পটুয়ার চোখে জলছবি---দেবশ্রী মজুমদার

পটুয়ার চোখে জলছবি
দেবশ্রী মজুমদার
শিল্পীর চোখে যখন জল, বিশ্ব স্রষ্টাও কী কাঁদে! হয়তো তাই। কারণ তখন শিল্প ও শিল্পীকে আলাদা করে চেনা যায় না!
" তোমার সিন্ধু মারা গেছে সরযু নদীর কূলে আরে কি কার্য করিলি রাজা কি কার্য করিলি আমার অন্ধের লড়ি রাজা তু কেন ভাঙিলি"(সিন্ধু বধ)। পটুয়াগানের তালে তালে পট দেখানো আর হয় না। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই শান্তনু পটুয়ার কথায় শিল্পী অরুণ পটুয়ার চোখ ছলছল করে উঠলো। ভারাক্রান্ত হয়ে বলে চললেন, শান্তিনিকেতনের খোয়াইয়ে শনিবারের হাটে বছর দুয়েক আগে পর্যন্ত এসেছেন পটের গান শোনাতেন দাদা। দাদা আর জীবিত নেই। আর বলতে পারলেন না। চোখে আর বাঁধ মানলো না ভাইপোর কথা বলতে গিয়ে। একটু থেমে বললেন, ভাইপো পট ছেড়ে পেটের ধান্ধায় কোন এক দোকানে কাজে লেগেছেন। এক বুক দুঃখ নিয়ে এঁকে চলেছেন....
শান্তিনিকেতনের নন্দন আর্ট গ্যাল্যারী। শিল্পী আপন মনে বসে পট আঁকছেন। পর্যটক থেকে উৎসাহী মানুষের আগ্রহের উত্তরও দিচ্ছেন। চলতি মাসের ১৬ তারিখ বিশ্বভারতীর কলাভবনের পেন্টিংস বিভাগের উদ্যোগে বেলা দুটো নাগাদ নন্দন আর্ট গ্যালারীতে পট প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়। সেখানে বেশ কয়েকজন পটুয়ার পট নিয়েই এই প্রদর্শনী। প্রদর্শনী চলবে ১৯ তারিখ পর্যন্ত। খোলা থাকবে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
শনিবারের প্রদর্শনীর দুপুরে একা পাওয়া গেল এক পটুয়াকে। নাম অরুণ পটুয়া। বাড়ি ময়ুরেশ্বর থানার ষাটপলশা অঞ্চলের সেরুনিয়া গ্রাম। তাঁর পিতামহ শ্রীপতি পটুয়া ও বাবা বাঁকু পটুয়া ছিলেন এলাকার বিখ্যাত পটুয়া শিল্পী। অরুণ পটুয়া বলেন, পটের গান শুনিয়ে আর পেট ভরে না। দু’এক কেজি চালে কী হবে বলুন? তাই অবসর সময়ে আঁকা শেখাই। তবে মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তাঁর জন্য মাসিকা হাজার টাকা শিল্পী ভাতা পাই। তাতে নুন তেলটা হয়। এর মধ্যেই মেয়ে পায়েল পটুয়া একাদশ শ্রেণীতে পড়ছে। তারপর পট শিল্পের কথা উঠতেই তিনি বলেন, পট শিল্প একদিন হারিয়ে যাবে। আমাদের পূর্বপুররুষরা ছিলেন বেদে। আমরা উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ। আমাদের রক্তে পট শিল্প। কিন্তু এখন আর কেমূল্য বোঝে! সরকারের উচিৎ পটের জন্য একটা মিউজিয়াম করে পট শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা। বর্তমান প্রজন্ম এই পট কি তা জানে না! তবে এই প্রদর্শনীতে এসে অনেকেই আগ্রহের সাথে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, কী রঙ ব্যবহার করেছি। কি করে পট বানানো হয়। পটের গান কী নিজেই লিখেছি ইত্যাদি। জানা গেছে, এর আগে দিল্লী ও ভোপালে তিনি প্রদর্শনীতে অংশ গ্রহণ করেন।
পট কিভাবে তৈরী হয়? তার উত্তরে তিনি জানান, আর্ট পেপারে ছবি আঁকা হয়। বিশেষ ঘরানার এই ছবি। আগে কালিঘাটে পটের কথা অনেকেই শুনেছেন। বা যামিনী রায়ের শিল্প কর্ম অনেকেই দেখেছেন। সেই আর্ট পেপারের নীচে কাপড় সাঁটানো হয়। আদিবাসীরা শিকারে গেলে কাঠবেড়ালি শিকার করে। তার লেজেই বানানো হয় তুলি। রঙ প্রাকৃতিক। মোরাম থেকে লাল রং। কাঁচাহলুদ থেকে হলুদ রং, সাদা রঙের সাথে অন্য রং মিশিয়ে বেগুনি, খোলার কালি থেকে কালো রং।
অরুণ পটুয়া বাবার ৮টি এবং দাদুর ১টি পট নিয়ে এসেছেন প্রদর্শনীতে। ১২৫ বছরের পুরানো পট সিন্ধুবধ দেখা গেল প্রদর্শনীতে। শ্রীপতি পটুয়া লিখেছেন পটের গান—অর্জ রাজার পুত্র রাজা/ নামে দশরথ/ সভা করে বসলেন লয়ে প্রজাগন/ প্রজাগণে বলেন উনি/ শোনেন মহাশয়। শনি রাজাকে নিলে রথ যাত্রায় …
বাঁকু পটুয়ার মোট ৮ খানা পট স্থান পেয়েছে এই প্রদর্শনীতে। যেমন- পরিবার কল্পনা, সিন্ধু বধ, নিমাই সন্যাস, গোপালন, বেহুলা লক্ষ্মীন্দর ও রবীন্দ্রনাথ অন্যতম। তিনি লিখেছেন- আমার ধ্যানের গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ জন্ম নিয়েছে জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে/ পিতা তাঁর দেবেন্দ্রনাথ/ মাতা সারদা দেবী/ তাঁহার গর্ভে জন্ম নিলে …

Comments

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার