অটলজীঃ এক সঙ্গে অনেক প্রকাশ ঃ দেবশ্রী মজুমদার

অটলজীঃ এক সঙ্গে অনেক প্রকাশ ঃ দেবশ্রী মজুমদার
সাচ্চায় ইয়ে হ্যয় কি / কেবল উঁচাই কি কাফি নেহি হোতি
সবসে আলগ থালগ/ পরিবেশ সে পৃথক
আপনো সে কদা বৈঁঠা/ শুন্য মে একেলা খাড়া হোনা
পহাড় কি মহনতা নেহি/ মজবুরি হ্যায়
উঁচায় ওর গহরায় মে / আকাশ পাতাল কি দূরি হ্যয়
জো জিতনা উঁচা/ উতনা একাকী হোতা হ্যায়
চড়হায় পর/ মুস্কানে চিপকা
মন হি মন রোতা হ্যায়।
এ কোন কবির লেখা বলার দরকার নেই। এই পঙক্তির মধ্যেই একাধারে নিজের জীবন অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন স্পষ্ট। হ্যা ঠিকই বুঝেছেন। বাজপেয়ীজীর কথা বলছি। বাজপেয়ীজী ছিলেন,  যেন এক সঙ্গে অনেক প্রকাশ! একইভাবে অত্যন্ত নিঃসঙ্গ ছিলেন উঁচু পাহাড়ের মত। মন হি মন রোতা থা। হয়ত!!! ২৪টি দল নিয়ে জোটবন্ধন সরকার চালিয়েছেন। ইরাক আক্রমণের সময় বাম নেতা হরকিষেন সিং সুরজিতের সাথে আলোচনা করেছেন। তাঁদের মতামত নিয়ে আমেরিকার আবেদনে সাড়া না দিয়ে ইরাক আক্রমণে ভারতীয় সৈন্য পাঠান নি। শুধু বলেছিলেন সংসদের বাইরে আপনারা বিক্ষোভ করুন। একইভাবে, গুজরাত দাঙ্গা নিয়ে তদানীন্তন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীকে রাজধর্ম পালন করতে বলেছিলেন। সেটাও কম নয়। তাঁর মত ব্যক্তির এরকম একটা কথা ‘দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে’ কাঠগোড়ায় দাঁড় করাতে পারে। তবুও তিনি তা পরোয়া করেন নি। গুজরাত যান নি। ‘ চাহাতা থা লেকিন’ এর মধ্যে আঁটকে গিয়েছিলেন। সাংবাদিক ও পায়োনিয়ারের সম্পাদক বিনোদ মেহেতা তাঁকে দোষে গুনে ভরা রক্ত মাংসের মানুষ বলেছেন।  তাঁর কাছে অটলজীর একিলিসিস হিলস গুলো ছিল পি এম ও অফিসের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন তাঁরাই। যার জেরে তিনি বাধ্য হয়ে অটলজীকে চিঠি লিখে মনে করিয়ে দেনঃ ইমার্জেন্সির সময় তাঁর প্রতি অন্যায়ের কথা। উত্তর পান নি। আউটলুক অফিসের এডিটর উপর অন্যায় ব্যবহার হয়। অফিস রেড হয়। শুধু মাত্র তহেলকা টেপে বংগালুরু লক্ষণের একটি মাত্র কথার সূত্রে খবরের জেরে!
অন্যদিকে দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনের অবসানের পর যখন সাউথ ব্লকের অফিসে ঢুকে তিনি দেখলেন তোষামোদিরা নেহেরুর প্রোট্রেট সরিয়ে দিয়েছেন। তখন তিনি বললেনঃ আই ওয়ান্ট ইট ব্যাক।  এমন মানুষ ছিলেন তিনি। সাংবাদিক কিংশুক নাগ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেনঃ অটলজীর মধ্যে নেহেরু ও মোদীর কিছু গুণ দেখতে পাওয়া গেছে। যদিও তিনি আলাদাই। হয়ত নেহেরুর মত বাগ্মীতা তিনি দেখেছেন। যার জন্য নেহেরু তরুণ অটলজী সম্পর্কে একদিন ভবিষ্যতবানী করে বলেছিলেন, ওয়ান ডে দিস ইয়ং ম্যান উড বিকাম দ্য প্রাইম মিনিস্টার অফ ইন্ডিয়া। আর হয়ত সিদ্ধান্তের দৃঢতা দেখে মোদীর সাথে কোথাও মিল খুঁজে পেয়েছেন ওই সাংবাদিক। রিচার্ড নিক্সনের চাইনা ডিপ্লোম্যাসির মত পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফের দিকে হাত বাড়িয়েছেন তিনি। পারভেজ মুশারফের পিছনে ছুঁরি তাঁকে কোনদিন শান্তি প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত করতে পারে নি। ১৯৯৮ সালে পোখরানে পরমানু বোমা পরীক্ষণ ঘটেছে। আন্ত র্জাতিক স্তরে তাঁর প্রভাব সামলেছেন।  যদি তাঁর রাজনৈতিক জীবন দেখা যায়, তিনি  একজন আর এস এসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘে তাঁর যোগদান। পাঞ্চজন্য সাপ্তাহিক, মাসিক রাষ্ট্রধর্ম, বীর অর্জুন এবং স্বদেশের সম্পাদনা করেন। ১৯৫২ সালে রাজস্থানে শ্যামাপ্রসাদের সাথে যাওয়ার পর সেখানে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৫৩ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাথে কাশ্মীরে আমরণ অনশন করেন বহিরাগতদের জন্য পারমিট প্রথার বিরুদ্ধে। শ্যামাপ্রসাদ ওখানেই মারা যান। ১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের বলরামপুর থেকে নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ১৩ দিনের প্রধান মন্ত্রী। তারপর ১৯৯৮-৯৯- ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী। এন ডি এ তে টিডিপির চন্দ্রবাবু নাইডুর মত ২৪টি ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলকে এক জায়গায় এনে ভারতীয় গনতন্ত্রের কত মজবুত ভিত্তি, তা দেখিয়েছেন। কিন্তু কিসের বলে, কেউ বলেছিল? বিজেপি অচ্ছুৎ নয়?  তাঁকে দেখেই। কেউ মন্ত্রীত্ব নিলেন? ঘর করলেন? তিনি তো আর আর এস এসের সৈনিক।  অটলজীর অন্তিম যাত্রায় চাঁদ সূর্য এক হওয়ার মত অলৌকিক ঘটনা ঘটল। সব ধর্ম মিলে মিশে গেল।  মোদীজী হাঁটছিলেন। তিনি কী ভাবছিলেন ? তাঁর মনে কি রসায়ন চলছিল, কারো বোঝার উপায় নেই। তিনি কি ভাবছিলেন অটলজী কি করে জীবিত ও মৃত অবস্থায় বিপরীত মেরুকে একজায়গায় আনতে সক্ষম হলেন? মানুষ কি চাই? এটাই কি অটলজী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন না?
