অনুগল্প :  অনুভব : দেবশ্রী মজুমদার

অনুগল্প :  অনুভব : দেবশ্রী মজুমদার
আপনি কী জানেন? --বেশি নিম ভাজা খেলে কী হয়? কিডনি ভালো রাখতে নিম পাতা ভাজা বেশি খাবেন না। জল পরিমিত খান, কমও না বেশিও না। বরং ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি নিয়ম মাফিক করুন । ধ‍্যেৎ! নিয়মের কোন ঠিক নেই। আজ যা ঠিক, কাল তা ভুল। কর্তার না পসন্দ ওই নিম! হাতে মোবাইল নিয়ে 'ফেবু ' স্ট‍্যাটাস থেকে মুখস্থ করার মত জোরে পড়তে লাগলেন অনুপম বাবু! উদ্দেশ্য, কথা গুলো গিন্নির কানে পৌঁছানো! যেমন ভাবনা, তেমনি কাজ। শাস্ত্রের কথা মিছে হবার নয়। ঝাঁঝালো সুরে গিন্নি সরযু বলল, ওই রকমভাবে পড়া মুখস্থ করলে, আজকে অফিসে বড়বাবু হতে! ওরকম কলম পিষতে হত না। -- এক্কেবারে আঁতে ঘা! তবুও বউয়ের সাত অপমান গায়ে মাখতে নেই। স্রেফ মাফ! কাব‍্যি করে অনুপম বললে, কিসে আর কিসে! নিম পাতার সাথে, বড়বাবু আসে?
গোপাল ভাঁড় নাকি রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে বলেছিলেন, প্রথমে তেঁতো মুখ করা যাক! পোড়া মুখে সব ভালো লাগবে!
কিন্তু তা হলো কৈ! সরযু দেবী মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, আর তখনই ফাটলো গার্হস্থ্য বোমা! একই বাড়িতে থাকে দুই তরফ। ছোট তরফ পুষেছে কুকুর। নাম লালু। হঠাৎ সেই লালু ঝাঁপিয়ে পড়লো তার উপর। আর যাই কোথা! বেচারা অনুপম পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে লালুকে চেনে বেঁধে দিল। আর তাতে পরিস্থিতি আরও বিগড়ে গেল।
সামাল সামাল বলে নাওয়ের মাঝি চিৎকার করলো ঠিকই, কিন্তু নাও ডুবলো। এখন দুই তরফের মুখ দর্শন বন্ধ!!
যাকে নিয়ে এত কাণ্ড। সেই লালুর খাতির বেড়েছে আগের থেকে দ্বিগুণ। কারণ এই লালুই ময়দানে নেমে ছোট তরফের হয়ে একাই প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করেছে। ছোট তরফের সারমেয় প্রীতির আতিশয্যে সরযুর দন্তপাটি যুগল ক্রমশ গ্রাইণ্ডিং মেশিন হয়ে উঠেছে! আর তাতে মাঝে মধ্যে নিষ্পেষিত অসহায় দুইজন। সে অনুপম ও তার মা!
কিন্তু, হঠাৎ করে লালু এই সংসারে আসে নি। লক্ষ্য ছিল রাস্তার কুকুরদের আশ্রয় দেওয়া। সেই ইচ্ছেতে হ‍্যাঁ মিলিয়ে তাঁর এই স্থান। যাহোক, তাদের অনেকেই গাড়ি চাপা পড়ে যাওয়ায়, ছোট তরফ লালুকে এক প্রকার দত্তক নেয়। প্রথম দিকে সারমেয় প্রীতি ছিল লক্ষ‍্য। এখন সংসারে প্রতিপক্ষকে জব্দ করার মোক্ষম হাতিয়ার। কারণ, লালুর বদ অভ্যাস অর্থাৎ পা চাটা, গা চাটা, গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়া, লোম ঝাড়া, খাবার কাপ ডিস ও থালা চাটা , সর্বোপরি যেখানে সেখানে পটি করা সরযু,একদম পছন্দ করতো না। এই নিয়ে দুই তরফে কথা কথান্তর কম হয় নি। সরযু ভাবে আবেগ অনুভূতি বড়ই যুক্তি হীন। আর এই জন্য হৃদয় থেকে মস্তিষ্ক বড়। সে হৃদয় বেত্তাকে যুক্তির নিত্তিতে মেপে নেয়। তাই আমূল পরিবর্তিত হয় অনুভূতি। একটু বলে নেওয়া ভালো। লালুর আগে ধলু গাড়ি চাপা পড়ে মারা যায়। তখন আফশোস হয়েছিল অনুপমের। আজ আর দুঃখ হয় না।
সংসারে বড় অসুখ। রোগহারক অনুপান সেবন করতে করতে কোনটা তিক্ত কোনটা মিষ্ট এই ফারাক করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে সে। সে বুঝতে পারছে, অভিজ্ঞতা দিয়ে, জীবন দিয়ে--অনুভূতির হাজার প্রকাশ! কেউ বলে হাজারো ফিকির! চোখ ধাঁধানো আলো যেমন গোটা চোখ জুড়ে আঁধার আনে, তেমনি নিস্পন্দ অন্ধকার আলোর পদধ্বনি শোনে। মন নিঃশীম ছায়া স্নাত হয়েও ভেসে যায় আলোর বন্যায়!
ধুলুর কথা হচ্ছিল, আপনাদের সঙ্গে। আঘাত সবাই পেয়েছিল। ছোট বড় সব তরফ। ভারাক্রান্ত মন বলেছিল--এক প্রকার ভালোই তো হল। আপদ তো গেছে! আদরে কখনো ধলু কখনো বা ভোলা। ভালবাসা প্রকাশের ভাষার সে অনেক ভঙ্গি। তার ঝক্কি পোহায় গুটি কয়েক জন। অকুতস্থল  তারাপীঠ গামী এক গ্রামের মসৃন রাস্তা। কোন ভিড় নেই। অবরোধ নেই। মিছিল নেই। কুকুর কুকুরের মত মরেছে। সাঁ সাঁ করে ধাবমান গাড়ির ধাক্কা। মসৃণ রাস্তায় রক্তের প্রলেপ। প্রখর রৌদ্রে যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিলিয়ে যাবে। কুকুরের রক্ত  মানুষের মত চাপ চাপ রক্ত, জমাট রক্ত নয়। যে রক্তে বোধ হয় পশুদের মানবের মত উদাসিনতা জমতে চাই না। জমাট বেঁধে স্বার্থপরতা তঞ্চিত হতে পারে না। তাই রক্তে এত পার্থক্য! মানুষকে কুকুর বললে , রাগ হয়। কিন্তু লজ্জা পাওয়া উচিত অন‍্য কারনে। এসব বিবেক দংশিত আজগুবি  প্রশ্নের বুদবুদি কাটছিল কার মনের অতলান্তে? তবে অবাক জ্বরে আক্রান্ত মন জানে সব কিছু ক্ষণস্থায়ী। আজ যা মনে হয় সঠিক। সময়ের নির্দেশ তন্ত্রে তার মিথ‍্যে হতে সময় লাগে না। সেখানে আমাদের গভীর গভীরতর অসুখ।যেন বেওয়ারিশ লাশের মত শুয়ে আছে লাশ কাটা ঘরে। অনুপম কি জানি, নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করেছিল কোন কারণে। কিন্তু প্রত‍্যক্ষভাবে সে তো দায়ী ছিল না! তবুও ভাবনা আসছে-- যদি, ভুলুকে এতটা দূর ছাই না করতাম! এই তো গত কাল বাড়ি ফিরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গ্রীলটা টেনে দিলাম। ভুলু পিছন পিছন এসেছিল। যা যা বলে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। আজ আর নেই। কত ভালোবাসা! ছোট তরফই যত্ন করত। কিন্তু ভুলু জানত, অনুপম প্রভুর বাড়ির সদস্য।  এই দায় বদ্ধতা কজন মানুষের আছে? এসব সাত সতেরো ভাবতে ভাবতে  যখন বড় তরফ,জানতে পারল, ভুলু আর নেই। ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। ভুলু রাস্তার কুকুর। যাকে গলা জড়িয়ে , বাড়ির ছোট্টরা কথা বলত আপন মনে, সাজাতো। শাসন করে গোটা দুপুরটা  কাটত তাদের। খবরদারি কম ছিল না কারো ভুলুর উপর। বাড়ির ক্ষুদ্র সদস্য অনুপমকে জানাল, জানো, ভুলুকে আর দেখতে পাবো না। সে আকাশের তারা হয়ে গেছে! কথাটা তার শব্দ ভান্ডারে স্থান পেয়েছে নিজের ঠাকুরদা মারা যাওয়ার পর। কিন্তু, আজ লালু বিড়ম্বনা। মরলে দুঃখ আসবে। হৃদয়ের কাজ হৃদয় করবে। যাকে বলে হৃদয়বেত্তা। মস্তিষ্ক তার মহৎগুণে জন্ম দেবে অন‍্যকোন নতুন অনুভবের!
অনুপম ঘটনার চকিতে কেমন যেন হয়ে ফের সম্বিৎ ফিরে পেয়েছিল সেদিন। যার সঙ্গে আজ আর তাকে মেলানো যাবে না কোনভাবেই। চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে- সদ‍্য তাকে মাটি চাপা দেওয়া হল বাড়ির উঠোনে। তীব্র অভিমানে একটি  কথায় তার মুখ দিয়ে বেরোল :: ভালো ই হল। কম ঝামেলা পোহাতে হয় নি। আর না। দুঃখ বড় তরফের হয় নি, তা নয়। কিন্তু, সে একটু লেখা টেকা করে। একটা গল্প লিখে নিজের মন হালকা করে নেবে। নৈতিক অবনমনের গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ উপায়। লোকে বলে, ফিরিঙ্গিদের কনফেসান আর কি! এসব কি নেহাতই মেকি। মনে পড়ে গেল তার ইলিয়টের বিখ্যাত লাইন-- Put on a face to meet the faces that you meet--সে সব যাগগে। অনেকক্ষণ থেকেই ছোট, বড় বলছি। আবার নাম ও বলছি। নামে কি আসে যায়? নাম তো প্রতীক। ধরুন, ছোট তরফ বলতে বেশ কিছু নামের ভিড়। আর বড় তরফ বলতে সেই একই। গল্পের চরিত্র এরা হয়ত কেউ নয়। কিন্তু আজ এদের কষ্ট বেশি। অনেকের চোখে জল। ভবিষ্যতে হয়তো তা অলীক বাষ্প।
হাড় কাঁপানো শীতে রাস্তার এক নেড়ি কুকুর বেশ  কয়েকটি বাচ্চা জন্ম দিয়েছে। এটাই ছিল আদ‍্যোপান্ত গল্প। গল্পের খোল নলচে এক থাকল। কিন্তু দিনের ছায়া- আলো খেলার মত, মানুষের আবেগ অনুভূতি গুলোই পাল্টে পাল্টে যেতে লাগলো। অনুভূতি গেল যেন-- দিনের আলো ফোটার সাথে সাথে গাছের ঘন সবুজ অবয়ব। নিষ্পাপ শিশুর মায়া মাখানো মুখের মত! আবার প্রখর আলোয়, তা উদ্দাম গীতি। আর দিনের শেষে আলো নেভার প্রাক মুহূর্তে মনের আত‍্যান্তরে হারিয়ে যাওয়া সুখ!! অনুভব ! তুমি অনন‍্য অনুভূতি! শুধু তোমার জন্য যা একসময়ের আবেগ, তা অন‍্যসময়ে বিড়ম্বনা মাত্র। একমাত্র তুমিই মানুষকে বানিয়েছ বিচিত্র জীব!!

Comments

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার