ডোন্ট টক...দেবশ্রী মজুমদার
ডোন্ট টক...
---- দেবশ্রী মজুমদার
বোনের নিজের হাতে কাঁচা লঙ্কা দলে দেওয়া আলু, মূলো, বড়ির ভাসা ভাসা টকের স্বাদের নেশায় মন যখন বুঁদ হয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে টোটো তে উঠলো, তখন সামনে বসে থাকা তরুণীর ভাসা ভাসা চোখ দেখার ইচ্ছেও নেই, বয়সও নেই! তবুও কেন জানিনা, আড় চোখে বার বার দেখছিলো একজোড়া চোখ।
সে যাই হোক! আমার চোখে তখন টকের নেশা। শিব নেত্র হয়ে যাচ্ছে বার বার! এক চোট ঘুম হলে ভালো হতো! ট্রেন লেইট থাকায় আপ কবিগুরু ট্রেন পেয়ে গেলাম। সিটও একটা জোগাড় হলো।
আমার মাসতুতো, পিসতুতো বোন আছে। তবে সহোদরা বলতে একজন। বোলপুরে থাকে। ভাইফোঁটা উপলক্ষে যাওয়া। ইদানিং কালে বোনের শরীর ভালো যাচ্ছে না। তবে ভাইদের দেখে শরীর যেন চাঙ্গা! ভগ্নিপতি চাকুরে। অফিস যাওয়ার আগে মাংস ও পোলাও রেঁধে গেছিল। ভগ্নিপতির পুরোনো কর্মস্থল
থেকে দাদা বৌদি, ননদ, ভাগ্নে, পুরোনো বাসার ভাই সবাই মিলে একরকম চাঁদের হাট! এসবের মাঝেও আমি টক ভালোবাসি তাই, টক রান্না হয়েছিল। ছিল আলুপোস্ত।
পোলাওয়ের সাথে টক যায় না। এটা সবাই জানি। তাই আলাদা করে সাদা ভাত ও হয়েছিল। এবার আসি একটু অন্য প্রসঙ্গে। যদিও তার সাথে টকের সরাসরি না হলেও একটা যোগসূত্র আছে। তখন আমি যুবক। পাশের গ্রাম সাঁকিরপুরে বেশ কয়েকঘর বোষ্টম বোষ্টুমীর বাস ছিল। সাদা কাপড় পরে তিলক কেটে তাঁরা মাধুকরী করত। তখন ভাবতাম এরা কি বিধবা! যাইহোক, একবার বাউল গানের আয়োজন করেছিল তাঁরাই। গান চলছে। বিশ্ব ভারতী থেকে আগত দুই জন বিদেশি পড়ুয়া মন দিয়ে গান শুনছেন। একে অল্প বয়স, তারপরে পরীর মত দেখতে তরুণী! প্রশ্ন করে জানলাম, তাঁদের বাড়ি অস্ট্রিয়া। তাঁরা অনুরোধ করল, কোন প্রশ্ন না করতে। অনুষ্ঠান শেষে তাঁরাও মাটিতে পাত পেড়ে খেতে বসলেন। খাবারের মধ্যে "টক" তাদের খুব ভালো লেগে যায়! জানতে চান- অটস দিজ? একজন পরিবেশক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যা বোঝাতে চেষ্টা করলেন, তাতে তাদের মনে হল খুব কসরৎ করেই এই "টক" বানানো হয়। পরিবেশক সোৎসাহে আরও ভালো ভাবে বোঝার চেষ্টা করতেই-- আরেক পরিবেশক বলে উঠলেন একটু বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথেই-- "ডোন্ট টক"। দুজনেই বক্তার দিকে ভয়ে ভয়ে সেই যে চুপ মেরে গেলেন, আর কথা বলেন নি। দ্বিতীয় পরিবেশক অবশ্যই বলতে চেয়েছিলেন, ইটস নট হোয়াট ইউ আর সেইয়িং। ইটস টক ( সাওয়ার)। টক এমনওতর জিনিস!
