আর কত ধবধবে কালো, হবে কুচকুচে সাদা দেবশ্রী মজুমদার

"কুচ কুচে সাদা, ধবধবে কালো। তৃণমূলে নেই কোনো ভালো।" এই বাক্যটি বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যর। এখন তিনি কী বলবেন? লোকমুখে বিজেপির বি টিম বলে খ্যাত ঋতব্রত তৃণমূলে এবার স্থান পেলেন দিদির দীর্ঘদিনের সাথী অনুব্রত মণ্ডল। শুধু স্থান নয়, পেলেন জেলার দায়িত্বও। তবে ঋতব্রত তৃণমূলে। নির্বাচনে পরাজয়ের পর পুরাতন কমিটি তো মমতা তৃণমূল আগেই ভেঙে দিয়েছে। বলাই বাহুল্য, শেষের দিকে, বিশেষ করে ছাব্বিশে কোন দায়িত্ব না থাকায় নিষ্ক্রিয় ছিলেন দিদির কেষ্ট । অন্যদিকে, জেলার রাজনীতিতে অভিষেকের পছন্দের ছিলেন কাজল সেখ। অনুব্রতকে সরিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আদি তৃণমূলে এক কথায় জেলার মধ্যমণি। তিনি আগেই ঋতব্রত তৃণমূলে যোগদান করেছেন। এবার সেই অনুব্রত ঋতব্রত তৃণমূলে জেলার দায়িত্ব পেলেন। ভাগ্যের উত্থান পতন কাকে বলে তা অনুব্রত মণ্ডলকে না দেখলে দুষ্কর। এই অনুব্রত মণ্ডল যার নির্দেশে বাঘে গরুতে একঘাটে জল খায় সেই বেতাজ বাদশাকে সিবিআইয়ের হাতে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবাস ভোগ করতে হয়। তবে অনুব্রত মণ্ডল রাতারাতি এইভাবে বেতাজ বাদশা হয়ে উঠেছেন এমন নয়। একসময় তিনি ছিলেন সামান্য এক মুদিখানার দোকানের মালিক। শমীক বাবু বলতেই পারেন, এটা তৃণমূলের পারিবারিক বিবাদ। তৃণমূল ভেঙে আসল তৃণমূল এখন ঋতব্রত নেতৃত্বে প্রধান বিরোধী দল। তারা কমিশনের কাছে ঘাসফুল সিম্বলের দাবিদার। আইনি লড়াইয়ে জটিলতা থাকলে হাতের পাঁচ এন সি পি আই তো আছেই। এখন মমতার হাত ছাড়লেন কেষ্ট। মমতা দিদির আদরের ভাই কেষ্ট! বহুদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী। গুঞ্জন আগেই শুরু হয়েছিলো। কেউ কেউ বলেছিলো, পড়ল কথা হাটের মাঝে, যার ব্যথা তার বুকে বাজে। সেই ব্যাথা মমতা থুড়ি রাসমণির বুকে কতটা বাজে দেখার! " রাসমণির আর কোনো সন্ধান রহিল না। " গল্পের এমন পরিসমাপ্তি কবে হবে জানা নেই। (রবীন্দ্রনাথের দান প্রতিদানের রাসমণির মতো মর্যাদা সম্পন্ন মোটেই এখনকার কোন নেত্রী নন, হওয়া সম্ভবও নয়।) তবুও অনুগামীদের একাংশের মত। অত:পর আর কোন দুর্নীতিযুক্ত দল, পাপড়ি ও মূল রহিল না। শুধু "ভালো"-ই রহিয়া গেল। সখেদ কিনা জানি না। তবে, ধবধবে কালো, এখন হাত যশে কুচকুচে সাদা। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচাৰ্য। খুবই বিশুদ্ধ, শিষ্ট মিষ্ট ভাষী। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, "কুচ কুচে সাদা, ধবধবে কালো। তৃণমূলে নেই কোনো ভালো।" তারপর থেকেই স্থানান্তরিত বিশেষণটি ফিগারস অফ স্পিচ হয়ে লোকমুখে ঘুরছে। কয়দিনের ঘটনাক্রমে স্পষ্ট যে ধবধবে কালো এবার কুচকুচে সাদা হবেই। সেই তালিকায় সদ্য তিন তৃণমূল সাংসদ, বিজেপি সাংসদ প্রার্থী হিসেবে সংসদের উচ্চ কক্ষে যাচ্ছেন। এটা নিশ্চিত। অতীতে এমনটা হয় নি তা নয়। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্র শেখরের ছেলে নীরজ শেখর ২০১৯ সালের জুলাই মাসে সমাজবাদী পার্টি (SP) ত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (BJP) যোগ দেন। আর তাতেই শুরু হয়েছে, হতাশা বিজেপির অনুগামীদের একাংশের মধ্যে। তারাই সমাজ মাধ্যমে শিক্ষাবিদ তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ড.সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্য তুলে ধরে এবং তৃণমূল নেতানেত্রীদের বিজেপিতে যোগদানের ছবি পাঞ্চ করে সুন্দর ককটেল বানাচ্ছেন। আর তাতে নেশাটাও জমে উঠেছে। যাকে একদিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, গরু পাচারকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে ভাইপোর কাছে অর্থ পাঠানোর কথা বলছেন, তিনিই এখন বিজেপিতে যোগদানের পর কুচকুচে সাদা। এই নতুন তালিকায় আরও নিত্য নতুন নাম সংযোজন অনুব্রত মণ্ডল। আদি তৃণমূলের পুরো মেশিনারী নব্য তৃণমূলের চায়। এটা অস্তিত্বের লড়াই। এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে সাংগঠনিক দক্ষতা ছাড়া, একটা মেকানিজম ছাড়া রাজধানী থেকে রাজ্যপাট চালানো যায় না, দলও চালানো যায় না। এই পুরো মেকানিজমটা মাঠের বাইরে বেশিদিন শাসকদল রাখতে দেবে না, তাদেরও কুচকুচে সাদা করে দলে ঢোকাবে। অমৃতে অরুচি তো সুরাসুর কারো নেই। ভালো হলে তো ক্ষেতি কিছু নেই। শুধু ধবধবে কালো না হলেই হলো। তবে শমীকবাবুর আরেকটা বক্তব্য নিয়েও খটকা লাগছে। তিনি বলছেন, জনগণকে এই ভূখণ্ড রক্ষা করতে হবে। নাহলে, যতমত তত পথ থাকবে না, কমিউনিস্ট থাকবে না, তৃণমূল যদিও এখন নির্মূল, কেউ থাকবে না। শক্তিশালী ভূখণ্ড না হলে, বহুত্ববাদ থাকবে না। একটা অংশ যা বলবে, তাই শুনতে হবে। তাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং তাঁর ভাষায় প্রতিশোধ নিতে হবে। এই তিনটে 'প্রতি' যুক্ত শব্দ তিনি আপামর জনসাধারণের উদ্যেশে বললে, বিজেপির নিচুতলার কর্মীদের যে সহ্য করতে হবে! তাদের আবেগকে মান্যতা দিতে হবে! এও কি সম্ভব? এই জন্যই যদি কেউ তাকে পিতামহ ভীষ্ম বা লুইস স্টিভেনসনের ড. জেকিল এবং মি. হাইডের মত এক বিখ্যাত দ্বৈত সত্তা বানিয়ে ফেলেন, খুব খারাপ লাগবে। সর্বপরি, তিনি একজন ভদ্র লোক।

