ব্যাঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাজনীতি দেবশ্রী মজুমদার
শাস্ত্রে "শব্দ" পরম ব্রহ্ম। আর এটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে দেশের শাসক দল। শব্দকে অপমানজনক হিসাবে না নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক পরিচয়ে নয়া রাজনীতির জন্ম দিয়েছে ভারতে। যার গর্ভধারিনী সমাজ মাধ্যম।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয় দেশে।
২০২৬ সালের ১৫-ই মে একটি মামলার শুনানির সময় একটি বিষয়ের পর্যবেক্ষণে তিনি কিছু সক্রিয়কর্মী ও বেকার যুবকদের "আরশোলা/ তেলেপোকা" ও "সমাজের পরজীবী" বলে অভিহিত করেছিলেন, যা তাৎক্ষণিক জাতীয় ক্ষোভের জন্ম দেয়। আদালতে বহু মামলা পেণ্ডিং থাকে। এরমাঝে কিছু ব্যক্তি সমাজকর্মী, আর টি আই কর্মী হয়ে আদালত অবমাননার মামলা করে আদালতকে ব্যস্ত রাখে। দেশের এই বেকার যুবক শ্রেণীর কথা তাঁর পর্যবেক্ষণে আসে। তবে সবার কথা তিনি বলেন নি। যেটুকু জানা গেছে, তিনি বলেন, "সমাজে ইতিমধ্যে পরজীবী আছে যারা ব্যবস্থার উপর আক্রমণ করে, আর আপনারা তাদের সাথে হাত মেলাতে চান? তেলাপোকার মতো তরুণ-তরুণী আছে; তারা কোনো চাকরি পায় না, এবং কোনো পেশায় তাদের স্থান নেই। তাদের কেউ মিডিয়া হয়ে যায়, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে যায়, কেউ আরটিআই কর্মী হয়ে যায়, কেউ অন্য কর্মী হয়ে যায়, এবং তারা সবাইকে আক্রমণ করা শুরু করে... আর আপনারা অবমাননার আবেদন দায়ের করেন।
ব্যস! তার ফলশ্রুতিতে জন্ম সি জে পি বা ককরোচ জনতা পার্টি। ২০২৬ সালের ১৬ মে 'আম আদমী পার্টি'র সাবেক সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যম কৌশলবিদ অভিজিৎ দীপকে কোন সরকারি নিবন্ধনহীন দলের প্রতিষ্ঠা করেন। বিচারপতির তির্যক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে এটি অনলাইনে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে, আন্দোলনটি গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যে ৩,৫০,০০০-এরও বেশি নিবন্ধন এবং ইনস্টাগ্রামে ২ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি অনুসারী সংগ্রহ করে। আরশোলার ছবি দিয়ে সবার এক ট্যাগ লাইন -"আমিও ককরোচ"।।
রাজনীতিতে আগে একটা কথা প্রচলিত ছিল, কুকুরকে বদনাম করো, তারপর ফাঁসিতে লটকাও। এখন সেই শব্দকে ব্যাঙ্গাত্মক রসে চুবিয়ে বুমেরাং তৈরির করার চল এসেছে ভারতবর্ষে।
এভাবেই স্ফিনিক্সের মতো
ককরোচ জনতা পার্টির আবির্ভাব। তেলেপোকা বা আরশোলা পার্টি সমাজমাধ্যমে কতটা প্রভাবশালী সাম্প্রতিক কালে তার প্রমাণ মিলেছে। দিল্লির যন্তরমন্তরে তাদের আন্দোলনে দেশের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। একই ভাবে ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, সশস্ত্র নকশালবাদের অনেকাংশে অবসান ঘটলেও ‘দিমাগি নকশাল’ বা মানসিকতার দিক থেকে নকশালপন্থী লোকজন এখনো সমাজে সক্রিয় রয়েছে এবং তারা অরাজকতা তৈরির সুযোগ খুঁজছে। প্রতিক্রিয়ায় পি চিদাম্বরম, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মহুয়া মৈত্র প্রমুখ বিরোধী নেতা এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। পি চিদাম্বরম ব্যঙ্গ করে বলেন যে, তিনি ‘দিমাগি নকশাল’ হতে পেরে গর্বিত। সামাজিক মাধ্যমে রিজিজু জানান, ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে মূলত তাঁদেরই চিহ্নিত করা হয়েছে যাঁরা মাওবাদীদের সমর্থন করেন ও ভারতীয় সংবিধান অস্বীকার করেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পাশে দাঁড়িয়ে ৩৭০ ধারাকে সমর্থন জানান এবং দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করতে চান।
কিন্তু, এই ব্যাখ্যা খুব কাজে দেয় নি।
প্রধানমন্ত্রীর 'দিমাগি নকশাল' শব্দটি ব্যবহার করার পর সেটিকে ঘিরে একটি ব্যঙ্গাত্মক সোশ্যাল-মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বা অনলাইন পার্টি তৈরি হয়েছে। “Dimagi Naxal Party” নামে ইনস্ট্রাগ্রামে পেজ তৈরি হয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১.৮১ লক্ষ অনুসারী পেয়ে যায়। হিন্দুস্তান টাইমসের কথা অনুযায়ী, তাদের স্লোগান/মোটো হিসেবে “থিঙ্ক, রিসার্চ, রেজিস্ট” ব্যবহার করা হয়েছে। পেজে মিম, ব্যঙ্গাত্মক গ্রাফিক্স, রিল, কবিতা ও রাজনৈতিক মন্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিশ্রুতিভঙ্গের অভিযোগ তুলে নতুন আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। 'স্কুল ঠিক করো' দেশব্যাপী অভিযান শুরু করেছে সিজেপি। সরকারি স্কুলগুলোর বেহাল পরিকাঠামো ঠিক করার দাবিতে স্বাধীনতা দিবসের দিন থেকে "স্কুল ঠিক করো" অভিযান শুরু করেছে তারা। এই আন্দোলন এখন শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ফ্রন্টলাইনের মতো ম্যাগাজিনে তাদের কার্যকলাপ স্থান করে নিয়েছে। সমর্থকদের ফ্রি লিগ্যাল এইড দেওয়ার জন্য ওয়েবসাইট খুলে বসেছে।
এখন রাজনৈতিক নেতারা সচেতন না হলে, নিত্যনুতন রাজনৈতিক দলের জন্ম হবে অনলাইনে। নেতাদের কেউ কেউ খোলা মঞ্চে গালিগালাজ করেন। সাবধান! ওপেন ফোরামে "শালা" পর্যন্ত বলবেন না। তখন দেখবেন, "আমি ও ককরোচ বা দেমাগি নকশালের" মতো, বলবে, "আমিও শালা"। বলতেও পারে, আমিও আপনার শালা। তাই, সাবধান!
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Gadget
আল্লাহ ভালো রাখসিলো, বান্দায় খাইসে দেবঋষি ০২/০৯/২৬
আল্লাহ ভেদ করে ন্নি ভালো রাখ্সিলো। বান্দায় রাখ্সে নি-- বুঝোন্নি-- আল্লাহ ভালা ছিলো বান্দায় রাখ্সে নি।। কথা গুলান হুনছিলা রংপুরে কইছেন এ...
Popular
-
বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই: দেবশ্রী মজুমদার ‘বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই, যাচ্ছে ফাটি বুকের ছাতি তোমার শোকে ভাই’। ব...
-
রম্যরচনা: দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার এখন আর সেই দুটি গ্রাম না থাকলেও, আই ডোন্ট নোউ, কেউ বলে না। তবে পাড়ায়...
-
আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার বড়শাল। কোনভাবেই আজ আর তাকে প্রত্যন্ত গ্রাম বলা যায় না। এখন শহরের হাওয়া লেগ...
No comments:
Post a Comment