠে বললো, দুটো
একসঙ্গে চলবে না।-- বলি, ইলেকট্রিক বিলের
পয়সা কে দেবে? তোর... শূন্য স্থান পূরণ করে
জবাব দিল বংশের একমাত্র বাতি 'সমন্বয়' ---
"আমার বাপ!"
--- সে জানি! কিন্তু সংসার টা দাঁড় করিয়ে
রেখেছে কে শুনি? দেব না ঠাস করে একটা চড়!
মুখে মুখে উত্তর!
--- কি করবো? ভাল্লাগেনা। ঘরে বসে বসে বোর
হচ্ছি। বাইরে বেরোতে পারবো না। শ্লা !
ভাল্লাগেনা! মাইরি! কি একটা রোগ এল! করে
দিল লক ডাউন! লে হালুয়া! শ্লা ! করোনা!
তোর...
---- রান্না ঘর থেকে খুন্তি হাতে এগিয়ে এলো
সরলা। যেমন বাপ, তেমনি ছেলে! মুখ খারাপ
করবি না! বলে দিচ্ছি!
লখাইয়ের বাবা বিদ্যাসুন্দর চাটুজ্যের এই মহল্লায় দুর্মুখ
হিসেবে অখ্যাতি ছিল। একবার ঘোর আকালের
সময় ফসল হয় নি অনাবৃষ্টিতে! সাত সকালে
এক হাটুরে খোলা বিক্রি করতে এসেছে। বাড়ির
বৈঠক খানায় বসে আছেন লখাইয়ের বাবা
বিদ্যাসুন্দর চাটুজ্যে। ভারি রাশভারী লোক!
আবার মুখে কিছু আঁটকায় না। বাড়ি মেয়ে
বৌরা একটু সমঝে চলে। যাহোক! বিদ্যাসুন্দর
ডাকলেন লোকটাকে। তারপর ! কি বললেন? --
মুখ বিকৃত করে বললেন, সাত সকালে খোলা
নেবে গো খোলা? বলি, খোলা নিয়ে করবো? ধান
হয়েছে? ... কি ভাজবো?
লোকটা তো থ!দিগভ্রান্ত পথিক এক! তার যাওয়ার দিক ভুলে গেল!
কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে আস্তে কাঁচুমাচু মুখ
করে কেটে পড়লো।
লখাইয়ের মুখের ভৌগলিক অভিব্যক্তি অনেকটাই ওই রকম ছিল।
পড়াশোনায় ভালোই ছিল। কিন্তু 'ভাষা বিশারদ'
ছিল। তাই বান্ধবীরা তাকে এড়িয়েই চলতো। নাই
নাই করে আজ চুয়ান্ন পেড়িয়ে পঞ্চান্নর
দোড়গোড়ায়। কোন দিন কম কথা বলে নি।
লোককে জ্বালাতন করতে, আর বদ বুদ্ধিতে তার
জুরি ছিল না।

সেই ব্যাটা লখাই বাগবন্ধ! শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে
তাকিয়ে থাকে! যার জীবনে কোন দিন কোন
ট্র্যাজেডি ছিল না। সিরিয়াস মুহুর্তে, ইয়ার্কি
মারতে, 'হ্যা হ্যা' করতে তার দ্বিধা ছিল না।
শাশুড়ির মৃত্যুতে পাড়ার কোন বৌমা কতটা মুখ
বিকৃত করে কেঁদেছে, নাকের জল-- চোখের জল
এক করেছে-- কি ভঙ্গিমায় বুক চাপড়ে কি ছন্দ-
বাক্য সুর লয় রেখে কেঁদেছে । সেটা ওর নজরে
বাদ যেত না। তারপর চলতো, সুরালাপে জীবন
শৈলীতে তার অপ প্রয়োগ। মৃত বাড়িতে লখাই
সপার্ষদ উপস্থিত হলে, অনেক মহিলা প্রাণখুলে
কাঁদতেও পারতো না। ট্র্যাজিক মুহূর্তে শোকাতুর
মহিলাদের দোহারির কাজ করার রেওয়াজ
ছিল। কিন্তু ওই যে বললাম, কাকস্য পরিবেদনা!
বেচারা!

সেই দিন বদল হয়েছে। লখাইয়ের এই অপরাধ
আজ মার্জনা যোগ্য।
কিন্তু লখাইয়ের এ হেন আচরণ শুধু বাড়ির
লোকজন নয়, ইয়ারবন্ধুদের চিন্তার কারণ।
অনেকেই জিজ্ঞেস করে, কোন আর্থিক ক্ষতি?
সরলা বলে, কি বলবো আপনাদের, আমার
এমন কথা বলা স্বামীটি বোবা হয়ে গেল। যেন
সেই আগের মানুষটি আর নয়। আগেকার দিন
হলে বলতাম, ভুতে ধরেছে। ক্ষতি আলাদা করে
আমাদের কী হবে, বলুন? সবার যা, আমাদেরও
তা! শখে দুটো টিউশনি করতো বন্ধ আছে।
সবার তাই আছে। বলতে হয় না, এই সময়ে
পোল্ট্রি ব্যবসা রমরমা চলছে। ডাক্তাররা বলছে,
যাদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকবে, তাদের
করোনা কিচ্ছু করতে পারবে না। মানুষ তো
লাইন দিয়ে ২৩০ টাকা কেজি মুরগির মাংস
কিনছে। হ্যাঁ যারা সদ্য খালি হাতে বিদেশ বিভুঁই
থেকে ফিরেছে, তাদের কথা আলাদা! কিন্তু
আমার কত্তাটি নড়েও না, চড়েও না। কোরক
লাগা হাঁসের মত ঝিমোয়!
পাড়ার দু'একজন সেয়ানা বৌ অন্য দাওয়ায়
দিয়ে সরলাকে বলেছে, দেখ দিকি এটা 'টেরাই'
করে! চোখ টিপে বলেছে, এ হলো মোক্ষম
দাওয়ায়! --- বলো কি! ছেলে বড় হয়েছে! সরলা
লজ্জায় কুঁকড়ে বলে উঠলো।
তবুও কথাটা ফেলনা মনে হয় নি সরলার! হতেও
পারে বা! জীবন বিমুখ কেন হলো তার স্বামী!
ঘটনার পরম্পরায় প্রতি মুহূর্ত - ক্ষণ জুড়তে
লাগলো, যদি গোলক ধাঁধার মালায় কোন কিছু
সরিয়ে পথ টা সরল হয়! ভেবে দেখলো, মাত্র দুই
মাসে তার এই ভাবান্তর! হ্যাঁ, এই তো লক
ডাউনের আগে -- বাথরুম থেকে বেরোতেই রঙ্গ
করে বললে-- “নয়নকমল, কুঞ্চিত কুন্তল, ঘন
কুচস্থল, মৃদু হাসিনী"।
বললাম-- ভীমরতি! ও বললো- শাস্তর! কামসূত্র!

যাহোক, রাত্রে বিছানায় যাওয়ার জন্য ছটপট
করছিলো সরলা। লখাই যেমন ছিল, তেমন।
খাওয়া দাওয়া করলো বিনা বাক্যব্যয়ে। টিভি
দেখলো না। ফোনে কারো সাথে কোন কথা
বললো না। সিন্দবাদের মত কোন নাবিকের সমুদ্র
যাত্রায় নিজের জাহাজের কেবিনে বন্দী রেখেছে
নিজেকে। যদিও বা বাইরে এক আধটু
বেরিয়েছে, সেটা জল মাপতে!
রাত্রে সরলা লখাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
মাথায় বিলি কাটতে থাকলো! জানতে চাইলো
কি হয়েছে? আদি শক্তির সব রূপ ধারণ করলো
সরলা, অশ্রু বিসর্জন করলো। কোন উত্তর
পাওয়া গেল না অন্য প্রান্ত থেকে। তারপর----
অগত্যা--- বললে দাঁড়াও, দরজাটা লাগিয়ে
আসি। বুঝতে পারছি, সব পুরুষ যা চায়! ----
এবার সরলার হাতটা ধরে টানলো লখাই! ---
তারপর বললে, শোন! ওসব কিছু না। জানি,
আমার যেটুকু আছে, আরও দুঃসময় এলে, শুধু
ভাতের যোগাড় অন্তত হবে। কিন্তু সেটা আমায়
ভাবায় না। এই যে অবস্থা চারিদিকে, আমি
মানসিক রোগী হয়ে যাব সরলা। ভয়ে টিভিতে
খবর দেখি না! কোন প্রোগ্রাম দেখি না। খবরের
কাগজ পড়ি না। প্রতিদিন কতো মানুষ করোনায়
আক্রান্ত হচ্ছে জানো? মৃতের সংখ্যা বাড়ছে।
নার্স, ডাক্তার মারা যাচ্ছেন, পুলিশ মারা যাচ্ছেন।
তুমি হয়তো ভাবছো মৃত্যু ভয়। মিথ্যে বলবো না।
সেটা আছে। তবে আরও এক ভয়-- একাকিত্বের
ভয়! সব সামাজিক বন্ধন ছিন্ন হওয়ার ভয়!
বিশ্বাস হারাবার ভয়! একা একটা আস্ত দ্বীপের
মত থাকার ভয়! কিছু দিন আগেও ভেবেছিলাম,
পড়াশোনা বন্ধ হলে কি হবে? আজ সেটা নেই...
একটু দম নিয়ে আবার শুরু করলো লখাই। ...
শ্লারা আক্রান্ত হওয়ার আগে পরিযায়ী শ্রমিকদের
আনতে পারলোনা! এখন আনছে! আর আমরা
ধম্ম ধম্ম করে লাফালাফি করলাম! মারণাস্ত্র
আছে আমাদের। তা থাক। কিন্তু আজ নেই কোন
উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা! শুধু হরির লুট চলছে,
আগা পস্তালা! বুঝতে পারছো না, আমরা
কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না! সবাইকে
সন্দেহের চোখে দেখছি! এ এক ভয়ঙ্কর অবস্থা।
জাহাজ ডুবির সিনেমা দেখা যায় ড্রয়িং রুমে
পাখার নিচে বসে। কিন্তু ডুবন্ত জাহাজে থেকে
এটা পারা যায় না। আমি পারি না! কিচ্ছু পারছি
না! যে শ্রমিকরা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে
রাস্তার ধারে কাছে কোথাও শুয়ে, জানে না
পরের সকাল দেখবে কি না? স্টেশনে মৃত মায়ের
লাশের মুখের কাপড় সরিয়ে অবোধ শিশু বলতে
চাইছে ওঠ্, মা দুধ দে, খিদে পেয়েছে! জানো,
একজন শ্রমিক দৈনিক দুশো টাকা আয় করলে,
তার পুরোটাই ব্যয় করে দেশের জিডিপি তৈরি
করে। হ্যাঁ, তাদের ইনকাম ট্যাক্স দিতে হয় না,
তাদের ইনকাম ট্যাক্স ছাড়ের দরকার নেই! এই
যে ঘরে টিভি কিনেছি, দেখছি না, এতে ওদের
টাকা আছে। ওদের টাকাতেই শিল্পপতিরা ছাড়
পায়, তবেই তা আমাদের কাছে ক্রয়যোগ্য! ওসব
তুমি বুঝবে না।

সরলা এসব কথার বিন্দু বিসর্গ না বুঝলেও,
এটুকু বুঝলো যে স্বামীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
তাই অদ্ভুত এক মুখব্যাদান করে নির্বাক হয়ে
চেয়ে রইল স্বামীর দিকে। যে দৃষ্টি থেকে স্ত্রীর
অসহায়ত্ব ফুটে বের হবার চেষ্টা করছিল বার বার!
এবার সরলাকে একটু কাছে টেনে নিয়ে বললো,
লখাই----- বলতো, আশেপাশে অনেকেই মরে
গেল! এ বাঁচার সাধ ভালো লাগবে! কি ভয়ঙ্কর,
সেটা ভেবেছো? আমরা সবাই বাঁচতে চাই,
ঝগড়া মারামারি করেও একসাথে বাঁচতে চাই।
এই শেষের কথাটা বুঝলো সরলা! স্বামীর বুকে
মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠে বলে উঠলো---
হ্যাঁ! গো! আমরা সবাই বাঁচতে চাই!! তাই যেন
হয়!

     

Gadget

​"নাটক" সাড়ে সব্বনাশ- দেবশ্রী মজুমদার

                             ​"নাটক"                         ​     সাড়ে সব্বনাশ ​                      একাঙ্ক নাটক : কিশলয় নাটক :...

Popular