ধর্ম ও রাজনীতি: সোনায় সোহাগা --দেব ঋষি

ব্রজবাসী শ্রীজীব গোস্বামীর দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন সম্রাট আকবর। কে এই দৈন্য বেশ ধারী অতি সাধারণ জীবন যাপনকারী সাধু! তাঁর চোখে বিস্ময়ের শেষ নেই। শ্রদ্ধায় তাঁর হৃদয় বিগলিত হলো। বৃন্দাবনের বৈষ্ণব সমাজ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তাঁদের প্রার্থনা বৈষ্ণবদের মন্দির নির্মাণে বাধা দূর করুন সম্রাট। শ্রীজীব গোস্বামীর প্রজ্ঞা, তিতিক্ষা ও ধর্ম নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে ভূমি দান করলেন দিল্লীশ্বর। আদেশ দিলেন, বৃন্দাবনের যেকোন স্থানে মন্দির নির্মাণ করা যাবে। শুধু তাই নয়, বৃন্দাবনে মৃগয়া নিষিদ্ধ হলো। ঘোষণা করলেন, বৃন্দাবনে পশু হত্যা নিষিদ্ধ।। ( বৈষ্ণবাচার্য শ্রীজীব গোস্বামী: ভারতের সাধক-সাধিকা (দ্বিতীয় খণ্ড), সুবোধ চক্রবর্তী। অন্যদিকে, ঔরঙ্গজেবের ধর্ম ও রাজনীতি যে ধর্ম নীতি তৈরি করেছিলো, তা ইতিহাসে ভৎর্সিত। কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর শাসনকাল (১৬৫৮–১৭০৭ খ্রি.) ছিল অত্যাচারের। অথচ তিনি ছিলেন ধার্মিক। সুন্নি ইসলামি আদর্শকে ভিত্তি করে রাজনীতি পরিচালনা করেন তিনি। তিনি নিজেকে ইসলামের রক্ষক মনে করতেন এবং শরিয়তসম্মত শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। তাঁর শাসনকালে জিজিয়া কর পুনরায় চালু করা হয়, বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস বা রূপান্তর করা হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তাঁর ধর্মনীতি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। রাজপুত, জাট, শিখ ও মারাঠাদের বিদ্রোহ বৃদ্ধি পায়, যা মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। উল্লেখ্য, ঔরঙ্গজেবের সময়ে ভারতের বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস হয়। এই পরিস্থিতিতে বৃন্দাবনের শ্রীশ্রী রাধা-দামোদর মন্দিরের সেবায়েতরা বিগ্রহের সুরক্ষার জন্য তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনেক চিন্তাভাবনার পর বিগ্রহটি নিরাপদে জয়পুরে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে যথাযথ পবিত্রতা বজায় রেখে নিয়মিত পূজা-অর্চনা শুরু হয়। রাজা কোনো বিশেষ ধর্মের অনুসারী হলে, রাজধর্ম ভুলে প্রজাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা তিনি হরণ করতে পারেন। এমন প্রমাণ ইতিহাসে ভুরি ভুরি আছে। গণতান্ত্রিক দেশে ভোট রাজনীতিতে প্রশ্রয় ও প্ররোচনা দুটোই হয়ে থাকে। নিরপেক্ষতা রাখতে ভারতের ডান ও বাম কেউ পারে নি। বামেরা জাতপাতের রাজনীতি করতে গিয়ে হিন্দু ধর্মকে আক্রমণ করেছে। চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ। তারা গীতার এই বাণী বিশ্বাস করতে চায় নি। আজও ২৫ ডিসেম্বর 'মনুস্মৃতি দহন দিবস' পালন হয়। হিন্দু ধর্ম সহনশীলতার ধর্ম, তাই এই আচরণ সহ্য করা হয়। অভিযোগ, বিষ্ণুর পদ যুগল থেকে শুদ্র-র জন্ম হয়, বলা হয়েছে। কেন, এই ধর্ম বৈষম্য? ব্রাহ্মণদের আক্ষেপ হয়, কী অপরাধে শ্রীবিষ্ণুর চরণ যুগল থেকে তাঁদের জন্ম হলো না! শুদ্র কোনো জাতি বাচক শব্দ না। কে বোঝাবে! ক্ষত্রিয় রাজা জনশ্রুতি-পৌত্রায়ণকে ‘শূদ্র’ বলিয়া অভিহিত করা হয়েছে।কারণ বেদান্ত-দর্শনের ব্রহ্মসূত্রে (১।৩।৩৪–৩৫) এবং তার টীকায় শ্রীমৎ শঙ্করাচার্য বলেছেন— এখানে ‘শূদ্র’ জাতিবাচক নহে। ‘শুচা দ্রবতি ইতি শূদ্র’ অর্থাৎ ব্রহ্ম জ্ঞানী শকট রৈক্বের জ্ঞানের মহিমা ও নিজের পুত্রের দীনতা দর্শনে শোকে দ্রবীভূত হন রাজা জনশ্রুতি-পৌত্রায়ণ। দানবীর হিসেবে শ্রেষ্ঠ হলেও বিদ্যা বা জ্ঞানে শকট রৈক্বের থেকে ছিলেন তুচ্ছ। দেবতাদের কাছে এই সত্য জেনে রাজার মন শোকে দ্রবীভূত হয়। তাহার নিকট দ্রুত গমন করেন জ্ঞান লাভের জন্য। সে কারণে ক্ষত্রিয় রাজাকে ‘শূদ্র’ বলা হয়। বহুজন সমাজ পার্টির কাঁসিরামের মতো নেতারা মি.গান্ধীকে রেয়াত করেন নি। তাঁর অপরাধ সমাজের পিছিয়ে থাকা বর্গের মানুষদের "হরিজন" বলতেন। হরিজন অর্থাৎ "ঈশ্বরের সন্তান" বলে নাকি তাদের অপমান করা হয়েছে। ভারসাম্যহীনতার এই রাজনীতি শুধুমাত্র ক্ষমতার হাতবদল করতে পারে। অবস্থার পরিবর্তন করতে অনেক ক্ষেত্রে অপারগ হয়। বিষয় যখন ধর্ম ও রাজনীতি, অপ্রিয় এই কাজটি করতেই হবে, কেউ পড়ুক না পড়ুক, আজ দিন হোক প্রবন্ধ -র। ধর্ম ও রাজনীতি, সোনায় সোহাগা সম্পর্কিত। তবে তা ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধ সোনা কিনা বলা বেশ শক্ত। এই দুইয়ের মিশেলে বিশুদ্ধতা না থাকতে পারে, কিন্তু টেকসই কতটা মানুষ কখনও হৃদয়ে আবার কখনও অস্থিতে অস্থিতে বোঝে। সুফী সাধকরা কিন্তু কাঁচা সোনার কথা বলেছেন। পাকা সোনা তো ভঙ্গুর! --দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা। তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলে ধরা দেয় না...সে যে মানুষ চেনা, সোনার মানুষ চেনা। যা হোক, এসব ভাবের কথায় ভাবনা বেশি। তবে, প্রথমে জানা দরকার ধর্ম কী? তার পরিভাষা কী? শাস্ত্রকাররা কী বলেন। আর আমরা কী জানি? -- মানুষ জন্মে ছিলো ধর্ম হীন হয়ে। তারপর পরিশীলিত জীবনের তাগিদে কার আবির্ভাব বলার অপেক্ষা রাখে না। এ কথা কেন বললুম? মহাভারত এ প্রসঙ্গে বলে, 'ধারণাদ্ ধর্মমিত্যাহুর্, ধর্মো ধারয়তে প্রজাঃ॥" অর্থাৎ যা ধারণ করে, রক্ষা করে এবং সমাজকে স্থিতিশীল রাখে, তাকেই ধর্ম বলা হয়; কারণ ধর্মই প্রজাদের ধারণ ও রক্ষা করে। আবার আরেকটি বহুল প্রচলিত শ্লোক হলো-- ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ॥ বাংলায় যার অর্থ- যে ধর্মকে রক্ষা করে, ধর্মও তাকে রক্ষা করে। এই ভাবনা থেকে অনেকে উজ্জীবিত হয়ে অত্যুৎসাহী হয়ে ওঠেন। তারা পূর্ণ শ্লোকটি খেয়াল করেন না। "ধর্ম এব হতো হন্তি, ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ। তস্মাদ্ ধর্মো ন হন্তব্যো, মা নো ধর্মো হতোহবধীত্॥" বাংলা অর্থ ধর্মকে নষ্ট করলে ধর্মই মানুষকে বিনষ্ট করে; আর যে ধর্মকে রক্ষা করে, ধর্মও তাকে রক্ষা করে। তাই কখনও ধর্মকে ধ্বংস করা উচিত নয়, পাছে ধ্বংসপ্রাপ্ত ধর্মই আমাদের ধ্বংস করে। এখন আমরা কিভাবে ধর্মকে রক্ষা বা ধ্বংস করতে পারি? মনুস্মৃতির ষষ্ঠ অধ্যায়ের ৯২ তম শ্লোক বলে, - ধৃতিঃ ক্ষমা দমোহস্তেয়ং শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ। ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্॥ যার বাংলা অর্থ হলো- ধৈর্য, ক্ষমা, আত্মসংযম, চুরি না করা, শুচিতা, ইন্দ্রিয়সংযম, ধী (বিবেক), বিদ্যা, সত্য এবং ক্রোধহীনতা—এই দশটি হলো ধর্মের লক্ষণ। এই লক্ষণ যদি আমরা রাজনীতির মধ্যে দেখতে পাই, তাহলে রাজনীতি ও ধর্ম নিঃসন্দেহে সোনায় সোহাগা। কিন্তু বাস্তবে ধর্ম কী শুধুই মোহ? শুধু মরে আর মারে? শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৩২ তম শ্লোক বলে, - অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমসাবৃতা। সর্বার্থান্ বিপরীতাংশ্চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।। যার বাংলা তর্জমা হলো-- হে পার্থ! যে বুদ্ধি তমোগুণে আচ্ছন্ন হয়ে অধর্মকে ধর্ম বলে মনে করে এবং সকল বিষয়কেই বিপরীতভাবে উপলব্ধি করে, সেই বুদ্ধিই তামসী বুদ্ধি। এখন একটা গল্প বলি: একদা পুরাকালে অতি শিলাবৃষ্টির কারণে কুরুদেশ বিধ্বস্ত হয়ে গেলো। চক্র পুত্র ঋষি উষস্তি বালিকা বধূ আটিকীকে নিয়ে ইভ্য গ্রামে উপস্থিত হলেন। খাদ্যের সন্ধানে একটি বাড়িতে ভিক্ষা করতে গিয়ে দেখলেন, গৃহস্বামী আধপঁচা মাষকলাই খাচ্ছেন। তার গৃহে আর কোনো খাদ্য দ্রব্য অবশিষ্ট না থাকায় এবং খিদের জ্বালায়, গৃহস্বামীর উচ্ছিষ্ট মাষকলাই খেলেন এবং স্ত্রীর জন্য সামান্য কিছু সঙ্গে নিলেন। তারপর গৃহস্বামী বললেন, বাড়িতে আর পানীয় জল নেই। আপনি কি আমার এঁটো জল খাবেন? -- উত্তরে উষস্তি বললেন, পানীয় জল উচ্ছিষ্ট তিনি খাবেন না। তার উত্তরে গৃহস্বামী বিস্মিত হলেন। তার বিস্ময় দূর করতে, উষস্তি বললেন, খাদ্য গ্রহণ আমার কাছে খুবই প্রয়োজনীয় ছিলো। কিন্তু জল তেষ্টা আমার পাই নি। আর তা পেলে আমি যোগাড় করে নিতে পারবো। ছান্দোগ্য উপনিষদের গল্প আমাদের বলে দেয়, কোনটাকে আমরা উচ্ছিষ্ট মনে করবো। আর এই জন্যই রাজনীতিতে যা উচ্ছিষ্ট তা কখনও সত্য-ই উচ্ছিষ্ট। ঢাকঢোল পিটিয়ে তার প্রচার হয়। আবার কোনো উচ্ছিষ্ট দিব্যি উচ্ছিষ্ট হয়ে যায় না। "চোর ধরো জেল ভরো" প্রচার দেখে তাই গৃহস্বামীর মতো বিস্মিত না হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। মনে হতে পারে, ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্ম যুদ্ধে প্রশ্রয় দিচ্ছি। না, তা মোটেও না। ধর্মের প্রকৃত রূপ দেখুন। খুব ভালো লাগবে। আবার একটি বহুশ্রুত উপনিষদের গল্প বলি, মহাভারতে মহারাজা পাণ্ডু তাঁর পত্নী কুন্তীকে বলেছিলেন। ব্রাহ্মণ সেবার জন্য নিজ পত্নীকে অর্থাৎ তাঁর মাতাকে পুংশ্চলী বা পরপুরুষের অনুবর্তী হতে দেখে একবার খুবই ক্রুদ্ধ হন শ্বেতকেতু। তিনি পিতা উদ্দালকের কাছে প্রতিবাদ করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, এ কী নিয়ম? পুত্রের ক্রোধ দেখে উদ্দালক বলেন, মা তাত কোপং কার্ষীস্ত্বমেষ ধর্মঃ সনাতনঃ।। হে বৎস! তুমি রাগ কোরো না। এটিই চিরন্তন প্রথা এবং প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা সামাজিক নিয়ম। আরও বললেন তিনি : অনাবৃতাঃ কিল পুরা স্ক্রিয় আসন্নবাননে। কামচারবিহারিণ্যঃ স্বতন্ত্রাশ্চারুহাসিনি॥ অর্থাৎ প্রাচীনকালে নারীরা কোনো নির্দিষ্ট পুরুষ বা সামাজিক নিয়মের অধীনে আবদ্ধ ছিলেন না। তাঁরা সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন এবং নিজের ইচ্ছামতো বিচরণ করতে পারতেন। তারপর শ্বেতকেতু কর্তৃক বিবাহ আইনের প্রবর্তন হলো। মহারাজা পাণ্ডু কুন্তীকে বললেন, হে মহাভাগে! এরপর শ্বেতকেতু ক্ষুব্ধ হয়ে মানবসমাজের কল্যাণের জন্য এই নতুন নিয়ম আইন প্রতিষ্ঠা করেন। এর বাইরে চলাকে তিনি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই সামাজিক সংস্কার যে ধর্মে নেই, সেই ধর্ম যথার্থ- ই অনাচার, অধর্ম। এই সমাজকে বাদ দিয়ে রাজনীতির অস্তিত্ব নেই। রাজনৈতিক নেতারা যে সব সিদ্ধান্ত নেন, তার প্রভাব পরে সমাজ জীবনে। রাজা ধর্মস্য কারণম্। যার বাংলা অর্থ হলো- রাজা (শাসক) ধর্ম বা ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রধান মাধ্যম। "রাজনীতি" শব্দটি আধুনিক বাংলা শব্দ। সংস্কৃত শাস্ত্রে এর সমার্থক শব্দগুলো হলো—রাজধর্ম, দণ্ডনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং নীতিশাস্ত্র। আমরা গণতন্ত্রে সবাই নিজেদের রাজা বলে থাকি। কারণ আমরাই রাজা নির্বাচন করে থাকি। আর রাজা কী করেন? সাম, দাম, ভেদশ্চ, দণ্ডশ্চেতি চতুরূপায়াঃ। সাম, দান (বা দাম), ভেদ এবং দণ্ড—এই চারটিই রাষ্ট্রনীতির চারটি উপায় বা কৌশল অবলম্বন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে থাকেন। যার ফল আমরা প্রত্যাশা করে থাকি। মহাভারতের রাজধর্মপর্ব পড়লে দেখা যায়, "সর্বে ত্যাগা রাজধর্মেষু দৃষ্টাঃ। সর্বাঃ দীক্ষাঃ রাজধর্মেষু চোক্তাঃ। সর্বা বিদ্যা রাজধর্মেষু যুক্তাঃ। সর্বে লোকাঃ রাজধর্মে প্রবিষ্টাঃ॥ বাংলায় যার অর্থ হলো-- সমস্ত ত্যাগ, সমস্ত দীক্ষা, সমস্ত বিদ্যা এবং সমগ্র সমাজব্যবস্থা রাজধর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আর এই কারণে, গুজরাট দাঙ্গার ঘটনায় তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী খুবই স্বল্প শব্দ চয়নে, গুজরাটের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রীকে অনেক বড় কথা বলেছিলেন, "রাজধর্ম পালন করো।" আমি কী ধারণ করবো, আমাকে কে বা কী ধারণ করবে? তার সঙ্গে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশভাগের আগে এবং পরে কোনভাবেই ধর্মকে আলাদা করা যায় নি। যে কোনো রাষ্ট্র বিপ্লবে ধর্মকে বাদ দিয়ে বিশুদ্ধ আন্দোলন করতে চেয়েছেন রাষ্ট্রনেতারা। তারা পেরেছেন কী? খুব কম। হিন্দু স্বরাজ গ্রন্থে মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী বলেছেন, ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতির কোনো অর্থ নেই। ধর্ম ও রাজনীতি প্রসঙ্গে তিনি আবার সত্যকে সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে বলেছেন, "The truth will set men free." তাহলে, সত্যই মানুষকে মুক্ত করে; রাষ্ট্রের ভয় বা শক্তি নয়। আর এই সত্যের সন্ধান যদি ধর্ম দেয়, তার ফল ঔরঙ্গজেব দেবে। আর যদি আধ্যাত্মিকতা দেয়, তার ফল আকবর দেবে। এ বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করেছি। আধ্যাত্মিকতা শুধু ধার্মিক হলে আসে না। প্রথাগত ধর্ম আর আধ্যাত্মিকতা বিস্তর ফারাক। এই প্রসঙ্গে সুক্ষ পর্যবেক্ষণ আছে। জানিনা সেটা কতটা তাবড় রাজনীতিবিদদের প্রভাবিত করতে পেরেছে। নেতাজি সুভাষ বোস চিরদিন আমাদের অনন্য পথের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "Our task is to stand on the basis of perfect equality, irrespective of religion, caste or creed." (ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে আমাদের দাঁড়াতে হবে।) কিন্তু তাঁর ধর্ম নিরপেক্ষতার উপর একটা সুমিষ্ট আবরণী ছিল। মাতৃভূমি চেতনা ছিলো সবার উপরে। তিনি বলেছেন,"The common bond that unites all Indians is the love of our mother land." এই জাতীয়তাবাদের একটা মাত্রা ছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই পরিমিত জাতীয়তাবাদের পক্ষে ছিলেন। উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে ছিলেন। জাতীয়তাবাদ তো হিটলারেরও ছিলো। কী ফল দিয়েছিলো? অন্যদিকে, ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অখণ্ড ভারত চেতনা বা জাতীয়তাবাদ চরম জাতীয়তাবাদ অভিমুখী বলে থাকেন অনেকেই। সমালোচনা করেন অনেক রাজনৈতিক দল। যদিও, তারা আদর্শগতভাবে নিজেরাও কোনোদিন ধর্ম নিরপেক্ষ থাকতে চেষ্টা করে নি বা পারে নি। তবুও তাদের বলবো, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে অস্বীকার করতে পারা অসম্ভব। তাঁর জাতীয়তাবাদ অখণ্ডতা, পূর্ণতা। সেটা যদি অন্যকোনো আদর্শ সাংঘর্ষিক হয়, মানুষ তা গ্রহণ করেছে। সেই পথেই তিনি হেঁটেছেন, বন্দি হয়েছেন ও মৃত্যু বরণ করেছেন। তিনি এক জাতির জন্য এক সংবিধান, এক পতাকা এবং এক রাষ্ট্রনেতৃত্বের দাবি জানিয়ে বলেন, "We demand one Constitution, one Flag and one Head for one Nation." ১৯৪১ সালে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ ছাড়া কৃষক প্রজাপার্টির প্রাদেশিক মন্ত্রী সভায় অর্থ মন্ত্রী ছিলেন তিনি। ১৯৪২ সালের ১৬ নভেম্বর মাসে পদত্যাগও করেন তিনি। তারপর থেকেই হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে পৃথক পশ্চিমবঙ্গ দাবির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠলেন তিনি। ইতিহাস সাক্ষ্মী, বঙ্গভঙ্গ ও উদ্বাস্তু সমস্যা শুধুমাত্র সংখ্যালঘু হিসাবে দেখলে অর্ধসত্য হবে। ভারতীয় উপমহাদেশের দুপাড়েই তা ছিল ধর্ম ও রাজনীতি। গান্ধী বাদ ছিলো ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতি। তলস্তয়ের আদর্শ এবং খ্রীষ্টীয় অহিংস নৈতিকতা মি. গান্ধীকে অনেকটাই প্রভাবিত করে। এক্ষেত্রে বহুল প্রচলিত উক্তি হলো- "A man cannot at the same time obey God and obey the State when the State demands what is contrary to God's law." ধর্ম এখানেই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে বলে অনেকে মনে করেন। সব ধর্ম না হলেও, কিছু ধর্ম, যেগুলো প্রিন্সপিলস্ নয়, রুলস। ড.আম্বেদকর সোশ্যাল ডেমোক্রেসির কথা সব সময় বলেছেন। দেশভাগের প্রাক্কালে তাঁর কিছু কথা শোনা যেতে পারে। যেগুলো কালোত্তীর্ণ নাও হতে পারে। তবুও উল্লেখ করা প্রয়োজন। -="Hindu society as such does not exist. It is only a collection of castes." এবং, "Caste is not merely a division of labour. It is also a division of labourers. ইসলাম ধর্ম সম্পর্কেও তিনি সমালোচনায় ভারসাম্য রেখে বলেছেন, "Islam is a close corporation and the distinction that it makes between Muslims and non-Muslims is very real." মাতৃভূমি ও সৌহার্দ্য সম্পর্কিত আরও কিছু বক্তব্য আমি বলা সমীচীন মনে করছিনা, কারণ সেগুলি ছিলো মূলত পাকিস্তান দাবির প্রেক্ষিতে করা মন্তব্য। এখন তার প্রাসঙ্গিকতা নাও থাকতে পারে। এবার আসি বীর সাভারকারের বক্তব্যে। সাভারকর তাঁর Hindutva: Who Is a Hindu? (১৯২৩) গ্রন্থে লিখেছেন, "A Hindu is one who regards this land of Bharatvarsha as both his Fatherland (পিতৃভূমি) and Holyland (পূন্যভূমি)." আর এখানেই মুসলিমের সাথে হিন্দুত্ববাদের বিরোধ। অন্যদিকে, মি. গান্ধীর সঙ্গে ড. আম্বেদকরের বিরোধ একটা ছিল। গান্ধী 'রিলিজিয়াস মরালিটি'র কথা বলতেন। আর আম্বেদকরের কাছে, ধর্ম কোন নিয়ম ছিলো না। শুধু মাত্র নীতি। তিনি 'কনস্টিটিউশনাল মরালিটি'তে বিশ্বাসী ছিলেন। জওহরলাল নেহরু অবশ্য ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নিয়ে একটা ধারণা পোষণ করতেন। তিনি বলেছেন, "We call our State a secular one. The word 'secular' perhaps is not a very happy one... It means freedom of religion and conscience, including freedom for those who may have no religion." জার্মান দার্শনিক কার্লমার্কস ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলেছেন, " ধর্ম হলো নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন বিশ্বের হৃদয়, আত্মাহীন অবস্থার আত্মা। ধর্ম হলো জনগণের আফিম। "জনগণের আফিম" এই অংশ বিশেষ নিয়ে ভারতে বামপন্থীরা চর্চা করতে ভালো বাসেন। তবে ভুললে চলবে না যে, উনিশ শতকে এই আফিম ছিলো ব্যাথা উপশমকারী ওষুধ। সমাজ জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী এবার কিছু অন্য ধর্মশাস্ত্রর দিকে দেখা যাক। সূরা আল-মায়িদা (৫:৮) বাংলা উচ্চারণ: ই'দিলু, হুয়া আকরাবু লিত্-তাকওয়া। বাংলা অর্থ: ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার (ভয় ভীতি, নির্দেশ ইত্যাদি) অধিক নিকটবর্তী। ত্রিপিটকের ধম্মপদ (১৮৩) বলে, সব্বপাপস্স অকরণং, কুসলস্স উপসম্পদা। সচিত্তপরিয়োদপনং, এতং বুদ্ধান সাসনং॥ যার বাংলা অর্থ: সব পাপ থেকে বিরত থাকা, সৎকর্ম সম্পাদন করা এবং নিজের মনকে পবিত্র করো। এটাই বুদ্ধদেবের উপদেশ। একইভাবে জরথ্রুষ্টীয় ধর্মের মূল নৈতিক বার্তা হলো- হুমতা, হুখতা, হ্বর্ষ্তা। যার বাংলা অর্থ হলো- সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম। পরিশেষে বলা যায়, সমস্ত ধর্ম -ই মানব ধর্ম হওয়া উচিৎ। সব ধর্ম মোটের উপর কম বেশি সমাজ মুখী। তবে গোঁড়ামী, ধর্মান্ধতা অন্য প্রসঙ্গ। ধর্মান্ধতা বিচ্ছিন্নতার কথা বলে। স্বামীজী বিশ্ব হিন্দু ধর্ম সম্মেলনে কী বলেছিলেন? - বলেছিলেন, "We believe not only in universal toleration, but we accept all religions as true." এই অমোঘ বাণী না মানতে পারলে, "ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে, অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।" আর ধর্ম ছাড়া রাজনীতি? এই দেশে অসম্ভব! ভারত জমীন কা টুকড়া নহী, জীতা-জাগতা রাষ্ট্রপুরুষ হ্যায়। হিমালয় ইসকা মস্তক হ্যায়, গৌরীশঙ্কর শিখা হ্যায়। কাশ্মীর কিরীট হ্যায়, পাঞ্জাব ঔর বঙ্গাল দো বিশাল কাঁধে হ্যায়। বিন্ধ্যাচল কটি হ্যায়, নর্মদা করধনী হ্যায়। পূর্বী ঔর পশ্চিমী ঘাট দো বিশাল জঙ্ঘায়েঁ হ্যায়। কন্যাকুমারী ইসকে চরণ হ্যায়। সাগর ইসকে পগ পখারতা হ্যায়। ইসকা কঙ্কর-কঙ্কর শঙ্কর হ্যায়, ইসকা বিন্দু-বিন্দু গঙ্গাজল হ্যায়। হম জিয়েঙ্গে তো ইসকে লিয়ে, মরেঙ্গে তো ইসকে লিয়ে। (অটল বিহারী বাজপেয়ী)