অটলজী দেশের প্রতি তাঁর অবদানের জন্য ২০১৫ তে ভারত রত্ন এবং তার আগে ১৯৯২ সালে পদ্ম বিভূষণ পেয়েছেন।  আর এস এসের লোক হয়েও হিন্দুত্ব নয়, ভারতীয়ত্বকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তাই তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল।  তার জমানায় ওল্ড  অ্যাঙ্কাল সাম কেম দেয়ার ট্যু চেঞ্জ- শুনতে হয় নি কাউকে। কাজ করে দেখিয়েছেন। গঙ্গাকে পুজোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, নদীর সাথে নদীর যোগ, সড়ক যোগাযোগের কথা ভেবেছিলেন। অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ – এ গুড ম্যান ইন ব্যাড সাইড। আরও মারাত্মক  অভিযোগ, ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনের সময় তিনি ও তাঁর দাদা প্রেম বাজপেয়ী  ২৩ দিন জেল খাটার পর, কোন দিন ব্রিটিশ বিরোধী কাজ না করার মুচলেকা দিয়ে মুক্তি নেন। তখন বাজপেয়ীর বয়স ১৮। যে বামপহ্নী নেতা  দেশদ্রীহিতার এই অভিযোগ করেন, তাঁর পুত্র কুমারলিংগম বিজেপিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রিত্ব নেন। তাঁর বোনও বিজেপিতে যোগ দেন। পাশাপাশি , এটাও অভিযোগ ওঠে,  সেই মুচলেকা উর্দুতে লেখা এবং  অটলজী উর্দু জানতেন না। কোনটা সত্যি ভবিষ্যত বলবে। আরেকটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। সত‍্যেন্দ্র দুবে কানপুর আই আই টির স্নাতক। ২০০২ সালে গ্র‍্যান্ড ট্রান্ক রোড প্রজেক্ট ডিরেক্টর ও দায়িত্বশীল ম‍্যানেজার। ঔরংগাবাদ -বারাছাট্টি সেকশন এন এইচ-২। কাজে ঢুকেই তিনি পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি ধরে ফেললেন। কন্ট্রাক্টরকে বাধ‍্য করালেন তিন ইন্জিনিয়ারকে সাসপেন্ড করাতে। ৬ কিমি রাস্তা নতুন করে নির্মাণ করতে বাধ্য করালেন। ফল মিলল হাতে নাতে। গয়া ট্রান্সফার করে দেওয়া হল তাঁকে। সেখানে ও রোড মাফিয়া। একই দুর্নীতি। সহ‍্য হল না। সরিসৃপ হতে পারলেন না। মানুষ তো ! আমরা না-মানুষের দল শুনবো কেন? স্বাক্ষরহীন চিঠির সাথে নিজের বায়োডাটা জুড়ে দেন। যাতে করে উড়ো চিঠি মনে না হয়। পাশাপাশি অনুরোধ করলেন, নাম গোপন রাখার জন্য। চিঠি বায়োডাটা সমেত বিভাগীয় দপ্তরে পাঠানো হল। কিছু গোপন থাকল না। মাফিয়ারা হুমকি দিতে থাকলেন। ভিজিলেন্স আধিকারিকরা তাঁকে ধমকাতে থাকলেন। বাধ‍্য হয়ে এন এইচ এম আই অধিকর্তার জ্ঞাতার্থে চিঠি লিখে সব জানালেন। কাকস‍্য পরিবেদনা। অবশেষে ২৭ নভেম্বর ২০০৩ সাল বারানসির এক বিয়ে বাড়ি থেকে ফিরছেন। ড্রাইভারকে বলা সত্ত্বেও গয়া স্টেশনে রাত্রি ৩টা নাগাদ এলেন না। রিক্সা করে ফিরছিলেন। গুলিবিদ্ধ দেহ পাওয়া গেল পরের দিন। গনতন্ত্রের দেশ সবার বিচার প্রাপ্য। ৩১ বছরের যুবক দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদীকে  ইংরেজিতে হুইসেল ব্লোয়ার বলে। তিনি বিচার পেলেন সিবিআই আদালতে। গয়ার কাটারি গ্রামের মন্টু কুমার,উদয় কুমার, পিংক রবিদাস ডাকাতি করার উদ্দেশ্যে তাঁকে নাকি খুন করেছিল। দুবের ভাই সিবিআই আদালতের রায় শুনে একটু ই বলেছিলেন, যাদের ধরা হয়েছে বা যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে তারা নির্দোষ। তাহলে দোষী কে? তাঁর সততার দাম দিতে অপারগতা কি চারিত্রিক হ‍্যামারসিয়া নয়? যা কাউকে ইতিহাসে ট্র‍্যাজিক হিরো বানাই! মনে পড়ে যায় এক উক্তি: Things without all remedy should be without regard: what's done is done. জানা নেই কোন অদৃশ্য পরামর্শের হাত ছিল এমন ঘটনা ঘটার পিছনে।
