এক নম্বর কমঃ  দেবশ্রী মজুমদার

এক নম্বর কমঃ  দেবশ্রী মজুমদার
 বালিগঞ্জে এসবি মোড়ে একটা হনুমান মন্দির ছাড়িয়ে  আরো একটু উত্তর দিকে কুঞ্জ এপার্টমেন্টস । ওখানেই ৫ম তলায় ডান দিকের রোতে একদম নাকবরাবর ফ্ল্যাটেই থাকেন এক মহিলা। ওখান থেকে বালিগঞ্জ গার্ডেন্স। সেখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে ওয়ার্ড নং ২৩ এ গার্ডেন ভিউ নার্সিং হোমের কাছে বাসন্তীদেবী কলেজের করণিকা তিনি। প্রতিদিন  এস -৩ ডব্লিউ বাসে এতটা পথ হাঁফিয়ে ওঠেন। হংকং ব্যাঙ্কটা ছাড়িয়ে একডালিয়া রোডে মিল্ক বুথটার কাছে এলে ধড়ে প্রাণটা ফিরে আসে। ওখান থেকে কিছুটা পায়ে হাঁটা পথ ধরে অটো ধরে বাড়ি। থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর। ভাল্লাগে না।  একমাত্র মেয়ে বালিগঞ্জ ষ্টেশনের কাছে নিউ কিডস হোম স্কুলে পড়ে। ইংলিশ মিডিয়াম। প্রচন্ড পড়ার চাপ।  যার কথা বলছিলাম তাঁর নাম লীনা বন্দ্যোপাধ্যায়। লীনা নামের সাথে বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক মানায় না। তাই নিজেকে মিস ব্যানার্জী বলেই ডাকা পছন্দ করেন তিনি। জানুয়ারির ২০ তারিখ শনিবার। কলেজে  ছুটি, ২১ তারিখ রবিবার, ২২ তারিখ বসন্ত পঞ্চমী, ২৬ তারিখ রিপাবলিক ডে, ২৭ তারিখ ফোর্থ স্যাটারডে, ২৮ তারিখ আবার রবিবার। মাঝে ২২ থেকে ২৫। মাত্র তিন দিনের ছুটি কি মিস ব্যানার্জী ম্যানেজ করতে পারবে না?  পরিচালন সমিতিতে ওয়ার্ড কাউন্সিলার মধুদা আছেন কেন? মাঝে মাঝে কাছে এসে মিস্টি মিস্টি কথা বলেন। ওঃ ম্যানেজ হয়ে যাবে। এমনিতেই সৌন্দর্য্যের পুজারী। খুঁটিয়ে দেখে মন্তব্য করেন। এই লীনা,  হেয়ার স্পাটা কোথায় করো? আপনার গিন্নী কোথায় করে? জিজ্ঞেস করলুম মুখ টিপে হেসে।  আরে ওর জন্যই তো জিজ্ঞেস করছি। - দেঁতো মধু ঢেকুর তুলে কথা বলল যেন! মনে মনে বললাম, তোমারে আমি চিনি না গোপাল! যাকগে! ওই মধুদাই! লীনা, তোমার মুশকিল আসান! বিপদ তারণ, সব কিছু। বিড়ালাক্ষী প্রিন্সিপাল মালা দে  ‘না’ করতে পারেন নি।  শুধু অযাযাচিত ভাবেই বললেন, শরীরটা ঠিক রেখো! কেমন খটকা লাগলো যেন! কেন ম্যাডাম? না শরীর তো! দেখো না আমার কি হাল হয়েছে। চোখটা আড় করে ফাইল থেকে মুখ না তুলেই, বললেন,  বেড়াতে যাচ্ছ তো, তাই বলছিলুম।  মনে মনে ওর ইঙ্গিতটা বুঝলুম। ধুত! বস্তা পঁচা সেন্টিমেন্ট ধরে রাখলে আর চাকরী জোটাতে হত না।  তারপর কলেজ থেকে বেড়িয়েই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম।  বাব্বা!  টানা ৮ দিন ছুটি। বহুদিন দিদির বাড়ি যাওয়া হয় নি।  ফোন করে জানল এপ্রিলে একটা ইউনিট টেস্ট আছে দিদির মেয়ের দিয়ার। নো প্রবলেম চলে আয়!—দিদি কেয়া বোস জানালো।  মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট ট্রিপ তারাপীঠ।  শিয়ালদায় ৭-১০  মাতারা  এক্সপ্রেস। রামপুরহাট ১২-৩০। ষ্টেশনে রিসিভ করতে এসেছিল দিদি নিজেই! টোটো করে দিদির বাড়ি। বাড়িটা পুরানো। ফ্ল্যাট কালচার থেকে মুক্ত। তবে বাড়ির চারিদিকে বাগান। জায়গাটার নাম হরিসভা পাড়া। একটা দুর্গা মন্দির আছে। পুকুর আছে। বাঁধানো ঘাট। দিদি জানালেন, আরে সেই রামপুরহাট আর নেই। এখানে শপিং মলের পর মল। আর প্রমোটার এপার্টমেন্টের পর এপার্টমেন্ট বানিয়ে চলেছে। আমাদের কবে থেকে চাপ দিচ্ছে জায়গাটা বিক্রি করে দিতে। জায়গার দাম ছাড়াও অফার দিচ্ছে একটা বড় ফ্ল্যাটের। কিন্তু ও রাজী হচ্ছে না। ও মানে কর্তা চন্দন বোস। পেশায় মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ। নে, তাড়া তাড়ি তোরা ফ্রেস হয়ে নে। কথার মাঝে বলল দিদি। তারপর আঙুল দেখিয়ে বলল, বাথরুমে কল আছে। ডান দিকে ঘোরালে ঠাণ্ডা আর বাম দিকে গরম। মেয়েকে স্নান করিয়ে দিল দিদি। আমি আরেকটা বাথরুমে ফ্রেস হয়ে বাইরে বেড়িয়ে শীতের রোদে চুল এলিয়ে বসলাম। দিদি তোর হেয়ার ড্রাই আছে রে! জিজ্ঞেস করতেই, দিদি জানালো তোর জামাইবাবু মেডিক্যালের লোক না?  কোম্পানী থেকেই হেয়ারড্রাই পেয়েছে এটা। বলেই হাতে ধরে ধরিয়ে দিল। বারান্দায় পয়েন্ট আছে ওখানে বস গিয়ে। শীতের কাঁপুনিটা এখানে বেশি মনে হল লীনার। পুকুরের উপর হাওয়াটা তির তির করে বয়ে যাচ্ছে। চাদরটা জড়িয়ে নিল। ওর ব্যাপারে দিদি কোন দিন কোন কিছু জানতে চায় না আর। চুলটা শুকিয়ে নিয়ে দিদির হাতের এক কাপ গরম কফিতে চুমুক দিতেই শরীরটা উষ্ণ হয়ে উঠল একটু। দূর থেকে জলের একদম উপরের স্তরে কোন পোকা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু স্থির জলে যেন জাল বুনে চলেছে। একটা কালসিঁটে ব্যাং উঁকি মারছে। আবার ডুবছে।  আরো কাছে গিয়ে একদম জল থেকে কিছুটা দূরে শেষ ধাপিতে বসে পড়ল লীনা। পুকুরের এক পাশে অসুরের একটা খড় দড়ি দিয়ে বাঁধা কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে।  তার থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে জলের দিকে চোখ ফেরাতেই দেখলো ছোট ছোট মাছ একদম ধারে। কি গতিতে তারা  লেজ নাড়ছে। ইচ্ছে হল  শ্রীনিকে ডাকার। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দিয়ার সাথে খেলছে। লীনার মন আবার নিবদ্ধ হল স্থির জলে। এবার শীতের ঝাপটা বাতাসে জলের উপরটা আলতো করে চাটাই গোটানোর মত গুটিয়ে গেল যেন। অস্থির বাতাসে লম্বা ঘাসের উপর হলুদ ফড়িংয়ের লেজের মত তার মন যেন কাঁপতে থাকল। দিদি ব্যস্ত রান্নায়। রাত্রের আগে চন্দনদা ফিরতে পারবে না।  দিদি হাউস ওয়াইফ। বাবার অমতে বিয়ে। তবে ওরা সুখী।  আর আমি! যেন সিংগল মাদার। বাবার  পদবী নিয়ে ঘুরছি। স্বামী অনেকদিন আগেই অন্যজনকে নিয়ে ভেগেছে। মুম্বাইয়ের ট্রি লাইফ কন্সাল্টেন্সিতে বড় অফিসার ছিলেন। মজলেন অফিসের এক পাঞ্জাবী রিসেপসিনিস্টের সাথে। ১৯/ এ – ৭  ওয়েস্ট নিউ সিওন । সিজ কলেজের উল্টো দিকে। ঝাক্কাস অফিস। বছর খানেকের সংসার। শ্রীনি পেটে আসার পর থেকেই বাঁধন গুলো আলগা হতে লাগল। শুরু হল স্ট্রাগল। আজ ‘আ সাকসেসফুল সিংগল মাদার’। মেয়ের বাবার পরিচয় সে কোথাও দেয় না।
মন্দিরে উঠতে পারলাম না। দূর থেকে প্রনাম জানালাম। এসময় মেয়েদের ওঠা যায় না। সব কিছু মানিয়ে নেওয়ার জন্যই তো মেয়েদের জন্ম। প্রশ্ন করলাম, মা যে সন্তানরা তোমাকে ভক্তিভরে পুজো দিতে আসে, তাদের ভক্তির অকারণ আতিশয্যও তো তোমাকে বোধ হয় মানিয়ে নিতে হয়। দিদি আসতে পারল না। দিয়া পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। সন্ধ্যেয় টিউটর আসবে পড়াতে। যে দিনকাল পড়েছে ! একদম কাউকে বিশ্বাস করা যায় না! কি বল ? আমার সমর্থন চাইল দিদি। মনে মনে বললাম, আমার থেকে কে বেশী জানে! জোরে বললাম- সে তো ঠিকই। দিদির বাড়িতে বেশ কাটল ক’দিন। এবার ফিরে যাওয়ার পালা। মেয়েকে নিয়ে আমার স্বপ্নগুলো শেয়ার করলাম দিদির সাথে। চন্দনদাও খুব অমায়িক।  দিদি বলতে থাকল, একসাথে থাকতে থাকতে ঝগড়া হয় নি তা নয়। সন্দেহ যে কোনদিন বাসা বাঁধে নি তা নয়। প্রথম প্রথম দেহের আকর্ষণ বেশী। তাই কেউ তোর চন্দনদার দিকে তাকালেই রাগ হত। বন্ধুর বউদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে রাগ হত। কিন্তু ওর একটা ভালো গুণ মদ ছোঁয় না। দিদি বলেই চলল। চন্দনদা – প্রিন্সের কায়দায় –মাই প্লেজার বলে স্মার্টলি উঠে একটু বাও করে নিজের বুকের উপর হাত দিল।  দিদি যেন থামতেই চাইছিল না।- তবে একটা কি জিনিস জানিস। একটা অবলম্বন দরকার। আমি আর ওকে নিয়ে কিছু ভাবিনা। মেয়েই আমার জীবন। -আমি ভাবলাম, সে সুযোগটা আমি পেলাম কোথায়?  মেয়ে জন্মাবার আগেই তো ভেগে পড়ল হিপোক্রিটটা। চন্দনদা বলল, আমার শালী রাঁধেও আবার চুল ও বাঁধে। --সে তুমি চাকরী করা মেয়ে বিয়ে করতে পারতে। নকল রাগ দেখিয়ে বলল দিদি। সেই বরং ভালো ছিল- একটু শ্লেষের সুরে বলল চন্দনদা। -- তাহলে অন্ততঃ মেয়ের উপর অত্যাচারটা কম হত। একটা দিন টিউশন কামাই করা যাবে না। সেজন্য তারাপীঠ গেল না। দিয়া তো আনন্দ পেত! দিদি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু গ্যাস ওভেনের বিফল লাইটারের মত দুবার ঠকাঠক আওয়াজ করে মিস ফায়ার করল। চন্দনদা দুই বোনকে ডেকে নিল নিজের কোলে। তাদের হাতে চকলেট দিয়ে বলল, যাও তোমরা কার্টুন দেখ গে যাও! ওই কার্টুনেই তো মাথা খেল। জানিস, সেদিন দিয়া আমাকে এসে বলে, মা তুমি বাবাকে  কিস করো না কেন? মারিনা তো সার্কোকে কিস করে। নাও ঠ্যালা! আমি হাসছিলাম। দিদি রেগে বলল, তুই হাসছিস? জানিস ও কি করেছে অক্টোবরের ইউনিট টেস্টের সময়? চন্দনদা রেস্লিংয়ের রেফরির মত –ওয়ান ট্যু থ্রি করে ঘটনার বিস্তারিত পর্যানুক্রমিক  বর্ণনা দিতে থাকল। দূর থেকে দিয়াকে আহত প্রতিযোগীর মতই দেখাচ্ছিল।  যাহোক চন্দন্দার বর্ণনা যে দিদির এজলাসে আপীল অযোগ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবুও সে  বলে চলল  --আমার মেয়ের ইংরেজী আর পরিবেশবিদ্যা মিলে কুড়ি কুড়ি করে মোট ৪০ নাম্বারের তৃতীয় পার্বিক পরীক্ষা ছিল। ওর পিছনের বেঞ্চে বসা মেয়েটি পরিবেশ বিদ্যার প্রশ্ন দেখে  ভয়ে শরীর খারাপ। দিয়াকে বলছে, তুই আন্টিকে বল আমার মাকে ফোন করে ডাকতে, আমি  পরিবেশ বিদ্যা পরীক্ষা দিতে পারব না। মেয়ে, আন্টিকে বলতে গিয়ে ভুলে গিয়ে একটি প্রশ্ন বাদ দিয়ে এসেছিল। তারজন্য এক নাম্বার কম পেয়েছিল। মানে ২০ তে ১৯। ওই ফার্স্ট গাল ছিল এবং আছে। আর ফার্স্ট না হলে কি অসুবিধে? এটাইতো বুঝে উঠতে পারলাম না।  এই বলে মেয়েকে নিজের কাছে ডেকে নিল। পড়াশোনার গুরু গম্ভীর আলোচনার মধ্যে আমার মেয়ে আমার গা ঘেষে দাঁড়িয়ে ডান হাতটা জড়িয়ে ধরল। দিদি থামতে চাই না। একটু জোরেই বলল,  আর মেয়ে কেমন গাধা দেখ, ওর কথা শুনতে গিয়ে নিজে জানা উত্তর ছেড়ে এল। আর ওই মেয়েটি  ইংরেজীতে ২০ তে ২০।  এবার দিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনে মাসিমনির দিকে চেয়ে বলল, ও তো সত্যি পরিবেশবিদ্যা পরীক্ষাটা দিতে পারে নি। ভয়ে আন্টিকে বলতে পারছিল না। ওর শরীর খারাপ ছিল। এ্যাই, তাহলে ২০ তে ২০ কি করে ও পায় রে? আমাকে শেখাচ্ছিস? দিদি ফস করে উঠল।  – মিউ মিউ করে দিয়া বলল, ওর তখন ইংরেজীটা হয়ে গেছিল। আমারও হতো, আন্টিকে ডাকতে না গেলে। দিয়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। শ্রীনিও চুপচাপ। কিছুক্ষণ আগে দিদি ‘অবলম্বনের’  কথা বলছিল।  বড় থেকে ছোট আমরা সবাই একটা অবলম্বন চাই ঠিকই। খুব আঁকড়ে ধরতে চাই। কিন্তু শুধু ‘এক’ কম মেনে নিতে চাই না। এখানে দিয়া ‘এক’  কম পেয়েছে। চন্দনদা কিছু মনে করে নি। দিদি মনে করেছে। আমার জীবনে হয়ত এরকম কোন ‘এক’ কম ছিল তাই একদিনের ভালোবাসার মানুষটি আমাকে মেনে নিতে পারে নি। সবাই ফুলমার্কস চায়। হান্ড্রেডে হান্ড্রেড। নো কম্প্রোমাইজ। একে ইঁদুর দৌড় বলব না। ইঁদুরের ও ধৈর্য্য অপার। মানুষের তা ছিঁটে ফোটা  নেই! ছোট্ট মেয়ে দিয়া ‘এক’  কম পেয়েও অন্য মানসিকতার পরীক্ষায় যে ‘এক’ বেশী পেয়েছে, তা দিদি বোঝে নি। লীনা তোমার অন্য ‘এক’  বোঝার ক্ষমতা শ্রীনিবাসের কোনদিন ছিল না! রাতের অগনিত তারা লীনাকে দূর থেকে দূরগামী বন্ধুর মত ইশারায় জানতে চাইল, লীনা তুমি সব কিছু এড়িয়ে লীন হতে পারবে? জানি ভুলতে পারবে না। কারন তোমার ‘এক’ কম ছিল না। তবুও শ্রীনির দিকে তাকিয়ে ওসব ভুলে যাও! এ চেষ্টায় যেন ভুল না হয়। ‘এক’ কমও না হয়। জেনো, তারারা এত দূরে,  তারাও দিকভ্রান্ত নয়। মেয়ের জীবন শুরু হলে তোমাকে আবার নতুন অবলম্বন খুঁজে নিতে হবে। সেদিনও বাঁচার রসদ ঠিক পেয়ে যাবে!!!  কোথাও এক কম , কোথাও এক বেশী।           

Comments

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার