বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার
বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই: দেবশ্রী মজুমদার ‘বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই, যাচ্ছে ফাটি বুকের ছাতি তোমার শোকে ভাই’। বর্ষার ছাতা হারিয়ে কারো মনের অবস্থা কেমন হয়, তা কবি কালিদাস রায়ের লেখনিতে স্পষ্ট। কিন্তু বৃষ্টিই তো নাই! তার পরে আবার ছত্রবিয়োগের দুঃখ কেন মশাই!-- ফেলে যাওয়া ছাতাটা ফেরত দিতেই, এক ক্রেতা কথাগুলো আওড়ালেন। উদ্দেশ্য, সেই বিক্রেতাকেই, যিনি তাঁর ফেলে যাওয়া ছাতাটা ফেরত দিলেন। ক্রেতা হসপিটাল পাড়ার বাসিন্দা চাঁদ মণ্ডল। তাঁর হাতেও ছিল এক ছেঁড়া ছাতা। উদ্দেশ্য যাইহোক! বিধেয়, পরিচিত দোকানে ছাতাটা সারানো। সকালে বাজার সারার সাথে সাথে ছাতাটাও গা'গতরে ঠিক করে নেওয়া। সকালেই বাজারের থলের সাথে এটিকেও ধরিয়ে দিয়েছে। বাজার সেরে পায়ে পায়ে ছাতা সারানো রামপুরহাটের ভাঁড়শালাপাড়া মোড়ের এক গলিতে। সেখানেই বসেন বছর পঞ্চাশের ছোটকা মুনসরি। বাড়ি রেলপাড় লোকোপাড়া। রামপুরহাট পুরসভার-১ নং ওয়ার্ডে বাড়ি। ২৫ বছর ধরে ভাঁড়াশালার এই গলিতে ছাতা সারাইয়ের কাজ করেন। বাজার সেরে মুখে আগুন নেন এখানেই। তার পর সংসারের গপ্প সেরে বলেন, না ভাই সংসার এক্কেবারে রাবড়ির মত শুধু পাকে পাকে জমে উঠ...
“বিভীষণের রাজ্যাভিষেকের পর শ্রী রাম অযোধ্যায় ফিরে যাওয়ার বাসনা প্রকাশ করেন। তখন বিভীষণ লঙ্কাতেই শ্রীরামচন্দ্রকে রাজত্ব করতে অনুরোধ করেন। লক্ষ্মণও তাতে রাজী হয়ে অযোধ্যা থেকে শতগুণ ঐশ্বর্য্যশালী লঙ্কায় থাকার জন্য শ্রীরামচন্দ্রকে অনুরোধ করেন। সেই মুহূর্তে শ্রী রামচন্দ্রের একটি উত্তর আজও আমাদের ভাবিত করে তোলে— “অপি স্বর্ণময়ী লঙ্কা না মে লক্ষ্মণ, জননী জন্ম ভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী”।” এই একটি শ্লোক জন্মভূমি ও জননীর প্রতি ভক্তির নির্দেশিকা তুলে ধরে আমাদের মনে। পূজা বার্ষিকীর বিশেষ সংখ্যায় “আজকের দুর্গা’ লেখাতে এই কথাগুলো পড়তে পড়তে চোখের কোণা দুটো ভিজে গেল ব্যর্থকামের! আর পড়তে পারলো না সে। বইয়ের পাতা মুড়ে ভাঁজ করে রেখে দিল। ভাবতে থাকল, কথাগুলো বইয়ের পাতাতেই থেকে গেল। জীবনের পাতায় পাতায় কোথাও তার আঁচড় টুকু দেখা গেল না। সংসারে ভালবাসার ‘টাগ অফ ওয়ার’ কি ভয়ঙ্কর… ভাবলে নিচের চোয়ালটা শক্ত হয়ে ওঠে তার। চিরদিন বদনাম থেকে গেল তার ভাগ্যে। সংসারের নিহিত স্বার্থের জন্য মাকে নিজের কাছে রাখতে পারল না সে। তাকে সমর্থন করল, বাকি সকলে। সকলের ভাবটা ছিল, এমন যেন ‘যা হচ্ছে, তা হতে দাও!’ Forgiveness is a better act than vengeance. If they are repentant then my purpose is achieved and I won’t do anything more to them. (Act V, Sc-1, The Tempest, Prospero) না, ব্যর্থকাম কোনদিন ভাবে নি সে প্রতিশোধের কথা! সে আজ দশ বছর আগেকার কথা!
ঘোষ চরা গ্রামের ব্যর্থকাম ঘোষ তখন পার্ক স্ট্রীটে একটা ছোট্ট কাগজের অফিসে কাজ করে। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সপ্তাহান্তে একদিন বাড়ি আসে মা, ছেলে, মেয়ে, ভাই বৌ সকলের কাছে। তারপর ফিরে যায়। থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় তার জীবন। কোনদিন টের পায় নি। সংসারে গ্রহ্নির বাঁধন প্রতিদিন একটু একটু করে আলগা হয়ে যাচ্ছে। একদিন নিজের এলাকা সাঁইথিয়ার একটি নিউজ এল তার কাছে। ডেস্ক ইনচার্জ বললেন খবরটা দেখ। ---করসপনডেন্ট কে জিজ্ঞেস করে, যেটুকু ইনপুট দরকার ছিল তা নিয়ে লিখে সাব এডিটরকে দিলাম। তিনি ফাইনাল দেখে এডিটরের কাছে পাঠালেন। সেখান থেকে গ্রীন সিগন্যাল পাওয়া যাবে মিটিংয়ের পর। মিটিং হবে ২টোয়। কাজ সেরে ঠোঁটের কোণে পরিতৃপ্তির হাসি নিয়ে ক্যান্টিনে খেতে গেলাম। এলাকার খবর। বেশ জমিয়ে লিখলাম। ‘ মা দুর্গার আরাধনা মণ্ডপে মণ্ডপে! কিন্তু ঘরের দুর্গা একটু খাবারের জন্য হাপিত্যেশ করে বসে আছে ফুটপাতে। ছেলে বৌমা মিলে বের করে দিয়েছে স্বর্গাদপি গরিয়সী জননীকে! যারা সংবাদমাধ্যমে কাজ করে, তাদের কাছে টাচি লাইন! মনটাও বেশ ভালো লাগছে, ভালো লিখতে পারার জন্য! কিন্তু ফিরে এসেই জানতে পারলাম, এডিটর আমাকে ডেকেছেন। প্রথমেই তিনি প্রশ্ন করলেন, জীবন সম্পর্কে কতটুকু ধারণা আছে আমার। তারপর বললেন, সেন্টিমেন্ট এক্সপ্লয়েট করে হাততালি কুড়োবার জন্য আমাদের লেখা উচিৎ নয়। সত্যটা বের করতে হবে। জেনো, চলমান জীবন স্রোতে ঘটনার অভিঘাত সব সময় একদিকে হয় না। তারপর কথামত, করেসপন্ডেন্টকে পাঠানো হল ছেলে বৌমা এবং প্রতিবেশীদের কাছে। তারপর যা জানা গেল, তাতে লেখাটা বাতিল করতে হলো। কারণ, হাজার হোক মা। কোন তুলনাই তার হয় না। সেখানে আপোষ করা যায় না, সমাজের দিকে তাকিয়েই। এসব ঘটনা অনেক কিছু চাক্ষুষ না করলেও, অল্প বিস্তর অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। কিন্তু, তা বলে নিজের বাড়িতেই! হ্যাঁ, ইচ্ছে থাকলেও, সবার ভাগ্যে মাতৃসেবা জোটে না! কিন্তু বদনাম জোটে! বাবা মারা যাওয়ার পর ছোট ভাই সুমন্ত্র ঘোষ মাকে নিয়ে আলাদা করে থাকতে শুরু করল। বদনাম রটল, দাদা দায়িত্ব নিতে চায় নি। যদিও কাজ থেকে নিষ্কৃতি মেলে নি মায়ের। কেউ একটা প্রতিবাদ করল না। ব্যর্থকাম চেয়েছিল, মাকে নিজের কাছে রাখতে। বলেছিল, মা পেনসন তুমি যাকে ইচ্ছে দাও, আমার কাছেও থাকো। তুমি না থাকলে আমার বদনাম হবে। মা দুর্গা বলেছিল, বাবা, পেনসিল তো বেশী পাই না। ছোটর কাছে না থাকলে ও আত্মহত্যা করবে।– ব্যর্থকাম তীব্র অভিমান নিয়ে বলে উঠেছিল, “আমি কি তোমার কেউ নই মা!” তবুও মা। মায়ের উপর রাগ করতে নেই। সেটা বুঝেছিল ব্যর্থকাম। সারা সারা দিন খাটতে খাটতে মায়ের শরীর ভেঙে গেল।
একদিন জিজ্ঞেস করে বড় ছেলেকে বলল, মৃত্যুর পর আমার কাজটা তুই করিস! যেমন তর্পণে যাবি কিনা, জিজ্ঞেস করত মা। যেতে একটু লজ্জা লাগত। কারন সেখানেও, অবিচারের শিকার আর বদনামের শিকার হতে হয়েছিল। বাবার মৃতদেহের সামনে শুধু চোখের জলে বলেছিল সে, বাবা, আমি কি অপরাধ করেছিলাম। কোন কর্তব্য তো বাদ রাখি নি। শুধু বদনামটাই ভাগ্যে জুটল! তর্পণে গেলে, নিন্দুকেরা আড়ালে আবডালে বলে, জীবিত অবস্থায় খেতে দিল না, আজ তর্পণ! কিন্তু কে কেড়ে নিল সব অধিকার? কারা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করল না? তার উত্তর সে পাবে না কোন দিন। শেষে এও শুনতে হল, মা ছিল না তার কাছে। কোন দায়িত্ব তো ওর উপর ছিল না। আসলে বড় ভাই কোন দায়িত্ব নিতে চায় নি।
মা গত হলেন। নটে গাছটি মুড়োলো! পেনসনের জন্য টানাটানিতে তাঁকে আর থাকতে হবে না! ব্যর্থকামের মনে পড়ে কত যত্ন করে মা তাঁকে খাইয়ে দিত। বড় ছেলের উপর কত আশা ছিল! কিন্তু নিজের ঘরের চার দেওয়ালে কেমন যেন বন্দী হয়ে গেছিল সে। একটু খুটখাট হলেই যেন বিপদ। অন্ধের মত দেখেও না দেখার ভাণ করা ছাড়া উপায় ছিল না ব্যর্থকামের। কাজ হারিয়ে ঘোষপুর গ্রামের বাড়িতে পাকাপাকি ভাবে ফিরে এসে দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে কি না বিপদে পড়েছিল সে। সেদিনও খুব অসহায় দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল মাকে। তাঁকেও চোখ বুজে থাকতে হয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ। শুধু দীর্ঘ হাহুতাশ বেড়িয়ে এসেছিল বুকফাটা কান্নায়ঃ আমি নিরুপায়! এই ছিল দীর্ঘশ্বাসের সার কথা। সহজ করে বললেন, তুই তো জানিস সংসারের অবস্থা। ব্যর্থ বলেছিল, সে তো ঠিকই মা। আমি তোমার আশীর্বাদে সামলে নেব। মনে মনে বলল, এখন আমরা যতই আলাদা হই, ত্রিবেণীতে তোমার তিন জলধারা আবার এক হবে। প্রকাশ্যে বলল, আমরা আবার এক হব। মা বলে উঠল, “চোখের সামনে হয়ত তা হবার নয়। চোখ বুজলে, তা যেন হয়, বাবা!” সেই মায়ের মৃতদেহ উঠোনে। বড়র অধিকার নেই সৎকারে। মা ছিল না তার কাছে। সেই তার অপরাধ। চোখ দুটো ভিজে ভিজে উঠছে মাঝে মাঝে। মৃতদেহের মাথার কাছে দুই ভাই, বৌমা, তাদের দুই সন্তান, পায়ের কাছে আরেক ভাই, বৌমা তার দুই সন্তান। বুকের উপর মাথা রেখে কাঁদছে মেয়ে। জামাতা দাঁড়িয়ে মৃত্যুর থেকেও ভয়ঙ্কর বাস্তবের সামনে!
Comments
Post a Comment