মণ্ডপের পিছনে চিকেন বার্গার ভোজীরা বাগেশ্বর বাবাজির কাছে পাখণ্ডী- দেব ঋষি

 মণ্ডপের পিছনে চিকেন বার্গার ভোজীরা বাগেশ্বর বাবাজির কাছে পাখণ্ডী



 মুখ্যসচিব থেকে মুখ্যমন্ত্রী যাঁর কাছে ভক্তিতে গদগদ হয়ে দণ্ডায়মান, তিনি অনেক কিছু ফরমান জারি করার অধিকারী হন। এটা বলার জন্য সংবিধানের জ্ঞান অত্যন্ত নগন্য বিষয়। এর আগেও ২০২৪ সালে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বর ধামের প্রধান পণ্ডিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী NCERT-এর তৃতীয় শ্রেণির পরিবেশবিদ্যার (EVS) পুরনো বই 'আস-পাস' (Aas-Pass)-এর 'চিঠি আই হ্যায়' পাঠটি নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান। এই বিতর্কটির মূল বিষয় ছিল যে পাঠ্য বিষয়টিতে 'রীনা' নামের একটি হিন্দু মেয়ে তার বন্ধু 'আহমদ'-কে চিঠি লিখছে। ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী অভিযোগ করেন যে, এটি একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এবং এর মাধ্যমে ছোট শিশুদের মনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে এই পাঠটি বই থেকে বাদ দেওয়ার বা সংশোধন করার দাবি ওঠে। NCERT পরে জানায় যে, নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা (NCF 2023) অনুযায়ী ইতিমধ্যেই পুরনো পরিবেশবিদ্যার বইটি পরিবর্তন করা হয়েছে। এভাবেই তিনি বিভিন্ন সময়ে হিন্দু ধর্মের রক্ষা করে আসছেন, বলে মনে করেন। 

বাগেশ্বর বাবাজিকে এই কারণে কেউ কেউ বাগাড়ম্বরেশ্বর বললেও দোষের হবে কি? বলছেনও তাই। ব্রাহ্মণ্যবাদ বলতে যেটা সবাই বোঝে। এই বাংলায় তার শিকড় ভারতের অন্য প্রান্তে যতটা গভীরে যেতে পেরেছে তা এই বাংলায় পারে নি। কারণ বাঙালি। বিদ্যাসাগর থেকে রামমোহন রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কেশব চন্দ্র সেন, মহর্ষি দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর আর কত নাম বলবো। সারদা মা বলেছেন, আমার ছেলেপুলেরা আমিষ চেটেপুটে খাবে। নিরামিষ খাবে না। আমি বলছি। স্বয়ং রামকৃষ্ণ দেব বলেছেন, হবিষ্যি করেও, আমিষাশী নরেণের উচ্চতায় পৌঁছুনো অসম্ভব। এরকম উদাহরণের শেষ নেই। 

বাগেশ্বর বাবাজি বাংলার বাঙালির চব্য চোষ্য লেহ্য পেয় খাদ্যাভাষের উপর কড়া ফতোয়া না দিয়ে ধর্মীয় অজ্ঞতা বা ভণ্ডামির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারতেন। কালিকা পুরাণ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে পারতেন, ওরে, মুঢ, বাঙালি সন্তান, মা মদ্যপায়ী নন। সাধনমার্গে একজন সিদ্ধ সাধক মদের উপর ভর করেন নি। নিজের মার মুখে মদ তুলে দিতে পারবি?-- “সোমধারা ক্ষরে যাতু ব্রহ্মরন্ধ্রাদ্ বরাননে। পীত্বানন্দময়ীং তাং যঃ স মদ্যসাধকঃ।” অর্থাৎ ব্রহ্ম তালুতে সুধারস ক্ষরিত হলে, তাহাই মদ্য। স্থুল মদ বা সুরা নয়। মাংস, মায়ের সামনে বলির মাংস না। 

“মা শব্দে রসনা শ্রেয়ো তদংশং রসনাপ্রিয়ে। সদা যো ভক্ষয়েদ্বি স এব মাংসসাধকঃ।” মৎস বা মাছ মায়ের জন্য পুকুর থেকে ধরে বা কিনে আনতে হবে না। “গঙ্গা যমুনয়োর্মধ্যে মৎস্যৌ চরতঃ সদা।

তৌ মৎস্যৌ ভক্ষয়েদ্ যস্তু স ভবেত্ মৎস্যসাধকঃ।” প্রাণায়ামের ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুন্মা জাগ্রত করে কুম্ভকে সেই মাছের সাঁতার হবে। মৈথুন হবে ষটচক্র ভেদ করে আজ্ঞাচক্রে সহস্রার শিব ও শক্তির মিলনে। না, এসব কথা না বলে, উনি কখনও শিশু লাভ জেহাদ, আবার কখনও আমিষ জেহাদে পড়ে রইলেন। বাঙালির মস্তিস্ক এতো স্থুল নয়। এই রাজ্যে বিজেপি তাঁর বক্তৃতায় আসে নি। তৃণমূল সরকারের অন্যায় অনাচারের বিরুদ্ধে এসেছে। জনতা আম ও দুধের মাখো মাখো মিলন দেখছে। এসব দৃশ্যপট ঘোরাতেই কি বাজে বকবকানি? বাংলায়, বিভিন্ন খাদ্যাভাস আছে। পোশাক থেকে বিভিন্ন রুচির পোশাক ও উৎসব পালনের রেওয়াজ আছে। সেখানে হাত দিলে, বিজেপির কপালে নির্ঘাৎ শনি আছে। মনে আছে? ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে বাগেশ্বর ধামের প্রধান ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীর একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান (বাংলার লিলুয়ায় হনুমান কথার মতো শ্রীরাম কথা) চলছিল। সেই সময় 'অখিল ভারতীয় অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি'-র প্রধান শ্যাম মানব তাঁকে তাঁর তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতা বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রমাণ করার জন্য ৩০ লক্ষ টাকার একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। অনুষ্ঠানটি ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী ১১ জানুয়ারি নাগপুর ত্যাগ করেন। এর জেরে শ্যাম মানব এবং সমালোচকরা দাবি করেন যে, বাগেশ্বর বাবা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে ভয় পেয়ে দুই দিন আগেই নাগপুর থেকে পালিয়ে গেছেন। এই অভিযোগ নিয়ে চাপান উতোর নিশ্চয়ই আছে। তবে এটাও সত্যি মহারাষ্ট্রের সরকারি পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইতে হয়েছিলো, মানুষের বিক্ষোভের কারণে। বাংলায় কংগ্রেসের পক্ষে অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তবে পেটরোগা (প্রতিবাদ হলে, অন্ধ ভক্তরা পেট রোগা বলে মনের ঝাল মেটাতে পারেন) বাঙালির মধ্যে ইতিমধ্যে পেটে ভুটভাট শুরু হয়েছে। বাবাজির কথা বাঙালির হজম হয় নি। আর সেজন্যই কৌরবকুলের পিতামহ ভীষ্মের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বলতে হচ্ছে - "বাঙালি নবমীতে কচি পাঁঠার ঝোলও খাবে, আবার অষ্টমীতে মায়ের ভোগের লুচি-তরকারি, খিচুড়ি, পায়েসও খাবে। বাঙালি কী খাবে, কীভাবে পুজো করবে, সেটা কোনো রাজনৈতিক দল ঠিক করে দেবে না। তাই কিছু হেরে যাওয়া রাজনৈতিক দলের অপপ্রচারে কান দেবেন না। বাঙালি তার নিজের দুর্গাপুজো, নিজের ঘরের মেয়ে উমাকে যেভাবে বছরের পর বছর আপন করে, আনন্দ করে, ভালোবেসে উদযাপন করে এসেছে, এবারও ঠিক সেভাবেই করবে। দুর্গাপুজো দুর্গাপুজোর মতোই হবে।।"

No comments:

Post a Comment

Gadget

​"নাটক" সাড়ে সব্বনাশ- দেবশ্রী মজুমদার

                             ​"নাটক"                         ​     সাড়ে সব্বনাশ ​                      একাঙ্ক নাটক : কিশলয় নাটক :...

Popular