কেশ ও নিকেশ রাজনীতি : রসে টইটুম্বুর হলেও ভবি ভোলে না দেবশ্রী মজুমদার

অভিনেতা অনুপম খেরের টাঁকে চুল গজায় নি, উনি খুব খুশি। সম্প্রতি কোলকাতায় বিজেপির রাজ্য সম্পাদক শমীক ভট্টাচাৰ্য -র সঙ্গে দেখা করে, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গেলেন তিনি , তাঁর মন্তব্যের জন্য। তিনি বললেন, ঈশ্বরের কাছে তাঁর প্রার্থনা ছিল, তাঁর টাঁকে যেন কেশ সঞ্চার না হয়। অর্থাৎ যাক তাঁর কেশ, তবুও নিকেশ হোক তৃণমূল সরকার। এই হোল "কেশ ও নিকেশ" রাজনীতি। বলিউড অভিনেতা অনুপম খেরকে আমরা মস্তক মুণ্ডিত অবস্থায় দেখে অভ্যস্ত। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী কিরণ খের বিজেপির সাথে যুক্ত। সেই সুবাদে তিনিও বিজেপির দিকে ঢলে আছেন। সারা বাংলায় পট পরিবর্তনে তিনিও আশাবাদী ছিলেন। তিনি যেহেতু বাংলার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন, তাই বিজেপি নেতা কৌস্তভ বাগচীর মতো তার ভীষণ কেশ প্রতিজ্ঞা ছিলো না। দ্রৌপদীও (যদিও মহিলা, অবশ্যই অবলা নন) কেশ উন্মুক্ত রেখে তাঁর প্রতিজ্ঞা রেখেছিলেন ও কৌরব বংশ নিকেশ করেছিলেন। এক্ষেত্রে কেশের-ই নিকেশের জয়। প্রাক নির্বাচনে শমীক ভট্টাচাৰ্য কী বলেছিলেন? "আকাশ মাটিতে নেমে আসতে পারে, সমুদ্র আকাশে উঠে যেতে পারে, এমনকি অনুপম খেরের টাঁক মাথায় চুলও গজাতে পারে, কিন্তু বাংলায় তৃণমূল আর ক্ষমতায় ফিরবে না।" এই মন্তব্যের পর অনুপম খের রসিকতার সুরে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন: "আরে ভাইয়া জি! আমি আপনার কী ক্ষতি করলাম? আপনি কেন চান যে আমার মাথায় আবার চুল গজাক? আমি তো কোনওদিনই সেটা চাই না!" মহাকবি কালিদাসের সুন্দর উপমা দিয়ে একটু ভাবুন, সরকারের পট পরিবর্তন হলো না। কিন্তু অনুপম খেরের মাথায় সুন্দর নয়নাভিরাম কেশ সঞ্চার হলো। কালিদাস লিখলেন, "সনীলালক-মধ্যশোভি মুখম্।" ঘন কৃষ্ণবর্ণ অলকের (কুঞ্চিত কেশের) মাঝখানে শোভিত মুখমণ্ডল। আহা, কী অপূর্ব! কুমার সম্ভবের আগমন হলো, কার্ত্তিক কোন্ অসুর বধ করলেন, কতো শ্লোক রচিত হয়েছিল, আরও কত রচিত হবে, সে অন্য বিষয়। কিন্তু এই রসাস্বাদন খালি পেটে কতটা সইবে, বাংলার কেশবতী কন্যেরা বুঝবে। যখন ঝাড়াই মারাইয়ের পর এককোটি চল্লিশ লক্ষ মা জননীরা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার থেকে বাদ পড়বেন। কারন বাজেটে রাহা খরচ বাবদ তো বরিদ্দ এক কোটির। সাকুল্যে ৩৬ হাজার কোটি। আগের সরকারের বরাদ্দ বাজেট থেকে এক কোটি বেশি মাত্র। কিন্তু ডবল ইঞ্জিন সরকারের ডবল পেমেন্ট তিন হাজার টাকা। পাশাপাশি, এই বাজেটে চুক্তি ভিত্তিক রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের একটাকাও বাড়ে নি। শুধুমাত্র আংশিক চুক্তি ভিত্তিকদের আংশিক বেড়েছে। আরেকটা দেখা গেছে, সেটা প্রমাদ বলে মনে হচ্ছে, শিক্ষা ক্ষেত্রে এজেন্সী চালিত সংস্থার শিক্ষা কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে। এটাও কি আদৌ সম্ভব? সদ্য এসেছে এই সরকার। শোনা যাচ্ছে, আগের সরকারে বিস্তর দুর্নীতি। বাড়ির দেওয়ালে অপরিচর্যার বেহালে শ্যাওলা পড়ে গেছে। ঘষা মাজা করে রঙ হবে। ঝাঁ চকচকে না হলেও, তক তকে হবে। কারণ পূর্বতন সরকার প্রচুর ঋণ করেছেন। ঘি খেয়েছেন। ক্ষমতার বাইরে থাকা বিজেপি, আর ক্ষমতার অলিন্দে থাকা বিজেপি এক নয়। প্রতি ইঞ্চিতে মানুষ মাপবে। বিজেপি যেটা বলছে, পূর্বতন সরকারের (ভালো তৃণমূল বাদে) সবাই হয় সরাসরি দুর্নীতি পরায়ন, না হয় দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছে। জনগণের একাংশও দুর্নীতিকে আশ্রয় করে বিভিন্ন প্রাকল্পিক সুবিধা ভোগী হয়েছে। দুই একজনের শাস্তিও হয়েছে। এক্ষেত্রে বিজেপি এখন আগমার্কা সততার প্রতীক। যদিও এটা তারা মুখে বলে নি। বরং আগের সরকার সেটা বড়াই করে বলতে অভ্যস্ত ছিলো। জনগণ শুধু নজরে রাখছে। নিট পেপার লিক নিয়ে সারা দেশে শুধু তেলেপোকা নয়, আপামর যুবক সমাজ ক্ষুব্ধ। এই আংশিক বাজেটে সব দিশা দেখানো সম্ভব নয়। যতদিন বিজেপি ক্ষমতায় ছিলো না, ততদিন ইস্যুগুলো ছিলো অনেকটাই ভার্চুয়াল। বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণ, মুর্শিদাবাদে এক পরিবারের দুই সদস্যদের খুন। দাঙ্গার পরিবেশ। বিভিন্ন ধর্মীয় সমাবেশে আক্রমণ, এগুলো ছিলো ক্ষমতায় আসার অগ্নি -ইন্ধন মাত্র। এখন সরকারে আসার পর, এই ইস্যুগুলো আর নেই। মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আনন্দ মেলা নিয়ে মেতে থাকে, যতদিন পেটে সয়। অর্থাৎ পিঠে খেলে পেটে সয়। এখন হকার উচ্ছেদ থেকে বেশ কিছু বাস্তব ইস্যু মানুষের ধর্মীয় প্রকোষ্ঠেও অনুপ্রবেশ করতে শুরু করেছে। মাইকে আজানের আওয়াজ বাড়লো, কি কমলো, এই বিষয় ক্রমশ প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। মানুষ যেদিন বুঝে যাবে, অর্জুনকে ভগবান কৃষ্ণের সেই উপদেশ- যে বিধি না মেনেও অন্য কারো উপাসনা করে, সে আমার-ই উপাসনা করে। "যে অপি অন্যদেবতা ভক্তা যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতা । তে অপি মামেব কৌন্তেয় যজন্ত্যবিধিপূর্বকম্ ॥ ২৩ ॥" তখন মাইকের আজান নিয়ে যারা ভাবতো, সেই মানুষগুলো আর ভাবিত হবে না। এখানেই বিজেপির বিপদ। বিজেপি ক্ষমতায় এলে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ অসাম্প্রদায়িক হতে বাধ্য। এই কৃতিত্ব অবশ্যই বিজেপির। মুসলিম সম্প্রদায় নিজেরাই বলতে আরম্ভ করে, গোরুকে জাতীয় পশু ঘোষণা করা হোক। মহরমেও কোন অস্ত্র প্রদর্শন হয় নি। অর্থাৎ প্রতিটি ইস্যু শুধু প্রশাসন নয়, মুসলিম ভাইয়েরা ইতি টেনে দিচ্ছেন। তাহলে এবার পড়ে থাকলো শুধু কাজ। কাজ আর কাজ। পাঁচটা বছর খুব বেশি নয়। কাজ বলতে শুধু হকার উচ্ছেদ নয়। পুনর্বাসন হলো, সমাধান, পরিসমাপ্তি। সেটা পূর্বে কে করেছিলো, করেনি সেটা মানুষের কাছে আজ আর কোন বিষয় নয়। সিস্টেম ঠিক করতে গিয়ে "Boiling Frog Syndrome" ভুলে, জনগণকে একেবারে গরম জলে ফেললে, উল্টো ফল অবশ্যম্ভাবী। তখন বিজেপি গোপ-গোপীদের কেশ সজ্জাও হবে না, কুঞ্জ সাজানোও হবে না। গাইতে হবে--আমায় যেন (শ্যাম) ছেড়ে যায় না, প্রবোধ দিও তারে”।

Comments

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার