ডোন্ট টক...দেবশ্রী মজুমদার

ডোন্ট টক...
---- দেবশ্রী মজুমদার
বোনের নিজের হাতে কাঁচা লঙ্কা দলে দেওয়া আলু, মূলো, বড়ির ভাসা ভাসা টকের স্বাদের নেশায় মন যখন বুঁদ হয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে টোটো তে উঠলো, তখন সামনে বসে থাকা তরুণীর ভাসা ভাসা চোখ দেখার ইচ্ছেও নেই, বয়সও নেই! তবুও কেন জানিনা, আড় চোখে বার বার দেখছিলো একজোড়া চোখ। সে যাই হোক! আমার চোখে তখন টকের নেশা। শিব নেত্র হয়ে যাচ্ছে বার বার! এক চোট ঘুম হলে ভালো হতো! ট্রেন লেইট থাকায় আপ কবিগুরু ট্রেন পেয়ে গেলাম। সিটও একটা জোগাড় হলো। আমার মাসতুতো, পিসতুতো বোন আছে। তবে সহোদরা বলতে একজন। বোলপুরে থাকে। ভাইফোঁটা উপলক্ষে যাওয়া। ইদানিং কালে বোনের শরীর ভালো যাচ্ছে না। তবে ভাইদের দেখে শরীর যেন চাঙ্গা! ভগ্নিপতি চাকুরে। অফিস যাওয়ার আগে মাংস ও পোলাও রেঁধে গেছিল। ভগ্নিপতির পুরোনো কর্মস্থল থেকে দাদা বৌদি, ননদ, ভাগ্নে, পুরোনো বাসার ভাই সবাই মিলে একরকম চাঁদের হাট! এসবের মাঝেও আমি টক ভালোবাসি তাই, টক রান্না হয়েছিল। ছিল আলুপোস্ত।
পোলাওয়ের সাথে টক যায় না। এটা সবাই জানি। তাই আলাদা করে সাদা ভাত ও হয়েছিল। এবার আসি একটু অন্য প্রসঙ্গে। যদিও তার সাথে টকের সরাসরি না হলেও একটা যোগসূত্র আছে। তখন আমি যুবক। পাশের গ্রাম সাঁকিরপুরে বেশ কয়েকঘর বোষ্টম বোষ্টুমীর বাস ছিল। সাদা কাপড় পরে তিলক কেটে তাঁরা মাধুকরী করত। তখন ভাবতাম এরা কি বিধবা! যাইহোক, একবার বাউল গানের আয়োজন করেছিল তাঁরাই। গান চলছে। বিশ্ব ভারতী থেকে আগত দুই জন বিদেশি পড়ুয়া মন দিয়ে গান শুনছেন। একে অল্প বয়স, তারপরে পরীর মত দেখতে তরুণী! প্রশ্ন করে জানলাম, তাঁদের বাড়ি অস্ট্রিয়া। তাঁরা অনুরোধ করল, কোন প্রশ্ন না করতে। অনুষ্ঠান শেষে তাঁরাও মাটিতে পাত পেড়ে খেতে বসলেন। খাবারের মধ্যে "টক" তাদের খুব ভালো লেগে যায়! জানতে চান- অটস দিজ? একজন পরিবেশক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যা বোঝাতে চেষ্টা করলেন, তাতে তাদের মনে হল খুব কসরৎ করেই এই "টক" বানানো হয়। পরিবেশক সোৎসাহে আরও ভালো ভাবে বোঝার চেষ্টা করতেই-- আরেক পরিবেশক বলে উঠলেন একটু বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথেই-- "ডোন্ট টক"। দুজনেই বক্তার দিকে ভয়ে ভয়ে সেই যে চুপ মেরে গেলেন, আর কথা বলেন নি। দ্বিতীয় পরিবেশক অবশ্যই বলতে চেয়েছিলেন, ইটস নট হোয়াট ইউ আর সেইয়িং। ইটস টক ( সাওয়ার)। টক এমনওতর জিনিস! এবার আসি এদিনের কথায়। আগেই একপেট টিফিন খেয়েছি। যাকে বলা হয় "বাটা"। বোন ফোঁটা দিল। যমের দুয়ারে কাঁটা বলেই কেঁদে ফেললো। চোখে ফুটো আছে বলে, ভাগ্নি থেকে ভগ্নিপতি পরিবেশ সহজ করার চেষ্টা করলো! আনন্দের দিনেও চোখে জল! আমারও মনে পড়ে গেল ছোট বেলায় বাবা কেমনভাবে এই ফোঁটার আয়োজন করতেন। জেলাপি, কদমা, আঁকুর ইত্যাদি( শুকনো তালির আঁটি ফাটিয়ে সাদা শাঁস)। শুধু আমাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য, দূরে বোনদের কাছে যেতে পারতেন না! আর ছিল সংসারে অভাব! আত্মবঞ্চনার মধ্যে দিয়েও সে এক অদ্ভুত সুখ পেতেন বাবা। দুই হাঁটুর উপর ভর দিয়ে শরীরটাকে একটু ঝুঁকিয়ে আমাদের খাওয়া দেখতেন। আজ নেই! সেদিন ছিল না স্মার্টফোন, ছিল না জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত স্টাট্যাস দিয়ে সবাইকে জানানোর সামর্থ্য! আজ সেটা আছে। আজ অভ্যস্ত! নেই শুধু সেই অনুভূতির দিন! আজ নিজের থেকে নিজে এতটা দূরে, সব কিছু মানিয়ে নিতে চাইলেও কোথা থেকে সঙ্কোচ, দ্বিধা একসাথে এসে জড়ো হয়। সেই মৌন মুখর প্রশ্ন এভাবেই বার বার সুখের মুহূর্তে চোখ বেয়ে বাইরে কোথাও যেন অন্তঃস্থল খুঁজতে যায় বৃথাই! রাজার মত অহঙ্কারে বোন কে বলেছিলাম, আজকে কি চাস বল? দেব! কত বার জড়িয়ে ধরলো বোন! তার পর অশ্রু সজল চোখে শুধু বললো-- তোরা ভালো থাক! নিশ্চিত হলাম আরেকবার, দধীচি কোন পুরুষ ছিল না!
-- না হয় আমি দধীচি হলাম
না হয় আমি স্বপ্ন ছুঁলাম!
এপার থেকে ওপার!
না হয় চেষ্টা মৃত সেতো
সেতু বরাবর।
না জানি কি পেল, পেলাম
না হয় আমি দধীচি হলাম
নে গুণে নে বজ্র হানার
বুকের ক'খানি হাড়!
পারিস যদি সেতু বানা
আঁধার ফুঁড়ে আলো আনার!

     

Comments

Post a Comment

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার