ঠোঁটের কোনে হাসিতে ছিলো না হঠকারিতা, যতোটা ছিলো চলে যাওয়াতে: প্রসঙ্গ আশীষ স্যার দেবশ্রী মজুমদার
প্রথম দিকে যতটা সব কিছু সহজভাবে নিতে পেরেছিলেন, শেষের দিকে পারেন নি। তাই ঠোঁটের কোনে হাসির তরতফাৎ ছিলো। কংগ্রেসের টিকিটে ১৯৮৭ ও ১৯৯২ দু'বার পরাজিত হন আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষের বার নির্বাচনে লড়াই করতে গিয়ে স্ত্রীর গয়না বিক্রি করতে হয়েছিলো। দলে ক্রমাগত কোনঠাসা হয়ে তৃণমূলে আসা। তখনও হার মানেন নি। প্রকাশ্যে বলেছিলেন, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল ছাড়তে হয়েছিলো, আমি তো কোন ছার! এবার নির্বাচনে পরাজিত হয়ে, মমতার সঙ্গ ছাড়তে গিয়ে তাঁর হাসির সেই তফাৎ সহজেই ধরা পড়ে। অপমানিত আগে যে হন নি, তা নয়। অনুব্রত মণ্ডল তাঁকে প্রকাশ্যে "অপদার্থ" বলেন। মেনে নিয়েছিলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ডিপ্লোম্যাসি করে বলেছিলেন, পরে যে প্রশংসা করলো, সেটা দেখলেন না। এভাবেই সব মেনে নিয়েছিলেন। তখনই অনেক শুভানুধ্যায়ী বলেছিলেন, এর ব্যবস্থা না হলে রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া উচিৎ। তখনও হাসি ছিলো। ইঙ্গিত ছিলো, সব সামলে নেব। মাঝে ভাইপো নিয়ে দলের অন্দরে ও বাহিরে প্রশ্ন ওঠায় দল থেকে তাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। ফের সেই ভাইপোকে এক প্রকার ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন। অনেকটাই সাবোতাজের আতঙ্কে, এমনটাই ছিলো বাতাসের আগের খবর। ২২ সালে রামপুরহাটে পুরনির্বাচনে পাঁচটি ওয়ার্ডে নমিনেশন করতে দেওয়া হয় নি। ২০১৮-২৩ পঞ্চায়েত প্রাক নির্বাচনেও, ছিল একই হুমকির রাজনীতি। একজন তাঁর কাছের লোকের কাছ থেকে শোনা, তিনি প্রথমে এটা মেনে নিতে পারেন নি। তার জন্য তাঁকে বলা হয়, খুব ভাগ্য ভালো যে তাঁকে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বলা হয় নি। তখনও দল ছাড়তে পারেন নি।
রাজনীতি ছিলো রক্তে নেশা। সাইকেলে পাঁই পাঁই করে ঘুরতেন। বড়শাল, দেখুড়িয়া এসব রামপুরহাট লাগোয়া ছিল একরকম ভাতঘর। প্রবীণ কংগ্রেস নেতা প্রাতস্মরণীয় অভয়াপদ ভট্টাচাৰ্যর কাছে গেছেন। তাঁর পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিয়েছেন। রামপুরহাট পার্শ্ববর্তী গ্রামের প্রায় সবাই তাঁর ছাত্র ছিলো। বড়াই করে বলতেন, সব গ্রামে আমার ছাত্র। ছাত্র অন্তপ্রাণ ছিলেন। কলেজে একটা দিন কামাই করেন নি। রামপুরহাট মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র ছাত্ররা আগেই বলে দিতেন, প্রথম দিনে কী কী বানান ধরবেন। তার মধ্যে দুই একটি হলো- কুজ্ঝটিকা ও ভুল। আগে থেকে জানা না থাকলে ভূল বানান করতো। বেঞ্চে দাঁড় করিয়ে বলতেন, ভুল বানানটাই ভুল করলি। কলেজে পড়া না পারলে শাস্তি পেতে হয়, তিনিই দেখিয়েছিলেন। মন্ত্রী হিসেবে কোন স্কুলে কোন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হলে প্রায়শই দেখতেন, প্রধান শিক্ষক তাঁর ছাত্র। বক্তৃতা দিতে উঠে ছেলের বাবাকে চিঠি লেখার একটা গল্প খুব বলতেন, "টাকা পাঠাইয়া প্রণাম নেবেন।" অর্থাৎ তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তহবিল থেকে কিছু দেওয়ার জন্য। কথাটা খুবই সত্যি। এটা সবাই খুব উপভোগ করতেন। আর তিনি খুব মজা করে মিষ্টি হেসে বলতেন। আরেকটি ঘটনা শোনা, তাঁরই এক স্নেহ ধন্যা ছাত্রী স্কুল শিক্ষিকার কাছে। বাড়িতে দোতলায় একটি ঘরে টিউশন পড়াতেন। সেই সময় অনেকেই বিভিন্ন কাজে আসতেন। সবার সাথে কথা বলতেন। কাউকে নিরাশ করতেন না। একবার এক বৃদ্ধা এসেছিলেন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। সব কথা শুনলেন। আশ্বাস দিলেন। বৃদ্ধা দোতলা থেকে নেমে আবার ফিরে এলেন। আশীষবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, সব কথা তো হলো। আবার কী? বৃদ্ধা বললেন, একটা কথা বলা হয় নি। আমার বাম কানটাতে একটু ব্যাথা হচ্ছে। যদি যন্ত্র নিয়ে একটু দেখে দিতে। আশীষ বাবু বুঝলেন বিভ্রান্তির জায়গা কোথায়। ভোট প্রচারে দেওয়াল লিখনে লেখা ছিলো ড. আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই চিহ্নে ভোট দিন। ব্যস্! বৃদ্ধার বিপত্তি "ড." শব্দকে নিয়ে। আশীষবাবু মজা করে হেসে হেসে বললেন, আসলে যন্ত্রপাতি সব সারাই করতে দেওয়া আছে। ছাত্র ছাত্রীরা হো হো করে হেসে উঠলো। বৃদ্ধা অবাক হয়ে তাকিয়ে নেমে গেলেন। ভাবলেন, এ কেমন ডাক্তার!
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Gadget
আল্লাহ ভালো রাখসিলো, বান্দায় খাইসে দেবঋষি ০২/০৯/২৬
আল্লাহ ভেদ করে ন্নি ভালো রাখ্সিলো। বান্দায় রাখ্সে নি-- বুঝোন্নি-- আল্লাহ ভালা ছিলো বান্দায় রাখ্সে নি।। কথা গুলান হুনছিলা রংপুরে কইছেন এ...
Popular
-
বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই: দেবশ্রী মজুমদার ‘বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই, যাচ্ছে ফাটি বুকের ছাতি তোমার শোকে ভাই’। ব...
-
রম্যরচনা: দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার এখন আর সেই দুটি গ্রাম না থাকলেও, আই ডোন্ট নোউ, কেউ বলে না। তবে পাড়ায়...
-
আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার বড়শাল। কোনভাবেই আজ আর তাকে প্রত্যন্ত গ্রাম বলা যায় না। এখন শহরের হাওয়া লেগ...
No comments:
Post a Comment