"নেতাজি বনাম শ্যামা প্রসাদ" -রাস্তার নাম পরিবর্তনের গিমিক রামপুরহাটে দেবশ্রী মজুমদার

বেশি দিনের ঘটনা না। ৬ জুলাই রামপুরহাটের একটি পুরাতন রাস্তার নাম ছিলো নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। সুভাষ নামাঙ্কিত রাস্তাটি বদলে শাসকদল ড. শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় রাখলেন। এই নাম পরিবর্তন একটি সরকারি পদ্ধতির মধ্যে হয়ে থাকে। সময় সাপেক্ষ। কিন্তু যে ঘোষণায় কমলা উত্তরীয় পরিহিত পুরপিতা সৌমেন ভকত এবং বিধায়ক ধ্রুব সাহা উপস্থিত থাকেন। তার একটা গুরুত্ব থাকে। আর সেখানেই বিতর্ক। রামপুরহাট পাঁচমাথা মোড় থেকে ঝনঝনিয়া মোড় পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার নতুন নাম ঘোষণা করা হয় শাসক দলের পক্ষে। এই রাস্তার নতুন নামকরণ করা হয় ‘ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী রোড’। ইতিমধ্যেই রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ছ’টি নামফলক ও কাট-আউট বসানো হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই রাস্তার সঙ্গে ১৪ নম্বর জাতীয় সড়কের সরাসরি সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান বিধায়ক ধ্রুব সাহা। তিনি বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে যেমন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকে সম্মান জানানো হয়েছে, তেমনি শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থারও আরও উন্নয়ন হবে। নাম বদলের এই রাজনীতির ঘা, নেতাজিকে ছুঁতে পারবে না, তিনি তো হৃদয়ে, আমরা সবাই জানি। ১৯৩৯ সালের ১৯ আগস্ট মহাজাতি সদনের উদ্বোধনী আনুষ্ঠানে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে দেশ নায়ক অভিধায় ভূষিত করেন। এটাও স্পষ্ট করে বলি, ভারত কেশরী ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান কোন অংশে ছোট করে দেখার নয়। তাঁর অবদান কারো থেকে কোনো অংশে কম নয়। দেখুন, তালাত মাহমুদের কাঁপা গলায় গান, আমার ভালো না লাগতেই পারে। তার পরিবর্তে লতা মঙ্গেশকরের গান বহু গুণে ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু এটা জানা দরকার, লতাজীর অন্যতম প্রিয় গায়ক ছিলেন তালাত মাহমুদ। তিনি তাঁর গান শুনতে ভালো বাসতেন। মতাদর্শের পার্থক্য থাকা সত্বেও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় নেতাজিকে কতটা শ্রদ্ধা করতেন, তাঁর লেখা ডায়েরির পাতা থেকে উদ্ধৃতি দিলে পরিষ্কার হবে। তিনি বলেছেন, "আমরা—বিশেষ করে আমি—সুভাষের বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ পোষণ করতাম না। বরং তাঁর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও স্নেহ ছিল। আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতাম যে, ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, বিশেষত বাংলায়, তাঁর সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না।" এখন প্রশ্ন, এই নাম পরিবর্তন আসলেই কি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে সম্মান প্রদর্শন করা হলো? নাম বদল, রঙ বদল, ভোল বদল, পালা বদলের পরেও কতটা প্রাসঙ্গিক, রাজনীতিকরা কি এব্যাপারে কোনোদিন ভাববেন না? না, মানুষের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেন না? প্রশ্ন থাকলো। হিন্দু সভা নিয়ে যেমন নেতাজির ব্যক্তিগত মতামত ছিলো। তিনি হিন্দু সভার রাজনৈতিক মতাদর্শের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ও ফরওয়ার্ড ব্লকের মুসলিম লীগের সঙ্গে জোট সঙ্গী হওয়ার বিরোধী ছিলেন। নেতাজির রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু চিত্ত রঞ্জন দাসের স্বরাজ্য দল ১৯২৩ সালে যে বেঙ্গল প্যাক্ট এনেছিল। ইন্টারনেটে সার্ফ করলে বোঝা যাবে তখন কার দিনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি কী ছিলো। এই গোটা বেঙ্গল প্যাক্টকে মৌলনা আবুল কালাম আজাদ ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, তাঁর ইণ্ডিয়া উইনস ফ্রিডম গ্রন্থে। তিনি বলেছেন, বেঙ্গল প্যাক্ট অনুসারিত হলে, দেশের বিভাজন থেমে যেতো। তিনিও মৌলবাদের শিকার হন। ট্রেন থেকে তাঁকে নামিয়ে মুখে কালিঝুলি মাখিয়ে দেন চরমপন্থীরা। দূর্ভাগ্যের বিষয়, তাঁরা ছিলেন নিজের সম্প্রদায়ের মানুষ। নেতাজিও ছিলেন চরমতম অসাম্প্রদায়িক মানুষ। আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাবাহিনীর খাবার পরিবেশনে ঝটকা মাংস ও জবাই মাংস মিশিয়ে দিয়ে বলতেন, হিন্দু মুসলিম উভয়ের জাত মেরে দিলাম (সুভাষ ঘরে ফেরে নাই)। সেই নেতাজির নামাঙ্কিত রাস্তা পরিবর্তন হলে সবাই ব্যাথা পাবেন, এটাই স্বাভাবিক। প্রতিবাদ না হওয়াটা অস্বাভাবিক। এসইউসিআই দলের বীরভূম জেলা সম্পাদক মদন ঘটক এক বিবৃতিতে এই পদক্ষেপকে ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিবৃতিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে বিকৃত করার উদ্দেশ্যেই জাতীয় নেতাদের গুরুত্ব খর্ব করার চেষ্টা চলছে। নেতাজির নামে দীর্ঘদিনের একটি রাস্তার নাম পরিবর্তন সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেরই অংশ বলে দাবি করেছে তাদের দল। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু নেতাজির স্মৃতির প্রতি অসম্মান নয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ইতিহাসের প্রতিও আঘাত। এসইউসিআই অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে 'নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু রোড' নাম পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। এ বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত উদ্ধৃতি থেকে জেনে নিই, বিজেপি কী ভাবছে, কতটা ভাবছে? বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলা সভাপতি উদয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিষয়টি ঠিক জানা নেই। তাই না জেনে মন্তব্য করবো না।

Comments

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার