মানুষের দ্বিজত্বে আশ্রম: দেবশ্রী মজুমদারের কলমে

মানুষের দ্বিজত্বে আশ্রম:: প্রনাম দেবশ্রী মজুমদারের-কলমে: “মানুষের মধ্যে দ্বিজত্ব আছে; মানুষ একবার জন্মায় গর্ভের মধ্যে, আবার জন্মায় মুক্ত পৃথিবীতে। মানুষের এক জন্ম আপনাকে নিয়ে, আর-এক জন্ম সকলকে নিয়ে”। গুরুদেবের এই কথার মর্মার্থ যে আশ্রমের একজন বুঝতে পারবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী!! হ‍্যাঁ যার কথা বলছিলুম। তিনি হলেন, বিশ্বভারতীর প্রাণী বিদ‍্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক অংশুমান চট্টোপাধ্যায়। আমরাও ভেবেছি খুব। আমাদের অবস্থান--কানু বিনে গতি নাই। জলের কথা বলছিলাম। ছোট থেকেই শোনা, জল ও জীবন সমার্থক। সবাই বুঝতে পারছি, প্রথম বিহনে দ্বিতীয় অর্থহীন। অর্থ অনর্থের মূল। এটা বেশি দিন আর বলতে হবে না। কারণ হাতে অর্থ থাকলেও, জল পাব না। এমনটা ভেবে আমরা আতঙ্কে ছিলাম। তাই হাত পা নাড়া বলতে যেটুকু বোঝায় -- ওই ফেসবুকেই সীমাবদ্ধতা! দিলাম একটা স্ট্যাটাস শেয়ার করে। ভাবলাম জব্বর দিলাম। কিছুক্ষণ অন্তর দেখলাম আড়ায় মাছ পড়েছে কিনা? মানে কমেন্ট ও লাইক। লাইকটা অনেকটা হাই হ্যালোর মত। কিন্তু কমেন্ট, হল গৃহস্থের আতিথেয়তা। সে যেমন হোক! ভেবেছিলাম চা ও নিদান পক্ষে মারি বিস্কুট। না, তা আর হল না। নিদানপক্ষে, এক গ্লাস জল। যাকে আমরা কাঁচা জল বলি। রাকা দত্ত নামে একজন ফেবু বন্ধু কমেন্টে লিখেছেন - এটা আবার কি যুক্তি হল। এমন গোছের। স্ট‍্যাট‍্যাসে ছিল- জন্ম নিয়ন্ত্রণ করুন। জল , জল করতে হবে না। এত জল কী করব ভাববেন। বুঝলাম, পেলাম, আর ঝেড়ে দিলাম, এমনটা ঠিক হয় নি। তার পরে খবরের তাগিদে নজরে এলো বিশ্বভারতীর প্রাণী বিদ‍্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক অংশুমান চট্টোপাধ্যায়ের গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জিং সিস্টেমের কাজ। নিজের বিভাগে কাজ শুরু। অনেকটা চ‍্যারিটি বিগিনস এট হোমের মত।অংশুমান চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি শান্তি নিকেতনের গুরুপল্লীতে। আদি বাড়ি হুগলীর বৈদ‍্যবাটি। চেন্নাইয়ে জল নিয়ে হাহাকার তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। না, সোশ্যাল মিডিয়ায় ওসব স্ট্যাটাসে বিশ্বাসী নন তিনি। গুরুদেবের আশ্রম যে ভাবনায় সবার থেকে এগিয়ে থাকে, যথার্থ এই শিক্ষককে না দেখলে বোঝা সহজ নয়। ইন্টারনেটে সার্ফ করলে যে হাড় হিম করা বিষয় উঠে আসে তা হল- ২০২০ সালের মধ্যে বেঙ্গালুরু, দিল্লি ও হাইদ্রাবাদের মত দেশের ২১টি নগর জল শুণ‍্য হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ ভারতীয় পানীয় জল পাবেন না। আর ২০৪০ সালে ভারতে ভূগর্ভস্থ জল ভাণ্ডার শুণ‍্য হবে। ইন্টারনেটের দৌলতে আমি আপনি সকলে আতঙ্কিত! কিন্তু করার কী কিছু নেই! জল অপচয় রোধ ও বৃষ্টির জল নিয়ে অনেক জায়গায় ' জল ধরো , জল ভরো' সরকারি প্রকল্পে কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু তাতেও সুরাহা মেলার আশা কম। এব‍্যাপারে এগিয়ে এসেছেন বিশ্বভারতীর অধ্যাপক অংশুমান চট্টোপাধ্যায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহাশয়কে চিঠি দিয়ে অনুমতি চাওয়ার পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য চেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে। যদিও এখনও তার উত্তর পান নি। তবে ২০ হাজার টাকা ব‍্যয়ে কাজ শেষ করে এব‍্যাপারে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। তাতে জানা গেছে, চেন্নাইয়ে জল নিয়ে হাহাকার শুরু হয়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুর, হুগলি ও বীরভূমে অবস্থা ভালো নয়। অংশুমান চট্টোপাধ্যায় বলেন, আমি উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী মহাশয়কে চিঠি লিখে জানিয়ে আমার বিভাগে কাজটি শুরু করেছিলাম। বর্তমানে সে কাজ সম্পূর্ণ। মাত্র পাঁচ দিনে দুটি গর্ত করে ২০ হাজার ব‍্যয় হয়েছে। এর জন্য ১০ -১৪ ফুট গর্ত করে পোড়া মাটির ছিদ্র যুক্ত তিন ফুট ব‍্যাসের রিং গুলো সিমেন্ট দিয়ে জুড়তে হবে। ছাদ থেকে রেন পাইপ দিয়ে বৃষ্টির জল সেই গর্তে ফেলতে হবে। তার আগে গর্তে তিনটি স্তর বানাতে হবে। প্রথমে থাকবে বালি, তার পর ১-২ ফুট ছোট আকারের নুড়ি পাথর। সব শেষে থাকবে বড় পাথর। যা ফিল্টারের কাজ করবে। অংশুমান বাবু জানান, প্রচণ্ড বৃষ্টির সময় জল ড্রেন দিয়ে চলে যায়। শক্ত মাটির আবরণ ভেদ না করেই বয়ে যায়। ফলে যে স্তরে জল জমা থাকে সেটা শুণ‍্যই থেকে যায়। গভীর নলকূপ, পাম্প ও সাবমার্সিবল ব‍্যবহারের কারণেই এটা ঘটে। আজকে চেন্নাইয়ে ওই স্তরে জল নেই। এটা ঘোষিত। কিন্তু এই গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জিং সিস্টেমের ফলে ওই স্তরে আবার জল জমবে। এখন থেকে এই স্বল্প খরচে স্বল্প সময়ে এই প্রকল্প গ্রহণ না করলে সেদিন আর বেশি দূরে নেই যে আমরা বিনা জলে মারা যাব। প্রানী বিদ‍্যার অধ‍্যাপক অংশুমান বাবু বলেন, নিতান্তই প্রাণের তাগিদে ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবে এই কাজে নেমেছি। ইন্টারনেট ও বাড়ির মালির সাথে কথা বলেছি। উপাচার্য মহাশয় চিঠির উত্তর না দিলেও, ধন্যবাদ জানিয়েছেন এই কাজের জন্য। অংশুমান বাবু জানিয়েছেন, কেউ সাহায্য চাইলে, এই কাজে সাহায্য করতে তিনি প্রস্তুত। এই বিশ্বকে সকলের বাসযোগ্য করে তোলার তাঁর এই প্রচেষ্টাকে কুর্নিশ জানাই। "সময়ের সমুদ্রে (আমরা) আছি,কিন্তু একমুহূর্ত সময় নেই”। তবুও বলবো তাঁর পথে হেঁটে, আমরা নিশ্চয়ই বাঁচবো।

Comments

  1. Atmoproshosa sona paap. Tobu bolbo bisoy ta niye socheton kora aar howa eto ta joruri je ektu aatmo somikkhar pryojon hoe poreche sobaar i...

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular

বর্ষাসাথী আমার ছাতি আজকে তুমি নাই:---দেবশ্রী মজুমদার

দেখবি, আর জ্বলবি, লুচির মত ফুলবি--- দেবশ্রী মজুমদার

আমার গ্রামের সাংস্কৃতিক জগতের ইতিকথা ঃ দেবশ্রী মজুমদার