এবার আসি এদিনের কথায়। আগেই একপেট টিফিন খেয়েছি। যাকে বলা হয় "বাটা"। বোন ফোঁটা দিল। যমের দুয়ারে কাঁটা বলেই কেঁদে ফেললো। চোখে ফুটো আছে বলে, ভাগ্নি থেকে ভগ্নিপতি পরিবেশ সহজ করার চেষ্টা করলো! আনন্দের দিনেও চোখে জল! আমারও মনে পড়ে গেল ছোট বেলায় বাবা কেমনভাবে এই ফোঁটার আয়োজন করতেন। জেলাপি, কদমা, আঁকুর ইত্যাদি( শুকনো তালির আঁটি ফাটিয়ে সাদা শাঁস)। শুধু আমাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য, দূরে বোনদের কাছে যেতে পারতেন না! আর ছিল সংসারে অভাব! আত্মবঞ্চনার মধ্যে দিয়েও সে এক অদ্ভুত সুখ পেতেন বাবা। দুই হাঁটুর উপর ভর দিয়ে শরীরটাকে একটু ঝুঁকিয়ে আমাদের খাওয়া দেখতেন। আজ নেই! সেদিন ছিল না স্মার্টফোন, ছিল না জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত স্টাট্যাস দিয়ে সবাইকে জানানোর সামর্থ্য! আজ সেটা আছে। আজ অভ্যস্ত! নেই শুধু সেই অনুভূতির দিন! আজ নিজের থেকে নিজে এতটা দূরে, সব কিছু মানিয়ে নিতে চাইলেও কোথা থেকে সঙ্কোচ, দ্বিধা একসাথে এসে জড়ো হয়। সেই মৌন মুখর প্রশ্ন এভাবেই বার বার সুখের মুহূর্তে চোখ বেয়ে বাইরে কোথাও যেন অন্তঃস্থল খুঁজতে যায় বৃথাই! রাজার মত অহঙ্কারে বোন কে বলেছিলাম, আজকে কি চাস বল? দেব! কত বার জড়িয়ে ধরলো বোন! তার পর অশ্রু সজল চোখে শুধু বললো-- তোরা ভালো থাক! নিশ্চিত হলাম আরেকবার, দধীচি কোন পুরুষ ছিল না!
-- না হয় আমি দধীচি হলাম
না হয় আমি স্বপ্ন ছুঁলাম!
এপার থেকে ওপার!
না হয় চেষ্টা মৃত সেতো
সেতু বরাবর।
না জানি কি পেল, পেলাম
না হয় আমি দধীচি হলাম
নে গুণে নে বজ্র হানার
বুকের ক'খানি হাড়!
পারিস যদি সেতু বানা
আঁধার ফুঁড়ে আলো আনার!
প্রসঙ্গঃ অভিজিৎ বাবু! --দেবশ্রী মজুমদার
প্রসঙ্গঃ অভিজিৎ বাবু!
-- দেবশ্রী মজুমদার
এ'কদিন ধরে "প্রসঙ্গ অভিজিৎ বাবু" পড়লাম। নিজের অজ্ঞতাটা অজ্ঞাত রাখতে চেয়েছিলাম। আর পারলাম না! আমিও তো বাঙালি! মাফ করবেন দাদা, দিদি ও বোনেরা। কারণ উল্টো পাল্টা একটু বকবো। যাঁরা পড়বেন না, তাঁরা বেঁচে গেলেন, তাদের ধন্যবাদ আমার প্রাপ্য। যাই হোক, আগে আমার পরিচয় দিলে, আমার অযোগ্যতা প্রমাণ হবে। অত্যন্ত অবহেলিত বৃত্তি মূলক শিক্ষার আংশিক সময়ের শিক্ষক, আংশিক সময়ের সাংবাদিক, আর কয়েকজনের গৃহ শিক্ষক। এই তো যোগ্যতা! তবে, আমার এক স্যারের কাছে নীরদ সি চৌধুরীর "ক্রেডো" পড়ার সময় প্রসঙ্গ ক্রমে জেনেছিলাম, মাননীয় নীরদ সি চৌধুরী কাজী নজরুল ইসলামের " বিদ্রোহী" কবিতা সম্পর্কে যেটি বলতে পারেন, সেটা অন্যজন বললে স্পর্ধা হয়। এই রকম ঘটনার প্রেক্ষিত কোন দিন এলে, কোন পণ্ডিত ব্যক্তি "মার্জনা করলুম" মনে মনে ভেবে চুপ থাকতে পারেন। কিন্তু, এই মুহূর্তে অন্যকে মাফ করা হবে না। অভিজিৎ বাবুর মত স্বনামধন্য ,বাঙালির গর্ব, ব্যাক্তির সম্পর্কে বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। আমি বুঝি, অভিজিৎ বাবু আমার পাকা ধানে মই দেন নি। জানি না ভবিষ্যতে মাঠের ধান বইয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন কিনা! বাঙালির পকেটে পয়সা থাক আর না থাক ভ্রমণের কথা ভাবে। আমার মাথায় কিছু থাক আর না থাক, আগেও গ্যাট চুক্তি লোকের বাড়ি বয়ে গিয়ে বুঝেছি। দাস ক্যাপিটাল ও একজনের বদান্যতায় কিছুটা হলেও বুঝেছি। "অন দ্যা ক্যানিবালস" পড়ার সময়, শিক্ষক কেন, "ই ইজ ইক্যুয়ালটু এম সি স্কোয়ার" প্রসঙ্গ আনলেন, তা সায়েন্সের শিক্ষকের কাছে বুঝেছি। তাই "পুওর ইকনমিস" বুঝতে কারো সাহায্য নেব। আপাতত ফোর ওয়ার্ড পড়তে শুরু করেছি। গল্পচ্ছলে বলা কথা ভালো লাগছে। সে যাই হোক, উনাদের মত মানুষ গুটি পোকার দশা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন বলেই আজ প্রজাপতি। উনার মত অনেক বিখ্যাত মানুষের জীবন সুর বাঁধা তন্ত্রীর মত। উনারা জানেন, কখন ধরতে হয়, কখন ছাড়তে হয়। (তীরের সাথে ঢেউয়ের অভিঘাতের সম্পর্ক, বোধ হয় প্রেরণা) আমরা কূপমণ্ডুক আবেগে ভেসে বেতাল হয়। তাই মধ্যবিত্ত। যদি এই মধ্যবিত্ত থেকে আবার কোন গুটিপোকা প্রজাপতি হয়, সাগর পেরিয়ে অনেক অনেক দূরে চলে যায়।যদিও এমন ঘটনা বার বার হয় না। সে যাই হোক, আমার মত মানুষ ধন্য হবে, না বুঝেই। অর্থাৎ মন্ত্রের অর্থ না বুঝেই, দেবতার সামনে বার বার আওড়াব। যাঁরা আমার বাজে বক বক পড়লেন, তাঁদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী! আমার স্ত্রী এই মাত্র খবর নিলেন, যা লিখছি, তা খবর কিনা? - উত্তরে বললাম, না। -- উত্তর পেলাম, এসব লিখে কী লাভ? এই হিসেবটা হয়তো সাধারণ মানুষের বিচার্য!!
বৃষ্টি ভিলেন আনন্দবাজারে, তাই আনন্দধারা বহিল না শান্তিনিকেতনে--দেবশ্রী মজুমদার
বৃষ্টি ভিলেন আনন্দবাজারে, তাই আনন্দধারা বহিল না শান্তিনিকেতনে
দেবশ্রী মজুমদার
আনন্দধারা বৃষ্টির ধারায় বাধা পেল! শুরু হতেই বৃষ্টি! বৃষ্টি ভিলেন এবারের আনন্দবাজারে! সে যাই হোক, এই আনন্দবাজার নিয়ে মানুষের উৎসাহের খামতি নেই! বৃষ্টি হলে যেমন খেলার ধারা বিবরণী বন্ধ হয়ে রেকর্ডিড খেলা দেখানো হয়, তেমনি পুরানো কাসুন্দি নিয়েই কিছু কথা শোনা গেল বিশ্বভারতীর অন্দরে!
এমন নামের দোকান পসরা নাকি তিন ভূবনে মেলে নি এ্যদ্দিন! কি চান? শিঙারা? – চলে যান ত্রিসিংহধারিণী স্টলে। শিঙারার নাম ত্রিসিংহধারিণী। ভেবে দেখুন শিঙাড়ার তিনটি শিং আছে। চা খাবেন? চলে যান আনন্দধারায়। চায়ে মন না ভরলে, কফি খান। তবে কফি নয়, সোমরস চাইবেন। অতি সাধারণ খাবারকে, অদ্ভুত নাম দিয়ে অসাধারণ এবং রহস্যের মোড়কে বানিয়ে তোলার কারিগর বিশ্বভারতীর পড়ুয়ারাই। আর সেটা তারাই পারে! আনন্দবাজারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার, দোকানের নামকরণ। নাম হতে হবে এমন, যা দেখে দোকানের প্রতি সকলের একটা স্বাভাবিক কৌতুহল জাগবে। তবেই না আনন্দবাজার!
এবার বৃষ্টির জন্য মাঝে একটু ছন্দপতন হলেও, রসিক প্রকৃতি সামলে নেয় নিজেকে! নিয়ম মাফিক কিছুক্ষণ নাট্যঘরে। তারপর যথারীতি গৌরপ্রাঙ্গণে! সকালের দিকে ঢাক বাজিয়ে দোকানের কাজ চলছে। পড়ুয়ারা ঢাকের তালে নাচছে! তখন থেকে আনন্দ শুরু!
আনন্দবাজার কবে থেকে শুরু হয় তার দিনক্ষণ জানা নেই। বলা যায় রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় এই আনন্দবাজারের প্রচলন। সালটা সম্ভবতঃ ১৯১০-১১। ১৯১৯ সালে এক মজার ঘটনার কথা জানা যায়। ছেলেরা করেছে সীতার পদধূলি, রামের ধনুক, চণ্ডীদাসের হস্তাক্ষর। এইসবের মিউজিয়াম। “সীতার পদধূলি” নাম প্রসঙ্গে বিশ্বভারতীর অধ্যাপিকা সবুজ কলি সেনের কাছে জানা যায়, ১৯১৯ সালের ঘটনা। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে সীতাদেবী। সেই নামে মিউজিয়ামের নাম “সীতার পদধূলি”। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ডেকে বলেছিলেন, “তোর পদধূলি দেখে এলাম”। কি মজার না! ভাবতেও গায়ে শিহরণ জাগে। একই ভাবে, মিউজিয়ামের নাম “ চণ্ডীদাসের হস্তাক্ষর”। এ সেই বিখ্যাত বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস নন। আশ্রমে চণ্ডীদাস নামে এক পাচক কাজ করতেন তখন। তাঁর হাতের লেখা। তাই সেই নামেই মিউজিয়াম। এখনও সেই পরম্পরা আছে। যেমন এখন খাবারের দোকানের নাম “খাইবার পাস”। এই খাইবার পাস, পাকিস্তান আর আফগানিস্তানের সীমায় গিরিপথ নয়। এখানে “ খাইবারে চাইলে ওই পাশে যাইতে পারেন”। আজও পাঠভবনের সামনে গৌরপ্রাঙ্গণের মাঠে বসে আনন্দবাজার। পাঠভবনের চতূর্থ শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী এবং সঙ্গীত ভবন ও কলাভবনের মত বিশ্বভারতীর অন্য ভবনের সব বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা এই আনন্দ মেলায় অংশগ্রহণ করে। স্টলের সংখ্যা নেহাত কম নয়। নিজেদের তৈরী সম্ভার নিয়ে বসে। এবং তা থেকে যে আয় হয়, সেটা চলে যায় বিশ্বভারতীর সেবা বিভাগে। সেই সেবা বিভাগ থেকে বিশ্বভারতীর আশেপাশের গ্রামের দুঃস্থ মানুষের মধ্যে কম্বল, কাপড়জামা বা খাবার বিতরণ করে থাকে। যদিও এবার তার অবকাশ নেই। মহালয়ের দিন শুরু। একদিনের মেলা। এক কথায় ঘণ্টা তিনেকের মেলা। বিকেল পাঁচটা থেকে শুরু হয়। এই মেলার প্রস্তুতি অনেকদিনের। মারবেল পেপার দিয়ে স্টল সাজানো। এসবের একটা প্রস্তুতি থাকে। তাছাড়া, একমাস দেখা হবে না। তাই হবে এই মেলা ঘিরে চুটিয়ে আনন্দ থাকে। কিন্তু এবার বৃষ্টি ভিলেন, বলে জানান, এক পড়ুয়া।
তিনি জানান, এই আনন্দ মেলা বা আনন্দবাজারের বিশেষত্ব হল, এখানে যা-ই বিক্রি করা হবে, তা হতে হবে নিজে হাতে তৈরি। সে হাতের তৈরী কাগজের ফুলহোক, বা যা কিছু! অধ্যাপিকা সবুজ কলি সেন জানান, বিশ্বভারতীতে দুর্গা পুজো বলা হয় না। এখানে বলা হয় শারদ উৎসব। মহালয়ার দিন আনন্দ মেলা করে শারদাবকাশ বলে ছুটি দেওয়া হয়।
এ যজ্ঞে নেই অশ্বত্থ, নেই - দেবশ্রী মজুমদার
এ যজ্ঞে নেই অশ্বত্থ, নেই বট
-দেবশ্রী মজুমদার
এ স্বারস্বত যজ্ঞে
সব আছে, তুমি , আমি
পিল পিল ভিড়, গোঘ্ন লোভাতুর মন!
নেই অশ্বত্থ, ত্যাগ, উদারতা
নেই বট অক্ষয় যা প্রলম্বিত অতিশয়
অতি দীর্ঘ সে, অশ্বত্থ বটমূলে!
হ'তে হ'তে ঋত্বিক একদিন
পীনন্নোত পয়োধরা যিনি
পয়োস্বীনি বহু প্রসবিনী
তোমার ঔরস, তোমার গর্ভ
তোমার গর্ব, হে হিরণ্যগর্ভ!
আকন্ঠ পান করাও সবে
নবনীত কোমল সুগন্ধি!
তবুও, উন্মত্ত যষ্ঠি সমরে, পিঠ পাতো নিরুপায়,
আজ এমন দিনে মানে, সে মানী !
হায় ! মধুময় জিহ্বাগ্রে-
হৃদয় হলাহলে
তুমি নীলকন্ঠ আজ!
কিছু বলো না বলো, শ্রেণী শত্রু তুমি, বড়
অসহায়!কোন বেদনায়?
রাজ রোষে ক্লান্ত -ক্লান্ত! বড়ো ক্লান্ত!
আজও খুঁজে ফিরি নীলাভ মেঘ
যা কোন এক সময়, বর্ণ হারিয়ে
ঝরেছে অকাতরে সবুজ অবোধ ঘাসে।
অপেক্ষায় ছিলে না কোন দিন কোন চাতকের!
আজ এ রাজসূয়ে চেয়ে দেখো,
তুমি নেই, আমি নেই!
বট নেই! অশ্বত্থ নেই!
যে কিনা পয়োস্বীনি হবে বলে
একদিন শুনিয়েছিল তার "সাধ" হবে আজ!
এসো তবে নিরুত্তাপ, শান্ত ছায়া নটে।
যেখানে হৃদয় আছে, প্রকাশ সংযত তার
চোখের কিনারে। দেওয়া নেওয়া- -
নয় নয় শুধু বিনিময়,
আরও অনেক কিছু,
আরও আরও অনেক আশ্রয়!!
থানা থেকে আসছি-- দেবশ্রী মজুমদার
থানা থেকে আসছি-- দেবশ্রী মজুমদার
বিয়ে বাড়ির রিসেপশন মানেই সানাই, রঙিন আলোর রোশনাই, ফুরফুরে সুগন্ধি, আর বিভিন্ন পদের সুবাস! কবজি ডুবিয়ে ভুঁড়ি ভোজন আর কি! এক কথায়, হই হই ব্যাপার, রৈ রৈ কাণ্ড বলতে যা বোঝায়!
তার মাঝেই, মহিলা মহলের খুনসুটি, ভাই ! মাথায় টোপর তো পড়লে! কেউ এক কলি গেয়েও শুনিয়েও দিল---
'মাথায় টোপর পড়ার আগে ওজন করে দেখো ,শোলার টুপি লোহার হবে সেটা মনে রেখো '
বিয়ে যে শুধু ওজনদার নয়, কতটা দায়িত্বের উপলব্ধির আগেই- - এক জোড়া হেলমেট নিয়ে হন হন করে -- থানা থেকে আসছি!! বর সৌম্য শংকর চিনতে ভুল করলেন না সিউড়ি ট্রাফিক ওসি সুমন প্রামাণিককে। কারণ তাড়াহুড়োয় হেলমেট মাথায় না নিয়ে বেরিয়েছিলেন বাইরে। স্টেট ব্যাংকের কাছে এই ওসির কাছে ফাইন গুনতে হয়েছিল। নববধূ সায়ন্তীর কাছে চমক। পুলিশ আসায় অনুষ্ঠানে তাল কাটেনি একটুও। কারণ হাতে উপহার, ফুলের ব্যুকে। তাঁদের দুজনের ডিজিটাইজড ছবি দিয়ে স্মারক।আর একগাল হাসি!
আসাটা তাঁদের সারপ্রাইজ হলেও, আন্দাজ একটু ছিল। কারণ বিয়ে বাড়ি থেকে কেটেরারের ফোন নং নিয়েছিল ট্র্যাফিক পুলিশ। বলা হয়েছিল ' পথ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বার্তা' রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হবে। সেভ ড্রাইভ সেফ লাইভের প্রচার হিসেবে এখন বিয়ে বাড়িকেই টার্গেট করেছে ট্রাফিক বিভাগ। আগেও একই ভাবে লাভপুরে নবদম্পতিকে হেলমেট দেওয়া হয়েছে।
এবার একটু পরিচয় দেওয়া যাক। বীরভূমের সিউড়ি শহরের ৭ নং ওয়ার্ডের কালিবাড়ি এলাকায় বর সৌম্য শংকর রায়ের বাড়ি। পেশায় ওষুধ ব্যবসায়ী। ১৫ অগাষ্ট হুগলি জেলার উত্তর পাড়াতে বিয়ে হয়। তার দুদিন পর জাতীয় সড়ক সংলগ্ন এক বেসরকারি ভবনে ছিল রিসেপশন। নিমন্ত্রিত অতিথিরাও পুলিশের এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। জেলা পুলিশ সুপার শ্যাম সিং বলেন, পথ নিরাপত্তা নিয়ে আমরা এই ধরণের কর্মসূচি নিয়ে থাকি। মানুষ খুব ভালো সাড়া দিচ্ছেন।
নববধূর কাছে এই অভিজ্ঞতা বেশ ভালো। যদিও একটি হেলমেট বাড়িতে আছে। তবে উপহার বলে কথা! স্বামীর বাইকের পিছনে বসে কোন বিশেষ মুহূর্তে দুজনে এক কলি গুনগুনিয়ে উঠতেও পারেন---এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো-
পটুয়ার চোখে জলছবি---দেবশ্রী মজুমদার
পটুয়ার চোখে জলছবি
দেবশ্রী মজুমদার
শিল্পীর চোখে যখন জল, বিশ্ব স্রষ্টাও কী কাঁদে!
হয়তো তাই। কারণ তখন শিল্প ও শিল্পীকে আলাদা করে চেনা যায় না!
" তোমার সিন্ধু মারা গেছে সরযু নদীর কূলে
আরে কি কার্য করিলি রাজা কি কার্য করিলি
আমার অন্ধের লড়ি রাজা তু কেন ভাঙিলি"(সিন্ধু বধ)।
পটুয়াগানের তালে তালে পট দেখানো আর হয় না। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই শান্তনু পটুয়ার কথায় শিল্পী অরুণ পটুয়ার চোখ ছলছল করে উঠলো। ভারাক্রান্ত হয়ে বলে চললেন, শান্তিনিকেতনের খোয়াইয়ে শনিবারের হাটে বছর দুয়েক আগে পর্যন্ত এসেছেন পটের গান শোনাতেন দাদা। দাদা আর জীবিত নেই। আর বলতে পারলেন না। চোখে আর বাঁধ মানলো না ভাইপোর কথা বলতে গিয়ে। একটু থেমে বললেন, ভাইপো পট ছেড়ে পেটের ধান্ধায় কোন এক দোকানে কাজে লেগেছেন। এক বুক দুঃখ নিয়ে এঁকে চলেছেন....
শান্তিনিকেতনের নন্দন আর্ট গ্যাল্যারী। শিল্পী আপন মনে বসে পট আঁকছেন। পর্যটক থেকে উৎসাহী মানুষের আগ্রহের উত্তরও দিচ্ছেন। চলতি মাসের ১৬ তারিখ বিশ্বভারতীর কলাভবনের পেন্টিংস বিভাগের উদ্যোগে বেলা দুটো নাগাদ নন্দন আর্ট গ্যালারীতে পট প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। সেখানে বেশ কয়েকজন পটুয়ার পট নিয়েই এই প্রদর্শনী। প্রদর্শনী চলবে ১৯ তারিখ পর্যন্ত। খোলা থাকবে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
শনিবারের প্রদর্শনীর দুপুরে একা পাওয়া গেল এক পটুয়াকে। নাম অরুণ পটুয়া। বাড়ি ময়ুরেশ্বর থানার ষাটপলশা অঞ্চলের সেরুনিয়া গ্রাম। তাঁর পিতামহ শ্রীপতি পটুয়া ও বাবা বাঁকু পটুয়া ছিলেন এলাকার বিখ্যাত পটুয়া শিল্পী। অরুণ পটুয়া বলেন, পটের গান শুনিয়ে আর পেট ভরে না। দু’এক কেজি চালে কী হবে বলুন? তাই অবসর সময়ে আঁকা শেখাই। তবে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তাঁর জন্য মাসিকা হাজার টাকা শিল্পী ভাতা পাই। তাতে নুন তেলটা হয়। এর মধ্যেই মেয়ে পায়েল পটুয়া একাদশ শ্রেণীতে পড়ছে। তারপর পট শিল্পের কথা উঠতেই তিনি বলেন, পট শিল্প একদিন হারিয়ে যাবে। আমাদের পূর্বপুররুষরা ছিলেন বেদে। আমরা উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ। আমাদের রক্তে পট শিল্প। কিন্তু এখন আর কেমূল্য বোঝে! সরকারের উচিৎ পটের জন্য একটা মিউজিয়াম করে পট শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা। বর্তমান প্রজন্ম এই পট কি তা জানে না! তবে এই প্রদর্শনীতে এসে অনেকেই আগ্রহের সাথে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, কী রঙ ব্যবহার করেছি। কি করে পট বানানো হয়। পটের গান কী নিজেই লিখেছি ইত্যাদি। জানা গেছে, এর আগে দিল্লী ও ভোপালে তিনি প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণ করেন।
পট কিভাবে তৈরী হয়? তার উত্তরে তিনি জানান, আর্ট পেপারে ছবি আঁকা হয়। বিশেষ ঘরানার এই ছবি। আগে কালিঘাটে পটের কথা অনেকেই শুনেছেন। বা যামিনী রায়ের শিল্প কর্ম অনেকেই দেখেছেন। সেই আর্ট পেপারের নীচে কাপড় সাঁটানো হয়। আদিবাসীরা শিকারে গেলে কাঠবেড়ালি শিকার করে। তার লেজেই বানানো হয় তুলি। রঙ প্রাকৃতিক। মোরাম থেকে লাল রং। কাঁচাহলুদ থেকে হলুদ রং, সাদা রঙের সাথে অন্য রং মিশিয়ে বেগুনি, খোলার কালি থেকে কালো রং।
অরুণ পটুয়া বাবার ৮টি এবং দাদুর ১টি পট নিয়ে এসেছেন প্রদর্শনীতে। ১২৫ বছরের পুরানো পট সিন্ধুবধ দেখা গেল প্রদর্শনীতে। শ্রীপতি পটুয়া লিখেছেন পটের গান—অর্জ রাজার পুত্র রাজা/ নামে দশরথ/ সভা করে বসলেন লয়ে প্রজাগন/ প্রজাগণে বলেন উনি/ শোনেন মহাশয়। শনি রাজাকে নিলে রথ যাত্রায় …
বাঁকু পটুয়ার মোট ৮ খানা পট স্থান পেয়েছে এই প্রদর্শনীতে। যেমন- পরিবার কল্পনা, সিন্ধু বধ, নিমাই সন্যাস, গোপালন, বেহুলা লক্ষ্মীন্দর ও রবীন্দ্রনাথ অন্যতম। তিনি লিখেছেন- আমার ধ্যানের গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ জন্ম নিয়েছে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে/ পিতা তাঁর দেবেন্দ্রনাথ/ মাতা সারদা দেবী/ তাঁহার গর্ভে জন্ম নিলে …
Subscribe to:
Posts (Atom)
Gadget
Popular
-
বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই: দেবশ্রী মজুমদার ‘বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই, যাচ্ছে ফাটি বুকের ছাতি তোমার শোকে ভাই’। ব...
-
রম্যরচনা: দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার এখন আর সেই দুটি গ্রাম না থাকলেও, আই ডোন্ট নোউ, কেউ বলে না। তবে পাড়ায়...
-
আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার বড়শাল। কোনভাবেই আজ আর তাকে প্রত্যন্ত গ্রাম বলা যায় না। এখন শহরের হাওয়া লেগ...
হাতির দাঁত বাইরে দেখায়
সেই তো সবাই আসলে চায়--
গজদন্ত মুক্তো লুকায়
মুখের বাহির রয় না রয়।
একই সংখ্যা লঘু হয়
ওপার কিম্বা এপারে।
সেটাই যদি হক আনে
কত তফাৎ রঙের টানে!
আসলে
জানতে হয়
জানতে হয়
ক্যামনে ডিমে তা দেয়!
পদ্মা আর ভাগিরথী
কে আপন কে সাথী
গভীরতায় বেড়ে ফারাক
সংখ্যা বাড়ে সংখ্যা কমে
লড়াই চলে মানুষ যমে
রঙের আগুন যতই পোড়াক!
তোমার জল যতই লোনা
চিবুক পানে বইতে মানা!