
ভ্রান্তি বিলাস: দেবশ্রী মজুমদার
সকাল থেকেই মেজাজ বিগড়ে প্রতিবেশী হিড়িম্বা বৌদির। মানে হিড়িম্বা নামও নয়, দেখতেও নয়। ঢুলু ঢুলু চোখ, একেবারে স্লিম না হলে ও দোহারা শরীর। খুব ভদ্র লক্ষ্মী মন্ত পতিপরায়না। এমনিতে শান্ত স্বভাবের। অত্যন্ত বিনয়ী। কিন্তু এখন যেন হিড়িম্বার তেজ। আর সেখানেই চিন্তা!! গিন্নিকে কিছু বলতে পারছেন না বিনয়বাবু মানে বিনয় চৌধুরী। নাকতলার মোড়ে নিকুঞ্জ ভবনে থাকেন। নতুন এসেছেন। ফ্ল্যাটের পুজোতেই আলাপ ভদ্র মহিলার সাথে। কি সুন্দর জোড় হাত করে হিন্দু স্তানী কায়দায় নমস্কার করলেন। মনটা ক্ষণেকের জন্য হু হু করে উঠলো। কিন্তু পাশেই খড়্গ ধারিনী মানে তাঁর স্ত্রী মিসেস চৌধুরী হুঁ হুঁ করায় বেশিক্ষণ কথা বলা হয় নি।
একদিন গিন্নি ছিলেন না বাড়িতে। ফোনটাও রেখে গেছিলেন। হ্যালো! মিসেস চৌধুরী বলছেন? না আমি উনার হাজব্যান্ড বলছি। ভালো আছেন দাদা। তার পর ভালো আছি কি নেই উত্তরের অপেক্ষা না করেই, বললেন, দিদিকে বলবেন, আমি ফোন করেছিলাম। ব্যস! ফোন কেটে দিলেন। বয়স বাড়লেও বোধ হয় দুষ্ট বুদ্ধির বয়স বাড়ে না। ফটাফট ফোন নং লিখে নিজের মোবাইলে সেভ করে নিলেন নিলয় নাম দিয়ে। নেট অন করে দেখা গেল ওটাই হোয়াটসঅ্যাপ নং। ওঃ কেল্লা ফতে! মনকে প্রবোধ দিলেন, এখন নয়, সবুরে মেওয়া ফলে! সেই মেওয়া এখন ফলছে! ওঃ কি কুক্ষণে না এসব দুর্বুদ্ধি মাথায় এসেছিল।
টুংটাং! কলিং বেল। দরজা খুলতেই সেই বিনয়ের অবতার মানে মিসেস রায় ও গিন্নি ঘরে ঢুকেই অজানা ফরিয়াদির মুন্ডপাত করতে আরম্ভ করলেন। ছিঃ ছিঃ কুক্ষণ না এলে কি এসব দুর্বুদ্ধি মাথায় আসে! পড়ত আমার পাল্লায়, মাথার চুল একখানা আস্ত রাখতাম না। অবচেতন মনে, নিজের মাথায় হাত দিলেন বিনয়বাবু্। পিছনে অর্থাৎ বাম্পারে কয়েক গাছি লম্বা চুল। মাথাটা যদি তাঁর ভারতের ম্যাপ হত, তাহলে একেবারে দক্ষিণের কেরালা থেকে চুল টাকে টেনে একেবারে কাশ্মীরের কপোল তলে ফেলে বিস্তৃত অঞ্চল ঢাকতে হয়। সে যে কি দক্ষতা, কি ম্যানুয়াল লেবার তার, তা কহতব্য নয়। সেই চুলেই হাত! শিউড়ে উঠলেন বিনয় একবার। গিন্নি বললেন, দুকাপ চা নিয়ে এসে তো চানাচুর বুড়ো। কোন এক সিরিয়ালে স্বামীকে ওই নামে ডাকে তাঁর গিন্নি। তারপর থেকেই... গরমা গরম চা হাজির। মিসেস চৌধুরী আত্মতৃপ্তির হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বললেন, আমার স্বামীর বাবা ওই দোষ নেই। -- তা ঠিক, দাদার ওসব নেই, তাল মিলিয়ে বললেন মিসেস রায়। আর এদিকে দাদার যা অবস্থা! মুখের জিওগ্রাফি হাসির না কান্নার স্বয়ং বিধাতার বোধগম্যের বাইরে! ---হ্যারে মেসেজ টা আছে তো? ওই নাম্বার টা আমাকে দিস তো? জানতে চাইলেন মিসেস চৌধুরী। -- মেসেজ আছে। কড়া করে মেসেজ পাঠানোর পর সুইচ অফ, জানালেন মিসেস রায়। শুনেই ফের সগর্জনে বলে উঠলেন, বটে! দেখছি। ওর ফোন থেকে বার বার ট্রাই করব। এই যে শুনছ? তোমার ফোনটা দাও তো একটা কল করতে হবে। মুখ কাঁচুমাচু করে হাত কচলাতে কচলাতে আসামী হাজির হয়ে জানালেন, সিমটা ব্লক হয়ে যাওয়ায় নতুন সিমের জন্য দোকানে বলেছি। কাল দেবে।---কাজের সময়--- যাকগে। সিম পাল্টে কিছু করতে পারবে না। ই আই এম আই না কি সব বলে না? ওই ধরে বেরিয়ে যাবে। চল কাল থানায় ডাইরী করব। আমি তোর সাথে যাব। সাইবার ক্রাইমের ধারায় মামলা হবে। দেখ না কি করি। এদিকে ভয়ে মুখ পাংশুটে হল চৌধুরী বাবুর।
---দিদি থাক না এসব। আমার উনি এসব জানতে পারলে---আরও কি একটা বলতে যাচ্ছিলেন মিসেস রায়। কিন্তু তাঁর কথা থামিয়ে দিয়ে মিসেস চৌধুরী বললেন, বলিস কিরে ? এতো সামান্য! মীট্যুর যুগ এখন। মুখ খুলতে হবে। --- ওঃ তুমি একটু ধমক দিলেই হবে, ভয়ার্ত গলায় মিন মিন করলেন রায় গিন্নি। এবার হাসি ফুটল বিনয় বাবুর মুখে। কিন্তু ছাড়ার পাত্রী নন, মিসেস চৌধুরী।
শেষে কোথাকার জল কোথায় দাঁড়ায়, অস্থির বিনয় বাবু। রাতেই সত্য কথা টি বললেন বিনয় বাবু। স্মার্টফোনে মিসেস রায়কে ইংরেজি হরফে বাংলা মেসেজ পাঠানোর জন্য দশমীর পরের দিন বেছে নিয়েছিলেন। বিজয়ার মেসেজ পাঠানো হবে-- এই আর কি! বিনয়বাবু উত্তেজনায় টান টান হয়ে ইংরেজি অক্ষরে টাইপ করলেন, দোলায় গমন, টাইপ হল- দোহাই তোমার। সবার মরন টাইপ হল- তোমার মতন। টাইপ করলেন, ভালো থেকো, টাইপ হল- ব্লাউজ দেবো। লিখলেন, শুভেচ্ছা,--টাইপ হল সোনাটা। আর তাতেই এই ভ্রান্তি। এসব শুনে মুখ গোমরা করে মিসেস, মিঃ কে বললেন, তাই হয় নাকি। ----- মা কালীর দিব্যি! এই তোমাকে ছুঁয়ে বলছি। তাড়াতাড়ি টাইপ করতে গিয়ে ওই বদমাইশ অক্ষর গুলো যেন আঙুল থেকে ছিটকে বেরিয়ে সেন্ট হয়ে গেছিল। পরে মিসেস রায়ের মেসেজ দেখে আমি চমকে যায়। দেরি হওয়ায় আর ডিলিট হয় নি। মিসেস চৌধুরী সব বুঝলেও বিনয় বাবুর মেসেজ পাঠানোর ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেন নি। চুল না ছিঁড়লেও, অভিমানে নাকি অমন শক্ত ধাতের মহিলা খুব কেঁদেছিলেন। মিসেস রায়ের সাথে সম্পর্ক ছেদ করেছিলেন। যদিও কারণ টা তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। পুরুষ জাতির সম্পর্কে লম্বা চওড়া সার্টিফিকেট দিয়ে মিসেস চৌধুরী নাকি মহিলা মহলে বলেছিলেন, পুরুষ চরিত্র দেবতার বুদ্ধির অতীত, মনুষ্য তো সামান্য!!!
Porhe moja pelum..
ReplyDelete