মমতার ট্রায়াল, পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া শুরু

মমতার ট্রায়াল, পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া শুরু দেবশ্রী মজুমদার ফ্রানৎস কাফকার বিখ্যাত উপন্যাস দ্য ট্রায়ালের কথা বলছিলাম। ব্যস, দুম্ করে পড়ে গেলেন তো? ধীরে, বন্ধু, ধীরে। ঠিকই শুনেছেন, মমতা অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ট্রায়াল শুরু হয়েছে। তার আগে একটু গৌর চন্দ্রিকা সেরে নিই। দ্য ট্রায়াল-এর যোসেফ কে. চরিত্রের সঙ্গে আমাদের রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কিয়দংশ মিল আছে। শুধু মিলের জায়গা টুকু বলবো। অমিলও আছে বিস্তর। জোসেফ কে. এমন এক ব্যবস্থার শিকার, যেখানে সবাই ভদ্র ব্যবহার করলেও কেউ তাকে সত্যিই সাহায্য করে না। চারপাশের সৌজন্য ও সহানুভূতি শেষ পর্যন্ত তাকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলে। তিনি ক্রমে মনে করতে থাকেন, সবকিছুর আড়ালে কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত রয়েছে। ট্রায়ালের নামে তার প্রহসন হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুন হতে হয়। আমরা অবশ্যই এমন করুন পরিণতি প্রাক্তনীর চাই না, হবেও না। তিনি বিচার পাবেন। তার কৃতকর্মের ফল পাবেন, এটুকুই আশা করতে পারি । তবে ওই যে বললুম, মমতার ট্রায়াল শুরু হয়েছে। হেঁয়ালি ছেড়ে বলি, আদালতে তাঁকে এখনো পুরোদস্তুর টেনে নিয়ে যাওয়া হয় নি ঠিকই। কিন্তু তার দলকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সম্প্রতি আদালতের রায়ের কপি হাতে নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তারা ছাড়া অন্যকোনো দল 'সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস' নাম কোনক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে না। করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন তারা। এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয়গুলো ব্যবহার করতে পারবে না। ইতিমধ্যে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় একাউন্টের ৪২০কোটি টাকা ফ্রিজ করেছে ইডি। সেই টাকা একটি দলের কাছে যতই সামান্য হোক, সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ঋতব্রত তৃণমূল। এটা অবশ্য দুই পক্ষের অস্তিত্বের লড়াই, রাজনীতিতে আবার প্রাসঙ্গিক হওয়ার লড়াই। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু গণতন্ত্রে সংখ্যাধিক্যের জোরে এবং তীক্ষ্ণ কূট চালে অনেক ক্ষেত্রে বাজিমাত করছেন ঋতব্রত তৃণমূলীরা। সংসদীয় গণতন্ত্রে দলত্যাগ বিরোধী আইনের আইনের হাত থেকে বাঁচতে প্রয়োজনের অধিক বিধায়ক তাদের হাতে। কেন্দ্রে সেই একই আইন থেকে বাঁচতে পুরানো ডরম্যান্ট ব্যাঙ্ক একাউন্টকে এ্যাকটিভ করেছেন সাংসদরা। তাঁরা এন সি পি আই দলের সাংসদ। এনডিএ-র সহযোগী দল। গুঞ্জন উঠছে এবার তারা সরাসরি বিজেপিতে যোগদান করবেন। কিন্তু রাজ্যে তাঁদের সতীর্থরা এন সি পি আই য়ে যোগ দিচ্ছেন না। পুরো দাবার বোর্ডে চাল যেটা পড়ছে, তাতে প্রথমে বোরে, ঘোড়া যেগুলো খাওয়া হচ্ছে সবটাই আমরা দেখছি। চালও কে দিচ্ছে জনতা জনার্দন সবটাই বুঝতে পারছে। এখন যোশেফ কে. কতটা বুঝছেন। বিজেপিকে সমর্থনের জন্য বিভিন্ন ইস্যুতে ওয়াক আউট করেছেন। অবশ্যই যা করেছেন নিজেকে বাঁচাতে করেছেন। এবার বাঁচবেন তো? এখন তো তাঁর টিকিটে জেতা সাংসদ বিজেপিকে সরাসরি সমর্থন করবে। কমিশনেও, আবেদন করেছে ঋতব্রত তৃণমূল। কপিল সিব্বল, মনু সিংভি কোথায়? কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বর্ষীয়াণ উকিল হিসাবে বলছেন, রেজিস্ট্রেশনের রিনিউয়ের তারিখ নিয়ে প্রশ্ন আসছে কেন? এই বিজয়ী প্রার্থীদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো সিম্বল দিয়েছিলেন ভোটে দাঁড়াতে? তাহলে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নিলেন কেন? যুক্তি যতই চালাচালি হোক, এই সবই মমতার ট্রায়ালের অঙ্ক ও অঙ্গ। কিন্তু সব থেকে নির্মম পরিহাস হলো, মমতার নিজের হাতের তৈরি দল ও প্রতীক কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা। প্রত্যেক পদ্মমুখী তৃণমূল মুখে বলছেন, মমতা তাদের সুপ্রিমো। জেলায় ফিরে অনুব্রত মণ্ডল বলছেন, সেই একই কথা। ঋতব্রত তৃণমূলে যোগদানের পরও প্রাক্তন মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিনহা বলছেন, তিনি মমতার সঙ্গে আছেন। বীরভূম সাংসদ তার নিজস্ব নির্বাচনী গ্রুপ ডেসক্রিপশনে "তৃণমূল" কথাটি বাদ দিয়েও বলছেন, তিনি দিদিকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন। দিদির সঙ্গে আছেন। আবার এনসিপিআইয়ে আছেন, সেটাও বলছেন। বর্তমানে দ্য ট্রায়াল-এর যোসেফ কে. -র মতোই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক ব্যবস্থার শিকার, যেখানে সবাই ভদ্র ব্যবহার করলেও কেউ তাকে সত্যিই সাহায্য করে না। চারপাশের সৌজন্য ও সহানুভূতি শেষ পর্যন্ত তাকে আরও বিড়ম্বনায় ফেলে দিচ্ছে। তিনি বুঝতে পারছেন, সবকিছুর আড়ালে কোনো অদৃশ্য চক্রান্ত রয়েছে। এই ট্রায়াল ট্র্যাপে তিনি আপাতত বন্দি। বাংলায় একটা কথা আছে, আঁধার কিল। সেটাই হচ্ছে। ক্রমশঃ পিঠ চাপড়ে গর্ত খোঁড়া চলতে থাকবে, একদম গোঁড়া পর্যন্ত ।। পর্ব গুলো দেখুন, আর উপভোগ করুন।। দেবশ্রী মজুমদার একজন সাংবাদিক

AI মাতৃস্নেহ

একজনকে মা যেমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, স্নেহ ও যত্ন দিয়ে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের পাশে থাকেন, ঠিক তেমনি আধুনিক প্রযুক্তির শক্তিকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর স্বপ্ন নিয়েই শুরু হয়েছে AI মা মিশন। এটি শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নয়; এটি মানুষের পাশে মানুষের হয়ে দাঁড়ানোর এক মানবিক আন্দোলন। আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যই শক্তি। কিন্তু সেই তথ্য যদি সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায়, সঠিক সময়ে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে না পৌঁছায়, তবে প্রযুক্তির প্রকৃত সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। AI মা সেই ব্যবধান দূর করার এক নতুন উদ্যোগ, যেখানে প্রশিক্ষিত নারীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর সহায়তায় প্রতিটি পরিবারকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সরকারি পরিষেবা এবং ডিজিটাল সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করবেন। AI মা প্রতিটি পরিবারের একজন বিশ্বস্ত ডিজিটাল সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, টিকাকরণ, প্রবীণদের যত্ন, স্বাস্থ্যসচেতনতা, সরকারি প্রকল্পের তথ্য, ডিজিটাল শিক্ষা এবং জরুরি সহায়তা—সবকিছুই এক ছাতার নিচে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই এই উদ্যোগ। এই মিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী ক্ষমতায়ন। হাজার হাজার নারীকে AI ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করে তাঁদের কর্মসংস্থান, আর্থিক স্বনির্ভরতা এবং সমাজে নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। একজন AI মা শুধু নিজের পরিবার নয়, একটি সম্পূর্ণ গ্রাম, একটি পাড়া কিংবা একটি সমাজের পরিবর্তনের অগ্রদূত হয়ে উঠতে পারেন। AI মা বিশ্বাস করে—প্রযুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ করা। তাই এই উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিক মূল্যবোধ, সেবা, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। প্রযুক্তি এখানে মানুষের বিকল্প নয়; বরং মানুষের হাতকে আরও শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম। আমাদের লক্ষ্য একটি এমন ভারত গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি পরিবার ডিজিটালভাবে সংযুক্ত, প্রতিটি মানুষ স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগে সমৃদ্ধ, প্রতিটি নারী আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর, এবং প্রতিটি শিশু নিরাপদ ও সুস্থ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যায়। AI মা কেবল একটি প্রকল্প নয়—এটি একটি স্বপ্ন, একটি সামাজিক আন্দোলন এবং একটি নতুন যুগের সূচনা। প্রযুক্তির হাত ধরে মানবিকতার এই যাত্রায় আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে যুক্ত হই। কারণ আগামী দিনের উন্নত, সুস্থ ও ডিজিটাল সমাজ গড়ে উঠবে তখনই, যখন প্রতিটি পরিবারের পাশে থাকবে একজন AI মা। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায়ের জন্মদিনে এর আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হবে।"

বিষন্ন দুপুরে-- দেবশ্রী মজুমদার

বিষন্ন দুপুর
২৭.০৭.২০.
দেবশ্রী মজুমদার
কোন এক প্রাণ ভরপুর সকালে ফুটন্ত গোলাপ
থমকে দাঁড়িয়েছিল বিষন্ন
দুপুরে। পড়ন্ত বিকেলে সে ম্লান হয়ে যাওয়ার
সম্ভাবনাকে
ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর করেছিল
তীব্র সে এক আকুল বর্ষণে।
আনা, গন্ডা, কড়া, ক্রান্তি ও তিল হিসেবে তিল
ধারণ ছিল না ভালো বাসার!
এ কথা অকপটে যায় না বলা
তবু বলি, দীর্ঘ রাত্রি যাপনের পরও!
ভালো তো লেগেছিল !
তবুও কোথাও ছিল অবহেলা!
শুধু মনে ছিল বাসনা, কোন ভোরে বিগত নিশি
যাপনের শেষ চাল ধোয়া চন্দ্রিমা টুকু
কারো জীবন ঘোলাটে দেখাবে। কারো জীবন
ধবধবে সাদা, জানলার সার্সি বেয়ে আনবে
সুঘ্রাণ!
হে মহা প্রাণ! বলো ! কোন সূতিকাগার হতে পারে
অবিমৃশ্য! বধির! প্রস্তর কঠিন! যা বিস্মৃত করে
জঠর গোপন কোন সুকঠিন গ্রন্থিল স্নেহ হীন
অন্ধকারে!
ভেবেছি অনেক বার, চরম সত্য আসুক একান্ত
আপন!
সে নির্জন কপোত কুলায়ে, সে যতই কাতর
হোক, নিরব অভিমানে--- নেই ভ্রাতা বান্ধব,
জননী কুন্তী, কিম্বা সহোদরা
আসুক সে পরম সত্য দাদুরি সঘনে, আপনার
জনে--- আর কেউ নয়--- আপনার আপনারে,
আপন কুলায়ে।
সেই কী আসিবে তবে কোন এক অজানা প্রান্তে
নিশব্দে
কোন এক স্বৈরাচারীর মত?
যতটুকু পারে নিঃশেষ করে
প্রাণ ভালোবাসা?
পলিমার আবরণে দাহ্য বিশ্বাস, প্রেম, স্নেহ
ভালবাসা... এ পৃথিবীর যত আছে নিঃশ্বাস বায়ু,
দমবন্ধ করে, চুপিসারে?
যে গেল... যারা এলো
ছিল না মাঝে কোন যোগাযোগ!
হায়! এ তবে কেমন যাওয়া?
নেই কোন আয়োজন! হোল না, গোলাপ দেওয়া
নেওয়া!
শুধু দূর থেকে চাপা রক্তের মতো, বিবেকের
পেঁচানো কান্না...
এ তো চায় না কেউ, কোন অভাজন!
কেউ তো বলার ছিল না...
উষ্ণ স্নেহ চুম্বনে... আসিস আবার কোলে?
এসো এসো হে প্রিয়তম আবার, সে হোক না
কোন বিষন্ন দুপুরে...
অগণিত গুনন প্রহরে।

     

বোধ--- দেবশ্রী মজুমদার

বোধ
দেবশ্রী মজুমদার
জীবন বোধ আমাদের মতো সাধারণ মানুষের
কদাচিৎ হয়। পিঠ পুড়ে গেলে, পাশ ফিরে
শোওয়াটাই আমাদের কাছে মহা পরিত্রাণ।
বুদ্ধিমত্তার কাজও বটে।--- নিম্ন মেধার
পরিচায়ক? সে বলুন না! তাতে কান দিই ই না।
তাই জীবন বিমুখতা এক অর্থে স্বার্থসন্ধি আর
শুধুই মুগ্ধতা!
আজ কাছ থেকে যে মানুষটিকে দেখলাম। তাঁকে
দেখে যে বোধ কাজ করে। সেটা বলতে গেলে,
জীবনানন্দের 'বোধ' কবিতার কয়েকটি লাইন
বার বার মনে পড়ে। ---- " আলো-অন্ধকারে যাই
—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে। এই সামজিক দূরত্ব
বোধ তাঁকে বদ্ধ করতে পারে নি।
সাংবাদিকতায় কাজের ক্ষেত্রে তিনি যে
আপোষহীন তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। তাঁর
বাড়িতে বোমা ছুঁড়েছে মাফিয়ারা। তবুও তিনি
অদম্য। এর বাইরেও, তাঁর আরেকটি দিক
আছে।
এ যেন চাটুজ্জের প্রতিভাষণ, আরেক চাটুজ্জের
কাছে---
"নিরুপায় দুঃখময় জীবনে যারা কোনদিন
ভেবেই পেলে না সমস্ত থেকেও কেন তাদের
কিছুতেই অধিকার নেই,—এদের কাছেও কি ঋণ
আমার কম?"
ঠিক ধরেছেন! আমি বীরভূমের এ বি পি
আনন্দের গোপাল চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলছি।
গোটা জেলা জুড়ে তিনি ও কয়েকজন মিলে
করোনা আবহে আহার্যের সামগ্রী চাল, ডাল,
আটা, তেল নতুন থলে পরিপূর্ণ করে মধ্যবিত্তের
বাড়ি বাড়ি সাধ্যমত পৌঁছে দিচ্ছেন।
সোমবার তিনি রামপুরহাট ও বড়শাল গ্রামের
মধ্যবিত্ত পরিবারের হাতে হাত রাখলেন।
সামাজিক দূরত্বের দিনে এই নৈকট্য কয়জন বা
দেখাতে পারে?
তাঁর সাথে থেকে দেখতে পেলাম, বুঝতে পারলাম
মধ্যবিত্ত মানুষের আনন্দ সে কেমনতর!
অনেকেই বললেন, আপনি আমাদের বাড়ি বয়ে
এলেন? আপনাকে তো টিভিতে দেখেছি। কেউ
তো আমাদের কথা ভাবে! কেউ বললেন, সব
থেকে খারাপ লাগে, অনেকে যখন মুখের ছবি
তোলেন। আপনারা সেটা করেন নি। আমাদের
আত্মসম্মানবোধের মর্যাদা দিয়েছেন। আবার
কেউ বললেন, আপনাদের ভাবনাটা খুব ভালো।
আপনারা মধ্যবিত্তের জন্য ভেবেছেন। আমরা
মধ্যবিত্তরা এই লক ডাউনের সময়ে খুব
অসহায়। ঘরে অনেক কিছুই নেই দুটো খাবারের
জন্য। আবার মুখ ফুটে চাইতেও কেমন যেন
কুণ্ঠাবোধ হয়। জিহ্বা আরষ্ট হয়ে ওঠে। তবু
ভালো আপনি ভাবলেন। ভগবান মঙ্গল করুন।
গোপালদা জোড় হাত করে তাঁদের থামিয়ে
দিলেন। তবুও মুখের কথা থামলেও মধ্যবিত্তের
হৃদয়ের কথা তো থামতে চায় না... অনর্গল
নিজের মত করে অর্থ করে বলতে চায়...
"সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে।
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো; তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর; কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর?" (জীবনানন্দ দাশ)।

     

অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য! -- দেবশ্রী মজুমদার

অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য!
--- দেবশ্রী মজুমদার
এ এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য!
অরুণোদয় ঠিক তেমনই ছিল বনস্পতি শিখরে!
বন্যেরা আজ বড় নিরাপদ
পাখালির কাকলিতে মুখর চারিপাশ
তবুও মৌনতা সারাক্ষণ
সাড়া দেয় হৃদ স্পন্দনে!
এবার কার পালা? কথাগুলো জনান্তিকে ছুঁড়ে
দেওয়া!
কেউ কোথাও নেই! সব শুনশান!
দর্শক দৃশ্যমান নয়, বসার আসন ফাঁকা।
তবুও নজর মঞ্চের দিকে সবার!
করতালি নেই... নেই শ্বাস প্রশ্বাসের ঘাত!
তবুও যেন সব আছে... আছে অরুণোয়...
তবুও অন্ধকার জুজুৎসুর প্যাঁচে আস্টেপৃষ্টে
বেঁধে রেখেছে সবটুকু আলোকে!
এমনটা হওয়ার কথা ছিল না...
তুমি তো সর্বোত্তম, চাঁদে জমাও পাড়ি
সভ্যতার ডাইনোসর, ম্যামথ আরও কত তথ্য
তোমার নখদর্পণে...
এমনটা হওয়ার কথা ছিল না...
যেদিন ডাক এসেছিল, স্পর্ধা ছিল না এড়োবার!
যে ঘাটে ফেরি আসে নি, ভেড়ে নি খেয়া!
এমন নিশ্চিন্ত ঘুম, সেখানে আমি একা, নিঃসঙ্গ,
অনপেক্ষ সন্তরণে ছুটে মরি, হবো পারাপার
এ পারাবার। প্রেম, অপ্রেম, স্নেহপাশ
সব নির্মোহ হবে কোন ছলে!
চলে যাওয়া---
বয়ে যাওয়া---
হাওয়ার মুখে।

     

Gadget

​"নাটক" সাড়ে সব্বনাশ- দেবশ্রী মজুমদার

                             ​"নাটক"                         ​     সাড়ে সব্বনাশ ​                      একাঙ্ক নাটক : কিশলয় নাটক :...

Popular