  সমালোচনা তাঁর মৃত্যুতে থামবে না। কারন তিনি মহারথী ছিলেন। কবি ছিলেন। আরেক কবি ইকবালের সায়রিতেই এর জবাব দেওয়া যায়ঃ “ কোন অধিকারে ফেরেশতারা ইকবালের অতীতের ভুলগুলোর হিসেব লিখবে? ভুলগুলোর মাঝে আমি তো আজন্ম বন্দী হয়েই আছি”।   
বিশিষ্ট সাংবাদিক কিংশুক নাগ বাজপেয়ীজী কে নিয়ে লেখা “অটল বিহারী বাজপেয়ীঃ আ ম্যান অফ অল সিজনজ”- বইয়ের  পরতে পরতে তুলে ধরেছেন  তাঁর  চরিত্রের আরেকটি দিক। নাজুক মন।  টাইম মেশিনে ধরা পড়েছে-- ‘ সেই সময় পাখীরাও ভালোবাসার কথা বলত না। ভঙ্গিতে প্রকাশ করত। চোখে প্রকাশ করত সেই ভাষা। কোন মুঠোফোন ছিল না।  বিশিষ্ট সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারের কথায়—সে সময় মেয়েদের সঙ্গে ছেলেরা  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করবে ভালো চোখে দেখা হত না। এক সুন্দর প্রেমের কাহিনী যা মর্যাদার সাথে চির গোপন ছিল। কিন্তু মৃত্যুর পাড় ভাঙা স্রোত বোধ হয় একুল দুকুল এক করে দিল। রাজকুমারী কউল যদি ক’বছর আগেই ক্যান্সারে মারা না যেতেন। হয়ত এই অমর প্রেম অতি পাষাণ হৃদয়ের চোখও ছাপিয়ে যেত! ১৯৪০ সালের কথা। ভিক্টোরিয়া কলেজ। বর্তমানে লক্ষ্মীবাই কলেজ। বন্ধুত্ব কখন প্রেমে পরিণত হয় বুঝতে পারেন নি দুজনেই। কিন্তু সাহস করে প্রেমপত্র লিখেছিলেন বাজপেয়ীজী। রাজকুমারী রাজী থাকলেও তাঁর পরিবারের আপত্তিতে প্রেম বিয়ে পর্যন্ত গড়ায় নি।  দুঃখ পেয়েছিলেন অটল। আর বিয়ে করেন নি। তবে পরবর্তীতে কেউ প্রশ্ন করলে, স্মিত হাসিতে একটাই জবাব ছিল তাঁর সময় করে উঠতে পারে নি।  সেজন্যই কি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ ছিল তাঁর প্রিয় উপন্যাস?  প্রিন্সেসের বিয়ে হয় রামজাস কলেজের ফিলসফি বিভাগের প্রধান এবং হোস্টেল ওয়ার্ডেন ব্রিজ নারায়ন কউলের সাথে। সাংবাদিক  গিরীশ নিকাম একবার এক সাক্ষাতকারে জানান, তখন অটলজী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। বাড়িতে ফোন করলে রেকর্ড থাকত। সেই রেকর্ডে একবার শোনা গেল, “ আমি মিসেস কউল , রাজ কুমারী কউল বলছিঃ আমরা চল্লিশ বৎসরের বেশী সময় ধরে একে অপরের বন্ধু!’  বি এন কাউলের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন অটলজী। দিল্লীতে লচেন বাংলোতে তাঁরা থাকতেন অটলজীর সাথে।  প্রিন্সেসের মেয়ে নমিতাকে দত্তক নেন অটলজী।  তারপর মেয়ে নমিতা ভট্টাচার্য এবং জামাতা রঞ্জন ভট্টাচার্য তাঁর সাথেই থাকতেন। শেষদিন পর্যন্ত তাঁরাই দেখাশোনা করতেন। যে সম্পর্কের নাম ছিল না কোন দিন।  তবু কেন জানি না মনে পড়ে  সপ্তপদীর মিস ব্রাউনকে। যাকে একদিন এমনিই ভালোবেসেছিলেন কৃষ্ণেন্দু। ঘটনার প্রেক্ষাপ্ট আলাদা। তবুও পরিচয় দিয়েছিলেন এক খ্রিস্টান চিকিৎসক বোমের আঘাতে আহত নার্সকে ‘স্ত্রী বলেই। -- কেন এমন বললে? প্রশ্ন ছিল ব্রাউনের। এমন নাটকীয় মোড় রিয়েল আর রিলকে অনেক সময় এক বন্ধনীতে রাখে না। সেকারনেই, ‘মন হি মন রোতা হ্যায়’।  তাই এই সম্পর্ক এত মিষ্টি! প্রশ্নাতীত!

Comments

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার