ব্রহ্মাণ্ডে কে আমিষ, কে নিরামিষ? দেবশ্রী মজুমদার

          ব্রহ্মাণ্ডে কে আমিষ, কে নিরামিষ?



একাদশীর উপবাসের পর চড়চড়িয়ে খিদে বাড়ে। অবশ্য কিছুটা রসিকতার সুরে স্বামী বিবেকানন্দ এব্যাপারে বলেছিলেন, তাঁর ক্ষুধা এত বেড়েছিল যে "কষ্ট করে থালা-বাটিগুলো খাওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছি।"

স্বামী বিবেকানন্দ-র মহাপ্রয়াণের দিন ১৯০২ সালের ৪ জুলাই দুপুরের আহার সম্পর্কে প্রচলিত স্মৃতিচারণে বলা হয়েছে যে তিনি সেদিন সকলের সঙ্গে বসে খেয়েছিলেন— ভাত, প্রিয় ইলিশ মাছের ঝোল, ভাজা, অম্বল ইত্যাদি। একবার রামকৃষ্ণদেবের কাছে নরেনের মাছ মাংস প্রীতি নিয়ে কিছু ভক্ত অনুযোগ করেন। তার উত্তরে তিনি বলেন, তোরা হবিষ্যি করলেও নরেনের উচ্চতায় পৌঁছুতে পারবি না। 

মা সারদাও বলেছেন, আমার সন্তানেরা কেউ নিরামিষ খাবে না, সবাই আমিষ খাবে। 

এই আমিষ - নিরামিষ প্রসঙ্গর অবতারণা, সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বর ধামের প্রধান পুরোহিত ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী বা বাগেশ্বর বাবার একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে। 

হাওড়ার লিলুয়ায় আয়োজিত একটি ধর্মীয় সভায় তিনি মন্তব্য করেন যে, দুর্গাপূজার সময় প্যান্ডেলের পেছনে বা প্রতিমার পাশে আমিষ খাবার রান্না ও বিক্রি করা অনুচিত। এমনকি নবরাত্রির দিনগুলোতে যারা মাছ-মাংস খায়, তাদের তিনি ‘পাখণ্ডী’ বলেন। তিনি বলতেই পারেন। ব্রহ্মান্ড তো একটি অণ্ড বা ডিম। সেই ব্রহ্মাণ্ড কি নিরামিষ? 

মনুস্মৃতি-র (১.৯) বলেছে- তৎ অণ্ডম অভবদ্ ধৈমং সহস্রাংশুসমপ্রভম্। তস্মিন যজ্ঞে স্বয়ং ব্রহ্মা সর্বলোকপিতামহ:।। অর্থাৎ আদি সৃষ্টির এই অণ্ড যা ব্রহ্মাণ্ড বা হিরণ্যগর্ভ তা ছিল সুবর্ণময়, সহস্র সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল। তার মধ্যেই ব্রহ্মার আবির্ভাব। তিনি সমগ্র জগতের পিতামহ বা সৃষ্টিকর্তা। তিনি আমিষ না নিরামিষ? ছাত্রবয়সে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ইংলণ্ডে বই পড়ে জেনেছিলেন, ডিম নিরামিষ। খেয়েও ছিলেন। তারপর পিতাশ্রীর কাছে তাঁর অপরাধ স্বীকার করে মার্জনাও চেয়েছিলেন। 

 প্রাক নির্বাচন প্রচারে যতই য়াব্বড় মাছ হাতে বিজেপি প্রার্থীরা প্রচার করেন, এখন বাগেশ্বর বাবা বলছেন, আমিষ ভোজীরা পাষণ্ড। তন্ত্রমতে, তারাপীঠে মায়ের ভোগে বিভিন্ন প্রকারের মৎস ও পাঁঠার মাংস দেওয়া হয়। দক্ষিনেশ্বরেও মায়ের ভোগে বিভিন্ন প্রকারের মৎস পদ থাকে। যদিও তন্ত্রমতের সাথে মানুষের খাদ্যাভাষের কোনো সম্পর্ক নেই। বাগেশ্বর বাবা তন্ত্রের পঞ্চ "ম" নিয়ে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিতেই পারতেন। কিন্তু, "না"। তিনি বলতে পারতেন, পঞ্চ ম-কার কী? ​'মদ্যং মাংসং তথা মৎস্যং মুদ্রা মৈথুনমেব চ শক্তিপূজাভিধানে পঞ্চতত্ত্বং প্রকীৰ্তিতম্।।'

​—মহানির্বাণ তন্ত্র, ৫ম উল্লাস।

​অর্থাৎ শক্তিপূজা-প্রকরণে মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন—এই পঞ্চতত্ত্ব সাধনস্বরূপে কীর্তিত হইয়া থাকে।

​মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুন এই পাঁচটি ‘ম’। পঞ্চ ম-কার বাইরে থেকে দেখলে অত্যন্ত স্থূল। এর গভীরেই অত্যন্ত গভীর সূক্ষ্ম তত্ত্বটি বিদ্যমান। একেই বলে পঞ্চ-তত্ত্ব। “সোমধারা ক্ষরে যাতু ব্রহ্মরন্ধ্রাদ্ বরাননে। পীত্বানন্দময়ীং তাং যঃ স মদ্যসাধকঃ।” অর্থাৎ, ভক্তের রাতুল হৃদয়, মা মা, তুমি মদ খাও বলে যে আকুতি দেখায়, তা ভুল। ভক্তের ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে নি:সরিত রস বা সুধা হলো মদ। একইভাবে মাংস সাধক বলতে মায়ের সামনে পাঁঠা বলি দেওয়া নয়। বাক্য সংযমী হয়ে ইন্দ্রীয় সংযত হলেই মাংস সাধক হওয়া সম্ভব। “মা শব্দে রসনা শ্রেয়ো তদংশং রসনাপ্রিয়ে। সদা যো ভক্ষয়েদ্বি স এব মাংসসাধকঃ।” আর মৎস্য কী? “গঙ্গা যমুনয়োর্মধ্যে মৎস্যৌ চরতঃ সদা। তৌ মৎস্যৌ ভক্ষয়েদ্ যস্তু স ভবেত্ মৎস্যসাধকঃ।” প্রাণায়ামের মধ্যে কুম্ভককে ব্যবহার করে ঈশ্বর চেতনা লাভ। এসব ব্যাখ্যা দিতে পারতেন। কিন্তু, "না"। তিনি মন্তব্য করলেন, বাঙালির খাদ্যাভাষ নিয়ে। শাসকদলকে বুঝতে হবে, এটা বিজেপি শাসিত রাজ্য হলেও, গোবলয় হয়ে যায় নি। বাঙালি অত্যাচারিত হয়ে বাংলায় বিজেপিকে এনেছে। বাংলায় ভেদাভেদহীন একটা মিশ্র সংস্কৃতি চলে। পুজো ক'দিন চিকেন বার্গার, চিকেন / মাটন বিরিয়ানি, সিফুড নুডলস, চাইনিজ থেকে চিজি পনির টিক্কা, চিজি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, মাশরুম চিলি সবই চলে। পোশাকেও গামছা শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, পালাজো, জিন্স ও বিভিন্ন ফিউশন তো আছেই। এসব নিয়ে দারোয়ানী বাঙালি বরদাস্ত করবে না। বাঙালি শুধু ধুতি পড়ে না, ধুতি থেকে সব কাপড় খুলে বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। তাই সাধু সাবধান। বিজেপির মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল বলেছেন, বাগেশ্বর বাবার সাধু হিসেবে নিজের বক্তব্য থাকতেই পারে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচাৰ্য অবশ্য বলেছেন, বাঙালি নবমীতে পাঁঠা খাবেই। রসিক বাঙালির পদ এবার পদ্যময় হোক। একটুকু প্রার্থনা।

No comments:

Post a Comment

Gadget

ব্রহ্মাণ্ডে কে আমিষ, কে নিরামিষ? দেবশ্রী মজুমদার

          ব্রহ্মাণ্ডে কে আমিষ, কে নিরামিষ? একাদশীর উপবাসের পর চড়চড়িয়ে খিদে বাড়ে। অবশ্য কিছুটা রসিকতার সুরে স্বামী বিবেকানন্দ এব্যাপারে ব...

Popular