জাতীয় শিক্ষা নীতি ও কান কাটা রাজার দেশ: দেব ঋষি

কানার দেশে ফলি পড়া রাজা।‌ এই প্রবাদ শুধু এক চোখো রাজার কথা বলে না। মনে পড়িয়ে দেয় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "কানকাটা রাজার দেশ" এর কাহিনী। কাক যখন রাজার কান নিয়েই পালিয়েছে, এবং যখন প্রজাদের যথাক্রমে এক কান, দুকান কাটা তখন- ব্লা ব্লা কানের সামাজিক মর্যাদা কিস্যু নেই।। এই ভেবে কিছু আকাট বিরোধী মুখ্খু ছাড়া কেউ মুখ খুলবে না এটা স্বাভাবিক। এই জাতীয় শিক্ষা নীতি নিয়ে আগের পর্বে যা বলেছি তা শোকেসের স্টক রেজিস্ট্রার দেখে বলেছি। এর বাইরে কত কী আছে জানা নেই। সব থেকে বেশি আলোচিত বিষয় হলো জাতীয় শিক্ষা নীতি 2020 -র নিম্ন লিখিত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টস:- 7.4 & 7.5: Consolidation of schools = বিদ্যালয়গুলির একত্রীকরণ। Group schools = বিদ্যালয়গুলিকে গুচ্ছবদ্ধ করা। Rationalize schools = বিদ্যালয়গুলিকে যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা। Shared or otherwise = যৌথভাবে ব্যবহৃত হতে পারে বা অন্য ব্যবস্থায় থাকতে পারে। Devolving decisions = সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা। Integrated semi-autonomous unit = সমন্বিত আংশিক-স্বায়ত্তশাসিত একক। এর সরল অর্থ সোজা ভাষায় বলতে গেলে শিক্ষার বেসরকারিকরণ করা। ( তাতে সরকারি বিনিয়োগ থাকবে। সরকারি কোম্পানির মাধ্যমে। ) যে সমস্ত বিদ্যালয় রুগ্ন বলে মনে হবে। অর্থাৎ ছাত্র শিক্ষক অনুপাত ৩০:১ নেই। সেক্ষেত্রে "ইদার অর" যুক্তিতে বিদ্যালয়গুলির একত্রীকরণ শুধু সময়ের অপেক্ষা। বিদ্যালয়গুলিকে গুচ্ছবদ্ধ করে একটি ইউনিট করা হবে। সরকারি আইনের জালে আপনি কী বলবেন? আপনি তো এক ইউনিটের মধ্যেই থাকবেন। যেমন প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি এক একটি চক্রের অধীন। সেই নিরিখে বিদ্যালয়গুলির যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করা হবে। সেগুলো যৌথভাবে ব্যবহৃত হতে পারে বা অন্য ব্যবস্থায় থাকতে পারে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্পণ করা হবে বেসরকারি সংস্থার হাতে। এটা প্রথমেই হবে এমনটা নয়। আবার শুধুমাত্র সংস্থার হাতেই থাকবে তা নয়। কারন পুরো বিষয়টি হবে "সমন্বিত আংশিক-স্বায়ত্তশাসিত একক"। এতক্ষণ আমি হাতির ভিতরের দাঁত দেখালাম। যা খুব কার্যকরী। এবার বাইরের দাঁত দেখাবো। সেটা কেমন? ১) আমাদের সনাতনী ভারতীয় সংস্কৃতির শিকড়ে যেতে হবে। ২) জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলতে হবে। ৩) মুঘলদের ভালোর পাশাপাশি, খারাপ দিকও তুলে ধরতে হবে। অবহেলিত হিন্দু সহ অন্যান্য অমুসলিম ইতিহাসকে ইতিহাসে স্থান দিতে হবে। আবার ফিরে আসি অবন ঠাকুরের কথায়। বড়লোকদের এক কাটা ছিল, মেয়েদের আধখানা, আর গরিব-দুঃখী ও পশুপাখিদের দুই কানই কাটা ছিলো, কানকাটা রাজার দেশে। সমাজজুড়ে সবাই এখন তাদের এই কান কাটা রূপ লুকাতে কেউ লম্বা চুল রাখতে শুরু করেছে, কেউ বড় পাগড়ি বা টুপি পরছে।রাজার আসল রহস্য, রাজ্যে কেবলমাত্র তারই দুটো আস্ত কান ছিল, তা নয়, কাক, রাজার এক কান চুরি করেছে। আর এক চোখে দেখা কানা রাজা কানে শুনছে। তাই কিছু বিভাগের বিদ্যালয় তিনি তুলবেনই। চালু করবেন নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা। সেটা এজেন্সীর মাধ্যমেই। যা আগের সরকার করেছিলো, সেটাই হবে। শুধু পদ্ধতি আলাদা। প্রথম কোপ স্টেট এইডেড ভোকেশনাল সেন্টারের উপর। শাসকদল পরিচালিত সংগঠন চেষ্টা করবে তাদের মতো। কিন্তু বসের বিরুদ্ধে যাওয়া তাদের কম্ম নয়। এখন প্রশ্ন : NEP 2020 শিক্ষাকে মহার্ঘ্য না মহার্ঘ করবে? বানানে শুধুমাত্র য-ফলার তফাৎ। বিরোধীদের অভিযোগ, শিক্ষায় বেসরকারি বিনিয়োগ ডেকে নিয়ে এসে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় বেসরকারিকরণ করতে চাইছে। বেসরকারি এজেন্সী ও কোম্পানিকে অনুরোধ করা হবে অভাবী ছাত্র ছাত্রীদের বিষয়টা দেখতে। তারা ব্যবসা করতে আসবে। দান খয়রাতি করতে আসবে না। সরকার নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলো এবিষয়টা দেখতে পারে। সেক্ষেত্রেও শিক্ষা নামক বস্তুটি মহার্ঘ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। দ্বিতীয়টি আরও মারাত্মক। আগেই বলেছি, যে সমস্ত স্কুলে শিক্ষক ছাত্র অনুপাত ঠিক নেই। সেই সমস্ত স্কুলকে একত্রীকরণ করতে হবে। এখানেই স্ববিরোধিতা আসছে। যেখানে নতুন স্কুল স্থাপনের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পুরানো স্কুল তুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। শিক্ষকরা দূরবর্তী এলাকায় শিক্ষকতা করতে যেতে পারেন। ছাত্র ছাত্রীরা স্থানীয় স্কুলে যেতে চায় না, দূরবর্তী স্কুলে কি যাবে? মনে হয় না। 2030 সাল স্থির করা হয়েছে ড্রপ আউট কমিয়ে পেশাভিত্তিক শিক্ষা পাঁচ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আমেরিকা বা জার্মানির মতো উন্নয়ন করবে। প্রসঙ্গত আমেরিকায় ৫১ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৭৫ শতাংশ। এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভারতে বর্তমান ৫ শতাংশ পেশা ভিত্তিক শিক্ষা আরও নেমে যাবে। আর তাই গোঁড়া থেকে বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রবর্তন। কিন্তু নিচু ক্লাস থেকে বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্ভব? তারপরে যখন খুশি ছেড়ে আবার শিক্ষা বর্ষে যোগ দেওয়া সম্ভব? মনে হয় না। NEP 2020 - র আরেক অসঙ্গতি: বয়স অনুযায়ী পূর্বের দ্বি স্তরীয় শিক্ষা ব্যবস্থার থেকে চার স্তরীয় শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো। কারণ CCE বা শিশুকল্যাণ দিয়ে অঙ্গনওয়ারীতে তিন বৎসর থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে পুষ্টি দেখা সহ সব কিছু পরিকাঠামো নিম্ন মানের। NEP 2020 তে শিকড়ের খোঁজ ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়েছে: শিকড়ের খোঁজ অবশ্যই দরকার। বিভিন্ন ভাষা, ধ্রুপদী শিক্ষা, খেলাধুলা, অঙ্কন সব জরুরি। তবে বিজ্ঞান সর্বাগ্রে। পুষ্পক রথ একটি সুন্দর কল্পনা। কিন্তু ওই রথের আকাশে ওড়া অবৈজ্ঞানিক, বলতে হবে। রাইট ব্রাদার্সদের কৃতিত্ব বড়ো করতে হবে। শিক্ষায় যেন ভুল না থাকে। ইতিহাস নিশ্চয়ই সব কিছু তুলে ধরবে: ইতিহাস অবশ্যই অবহেলিত কথা তুলে ধরবে। তবে কোনো কিছু বাদ দিয়ে নয়। জওহরলাল নেহেরুর যতই সমালোচনা থাক, তাঁর পাণ্ডিত্য প্রশ্নাতীত। একবার ছাত্রাবস্থায় নেহেরু তাঁর শিক্ষককে বলেন, ইংরেজরা অত্যাচারী। আমাদের পরাধীন করে রেখেছে। তাদের ইতিহাস পড়বো কেন? শিক্ষক বলেন, তুমি না পড়লে তাদের কোন যায় আসবে না। তুমি পিছিয়ে থাকবে। এটা মনে রাখা দরকার।

No comments:

Post a Comment

Gadget

শিব দেব ঋষি

  মস্তিষ্ক শিখরে স্থির  আছে অজেয় ধীর  সহস্র পাপড়ি যার  অটল শিব। কৈলাস মস্তিস্কে নীড়  নিষ্কম্প সুগভীর নিরাকার নির্বিকার  পশুপতি জীব।  পুত ...

Popular